ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

কেমন বিদঘুটে কাণ্ড বলুন তো! মমতা ব্যানার্জিকে টিভি অনুষ্ঠানে ডেকে জনগণের সামনে বেইজ্জত করার পাক্কা ষড়যন্ত্র হয়েছিল। ভাগ্যিস! দিদি আগেই টের পেয়ে গিয়েছিলেন। তাই তিনি লাইভ প্রোগ্রাম ছেড়ে সরে পড়তে মোটেই দেরি করেননি। পোড় খাওয়া নেত্রী। ছাইয়ের গাদায় ধোঁয়া দেখলেই বুঝতে তার অসুবিধা হয় না—ভেতরে আগুনটা আছে কি নেই! তিনি যদি সেদিন কলকাতার সিএনএন-আইবিএন টিভির ওই ‘মমতার ক্ষমতার বর্ষবরণ’ অনুষ্ঠান থেকে সটকে না পড়তেন, কী অপমানই না হতেন।

কলকাতার গণতন্ত্রের মানসপুত্রীর বিরুদ্ধে বাম-মাও-লেনিন-মার্ক্সীয় শত্রুরা একজোট হয়ে কোমর বেঁধে এসেছিল। একটার পর একটা ফালতু প্রশ্ন দিদিকে করা হচ্ছিল। অম্বিকেশ মহাপাত্র নামে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কুলাঙ্গার শিক্ষক দিদিকে নিয়ে নোংরা কার্টুন এঁকে ফেসবুকে ছড়িয়ে দিচ্ছিল। না, না, ওটা কার্টুন বা ব্যঙ্গচিত্র মোটেই নয়, ওটা সিপিএম-মাওবাদীদের গোপন ষড়যন্ত্র। ওরা কার্টুন দিয়ে দিদিকে ক্ষমতা থেকে হটাতে চেয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর দিদির হানিমুন পিরিয়ড এখনও কাটেনি। মাত্র তো এক বছর পূর্তি হলো। এর মধ্যেই একটা ব্যঙ্গচিত্রের ভয়ে তিনি মসনদ ছেড়ে কেটে পড়বেন, সে হয় না। তাই সময় থাকতে তিনি কঠিন পদক্ষেপ নিয়েছেন। ওই লোকটা কিসের অধ্যাপক? কিসের ইনটেলেকচুয়াল। ও একটা আস্ত শয়তান। তাই দিদিমণির লোকেরা মামলা ঠুকে দিয়েছে। ভণ্ড-প্রতারক অধ্যাপককে জেলে পাঠানো হয়েছে। এটা তো দমন-পীড়ন-দলনের এমন কোনো কাণ্ডই নয়। ষড়যন্ত্রী অধ্যাপককে নমুনা পানিশমেন্ট আর কি!

আর তা নিয়ে কিনা সিএনএন-আইবিএনের ওই অনুষ্ঠানে মাওবাদীদের এক নারী-চর ম্যাও ম্যাও করে উঠল। জবাবদিহি চাইল সে, কত বড় সাহস!
মমতাদি হচ্ছেন গণতন্ত্রের মানসপুত্রী। খোদ মার্কিন পাওয়ার লেডি হিলারি ক্লিনটন তাকে সার্টিফিকেট দিয়ে গেছেন। আমেরিকায় গিয়ে দিদিকে নিয়ে অনেক প্রশংসাও করেছেন।
এমন একজন ‘মিস ডেমোক্রেসি’কে তার কৃতকর্ম নিয়ে প্রশ্ন করাই অন্যায়। এটা গণতন্ত্রের অপমান। দিদি তখন অনুষ্ঠান ছেড়ে না গিয়ে কী করবেন?

দৃশ্যটা দেখতে খানিকটা কটুই লেগেছে সবার চোখে। লাইভ প্রোগ্রামে দিদি প্রশ্নকর্মীকে তুই-তোকারি করলেন, তুই তো মাওবাদী! এখানে তোরা মাওবাদী ছাড়া অন্য কেউ কি নেই? যাদবপুর ভার্সিটির ওই শিক্ষক একটা কালপ্রিট। ও সিপিএমের লোক। পেইড ব্লগার। ও বুদ্ধিজীবী হতে পারে না।

শাড়ির আঁচলটা আলতো হাতে গুছিয়ে ক্ষুব্ধ রুষ্ট দিদিমণি লম্বা লম্বা পায়ে অনুষ্ঠান থেকে লম্বা দিচ্ছেন—সে দেখার মতো দৃশ্য বটে। তার পেছন পেছন অনুষ্ঠানের সঞ্চালিকা ছুটছেন—হাতে-পায়ে ধরছেন। দিদি হাত নেড়ে তীব্র ক্ষোভ ঝাড়ছেন—এমন ‘লাইভলি ডেমোক্রেসি’ সিনেমা ছাড়া খুব একটা দেখা যায় না।

