ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কথায় ভীষনভাবে আপ্লুত হয়েছি। তার প্রজ্ঞা, জাতীয়-আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে জ্ঞানগম্যি সম্পর্কে আনিস স্যার, হক ভাইসহ নানাজনের কাছে অনেক প্রশংসা শুনেছি। শুনেছি- এমন জানাশোনা লোক আর হয় না। এতদিনে একজন যুগ্যি লোকের হাতে আওয়ামী লীগের বিভ্রান্ত তরণির বৈঠা তুলে দেয়া হয়েছে। তিনি মস্ত-কাণ্ডারী। নিশ্চয়ই সঠিক বন্দরে নৌকা ভিড়াতে পারবেন। তার মোক্ষম প্রমাণও পাচ্ছি।

লোকমুখে শুনেছি- নোবেল পুরস্কার জয়ের নানা উপায় নিয়ে তিনি গবেষণা করছেন। সত্য মিথ্যা জানি না, সেই গবেষণার কয়েক ফোঁটা জ্ঞান সম্প্রতি তিনি বিতরণ করেছেন। জ্ঞান তো নয়- অমৃত সুধা। এমনও শুনেছি- তিনি ওই জ্ঞান সর্বসমক্ষে জ্ঞাপন করার পর ঢাকা ও সারাদেশের শুঁড়িখানায় নিয়মিত যাতায়াতকারীরা ‘চিয়ার্স’ বলে উল্লাস প্রকাশ করছেন। কোথাও কোথাও মদ্যসেবীর সংখ্যা বেড়ে গেছে। নতুনরা ভীড় করছে। নোবেল পুরস্কার পেতে কার না মন চায়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পাওয়ার পর কোলকাতার বাবু ও দাদারা একটি মিথ্যা ধারণা কয়েক যুগ ধরে জগদ্দল করে রেখেছিল- এটি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি না হলে পাওয়া যায় না। এটি কোহিনুর হীরক খণ্ডের চেয়েও দামি।

এইসব আধমরা জীর্ণ পুরাতনদের পশ্চাদদেশে এক ঘা মেরে সৈয়দ সাহেব হাটে হাড়ি ভেঙে দিয়েছেন। নোবেল পুরস্কার কেন্দ্রিক রাবিন্দ্রিক তথা অমর্ত্য-ইউনূসীয় এসটাবলিস্টমেন্টের মিথ্যা মিথটিকে তিনি তুলাধুনা করে ছেড়েছেন। শুড়িখানার মদ্যপদের জন্য নোবেল পুরস্কারের দরোজা খুলে দিয়েছেন। এটি পাওয়ার সহজ তরিকাটি বাতলে দিয়েছেন।

আমরা যেমন সবাই বঙ্গবন্ধু হওয়ার স্বপ্ন দেখি- দিলীপ বড়ুয়া, সৈয়দ আশরাফের মতো ‘মওকা-এ উজির’ হওয়ার স্বপ্ন দেখি- তেমনি এখন আমরা নোবেল বিজয়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারবো। আশরাফ ভাইকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষা আমার জানা নাই। আশা করা যায়- অচিরেই বাংলাদেশ নোবেলে নোবেলে ভরে উঠবে। কেননা শুড়িখানায় গিয়ে বাংলা ওয়াইন, পাঁচতারকা হোটেলসহ দামি বারে গিয়ে ওয়াইন পান করেন- এমন বাঙালির সংখ্যা কম নয়।

এবার আশরাফ সাহেবের মহাজনী তরিকাটি একটু উদ্ধৃত করতে চাই। তিনি বলেছেন- ‘চিজ স্যান্ডউইচ আর সাদা ওয়াইন খেলে জনপ্রিয়তা বাড়ে। সময়মত একটা নোবেল পুরস্কারও পাওয়া যায়। আশরাফ বলেছেন- নোবেল পুরস্কার কিভাবে আসে- তা অনেকেই জানেন। আয়ারল্যান্ডের দুই গৃহবধূ হঠাত্ করে সেদেশে শান্তি আন্দোলন শুরু করলেন। ‘মাদারল্যান্ড পিস’ নামে সংগঠন করলেন। এই সংগঠন করার ২ মাসের মধ্যে তারা নোবেল পান। আর নোবেলের টাকা ভাগ নিয়ে দুই নারীর মধ্যে ঝগড়া বেধে যায়। তিন মাসের মধ্যে তাদের ঝগড়া আদালতে গড়ায়।

সৈয়দ আশরাফের জ্ঞানগম্যির দৌড়টা দেখুন, শুনেছি টিভি টকশো’র জন্য সঞ্চালকরা হন্যে হয়ে বুদ্ধিজীবী ও বুদ্ধিধরদের খুঁজে বেড়ান। দেশে বুদ্ধিধরদের সংখ্যা নেহাতই কম বলে হাত আঙুল আর থুতনি নাড়া কথার ভাঁড় গোপালদের চর্বিত বক্তব্য শুনে শুনে দর্শকশ্রোতারা ক্লান্ত। গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায়- সৈয়দ সাহেবকে নিয়মিত নেয়া হলে ওইসব টকশো’র টিআরপি আসমানে উঠে যাবে। বিশেষ করে বৈশাখী টিভিকে সুপারিশ করবো- ডেসটিনির এমডিকে আর না এনে সৈয়দ আশরাফকে নিয়ে ‘নোবেল জয়ের সহজ উপায়’ সংক্রান্ত সিরিজ টকশো’ করুন। তাতে বৈশাখীও জনপ্রিয় হবে। আবার ঈশ্বরের কৃপায় ডেসটিনিও বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবে।

