ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

সাংবাদিকরা এবার যাবে কোথায়! কোথায় তাদের নিরাপত্তা! নিরাপত্তা নেই বাসায়, বাড়িতে। সেখানে ওঁত্ পেতে আছে সাগর-রুনির খুনিরা। খুন করে দিব্যি তারা গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরছে। জীবন-জীবিকার তাগিদে প্রাণটা হাতে নিয়েই কর্মক্ষেত্রে ছুটতে হয়। খবরের সন্ধানে সকালে প্রেস ক্লাবের সামনে, বিকালে মেডিকেলের মর্গে, সন্ধ্যায় ঘর্মাক্ত ক্লান্তদেহে হৃদয়ের সব আন্তরিকতা ঢেলে রিপোর্টিং। কিন্তু সব জায়গায় সাংবাদিককে খুঁজছে মৃত্যুর সওদাগর। প্রেস ক্লাবের সামনে, ধানমন্ডিতে, উত্তরায় চলতি পথে মূর্তিমান যম হলো খান সাহেবের সেনারা। কোথাও তারা বাসের চাকার নিচে রিপোর্টারের মাথা থেঁতলে দিচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু। রাস্তা তখন রক্তে লালে লাল। বিভাসের থেঁতলানো মাথা, দীনেশ দাসের রক্ত ও মগজে সড়ক সয়লাব। মৃত্যু আর মৃত্যু। এই লাশের কাফেলার শেষ নেই। শোকার্ত, মূহ্যমান সাংবাদিকদের কাঁদতে নেই। বিক্ষুব্ধ হতে নেই। প্রতিবাদ করতে নেই। প্রতিবাদ করলেই পুলিশের ব্যাটন, লাঠিচার্জ। সাংবাদিক-বিধবা স্ত্রীদের কান্না কেউ শোনে না। বরং বাসড্রাইভার, মন্ত্রী এসব মৃত্যু নিয়ে মেতে ওঠেন তামাশায়। তিনি সদম্ভে বলেন, তার খুন-সেনাদের কোনো দোষ নেই। ওদেরকে কোনোরকম শাসন করা যাবে না। বুকে কষ্টের পাথরচাপা দিয়ে আবার কাজে ছোটো। কিন্তু সরকারের বিপক্ষে যায় এমন কিছু লেখা যাবে না। সমুদ্র বিজয়ী-এভারেস্ট বিজয়ী সরকারের হিমালয়-মজবুত ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত করবে, এমন ছবিও তোলা বারণ। ছবি তুললে সাহারা-সেনারা মেতে ওঠে সাংবাদিক পেটানোর মহোত্সবে। পেটা সাংবাদিক পেটা। রাস্তায় ফেলে পাড়া। দাঁত খুলে নে। দু’চারটা সাংবাদিক মারলে কিছু হয় না। বরং সাংবাদিক পেটালে, মারলে মিলবে প্রমোশন। কিংবা রাঙামাটির বেতবুনিয়ায় মনোরম পাহাড়ি নিসর্গে অবকাশের অঢেল আরাম। ২৬ মে প্রথম আলো পত্রিকার তিন আলোকচিত্রীকে একই স্পটে ধুন্ধুমার পিটিয়েছে এসি শহীদুল, ইন্সপেক্টর কবীর ও তার পুলিশ সঙ্গীরা। সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে সেই নিষ্ঠুর নির্যাতনের ছবি। আমি তো বললাম নির্মম-নিষ্ঠুর; কিন্তু এসি শহীদুল, ইন্সপেক্টর কবীরের অত্যাচারের দৃশ্যগুলোয় ছিল নৃত্যের ছন্দ। উন্মাদ আনন্দ।

ইন্সপেক্টর কবীর নাচতে নাচতে, কখনও হাডুডু খেলার ভঙ্গিতে, কখনও ককফাইট, মানে মুরগি-নাচের উল্লসিত ভঙ্গিতে লাথিয়েছে সাংবাদিকদের। লাথির পর লাথি। হাসতে হাসতে নাচতে নাচতে লাথানোর সেকি ভয়ঙ্কর উত্সব! সংবাদপত্রে সেই ছবি ছাপার পর কী করতে পেরেছে সাংবাদিকরা! এই মচ্ছবের মূল হোতা শহীদুলকে নামকাওয়াস্তে ক্লোজ করে বেতবুনিয়ায় আই ওয়াশ বদলি করা হচ্ছিল। পরে সাময়িক বরখাস্তের বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চলছে।