ঘোরতর শত্রুরা দলবেঁধে বলছে, বিগড়ে যাওয়া মেজাজকে কন্ট্রোলে রাখতে পারেননি তৃণমূল নেত্রী। এভাবে অনুষ্ঠান থেকে মাঝপথে সিন ক্রিয়েট করে চলে যাওয়া অর্ধশিক্ষিত একটা কাজ। ক্ষমতার মমতায় মাথা খারাপ দশা মিস ব্যানার্জির। অকালে মুখ্যমন্ত্রীর বোধন ঘটেছে বলেই এই কদর্য বাড়াবাড়ি। সওয়াল জওয়াব-টিভি টকশো গণতন্ত্রেরই একটা প্র্যাকটিস। সেটাকে পায়ে মাড়িয়ে মমতা এভাবে দম্ভ দেখাতে পারেন না। তাছাড়া মমতার জমানায় কেউ সিপিএমকে সমর্থন করতে পারবে না, এমন আবদার বড় অন্যায়।

নিন্দুকেরা এসব কথা বলবেই। কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের একটা সমস্যা—ওরা বাইরের দুনিয়ার খবর কিচ্ছু জানে না। এমনকি কাঁটাতারের ওপারে পূর্ব সীমান্তে যে ওপার বাংলা—বাংলাদেশ, সেই দেশটার বাংলা খবরও ওই লোকগুলো জানে না। ঢাকার টিভি চ্যানেলগুলো কলকাতায় বন্ধ রাখা সত্যিই মস্ত বড় ভুল হচ্ছে। বাংলাদেশ সম্পর্কে কলকাতাবাসী সত্যিই বেখবর। যদি প্রতিদিনকার ঢাকাই নিউজগুলো আনকাট দেখতে পারত- কলকাতার এই বাম ইনটেলেকচুয়ালরা বুঝতে পারত—গণতন্ত্র কত প্রকার ও কী কী! বাম জমানার কারাগারে ৩৫ বছর বন্দি থেকে এরা ভুলেই গেছে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা।

আমি এপার বাংলার একজন ক্ষুদ্র কলামিস্ট হিসেবে মমতা দিদিমণির অভিমানকে সহানুভূতির সঙ্গে দেখি। তিনি ক্ষুব্ধ রুষ্ট হতেই পারেন। কষ্ট পেতেই পারেন। এমনকি অনুষ্ঠান ছেড়ে গিয়েও কোনো অশ্লীল কাজ করেননি।

কলকাতাবাসী ঢাকাই টিভি দেখতে পায় না বলে তারা ঢাকার ‘বিশ্বের মডেল গণতন্ত্র’ সম্পর্কে বেখবর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি সগৌরবে আত্মতৃপ্তি ও অহংকারের সঙ্গে বলেছেন, বাংলাদেশের অগ্রগতি এখন বিশ্বের মডেল।

প্রধানমন্ত্রীর কথা যদি সত্য হয়, ধারণা করা যায়, বিশ্বের দেশে দেশে বাংলাদেশকে নিয়ে এখন গবেষণা হচ্ছে। আলোচনা হচ্ছে। সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হচ্ছে। লাটভিয়ায় হচ্ছে, বেলারুশে হচ্ছে। সবাই ‘ডেমোক্র্যাসি ও সুশাসন : বাংলাদেশ স্টাইল’ নিয়ে নানাভাবে জানতে আগ্রহী। এই স্টাইলে দেশ শাসনের পদ্ধতি অনুসরণ করতে চাইছে সবাই। আমাদের পর্যটক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি দেশীয় নিন্দুকদের কাছে ভারতবন্ধু—বন্ধুহীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নামে নিন্দা কুড়ালেও বহির্বিশ্বে নিশ্চয়ই প্রবল জনপ্রিয়। বাইরে তার প্রচণ্ড ডিমান্ড। তিনি একা একা বিভিন্ন দেশে যান—আমাদের সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়ে যান না বলে তার এই কৃতিত্বের দিকটা সম্পর্কে আমরা জানি না। তার সঙ্গে গেলে নিশ্চয়ই জানতে পারতাম, তিনি সেসব দেশে কত মহা সমারোহে অভিনন্দিত হচ্ছেন। আশা করি, আগামীতে তিনি আওয়ামী ঘরানার কিছু সাংবাদিক অবশ্যই নিয়ে যাবেন। তারা দেশে এসে তার মহত্ কীর্তিকাণ্ডের কথা সবিস্তারে লিখবে। জাতি তখন জানতে পারবে আসল রহস্য। আমি এমনিতেই প্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একনিষ্ঠ ভক্ত। তারা যাই বলেন, তাই ভালো লাগে। তাদের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা এমন বিশাল যে তাদের কথাবার্তাতেই মুগ্ধ মনে ধারণা করতে পারি, কোথায় কী হচ্ছে! কেন হচ্ছে।

