ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

এ কথা এখন অস্বীকার করার উপায় নেই- ‘দি ভয়েজেস অব দীপুমনি’ মহাজোট মন্ত্রিসভার অন্যান্য মন্ত্রীকেও দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করছে। তারাও বিজয় রাজটীকা হাসিনাকে এনে দেয়ার জন্য নানাদিকে অভিযানের জোর প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন। আবুল হোসেন কেলেঙ্কারিতে ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধনের আগেই পদ্মার অথৈ জলে ডুবে গিয়েছিল সোয়া ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বৃহত্তম সেতু প্রকল্পটি। লর্ড ক্লাইভ বিশ্বব্যাংক ও কথিত দুর্নীতিবাজ দেশীয় মীরজাফর কমিশনখোর চক্র ডুবিয়ে দেয়ার উপক্রম করেছিল এটিকে। এটার জন্য বাক্যবীর সেনাপতি ওবায়দুলকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংককে না হয় খুইয়েছে আবুল- তাতে কি আসে যায়। ওবায়দুল ডুবন্ত সেতুকে বাস্তবায়ন করতে মালয়েশিয়া অভিযানে গেছেন। পদ্মা সেতু এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এই হয় হয় আর কি। ওবায়দুল যেভাবে নাঙ্গা তলোয়ার হাতে অর্থ সংগ্রহ অভিযানে নেমেছেন- দেখি এবার কে ঠেকায়। মালয়েশিয়া থেকে তিনি আস্ত একখানা সেতু নিয়ে নিশ্চয়ই ফিরবেন। তারপর সেটি পদ্মা নদীর ওপর ঠিকমত ফিটিং করা আর কয়দিনের কাজ। মহাজোটের চলতি মেয়াদেই ইনশাল্লাহ হয়ে যাবে। আর এটি হলে আমরা পদ্মা বিজয় নামে সংসদে, চীন মৈত্রী বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্র ও পল্টনে যুগপত বিজয় উত্সব করবো।

দেশে হত্যার হোলিখেলা চলে চলুক, ছিনতাই ডাকাতি চলুক- গুম গুপ্তহত্যা চলুক- কোন সমস্যা নেই। যে মন্ত্রী সাংবাদিক নেতাদের বিবেকের লাশের ওপর সাগর-রুনির খুনে ভেজা রক্তাক্ত দণ্ড ঠুকে দিয়ে পত পত করে ওড়াতে পারেন বিজয় পতাকা- তার তখত্ আগামী পৌনে ২ বছর সুরক্ষিত থাকবে ইনশাল্লাহ।

তবে মহাজোটে যে কয়েকজন বাগড়া মন্ত্রী রয়েছেন- তাদের নিয়েই যতো গণ্ডগোল। ওবায়দুল কাদের এতো বড় গলা করে মালয়েশিয়া ট্রিপে গেলেন- ঠিক সেই মুহূর্তে অর্থমন্ত্রী বেফাঁস বলে বসলেন- মালয়েশিয়ার সঙ্গে যে সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হয়েছে- তাতে কিন্তু পদ্মা সেতু নেই। মাউ (মেমেরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং)টি হয়েছে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে। পদ্মা সেতু নিয়ে নয়।

ইনু-মেননও গলা ফাটিয়ে বললেন, দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি ও ঘণ্টায় লোডশেডিং নাকি সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ইনু বললেন, কুইক রেন্টাল বিদ্যুত্ চরম ভুল। লুটপাট হচ্ছে।

মেনন সাহেব বিএনপির পক্ষাবলম্বন করতেও পিছপা হননি- লাজশরমের মাথা খেয়ে বললেন, বিদ্যুত্ সঙ্কট বিএনপির আমলের চেয়ে অনেক বেড়েছে। সরকার বিদ্যুত্ খাতে যা বলছে- বাস্তবতা তার বিপরীত।

পদ্মা সেতুর অর্থায়নের মাউ স্বাক্ষরের জন্য যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল স্বয়ং অর্থনৈতিক সম্পর্ক সচিব, সেতু সচিব- উপর্যুপরি পদ্মা সেতু প্রকল্প পরিচালককে সঙ্গে নিয়ে মালয়েশিয়া ছুটে গেছেন। ১০ এপ্রিল মাউ স্বাক্ষরও করেছেন। তেমনটাই তারা জাতিকে জানিয়েছেন। অর্থমন্ত্রীর কথা যদি সত্য হয় তবে কি মুশকিল। বাঘা মন্ত্রী, বাঘা সচিবরা কি তবে মাউ-এর পেপারগুলো না পড়েই মালয়েশিয়ায় পদ্মা সেতু জয় করতে গেলেন। সমঝোতা স্মারকের ইংরাজী কপি পঠন পাঠনে অতি দক্ষ আমাদের অর্থমন্ত্রী। তার চুলমাত্র ভুল হওয়ার কথা নয়। ওবায়দুলও কি দেশে ফিরে দীপুমনির মতো সুর পাল্টে বলবেন মাউ নয়- আমরা পদ্মা সেতু দিয়ে মালয়েশিয়ার সঙ্গে অনেক আলোচনা ও হাউকাউ করে এসেছি। তবে নবযুগের মন্ত্রী-আমলাদের অভিনব কর্মকাণ্ড অনুধাবনে অবশ্য ভুল করতে পারেন অর্থমন্ত্রী। অবকাঠামোর মাউ-এ পদ্মা সেতু পড়েই। কেননা পদ্মা সেতু অবকাঠামোর মধ্যেই পড়ে যে!