এই মুহূর্তের বাংলাদেশে সবচেয়ে নির্যাতিত, অনিরাপদ সাংবাদিকরা। মৃত্যুর পরোয়ানা হাতে নিয়েই তারা পালন করে চলেছেন পেশাগত দায়িত্ব। বাসায় নিঃশব্দ আততায়ীর হাত থেকে পালিয়ে, কর্মক্ষেত্রে ছবি তুলতে গিয়ে রক্তাক্ত আহত হয়ে কোন ঠিকানায় তারা আশ্রয়ের সন্ধান করবেন! অফিসে গিয়ে একটু জিরোবেন; স্বস্তির নিঃশ্বাস নেবেন, তারও উপায় নেই। সেখানেও হামলা চালাচ্ছে সংঘবদ্ধ ‘যুবলীগ‘ সন্ত্রাসীরা। তারা রামদা দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপাচ্ছে। কুপিয়ে হাত-পা আলাদা করার জোগাড়। ২৮ মে অনলাইন মিডিয়া বিডিনিউজ অফিসে ঢুকে রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছে রক্তপিপাসুচক্র। ১০ সাংবাদিক ও কর্মীকে তারা এমন রামদা-ধোলাই করেছে, পুরো অফিস সিঁড়ি রক্তে সয়লাব। অকল্পনীয় সেই দৃশ্য।

তাহলে সাংবাদিকরা যাবেন কোথায়? তাদের ঠিকানা এখন কবরস্থান, নয়তো হাসপাতাল। মন্ত্রীর ভাই-ভাতিজা, ছাত্রলীগ-যুবলীগের ক্যাডার সবাই মিলে নানা জায়গায় পিটিয়ে কুপিয়ে চলেছে সাংবাদিকদের। কোনো বিচার নেই। প্রতিকার নেই। প্রতিবাদ নেই। সাংবাদিক সমাজ নিজেরাই দু’পক্ষ হয়ে একে অপরের নিঠুর নীরব শত্রু হয়ে রাজনৈতিক-সামাজিক সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দিয়েছে জান কবজের অধিকার। সবাই জেনে গিয়েছে, এখন আর সাংবাদিক পেটালে কিছু হয় না। হত্যা করলেও কিছু হয় না।