পত্রিকান্তরে পড়েছি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাড়ে তিন বছরে শতাধিক দেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন। কেউ কেউ টিটকিরিও দিচ্ছে—শাহজালাল বিমানবন্দর তার জন্য নাকি ট্রানজিট প্যাসেজ। আফটার অল বাংলাদেশের মন্ত্রী। মাটির টান একটা থাকবেই। তাই কোনো দেশ থেকে বিমান তাকে ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছে দিতেই তিনি আরেক দেশের অভিমুখে অন্য বিমানে চড়ে বসেন। মোটামুটি বিমানবিহারেই তিনি রয়েছেন। এই যে শতাধিক দেশ তিনি পরিভ্রমণ সাঙ্গ করেছেন, তারপরও তার মনে শান্তি নেই। জুলেভার্নে লিখেছিলেন, অ্যারাউন্ড দি ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ। মাত্র আশি দিনে সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়ানো সম্ভব। জুলেভার্নে ওই বৈজ্ঞানিক পরিভ্রমণ কথা যখন লিখেছিলেন, সেই সময়ের তুলনায় বিশ্ব এখন নিশ্চয়ই আকারে আয়তনে বড় হয়ে যায়নি। সেই আগের আকারেই রয়েছে। যদি তাই হয়, তবে মস্ত লজ্জার কথা। গেল শতাব্দীতে মাত্র আশি দিনে সারাবিশ্ব ভ্রমণ সম্ভব ছিল, সেখানে এখন ডিজিটাল একবিংশ শতাব্দী চলছে। বিমান পরিভ্রমণ ব্যবস্থা আরও আরামদায়ক—আশ্চর্য উন্নত হয়েছে। বিমানের বিজনেস ক্লাস, যতদূর শুনেছি, দুবাইয়ের সেভেন স্টার হোটেলের চেয়েও বেশি আরামদায়ক।

এমন বিলাসবহুল জমানায় তিনি কিন্তু সময় ও সুযোগের যথার্থ সদ্ব্যবহার করতে পারেননি। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। ২৫ বছর বা ৪২ বছর মেয়াদি ক্ষমতা—মূর্খজন ছাড়া ওসবে বিশ্বাস করতে নেই, যা করতে হবে এখনই।

তাছাড়া তিনি যথেষ্ট সময় পেয়েছেন। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার ওবায়দুল কাদের বা সুরঞ্জিতের মতো গোধূলি লগ্নের বা বেলাশেষের মন্ত্রী তিনি নন। তিনি বেলাশুরুর মন্ত্রী। মহাজোট প্রাইভেট লিমিটেডে তিনি শুরু থেকেই পূর্ণ মন্ত্রী। পূর্ণ বেনেফিসিয়ারি। এরই মধ্যে সাড়ে তিন বছর অর্থাত্ ১২৭৬ দিন চলে গেছে। কী মূল্যবান একেকটা দিন! ক্ষমতাহারা হলে সবকিছু মূল্যহীন, অসার হয়ে পড়বে। তখন এই সমুদ্রজয়ী দীপু মনি সেই পুরনো ডাক্তার দীপু মনি হয়ে পড়বেন। কেউ আর বিশ্বপর্যটক বলে সম্মানের আসনে বসাবে না। যেখানে মাত্র ৮০ দিনে সারা দুনিয়া ভ্রমণ করা সম্ভব, সেখানে ১২৭৬টি মূল্যবান দিন চলে গেল, আর দীপু মনি কিনা সবে সেঞ্চুরির কোটা পূরণ করেছেন। হাতে মাত্র বাকি দেড় বছর। এই গতিতে চললে বিশ্বভ্রমক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলে গিনেস বুকে তার নাম লেখানো হবে না। বাংলাদেশের নারীরা অনেকেই কিছু না কিছু একটা করে গিনেস বুকে নাম লিখিয়ে ফেলছেন। তবে তারা যা কিছু দেশের মধ্যেই করছেন। দাবার সম্রাজ্ঞী রাণী হামিদ—অসংখ্যবার জাতীয় নারী দাবা চ্যাম্পিয়ন হয়ে গিনেস বুকে ঠাঁই নিয়েছেন। টেবিল টেনিস কুইন জোবেরা লুনাও জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে কোয়ার্টার সেঞ্চুরি করার পথে। তিনি গিনেস বুকে উঠে গেছেন। গানের কোকিল মমতাজ—তিনি দেশীয় পর্যায়ে বস্তা বস্তা ডিস্ক বের করে গিনেস বুক আইটেম।

এ নিয়ে তাদের কত অহংকার। ভাবখানা যেন তারা বিশ্বজয় করেছেন। তারা বিশ্ব ইতিহাসের অংশ। অথচ বাস্তবে সবকিছুই তারা করেছেন দেশের মধ্যে। ডা. দীপু মনি এক্ষেত্রে বিরল কাজটি করেছেন। তুল্যমূল্য হিসাব দস্তুর করলে এরই মধ্যে দীপু মনির বিশ্বভ্রমণের বিশ্ব রেকর্ডটা হয়ে গেছে বলে আশা করা যায়। তারপরও ঝুঁকি নেয়া ঠিক হবে না।