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেখছি- পদ্মা বিজয় ও বিদ্যুত্ বিজয় নিয়ে মস্ত গ্যাড়াকলে পড়েছেন। কুইক রেন্টাল করে বিদ্যুত্ সেক্টরে মহাবিজয়ের কথা তিনি সংসদে মহা আড়ম্বরে ফলাও করে বলেছিলেন। কেউ যাতে লোডশেডিং ভুলে না যায়- সেজন্য প্রতীকী লোডশেডিং দিয়ে মানুষকে অতীত-ইতিহাস সচেতন রাখার প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তার সরকারের অলঙ্কার এবং বিদ্যুত্ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জেনারেল (অব.) সুবিদ আলী ভুইয়ার কণ্ঠে একি উদ্ভট কথা শুনলাম আমরা। ইনু-মেননের কণ্ঠেও কি শুনছি! ‘বিদ্যুত্ সঙ্কট ও জনস্বার্থ’ শীর্ষক ওয়ার্কার্স পার্টির গোলটেবিলে ৯ এপ্রিল ’১২ সুবিদ আলী বললেন, বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাত নিয়ে আমাদের সরকারের নেয়া সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হয়েছে। দ্রুত বিদ্যুতের পরিকল্পনা ব্যর্থ প্রমাণ হয়েছে। বিদ্যুত্ সমাধান তো হয়নি- বরং অর্থনৈতিক অবস্থাও খারাপ হয়েছে।

এসব কথা সত্যি সুবিদ আলী বলেছেন তো! হঠাত্ মহাজোটের মহা বিদ্যুত্ বিজয়ের সুর পাল্টে তিনি ভরাডুবির কথা কেন বলছেন! কোথায় গেল প্রধানমন্ত্রীর প্রত্নতাত্ত্ব্বিক লোডশেডিং।
ইনু-মেননও গলা ফাটিয়ে বললেন, দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি ও ঘণ্টায় লোডশেডিং নাকি সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ইনু বললেন, কুইক রেন্টাল বিদ্যুত্ চরম ভুল। লুটপাট হচ্ছে।
মেনন সাহেব বিএনপির পক্ষাবলম্বন করতেও পিছপা হননি- লাজশরমের মাথা খেয়ে বললেন, বিদ্যুত্ সঙ্কট বিএনপির আমলের চেয়ে অনেক বেড়েছে। সরকার বিদ্যুত্ খাতে যা বলছে- বাস্তবতা তার বিপরীত।
সুবিদ আলী বললেন, দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে বিদ্যুত্ দুর্নীতি ও লুটপাট বন্ধ করতে হবে। মহাজোট সরকার প্রাইভেট লিমিটেডের বিরুদ্ধে কী অশ্রাব্য অকথ্য অপপ্রচার। প্রধানমন্ত্রী যা বলছেন- ঠিক তার আকাশ-পাতাল উল্টো বলা। ইনু-মেনন-সুবিদ এরা মহাজোটে আছেন তো। আমরা যারা প্রধানমন্ত্রীকে বিনা বাক্যব্যয়ে বিশ্বাস করি- তাদের কাছে এসব কথা অসহ্য লাগছে। কদিন আগে ইনু সাহেব স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার মতো উস্কানি দিয়ে বসলেন- বললেন- সরকারের ভুলত্রুটির জন্য আমাদের জুতা মারুন।

ইনু তো বলেই খালাস। তিনি কোন মন্ত্রণালয় পাননি। জনগণ যখন জুতা মারতে শুরু করবে- তখন একটাও তার গালে পড়বে না। তিনি উস্কানির স্লোগান দিয়ে দায় এড়ানোর তালে আছেন। মহাজোটের এইসব ঘরের শত্রু বিভীষণকে চিহ্নিত করা দরকার। বাক স্বাধীনতা মানে বিদ্যুতের অবিরাম জোয়ারকে অমাবশ্যার ভাটা বলার স্বাধীনতা নয়। নৌকায় চড়ে দিব্যি নির্বাচনের বৈতরণী জয় করলেন, এখন দুর্দিনে উথাল সমুদ্রে নৌকাকে রেখে ইমার্জেন্সি লাইফ বোটে চড়ে পালাবেন- এটা হতে দেয়া যায় না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাংবাদিকদের জয়