এসি শহীদুল, পরিদর্শক কবীর সদম্ভে চিত্কার করে জানিয়েছে এই নিষ্ঠুর সত্য। সাগর-রুনি হত্যার পর স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তার শ্লেষ ও খাঁজ মেশানো মধুর কণ্ঠে বলে দিয়েছেন, তিনি বেডরুমের নিরাপত্তা দিতে পারবেন না। রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী নিজেই যাদের ‘ত্যাজ্য ও এতিম’ বলে জানিয়ে দেন, তারা পদে পদে মার খাবে—এটা খুবই স্বাভাবিক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের দিয়ে চলেছেন নানা সবক। প্রতিমন্ত্রী টুকু ভাই ইদানীং মনে হয় ভয় পাচ্ছেন পুলিশকে। এই দিন তো দিন নয় আরও দিন আছে। সাবেক প্রতিমন্ত্রী বাবরের কি হাল-হকিকত, সে কথা টুকুর চেয়ে ভালো কে জানে। তাই তিনি সাংবাদিকদের বাতলে দিয়েছেন রিপোর্ট করার তরিকা। বলেছেন, রিপোর্ট করার সময় পুলিশ থেকে নিরাপদ দূরে থাকবেন। কাছে যাওয়া বারণ। বারণ তো করবেনই। পুলিশ নাকি ইদানীং ডগ স্কোয়াড নিয়ে ঘোরে। বড় ডেনজারাস। পুলিশ ও ডগ স্কোয়াড থেকে কত মিটার দূরে থাকতে হবে তা বিস্তারিত মন্ত্রী বলেননি। তবে মন্ত্রী কেন দূরে থাকার সবক দিলেন, তার মাজেজা ২৯ মে হাতে-নাতে পাওয়া গেল। খোদ কোর্ট-কাচারি এলাকা থেকে এক কিশোরীকে তুলে নিয়ে ইজ্জতহানি ঘটিয়েছে। অতি ন্যক্কারজনক ঘটনা। দিনের আলোতে বাবা-মায়ের সামনে থেকে পুলিশ মেয়েটিকে তুলে নেয়। রক্ষকই এখন ইজ্জতের ভক্ষক। এদের ছবি যদি তুলতে চায় সাংবাদিকরা, উন্মত্ত পুলিশ তো তাদের পেটাবেই। যদি রিপোর্টার খবর নিয়ে যায়, ধর্ষকামী পুলিশ তাদের লাথি-গুঁতা মারবেই। এসব রেপ-শ্লীলতাহানির দৃশ্য থেকে সাংবাদিকদের দূরে থাকা উচিত। সাংবাদিকদের দূরে থাকতে হবে যুবলীগ-ছাত্রলীগ থেকেও। ওদের কাছে যাওয়াও নিষেধ। ওরাও ভয়ঙ্কর। ওদের বিরুদ্ধেও কিছু লেখা ঠিক নয়। ওরাও যদি ধর্ষকামী, খুন-পিয়াসী হয়—একদম স্পিকটি নট। নো ক্যামেরা। কেননা, ওদের কথা না শুনলে যুবলীগের রামদা-ক্যাডাররা দল বেঁধে এসে অফিসের মধ্যে ঢুকে কোপাবে। বিডিনিউজের অফিসে আমরা যেমন যুবলীগের কোপাকুপির তাণ্ডব দেখলাম। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সাহারা খাতুনের সাফাই-দোহাই তো আরেক কাঠি সরেস। তিনি বলেছেন, এমন ভাল পুলিশ আর হয় না। পুলিশ এখন অনেক অনেক ভাল। দুষ্কর্মা পুলিশ সদস্যের অপকর্মকে তিনি কোথায় তিরষ্কার করবেন! তা না, তিনি তাদের প্রতি অকুন্ঠ ভালবাসা জানাতে তার রাজনৈতিক জীবন-নামচা খুলে বসেছেন। বললেন, বৃটিশ আমলের পুলিশ নাকি খুউব খারাপ ছিল। আগেকার পুলিশ পিটিয়ে তার পা ভেঙে দিয়েছিল। এখনও তিনি সেই খোড়া পা নিয়েই চলছেন। ফিরছেন। তার অনেক কষ্ট। পুলিশ মন্ত্রী হওয়ার পর পুলিশ আর তার সঙ্গে অমন আচরণ করে না। তারা তাকে মান্যগন্য করে। সালাম আদাব দেয়। লাঠি সোটা নিয়ে জয়নাল আবদিন ফারুককে পিটিয়ে রাস্তায় শুইয়ে ফেললেও তাকে লাঠি নিয়ে তাড়া করে না। সত্যি এমন সুবোধ পুলিশের প্রশংসা না করলে কিসের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তিনি। হাজার হোক ৩০-৪০ বছরের পোড় খাওয়া রাজনৈতিক কর্মী। মন্ত্রী হলেও পুিলশি আতঙ্ক এখনও তার যায় নি। পুলিশকে ভয় পাওয়া স্বাস্থ্য সম্মত। কেউ তো আর সারাজীবন মন্ত্রী থাকে না। তাছাড়া মন্ত্রী থাকা অবস্থাতেই পানি মন্ত্রী রমেশ চন্দ্রের যে করুণ অবস্থা। মন্ত্রণালয়ের কেউ নাকি তার কথা শোনে না। সাহারা মন্ত্রী থাকা অবস্থায় এমন হেনস্থার শিকার হতে চান না। কতিপয় পুলিশ সাধারণ মানুষ-যুবতীদের হেনস্থা করলেও মন্ত্রীকে অপমান করছে না— ঠ্যাং ভেঙে দিচ্ছে না; সেই বা কম কিসে! পুলশের আদব-লেহাজ এখনও একদম শেষ হয়ে যায় নি। অবশ্য, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সমীপে জানাই,সাংবাদিকদের এত সবক-সাফাই না দিলেও সরকারের কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কেননা, পেশাজীবী সাংবাদিক সমাজের এখন মাজা ভাঙা। এদের না আছে ঐক্যের শক্তি, না আছে সব সংবাদপত্র মিলে অটুট নিরাপত্তা আন্দোলন গড়ে তোলার দৃঢ় মনোবল। এদের লেখনি-শক্তি এখন এতই হীনবল যে, মধ্যরাতের টকশোতে ২-৪টা মুখরোচক কথাবার্তা বলেই দায় সারছেন নিত্যমুখ দেখানো কিছু সাবেক ও বর্তমান সংবাদকর্মী। সাংবাদিক সমাজ বর্তমানে এতটাই হীনবীর্য যে টকশোতে বকাবাজি করেই তাদের সব উত্তেজনা, দুর্দশা, ক্ষোভ থিতিয়ে যায়। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ নাকি মিডিয়া। টকশোতে যখন কোনো বক্তা একথা বলে মূল্যবান বাণী দেন তখন মনে হয় এরচেয়ে বড় ঠাট্টা-তামাশা আর কী হতে পারে। ফোর্থ স্টেট—চতুর্থ শক্তি, হাঃ হাঃ। রাষ্ট্রের অন্য স্তম্ভগুলো মিলে ডাণ্ডা মেরে লাথিয়ে গুঁতিয়ে পাড়িয়ে মারিয়ে চতুর্থ স্তম্ভকে জীবন্ত লাশ বানিয়ে ছাড়ছে।