গিনেস রেকর্ড বুক কর্তৃপক্ষের শরণাপন্ন হওয়ার আগে নিজের কোমরটা শক্ত করে নেয়াই উত্তম। দীপু মনির হয়েই গিয়েছিল, কিন্তু মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এক্ষেত্রে কিঞ্চিত্ সংশয়ের সৃষ্টি করেছেন। কে তাকে প্ররোচনা দিয়েছে কে জানে! হয়তো বাংলাদেশ থেকেই হিলারির কোনো পুরনো বন্ধু এবং দীপু মনির প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ কোনো শঠ ষড়যন্ত্রকারী মার্কিন ঘরকুনো হিলারিকে উস্কে দিয়ে থাকবেন। আর তাই হিলারিও কোমর বেঁধে ওয়ার্ল্ড ট্যুরে নেমে পড়েছেন। মার্কিনিদের অঢেল পয়সা; বিশ্বমোড়ল তারা। খোদ বিমানবাহিনীর লেটেস্ট উড়োজাহাজ নিয়েই তিনি সদলবলে ঘুরছেন। কেন তার এই চিত্তবিভ্রম! আমেরিকা এত সুন্দর দেশ! এত আরাম-আয়েশ সেখানে! তা ফেলে বাংলাদেশ, যেখানে থাকার মতো ভালো একটা পাঁচতারা হোটেল নেই, যে দেশের খাবার মুখে তোলার অযোগ্য; কলকাতা—সিটি অব বস্তি; পাকিস্তান—তালেবান মৃত্যু উপত্যকা—এসব দেশে প্রাণ হাতে নিয়ে কেন ঘুরছেন হিলারি! তার কি প্রাণের মায়া নেই। তাকে কি এখন হিপ্পিদের মতো নোংরা যাযাবর জীবন-বিলাসিতায় পেয়ে বসেছে!

হিলারি এভাবে হঠাত্ বিশ্বভ্রমণ রেসে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত না হলে দীপু মনি হেসে-খেলেই ‘বিশ্ববিজয়ী’ খেতাবটা ছিনিয়ে নিতে পারতেন। তবুও আশা করা যায়, বয়সে দীপু মনির চেয়ে অনেক সিনিয়র হিলারি শেষ পর্যন্ত পারবেন না। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে চ্যালেঞ্জ নেন, তা জিতে ছাড়েন।

অনেকেই বলে ফিরছে, নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার দৌড়ে ড. ইউনূসের কাছে আমাদের প্রকৃত যুদ্ধবিজয়ী ও সমুদ্রবিজয়ী প্রধানমন্ত্রী দুঃখজনকভাবে হেরে গেছেন। তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
এই ইউনূস কিন্তু ওই লেডি হিলারির সাবেক কুটুম্ব-আত্মীয় এবং ভার্সিটি জীবনের বন্ধু। ইউনূসের বান্ধবীকে হারিয়ে অতি অবশ্যই বদলা নিতে হবে দীপু মনিকে। তাতে বাংলাদেশের মর্যাদা বাড়বে। আর যাই হোক পরবর্তী প্রজন্ম বলতে পারবে, আমাদের দীপু মনি হারিয়েছিলেন হিলারিকে। মধুর বদলা নিয়েছিলেন নোবেল পুরস্কার বঞ্চনার।

দীপু মনির হাতে বিশেষ সময় নেই। জাতিসংঘের স্বীকৃত তালিকাভুক্ত দেশের সংখ্যা বর্তমান ১৮৯টির মতো। এর বাইরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আরও কিছু দেশ রয়েছে। দেশবাসীর উচিত বিশেষ করে বুদ্ধিজীবী, কবি-সাহিত্যিকদের উচিত দীপু মনিকে উত্সাহিত করা। বাংলালিংক, এয়ারটেল, রবি—এসব প্রতিষ্ঠানের উচিত তাকে স্পন্সর করতে এগিয়ে আসা। ১২৭৬ দিনে ১০০ দেশ ঘুরেছেন। বাকি ৫৪৭ দিনে আরও প্রায় ১০০ দেশ ঘুরতে হবে। গো অ্যাহেড দীপু মনি। আমরা অবশ্যই আছি আপনার সঙ্গে।

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের নিঝুম গ্রামে ১৯৮১ সালে জন্ম নেয়া পুঁচকে একটা মেয়ে নিশাত মজুমদার নিশু হেঁটে হেঁটে জীবনবাজি রেখে জয় করল এভারেস্ট শৃঙ্গ। মরণকে পরোয়া করেনি। ভয়কে তুড়ি মেরে জয় করেছে এই তরুণী। রাষ্ট্র-সরকারের আনুকূল্য-পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই বিশ্বশিখরে পৌঁছে দিয়েছে বাঙালি নারীর সম্মান। আরামকে হারাম করে অবিরাম লড়েছে দুর্গম বিপদসঙ্কুল মৃত্যু-উপত্যকার মতো ভয়াল এবং ভয়ঙ্কর সুন্দর হিমালয়ে। নিশাত পারল কারও সাহায্য-সহমর্মিতা ছাড়াই।

সেখানে মহাজোট সরকার বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিআইপি মর্যাদা, আরামস্বর্গ সাততারকা হোটেল, বিজনেস ক্লাস—এই বিত্ত-বিলাসব্যসনকে সঙ্গী করে দীপু মনি বিশ্বজয় করতে পারবেন না, সে হয় না। তাকে পারতেই হবে। লোকে যা বলে বলুক—কী আসে যায় তাতে?