ইতোমধ্যেই আশরাফের ‘সাদা ওয়াইন’ তত্ত্ব বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। হাজার হাজার নোবেল প্রত্যাশী তরুণ, কবি সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ- সমাজকর্মী সাদা ওয়াইন সন্ধান করছেন। চিজ স্যান্ডউইচ ঢাকায় খুবই সহজলভ্য। সাদা ওয়াইন বলতে যদি বাংলা মদকে বোঝান- তাও সহজলভ্য। কিংবা অন্য দামী- অতি দামী- কম দামী- সবরকম ওয়াইনই ঢাকায় সুলভ। পয়সা দিলেই মেলে। রাজনীতিবিদদের জন্য টাকা-পয়সা এখন আর কোন ব্যাপার নয়। মদ খেতে আর ক’পয়সা লাগবে। কবি সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীরাও সমুদ্র জয়- তিস্তা জয় বিষয়ক নানা গ্লোবাল সংবর্ধনার আয়োজন করে ভালোই কামাচ্ছেন।

এখন সৈয়দ সাহেব যদি সঠিক ব্রান্ডটি বাতলে দিতেন- তাহলে উত্সুক মানুষ সেটি পানাহার শুরু করতে পারেন। কেন যেন এই ব্র্যান্ডের রহস্য একমাত্র সৈয়দই জানেন বলে ধারণা করছেন সবাই। ইন্টারনেটে এক নোবেল প্রত্যাশী যুবকের মন্তব্য দেখলাম- চিজ-স্যান্ডউইচ-কাবাব খাচ্ছি- এখন সাদা ওয়াইনের বদলে ফেনসিডিল খেলে হবে কিনা স্যার বলুন- রাজনৈতিক শুঁড়িখানায় ফেনসিডিল তো আরও বেশি জনপ্রিয়।

আরেক বিজ্ঞ বেরসিক বলছেন- সৈয়দ আশরাফের বাতলে দেয়া তরিকায় ড. ইউনূসের নোবেল পাওয়ার কথা নয়- বরং মন্ত্রিসভায় যেসব সুযোগ্য সাদা ওয়াইন সেবী রয়েছেন। তারা কবে নাগাদ নোবেল পাচ্ছেন।

জানি না- এই ইন্টারনেটসেবী কার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। তবে কেউ একজন যে আছেন ধারণা পাওয়া গেল। কে তিনি- সেটা সর্বজ্ঞ নেত্রী ভালো বলতে পারবেন। তার জানার কথা।

তবে সৈয়দ সাহেব যতো বড়ই মহাজ্ঞানের মাস্টার হন না কেন- আমার মতো মহাজোট সরকারের ভক্তদের জন্য তিনি অতিশয় দুঃখজনক বার্তা বয়ে এনেছেন। আমরা সকলেই জানি এবং বিশ্বাস করি- মহাজোট নেত্রী শেখ হাসিনা নোবেল শান্তি পুরস্কারের একজন হকদার। তাকে ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তিনি এবং তার ভ্রাতা আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি এনেছেন। শান্তি চুক্তি করেছেন। তাদের যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পাওয়া উচিত ছিল।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলের আগ্রহ ও আকাঙ্ক্ষা সুবিদিত। দেশের এটর্নি জেনারেল মাহবুব-এ আলম খোদ আদালতে দাঁড়িয়ে এই সত্যটি সবার সামনে তুলেও ধরেছেন। হায় হায় এবার কি হবে?
সৈয়দ আশরাফ খোদ মহাজোটের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের কাণ্ডারি হয়ে নেত্রীর পথে কাঁটা বিছালেন। দেশের অন্য সব সম্ভ্রান্ত পরিবারের কথা জানি না- কিন্তু শেখ পরিবারে সাদা ওয়াইন হারাম- নাজায়েজ ঘৃণ্য বস্তু। আলজিয়ার্সে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে যখন বঙ্গবন্ধু অংশ নেন- তখন অবকাশ কেন্দ্রে তার তাঁবুতে মদের ট্রলি ঠেলে আনা হলে তিনি চরম ঘৃণা সহকারে- তীব্র তিরস্কারে তা প্রত্যাখ্যান করেন। সেই বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির অনুসারি হয়ে সৈয়দ আশরাফ এ কোন ‘মদ্য তরিকা’ এসতেমাল করলেন। তাছাড়াও নোবেল বিজয়ী দুই নারীর গল্প বলে তিনি কি বোঝাতে চাইলেন- তাও আমাদের মত নির্বোধদের কাছে রহস্যাপূর্ণ ঠেকছে।

আশরাফের ‘ওয়াইন তরিকা’র অবতারণা; সেটা কি ড. ইউনূস, অমর্ত্য সেন, মাদার তেরেসা- রবীন্দ্রনাথকে খাটো ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার জন্য— নাকি আমাদের দেশনেত্রীর ভক্তদের নোবেল প্রত্যাশার স্বপ্নকে ভণ্ডুল করার কোন ষড়যন্ত্র- তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

মহান মওলানা ভাসানী যখন তার পল্টনের বক্তৃতায় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি নিয়ে বজ্রকণ্ঠে মুজিব সরকারকে কথার চাবুক দিয়ে চাবকাতেন- তখন আগুনের হলকায় কিঞ্চিত্ ঠাণ্ডা জল ঢেলে আস্তে করে বলতেন- নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের পাশাপাশি মদের দামও বেড়েছে। অবশ্য এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। কিন্তু আমার এই যাদু জানে। অগ্নিমূর্তি জনসভায় তখন এক পশলা হাসির ঝরনা বয়ে যেতো। মহাজোট মন্ত্রিসভায় তেমন কোন স্নেহের ‘যাদু’ ঘাপটি মেরে আছে কিনা- সে রহস্যও খোলাসা হওয়া দরকার।