উচ্চ জন্মহারের এই বাংলাদেশে সাংবাদিক সংগঠনের কোনো অভাব নেই। সব ধরনের সংবাদকর্মী নিয়ে দেশব্যাপী বিশাল সাংবাদিক ইউনিয়ন আছে। তারা দু’ভাগ হয়ে আছেন। রিপোর্টার, সাব-এডিটরদের আলাদা সংগঠন আছে। মফস্বল সাংবাদিক, তৃণমূল সাংবাদিকরাও নানা নামে বেশকিছু সংগঠনের জন্ম দিয়েছেন। তদুপরি ক্রাইম, এনার্জি, কূটনীতি, অর্থনীতি, সংসদ, নির্বাচন কমিশনসহ নানা বিটের সাংবাদিকরাও আলাদা সংগঠন করে তাদের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছেন। এটা কোনো মন্দ কাজ নয়। শক্তিশালী গণতন্ত্রে বহুমত অবশ্যই শক্তির উত্স। কিন্তু এত সংগঠন, এত ইউনিয়ন অথচ তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঘোড়ার ডিমটাও করতে পারছে না। শুধু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংগঠন খুলেই তারা খালাস। কীভাবে দাবি আদায় করতে হয়, কীভাবে আত্মরক্ষা করতে হয়, কীভাবে অপশক্তি খুনি পেটোয়াদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয় তার ছিটেফোঁটা নেতৃত্বগুণ এসব সংগঠন ও ইউনিয়নের ‘মহান’ নেতাদের নেই বললেই চলে। তাদের দৌড় সিটিং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হাসিমুখে ফটোসেশন করা পর্যন্ত। ওতেই এ নেতাদের জীবন ধন্য হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাসায় ডেকে চা-চামুদ খাওয়ালেও তারা বর্তে যান। সব দাবি-দাওয়া-আন্দোলন তারা নিমিষেই বন্ধক দিয়ে আসেন সেখানে।