২.
পত্রিকান্তরে দেখলাম, দীপু মনি যেসব দেশ ঘুরেছেন, তার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট সফর হাতেগোনা। বেশিরভাগই সেমিনার-সিম্পোজিয়াম ইত্যাদি। যারা এসব বলছেন, তারা নিশ্চয়ই খাটো করতে চাইছেন আমাদের মন্ত্রীকে। এরাও মমতাদির কথিত ‘মাওবাদী ম্যাও’ কিনা কে জানে। আমি এই অপপ্রচারের সমুচিত জবাব দিতে চাই।

সেমিনার-সিম্পোজিয়াম তো খারাপ কিছু নয়। কোন কিতাবে লেখা আছে—মন্ত্রীরা সেমিনারে যেতে পারবেন না। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উক্তিটি থেকে ধারণা করা যায়, বিশ্বের দেশে দেশে বাংলাদেশের অগ্রগতি, গণতান্ত্রিক স্টাইল ইত্যাদি নিয়ে তোলপাড় চলছে। দুনিয়ার বড় দেশগুলো ভেঙে বুরকিনা ফাসো, বেলারুশ, কসভো, লাটভিয়া, দক্ষিণ সুদান মার্কা নতুন নতুন দেশের জন্ম হচ্ছে।

এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা—সর্বত্রই চলছে দেশ ভাঙা-গড়ার পালা। এসব দেশের গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতা নেই। দেশ শাসন, সুশাসন, পুলিশ শাসন ইত্যাদি কোনো কিছুরই অভিজ্ঞতা নেই। দেশগুলো স্বাধীন করে সংশ্লিষ্টরা পড়েছে মহা বিপদে। কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। দেখা যাচ্ছে, যারা মিলেমিশে স্বাধীনতা এনেছে, তারাই কোন্দল করে স্বাধীনতার সুফল পণ্ড করতে চলেছে।
লক্ষ্য করার বিষয়, দীপু মনি বেছে বেছে এসব দেশেই যাচ্ছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হিলারির চেয়ে অনেক আগে সেসব দেশে পৌঁছে যাচ্ছেন। নিশ্চয়ই তিনি সেমিনার করে এসব অখ্যাত-অজ্ঞাত দেশে ‘সবক’ বিলিয়ে বেড়াচ্ছেন—কীভাবে দেশ শাসন করতে হয়, কীভাবে ‘ম্যাও’-মার্কা বিরোধী দলকে কন্ট্রোলে রাখতে হয়, কীভাবে অব্যাহতভাবে গুম-খুন চালিয়ে সরকার রাজহাঁসের মতো নিষ্কলুষ দাবি করতে পারে নিজেকে।

নবগঠিত ওইসব দেশের এইসব ‘সবক’ খুবই প্রয়োজন। ধারণা করছি, তারা এমন বুদ্ধি-পরামর্শ নিচ্ছেন বলেই প্রধানমন্ত্রী খোলা কণ্ঠে দাবি করতে পারছেন, বাংলাদেশের সরকার এখন বিশ্বের মডেল।

সদ্য স্বাধীন সরকারগুলো যদি ‘বাংলাদেশ স্টাইল’ আক্ষরিক অর্থে অনুসরণ করতে পারে, আশা করা যায়, তারাও ২৫-৪২ বছরব্যাপী একনায়কতন্ত্র কায়েমে কামিয়াব হবে।

৩.
দীপু মনি তার সফরসূচিতে ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির কাছে কয়েকবার গেছেন বলে অনেকেই গোস্বা প্রকাশ করেছেন। কিসের এত গোস্বা! তিস্তার পানি দেবেন না বলে আমরা মমতাদির পাশে দাঁড়াতে পারব না, সে কেমন কথা! এই মুহূর্তে দিদির সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সরকার পরিচালনায় মহাজোটের প্রেসক্রিপশন।

নাচতে নাচতে বলাকার ছন্দে খুব তো ক্ষমতা দখল করেছিলেন! লাল কলকাতাকে নীল কলকাতা বানাবেন—আহা! খায়েশ কত?

এক বছরও তো ভালোমত মসনদে থাকতে পারলেন না, এরই মধ্যে টিভি টকশোর কটু প্রশ্নের মুখে পালিয়ে যাচ্ছেন! ছি! মমতা ছি! তুমি দিদি বাঙালি নারীর কলঙ্ক। আমরা এত কাছে সীমান্তের এপারে দিব্যি সাড়ে তিন বছর নির্বিঘ্নে নিশ্চিন্তে মহাজোট জমানা অব্যাহত রাখলাম, বিরোধী দল মাথাটি বের করলেই ঠেঙালাম—কই কিচ্ছুটি হলো না।

কী এক ভার্সিটি শিক্ষক মহাপাত্রকে শাস্তি দিতে গিয়ে তুমি মহাপাতকে পরিণত হতে চলেছ। আর আমরা এখানে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ফেসবুক ম্যাসেজ দেয়ায় একজনকে দণ্ড পর্যন্ত দিয়েছি। আরো একাধিক মামলা প্রক্রিয়াধীন। দণ্ডিতকে দেশছাড়া করে রেখেছি। আতঙ্কে সে আর দেশে ঢুকতেই সাহস পাচ্ছে না।