এবার সন্দেহাতীত নিরঙ্কুশ জয় দিয়ে আজকের কলামের ইতি টানতে চাই। বাংলায় বক্তৃতা দিয়ে বঙ্গবন্ধুর বিশ্ববিজয়ের মতো কিছুদিন আগে দিল্লীতে বাংলায় প্রেস কনফারেন্স করে ভারত সভা জয় করার চমত্কার চেষ্টা চালিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন। তার অনুপ্রেরণা বঙ্গবন্ধু। তিনি সদা মুজিব অনুরাগী। তবে তার পরিকল্পনায় গলদ ছিল। তিনি সঙ্গে করে ড. কামাল-হুমায়ুন রশীদ মার্কা দক্ষ ইংরাজী জানাঅলা নিয়ে যাননি। তাই দিল্লীর সাংবাদিককুলের মন জয়ের বদলে হাসির পাত্রে পরিণত হন তিনি। তা নিয়ে দেশেও নিন্দুকেরা কম নিন্দাচর্চা করেনি। কেন তিনি দিল্লীর কূট-সাংবাদিকদের ফার্মগেটের মোড়ে হরতালের দিন অবস্থানরত মাঠ সাংবাদিক ভাবলেন- সে নিয়ে রসময় প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

তা নিয়ে যতো হাসাহাসি হোক- অবশেষে বহুত ছুপা রুস্তম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন তিনি। সাম্প্রতিককালে মহাজোট সরকার ও শেখ হাসিনাকে সবচেয়ে বড় বিজয়টি এনে দিয়েছেন তিনিই। রাজনৈতিক-প্রশাসনিক বিচারে এটি সমুদ্র জয়ের চেয়েও বড় অর্জন।

কূটনীতিক খালাফ এবং সর্বোপরি সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড নিয়ে অসম্ভব পেরেশানিতে দিন যাচ্ছে শেখ হাসিনার। সাংবাদিক হত্যা ইস্যুতে দেশের সাংবাদিক সমাজ রাতারাতি ঐক্য গড়ে তুললো। সরকার সমর্থক সাংবাদিকরা বিরোধীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে অবস্থান ধর্না কলমবিরতি করলো। সর্বাত্মক কর্মসূচির হুমকিও দিল। এটা গ্লোবাল মিডিয়া যুগ। দেশ-বিদেশে সরকারের ইমেজ ভূলুণ্ঠিত হয়ে পড়েছিল। মিয়ানমারের হাতে সেন্টমার্টিনের অবস্থান রেখা হাতছাড়া হয় হোক- ব্লক যাক। তাতে কিছু আসে যায় না। সাংবাদিকরা সাগর-রুনি ‘ফালতু ইস্যু’ নিয়ে সরকারের ইজ্জতহানি ঘটাতে চলছিল।

যে সাংবাদিক নেতারা আট ঘাট কাছা কোমর বেধে বলেছিলেন- বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সুচ্যগ্র মেদেনী। তারা তাদের মস্ত মস্ত বজ্রকণ্ঠ বক্তৃতা-ওয়াদা- সব শপথ বন্ধক রেখে এলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চায়ের চুমুকে।

সেই বেয়ারা-বেয়াদব সাংবাদিকদের জয় করে দেখালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। মাঠ রাজনীতির অসাধারণ ক্যারিশমায় তিনি সাংবাদিক নেতাদের তার মিন্টো রোডের বাসায় ডাকলেন। চা খাওয়ালেন। জাদুমন্ত্র করলেন। তারপর ঐন্দ্রজালিক ঘটলো। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্নেহের ছোয়ায় ভেজা বেড়াল হয়ে গেলেন সাংবাদিক নেতারা। মন্ত্রীর বাসার চায়ের কি অপূর্ব স্বাদ। তারা সব ধরনের কর্মসূচি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখলেন। যে সাংবাদিক নেতারা আট ঘাট কাছা কোমর বেধে বলেছিলেন- বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সুচ্যগ্র মেদেনী। তারা তাদের মস্ত মস্ত বজ্রকণ্ঠ বক্তৃতা-ওয়াদা- সব শপথ বন্ধক রেখে এলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চায়ের চুমুকে।
সমুদ্র জয়, বিদ্যুত্ জয় ইত্যাদি বিতর্কিত ভুয়া বিজয়ের ডামাডোলে একেবারেই লাইমলাইটে আসেনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সাংবাদিক নেতাদের বশীকরণ- বিজয় কাহিনী।

দেশে হত্যার হোলিখেলা চলে চলুক, ছিনতাই ডাকাতি চলুক- গুম গুপ্তহত্যা চলুক- কোন সমস্যা নেই। যে মন্ত্রী সাংবাদিক নেতাদের বিবেকের লাশের ওপর সাগর-রুনির খুনে ভেজা রক্তাক্ত দণ্ড ঠুকে দিয়ে পত পত করে ওড়াতে পারেন বিজয় পতাকা- তার তখত্ আগামী পৌনে ২ বছর সুরক্ষিত থাকবে ইনশাল্লাহ।