বছরের পর বছর এরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু স্যার, আপনাদের অর্জন কি! সাংবাদিকদের জন্য আপনাদের কনট্রিবিউশন কি! কি করেছেন এই মার খাওয়া, রক্তে সারা শরীর ও অফিস ভেসে যাওয়া সাংবাদিকদের জন্য। তাদের কনট্রিবিউশন একটাই, খণ্ডিত ইউনিয়নে বছর বছর নামকাওয়াস্তে নির্বাচন, নেতা হওয়া। পুনর্নির্বাচিত হওয়া। তারপর নিজ নিজ নেত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত্ করে ছবি তোলা। আর একখানা কর্মতত্পরতা তাদের আছে। উত্তরা, পূর্বাচল, কেরানীগঞ্জে রাজউক জমি দিলে সেইখানে খয়রাতি সাহায্য মার্কা ২/১ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়। সেই বরাদ্দ নিয়ে আফ্রিকার দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশের বুভুক্ষু ক্ষুধার্ত মানুষগুলোর মতো নির্লজ্জ খেয়োখেয়ি। ওরা যেমন বিমান থেকে ছুড়ে দেয়া খাদ্যের বস্তা নিয়ে কাড়াকাড়ি করে, এই ক্ষমতাসীন ইউনিয়নও তেমনি জমি নিয়ে হরির লুটে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। খালি লিস্টি আর লিস্টি। লিস্টি করো, লিস্টি কাটো। কে কত বড় তেলবাজ, কে কত বড় দড়াবাজ দলবাজ, তার ভিত্তিতে লিস্টি বানাতে বছরজুড়ে দৌড়ঝাঁপ। এসব করে জগদ্দল ভুষুণ্ডির কাক নেতারা হয়তো এক বা একাধিক প্লট বাড়ি বানিয়েছেন। এছাড়া বৃহত্তর সাংবাদিকদের জন্য শুধু ফালতু বজ্রকণ্ঠের বক্তৃতা ছাড়া তারা আর কী করেছেন। তারা কি কখনও খোঁজ নিয়ে দেখেছেন, একজন সাধারণ রিপোর্টারের কীভাবে জীবন চলে! কম্পিউটার সেকশন, সম্পাদনা সহকারী সেকশন, প্রেসকর্মী তারা কীভাবে বেঁচে আছেন? একবার বাসায় গিয়ে দেখে আসুন, একজন সম্পাদনা সহকারী মধ্যরাতে বা শেষরাতে বাসায় ফিরে কি খান! তার থালায় কি খাদ্য আর আপনার থালায় কি খাদ্য! আপনি না হয় সুখাদ্য নিশ্চিত করেছেন; কিন্তু সংবাদপত্রের এই প্রাণকর্মীরা সুখাদ্য না অখাদ্য গিলছেন, কেউ সেই খবর রাখেন না। কেউ না। কেউ রাখেন না। অথচ নেতা হিসেবে এটা আপনাদের কর্তব্য। একবারও খোঁজ নিয়ে দেখেছেন, একজন সংবাদকর্মী দুটি চাকরি কেন করেন? কেমন করে করেন। ৭-৮ ঘণ্টা করে পর পর দুটি ডিউটি। অমানুষিক। অতিমানবিক। দু’মুুঠো অন্নের জন্য নানা রোগব্যাধির বেদিতে নিজেদের জীবনকে উত্সর্গ করে তারা সংসার চালাতে, সন্তানকে মানুষ করতে নিরন্তর জীবনযুদ্ধে লড়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৫-১৬ ঘণ্টা তাকিয়ে আছেন কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে। কেউ ১৫-১৬ ঘণ্টা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অক্ষরগুলো পড়ে চলেছেন, তাদের চোখ যাচ্ছে। তারা হারিয়ে ফেলছেন জীবনীশক্তি। সংঘবদ্ধ প্রভাবশালী চক্রের ভাড়াটে খুনি, পেটোয়া পুলিশ কিংবা মন্ত্রীর ভাই ছিঁচকে মাস্তান সন্ত্রাসীদের শিকার এরা হয়তো হচ্ছেন না; কিন্তু এরা শিকার হচ্ছেন নীরব ঘাতকের। অকাল বার্ধক্য; অকালে রোগে ভুগে তারা শিকার হচ্ছেন নীরব মৃত্যুর। তাদের এই উত্সর্গের কথা সংবাদপত্রের কোনো ইতিহাসে লেখা হবে না। এই উদয়াস্ত পরিশ্রম করেও তারা কেউ ঢাকা শহরে একটু ঠাঁই গড়তে পারেননি। অনেকেই বেকার হয়ে পড়ছেন যখন-তখন। তারা না পারছেন সেই কর্মহীন জীবনের জন্য কিছু টাকা সঞ্চয় করতে। সংসার নামের ক্ষুধার্ত রাহু প্রতি মাসের সব আয় গিলে খাচ্ছে। আর যখন অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, তারা ধুঁকে ধুঁকে মারা যাচ্ছেন বিনা চিকিত্সায়। কেউ এই অবহেলিত সংবাদকর্মীদের কথা, সাংবাদিকদের কথা মনে রাখে না। সবাই রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলেই খালাস। এরা বেঁচে আছে, না মরে গেছে, কেউ খবর রাখে না তার।

তারপরও যখন শুনি আমার সহকর্মী, তিনি সম্পাদনা সহকারী, কিংবা কম্পিউটার অপারেটর কিংবা রিপোর্টার, সাব-এডিটর, প্রেসকর্মী, নিরাপত্তা কর্মী, তার পুত্র কিংবা কন্যা এসএসসি- এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলা পরিশ্রমে অর্জিত পারিশ্রমিকে মিষ্টি কিনে খাওয়ান পিতা তখন চোখ ভরে আসে কান্নায়। আনন্দ, গৌরব, শ্রদ্ধায় অবনত হয় মাথা। বিশ্বাস করুন, তখন মনে হয় মুসা ইব্রাহিম, মুহিত-নিশাত-ওয়াসফিয়ার এভারেস্ট বিজয়ের মতোই মহত্ ও আনন্দময় ওই সুখবর। কেননা, দুর্গম হিমালয়ে পদে পদে বিপদের সঙ্গে লড়ে ওরা যেমন চূড়ায় পৌঁছেছেন, সংসার নামক পাহাড় শ্রেণী অক্লান্ত পরিশ্রমে ডিঙিয়ে এই সংবাদকর্মীরা তার সন্তানকে পৌঁছে দিচ্ছেন একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের দ্বারপ্রান্তে। এই অর্জন কোনো কিছুর তুলনায় তুচ্ছ নয়।