দিদি তোমার মুখেই কেবল জোর। আর লম্বা লম্বা পায়ে হেঁটে দৌড়ে এমন ভাব করছ—বিরোধী দলকে যেন পায়ে মাড়িয়ে চলছ। বাস্তবে ঠিক তার উল্টোটি ঘটছে।

বাম ফ্রন্ট সিপিআইএম, মাওবাদীদের ঘাঁটি শক্ত হচ্ছে। ওদের কত বড় সাহস—সিএনএন-আইবিএন মার্কা পুঁজিবাদী মিডিয়াকে হাত করে তাদের লাইভ স্টুডিওতে ঢুকে পড়ে তোমাকে ঘায়েল করতে সক্রিয়। আমাদের এখানে এমনটা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। টিভি স্টুডিওতে পৌঁছানোর আগেই সাগর-রুনির মতো চিরতরে মাইনাস হয়ে যাবে। মুখে মুখে তর্ক করবে মন্ত্রী-মহামন্ত্রীর সঙ্গে। আমরা তার আগেই ওদের বেডরুম-ড্রইংরুমের নিরাপত্তা প্রত্যাহার করে স্থায়ী শায়েস্তা করতাম।

শুনেছি, সংবাদপত্রের ওপর খুব ক্ষেপেছে দিদিমণি। সাংবাদিকদের ঠিকমত ট্যাকল করতে পারছে না। বিজ্ঞাপন বন্ধ করবে—ভয় দেখাচ্ছে। সরকারি অফিসে কোন পত্রিকা কেনা হবে, সেটির ফরমান জারি করছে। কী আশ্চর্য বোকা মেয়ে তুমি। তোমার সব বুদ্ধি ও অ্যাকশন শুধু মুখে মুখে। আর আমাদেরটা কাজে। আমরা মুখে বলি না, কাজ করে দেখাই। এখানে মহাজোট সরকার বিরোধী পত্রিকাকে ছিটেফোঁটা বিজ্ঞাপনও দেয়া হয় না। সরকারি অফিসে ওসব পত্রিকা স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ।

এ নিয়ে সাংবাদিক ইউনিয়নগুলো টুঁ শব্দটিও করে না। তারা সব সময় দুই ভাগ। ওই অম্বিকেশ মহাপাত্র মার্কা কিছু পাতক বুদ্ধিজীবী মাঝেমধ্যে বলে বটে, কাকের মাংস কাকে খায় না; কিন্তু সাংবাদিকদের মাংস সাংবাদিকদের খেতে অরুচি নেই।

তারপরও ওদের ঘুমন্ত বিবেক জাগে না। ওরা ঐক্যবদ্ধ হয় না। আমরা এমনভাবে ওদের ঘুম পাড়িয়ে রেখেছি, অসংখ্য সাংবাদিককে হত্যা করে পিটিয়ে মেরে কেটে গুম করে চলেছি, ওরা তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া করে না। একটু মিছিল-মিটিং-মহাসমাবেশ করে বটে, তারপর ওদের ডেকে চা খাওয়ালেই সব চুপ। আমাদের এক কথার বাদশা বাসমন্ত্রী আছে—তার ক্যাডাররা নিয়মিত সাংবাদিকদের চাকার নিচে ফেলে হত্যা করছে, পঙ্গু করছে, তারপরও ওরা নির্বিকার।

ওদের কিছু নেতা মধ্যরাতের টকশোতে থুতনি নেড়ে নেড়ে কথা বলেই মিটমাট করেন ইস্যুগুলো। ওদেরকে উত্তরা পূর্বাচলে ৩-৫ কাঠার প্লট দিলেই মুখে কুলুপ।
মাত্র একটি বছরও সুখে তুমি পার করতে পারলে না, দিদিমণি। শুনেছি, এর মধ্যেই শহরে জেলায় বন্দরে বামফ্রন্টের ভূত দেখে চলেছ। অনেক ক্ষেত্রে বামফ্রন্টের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারছ না। ওরা তোমাকে ‘বিলীন’ করতে চলেছে। তোমার কর্মীদের মাঠে ঠেঙাচ্ছে। তোমাকে ফেসবুকে, টকশোতে বেইজ্জত করছে।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশ মডেলের প্রেসক্রিপশনটা অনুসরণ করলে কেউ তোমার অগ্রযাত্রা রুখতে পারবে না। তুমি অজয়, অমর হয়ে উঠবে। শুধু ৪ বছর নয়, তুমি ৪০ বছর রাজ্যশাসনের স্বপ্ন
দেখতে পারবে।

মমতা দিদিমণিকে ভয় পেলে তো চলবে না। অথচ এপারে দেখো—আস্ত একটা বিরোধী দলকে কত সহজে আমরা কাবু করে ফেললাম। শুধু কি কাবু—পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে মাজা ভেঙে দিয়েছি। গুম-খুন না হয় পরপর বেশ কয়েকটা হয়েছে, তাতে এত হৈচৈ করার কী হলো! চৌধুরী আলম নামে বিএনপির এক মাঝারি নেতাকে সেই কবে গুম করা হয়েছিল। কই কোনো পশমও ছিন্ন করতে পারেনি বিরোধীরা। তারপর গত সাড়ে তিন বছরে গুম-খুনকে দিব্যি কালচারে পরিণত করা হয়েছে। গুম-খুন যেন দেশ শাসনের একটা অংশ। এটা না করে সুশাসন নিশ্চিত করা মুশকিল। যদি কাউকে পছন্দ না হয়, দাও গুম করে। কোনো পোশাক শ্রমিকনেতা আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে ঝামেলা করছে। দাও গুম করে। কোনো সাংবাদিক তেল-গ্যাসের ডকুমেন্ট জোগাড় করে রিপোর্ট করতে যাচ্ছে। প্লট-ফ্ল্যাটের টোপ দিয়েও তাদের ম্যানেজ করা যাচ্ছে না, দাও খুন করে। কোনো উদীয়মান তরুণ নেতা তড়তড়িয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, আগামী নির্বাচনে কোনো এলাকার ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে, তাকেও গুম করে দাও—নাও রাস্তা থেকে উঠিয়ে, তারপর এমন ঠিকানায় নিয়ে যাও, কেউ যেন কোনোদিন খুঁজে না পায়। বিরোধী দল কী এমন ঘোড়ার ডিমটা করবে? রাস্তার আন্দোলন শেখাবে আওয়ামী লীগ-মহাজোটকে! সেকি হয়? বিএনপি-বিরোধী দলের দৌড় কদ্দূর, সেটা আওয়ামী লীগের চেয়ে ভালো কে জানে? বিরোধীদলীয় নেতাকে বাড়িছাড়া করা হল অনায়াসে। কই কীই বা তারা করতে পারল! তখনই তাদের আন্দোলনের মাপটা নেয়া হয়ে গেছে। ইলিয়াস আলী গুমের পর তারা একটু হট্টগোল করেছে বটে।

হরতাল-টরতাল দিয়েছে। খুব লমম্ফঝমম্ফ দিচ্ছিল। কিন্তু একটা ‘গাড়ি পোড়াও’ মামলা দিতেই সব উত্তেজনা ঠাণ্ডা। সুশাসন কায়েম করার আধুনিক তরিকা হলো—শুধু গুম-খুন করলে চলবে না, ভয় দেখাতে হবে। সৃজনশীল নানা মামলা করতে হবে। তাতেও যদি ভয় না পায়, হামলা করতে হবে। তবে এবার মামলাতেই কাজ হয়েছে। রথী-মহারথী নেতারা সবাই পালিয়ে কোথায় লুকালেন। তাদের খুঁজে পাওয়াই হয়েছিল মুশকিলের। তারা হাইকোর্টে হাজির হয়েছিল লুকিয়ে-চুরিয়ে। ভয় দেখালে কেউ যখন ভয় পায়, তখন তাকে কব্জা করতে বড় সুবিধে। তখন নিয়ম হলো আরও ভয় দেখাও, আরও স্টিমরোলার চালাও। ভীতু লোক কখনোই বীরের মতো সাহস দেখাবে না। বীরভোগ্যা বসুন্ধরা। এটাই সত্য। বসুন্ধরা কখনোই ভীতুভোগ্যা নয়। আর তাই বিরোধী নেতাদের লাইন বেঁধে জেলখানায় নেয়া হলো, তারা কিছুটি করতে পারলেন না। এখন এমনই অদ্ভুত অবস্থা দেশে, একমাত্র বেগম খালেদা জিয়া বাদে আর কোনো সাহসী নেতা আছেন কিনা সেটাই বড় প্রশ্ন। এক-এগারোর হারাম সরকার যখন এসেছিল, সব নেতানেত্রীর সাহসের দৌড়টা তখন দেখা গেছে। সবাই পালিয়ে লুকিয়ে দেশছাড়া। একমাত্র খালেদা জিয়া কোথাও যাননি। শত ভয়-শঙ্কা, মৃত্যু-হুমকি মাথায় নিয়ে তিনি সরল কণ্ঠে বলেছিলেন, কোথায় যাব, বাংলাদেশ ছাড়া আমার তো কোনো দেশ নেই।