প্রিয় সাংবাদিক নেতা ভাইরা, আমার মতো তুচ্ছ কলামিস্টের কথায় বেয়াদবি নেবেন না। আমি আপনাদের নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ করছি না। শুধু আপনাদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রাখছি। আত্মজিজ্ঞাসা করুন। সবিনয়ে বলি, বিবেককে জাগ্রত করুন। আপনারা এফবিসিসিআই মার্কা শিল্পপতি সংগঠনের নেতা নন। আপনারা হ্যাভ লট নয়, ‘হ্যাভ নট’দের ইউনিয়ন লিডার। আপনারা নিত্যনির্যাতিত, হত্যা, খুন, জখম, দমন-পীড়নের শিকার মজলুমের নেতা। সাংবাদিক ইউনিয়ন সম্পদবিলাসীদের সংগঠন নয়। বরং সম্পদহীনদের শেষ ঠিকানা। আপনাদের স্যুটেড ব্যুটেড সুদর্শন চকচকে চেহারা যখন দেখি, ভালোও লাগে, আনন্দ হয়। কী স্মার্ট আমাদের নেতারা। কী ঝকঝকে তকতকে জামা-কাপড় তারা পরেছেন। গুলশান ধানমন্ডি উত্তরা বসুন্ধরার তারা বাসিন্দা।

টিভির মাইক্রোফোনটা সামনে পেলেই বিএফইউজের বৃহত্ সভাপতি সাগর-রুনির হত্যা নিয়ে কিসব ভারি ভারি তত্ত্বকথা বলছেন। আলটিমেটাম নামক চে গুয়েভারার কাব্য পাঠ করছেন। মনে হয়, তিনি সংগঠনের নেতা নন; কোনো দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকীয় আবৃত্তি করে শোনাচ্ছেন। এলিট চেহারা, এলিট ভাবসাব, এলিট বিলাসী জীবন। মনে হয় নেতা ভাইয়ের জীবনখানা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুখ ও আরামে মোড়ানো। এলিট লাইফস্টাইল দিয়ে রাজপথের আন্দোলন হয় না ভাই।

আমি ও আমরা সুযোগ পেলেই নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান এমপি সম্পর্কে দু’চার কথা সমালোচনা লিখে দিই। তাকে বাসমন্ত্রী, ড্রাইভারমন্ত্রী বলে টিটকারি দিই। আমাদের স্যুটেড ব্যুটেড নেতারাও রাবিন্দ্রিক উচ্চারণে গমগমে আবৃত্তিতে শাজাহান খানের ব্যাপারে ধরি মাছ না ছুঁই পানি মার্কা কিছু বলে থাকেন। অথচ তারা নেতা হিসেবে শাজাহান খানের যোগ্যতা, নেতৃত্বগুণ, পারদর্শিতার সঙ্গে নিজেদের তুলনা করে কখনও দেখেন না। যদি একবার তুল্যমূল্য তুলনা করে দেখতেন, আয়নায় ঠিকই নিজের চেহারা দেখতে পেতেন।