আজও গুম-খুন দ্বারা সুশাসিত এই গণতন্ত্রের দেশে একমাত্র খালেদা বাদে আর সবাইকে বোতলবন্দি করা গেছে। বাংলাদেশে এখন কবরস্থানের সুশাসন বিরাজ করছে। মমতা দিদিমণি এই সুশাসিত বাংলাদেশ থেকে শিক্ষা নিতে পারতেন। সেজন্য তার কাছে বারবার ডেলিগেশনও পাঠানো হয়েছে। কিন্তু দিদির ওই এক গোঁ। আমাদের গোঁয়ার-গেঁয়ো দিদিমণি। তার এক রা— তিস্তার পানি দেবেন না। তিস্তার পানি নিয়ে খুব দেশপ্রেমের বাহানা দেখাতে গিয়েছেন। দিল্লির দাদাগিরির পাশাপাশি তারও খায়েশ হলো—বাংলাদেশের ওপর তিনিও দিদিগিরি করবেন। এখন বুঝুক ঠ্যালা। তিস্তার একটু জল পেলেই আমরা বিনে পয়সাতেই রাজ্যশাসনের দিস্তা দিস্তা লেটেস্ট ফরমুলা দিতে পারতাম। আমাদেরও মুখ রক্ষা হতো, দিদিরও রাজ্য রক্ষা হতো। দিদি ইতিহাস ও ভূগোলে বড্ড কাঁচা। কিছুদিন আগে বাংলাদেশের অবস্থান নাকি পাকিস্তান সীমান্তে—এমন জ্ঞান-গম্যি সবাইকে জানিয়ে বেশ লোক হাসিয়েছিলেন। আধুনিক ভারতের ইতিহাসও তার জানা নেই। গত শতাব্দীর সত্তর দশকে আমরা খোদ ভারতমাতা ইন্দিরা গান্ধীকে বাংলাদেশ স্টাইলের শাসনে উদ্বুদ্ধ করেছি ও মন্ত্রণা দিয়েছি। ’৭২ সাল থেকে ’৭৫ সাল পর্যন্ত আমরা বিশ্বকে হাতেকলমে শিখিয়েছি, কীভাবে দেশ শাসন করতে হয়, গনতন্ত্র কত প্রকার ও কী কী—তার অসংখ্য নজির তখনও হাজির করা হয়েছিল। কীভাবে গুম-খুন-হত্যার মাধ্যমে দেশকে দাবিয়ে রাখতে হয়, কিভাবে পিঠে পেছন থেকে গুলি করে দেশপ্রেমিক সিরাজ সিকদারদের চিরতরে দমন করতে হয়, মাওবাদী নকশালদের দমনে গুলিই হচ্ছে শেষ কথা। সেটা তো আমরা সত্তর দশকেই বিশ্ববাসীকে শিখিয়েছি। আর দেশ শাসন, সুশাসনের কথা যদি বলি, তারও শ্রেষ্ঠ নজির তখনকার—এখন শুধু সেই ফরমুলার আপগ্রেডেশন করা হচ্ছে মাত্র। আমরা হাতেনাতে করে দেখিয়েছি—সুশাসন হচ্ছে তা-ই; মন যা চায় তাই করো, মন যা চায় তাই বলো। প্রধানমন্ত্রী হতে মন চাইছে—হও প্রধানমন্ত্রী। প্রেসিডেন্ট হতে মন চায়—হও রাষ্ট্রপতি। মন চাইলে একটা দেশকে এক নেতা ও এক দলের দেশ বানানো যায়, সেই নজির আমরা তখন দেখিয়েছি। তখনও বাংলাদেশ সারা বিশ্বে মডেল হিসেবে পরিগণিত হচ্ছিল। সবাই বাংলাদেশের মতো সরকার কায়েমের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। দিল্লিতে খোদ ইন্দিরাজীও ঢাকা স্টাইলের শাসন কায়েম করতে গিয়েছিলেন। সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় তখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। তিনিও ওপার বাংলাজুড়ে মাওবাদী-নকশাল দমনে নেমেছিলেন। জেলখানা থেকে খুনিদের স্পেশাল মিশনে নামিয়ে খুন করা হচ্ছিল বিরোধীদের। আবার মিশন শেষে খুনিরা সবাই জেলখানায়। সিরাজ সিকদারসহ হাজারো লালবাহিনী সদস্যকে নির্বিচারে খুন-গুম, তথা লাল ঘোড়া দাবড়ে দিয়ে রক্তগঙ্গা, সে তো সেই সময়ের বাংলাদেশ মডেলের ঈর্ষণীয় সাফল্য। শুধু কলকাতায় কেন, ভারতজুড়ে ইন্দিরা গান্ধীও সেই ফরমুলা অনুসরণ করেছেন। রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছেন পাঞ্জাবেও। এমনকি বাকশাল স্টাইলটাও তিনি খুব পছন্দ করেছিলেন। আর তাই সারা ভারতকে এক মুঠোয় বন্দি করতে, বন্দে ইন্দিরা মাতরম কায়েম করতে তিনিও জারি করেছিলেন জরুরি অবস্থা।

মমতা দিদিমণি, আমরা ইতিহাসবিস্মৃত নই। পূর্বপুরুষের সঙ্গে আমরা বিশ্বাসঘাতকতা করি না। আমরা সেই স্বর্ণালি শাসনব্যবস্থাকেই আধুনিক ঘষামাজা করে, যুগোপযোগী করে একালেও সুশাসন কায়েম করেছি। গায়ে পড়ে তো আর প্রেসক্রিপশন দেয়া যায় না। তবে এখন গ্লাসনস্ত-পেরেসত্রৈকা, অর্থাত্ খোলা জানালার যুগ। জানালা খোলা রাখুন। বাংলাদেশকে দেখুন। খুব সহজেই আপনি ২৫ থেকে ৪৫ বছর রাজ্য শাসনের বুদ্ধি-পরামর্শ পেয়ে যাবেন, কেউ আপনাকে আর আটকাতে পারবে না। টিভি লাইভ টকশোতে লাঞ্ছনা করার কল্পনাও করবে না।