শাজাহান খানও ইউনিয়ন লিডার। সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সুদীর্ঘ পথচলার কার্যকরী সভাপতি। মন্ত্রী হয়েও শ্রমিক ইউনিয়ন তিনি ছাড়েননি। তাকে দেখে শিখতে পারেন ক্ষমতাসীন সাংবাদিক ইউনিয়নের বাঘা বাঘা নেতারা। যারা ২৫-৩০ বছর ধরে আগলাচ্ছেন নেতৃত্ব। অদক্ষ, ভুইফোঁড়, সদ্য স্টিয়ারিংয়ে বসা কিশোর তরুণ বাসচালকরা সারাদেশের মহাসড়ককে মৃত্যুফাঁদ বানিয়ে রেখেছে। ঢাকা-আরিচা রোডকে তো বলাই হয় পরকালের রাস্তা। এসব বাসচালকের চাকার নিচে মারা পড়েছেন অগুনতি সাংবাদিক। পঙ্গু হচ্ছেন অনেকে। মারা পড়ছে বুদ্ধিজীবী, চলচ্চিত্রকারসহ হাজারো সাধারণ মানুষ। আহত পঙ্গুত্বের হিসাব সে তো কল্পনারও বাইরে। তারপরও দেখুন, এই সড়ক শ্রমিক-অন্তপ্রাণ কার্যকরী সভাপতি শাজাহান খান কীভাবে রক্ষা করে চলেছেন এইসব ‘খুনে চালক’কে। তাদের যাতে কোনো শাস্তি না হয়, তাদের যেন গ্রেফতার করা না হয়, গ্রেফতার করা হলে অনতিবিলম্বে জামিন, মন্ত্রী-কাম-সভাপতির সে কি ক্লান্তিহীন তদবির। তিনি নাছোড়বান্দার মতো পড়ে আছেন তার ইউনিয়নের শ্রমিকদের নিয়ে। তারা ‘খুন’ করে এলেও তার কাছে স্নেহভাজন পরিবহন কর্মী। আমরা সাংবাদিকরা তাদেরকে ‘হত্যাকারী, খুনি, যন্ত্রদানব’ ইত্যাদি বলে মনের ঝাল মেটাই। আর তিনি প্রায় প্রতিদিন একাধিক মিটিং সমাবেশে সেই অভিযোগ খণ্ডন করেন। তার শ্রমিকদের পক্ষে বলেন, ‘যন্ত্রদানব’ বলায় পাল্টা বিষোদগার করেন, ‘সড়কের হত্যাকারী’দের বিচারের জন্য যাতে কঠিন কোনো আইন না হয়, মৃত্যুদণ্ডের বিধান না হয় সেজন্য তিনি সংসদের মধ্যে ও বাইরে সবসময় তত্পর। তাকে দেয়া হয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রক।

কিন্তু তার ধ্যানজ্ঞান সড়ক শ্রমিক ইউনিয়ন। ২৪ ঘণ্টার দিনটাকে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা বানিয়ে তিনি মন্ত্রণালয় সামলানোর পাশাপাশি সিংহভাগ সময় ব্যয় করছেন ইউনিয়নের জন্য। শ্রমিকদের স্বার্থচিন্তা তার কাছে মুখ্য। প্রধান বিবেচ্য। এই ইস্যুতে তিনি নিজদলীয় সরকারের বিরুদ্ধে যেতেও কার্পণ্য করেন না। যখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ছিল তখনও তিনি সর্বাত্মক নেতৃত্বগুণে সড়ক শ্রমিকদের স্বার্থ আদায়ে সদাসক্রিয় ছিলেন। প্রয়োজনে আন্দোলন, প্রয়োজনে সুসম্পর্ক রক্ষা করে তিনি শ্রমিক স্বার্থকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। কোন সরকার ক্ষমতায়, সেটা তার কাছে মুখ্য নয়। তিনি সবসময় দক্ষ-আধা দক্ষ বাস-ট্রাক চালকদের লাইসেন্স পাইয়ে দিতে তদবিরের কমতি রাখেননি। আর এ কারণেই লাখো শ্রমিকের তিনি অবিসংবাদিত নেতা। তার মুখ চেয়েই, নেতার ওপর ভরসা করে বাস-ট্রাক চালকরা বেপরোয়া চালাতে সাহস পাচ্ছে। মানুষ মারছে। তাদের কোনো হুঁশ নেই। কেননা, শ্রমিকরা জানে, তাদের সঙ্গে নেতা আছেন। বিপদে আপদে থাকবেন। কাউকে খুন করলেও তিনি পিতৃস্নেহে তাকে বাঁচাবেন। আর এ কারণে আমরা দেখেছি, সড়কে হত্যার পর হালকা মামলা হয়। ঘাতক চালককে কখনও কখনও নামকাওয়াস্তে আটক করা হয়। তারপর নেতার আশীর্বাদে তারা জেলখানা থেকে জামিনে বের হয়ে আসেন।
আমি শাজাহান খানের নিন্দা করতে বসিনি। শুধু বলব, তার নেতৃত্বের মাপটা দেখুন। বিএফইউজে (বাংলাদেশ ফেডারেল ইউনিযন অব জার্নালিস্ট) কলম শ্রমিকদের বিশাল ইউনিয়ন। এতই বিশাল যে, নেতৃত্ব দিতে দু’দুটি খণ্ডিত ইউনিয়ন করতে হয়েছে। এই বিশাল সংগঠনের সভাপতি সাধারণ সম্পাদকরা বছরের পর বছর ইউনিয়নের ক্ষমতায়। একবার শাজাহান খানের পাশে নিজেদের মাপটা দিয়ে দেখুন।

সাংবাদিক নেতা এবং সাংবাদিকরা নিজেদের খুব হনু ভাবেন। মনে করেন, ওরে বাবা, তারা বিশাল ব্যাপার-স্যাপার। বিশাল বুদ্ধিজীবী। মহান কলম সৈনিক।

অন্য পেশাজীবীদের জন্য তারা নিরন্তর কলম ধরেন। মানুষের সুখ-দুঃখ লেখেন। অথচ তাদের হালটা দেখুন। তাদের নেতাদের অবস্থা দেখুন।

এই সাংবাদিকদের পাছায় বুকে পিঠে ইন্সপেক্টর কবীর নাচতে নাচতে লাথি দিচ্ছে। ওরা পায়ের নিচে ফেলে মাড়াচ্ছে। হাত-পা ভেঙে পঙ্গু করছে। অশ্রাব্য গালাগাল করছে। ওরা এখন সাংবাদিকদের মশামাছির চেয়েও তুচ্ছ মনে করছে। আস্ফাালন করছে সাংবাদিক মারলে কোনো সমস্যা হয় না। ভাবুন একবার অবস্থা। আর আমাদের মহান ইউনিয়ন নেতারা নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছেন। বাটি চালান দিয়েও নির্যাতিত সাংবাদিকদের পাশে তাদের পাওয়া মুশকিল। কেউ আহত নিহত হলে তারা খবর নেন, কোন পত্রিকার সাংবাদিক। কোন ইউনিয়ন করে। আওয়ামী লীগ না বিএনপি। পত্রিকাটা সরকারপন্থী না সরকারবিরোধী। এসব খবর নিতে নিতে আহত সাংবাদিক কবরস্থানে রওনা দিয়েছেন; কিন্তু নেতাজি তার ঘর থেকেও বের হননি।

বুকভরা দুঃখ কষ্ট অভিমান ক্ষোভ থেকে বলছি, এই নেতাজিদের দিয়ে কীভাবে হবে সাংবাদিকদের স্বার্থরক্ষার আন্দোলন! এদের তদবিরে সাংবাদিকের প্রাণরক্ষা হবে! হায় হায়, আমরা এদের ভরসায় আশায় বুক বেঁধে আছি, সাগর-রুনি হত্যার সুষ্ঠু বিচার হবে।

সাবেক প্রধান বিচারপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা সুলেখক মুহম্মদ হাবিবুর রহমান আমাদের চোখে ডিনামাইট ফাটিয়ে বললেন, কাকের বিপদে কাকও পাশে আসে। সাংবাদিকের বিপদে সাংবাদিকদের দেখা মেলে না। তিনিও ঐক্যের তাগিদ দিলেন। আর আমরা অনৈক্য, বিভেদ, রাজনৈতিক দলবাজি, নেতানেত্রীর তেলবাজি করে নিজেদের গণকবর খুঁড়ে চলেছি।
শাজাহান খানকে দেখুন, তিনি ‘হত্যাকারী বাসচালক’কে রক্ষার জন্য সর্বস্ব লড়ছেন। ওই চালক বিএনপি করে না আওয়ামী লীগ—এই খবর-তালাশ তিনি করেন না। তার কাছে সড়ক শ্রমিক মানেই আপন লোক। নিজের লোক।

আজ তার প্রশ্রয়-আশ্রয়াধীন কর্মীরা ‘হত্যা’ করেও রেহাই পাচ্ছেন। জামিন পাচ্ছেন। যদি তার শ্রমিকরা নির্যাতিত হতো সাংবাদিকদের মতো, প্রায় প্রতিদিন পুলিশের ডাণ্ডা-বুটের নিচে, বেডরুমে, বাস চালনার সময় দমন-পীড়ন, খুন-খারাবির শিকার হতো, আমরা তখন শাজাহান খানের কোন চেহারাটা দেখতাম। খান সাহেব নিশ্চয়ই বাঘের মতো গর্জন করে উঠতেন। মুহূর্তের মধ্যে অচল হয়ে যেত সারা বাংলাদেশ। টাইম নিউজউইক তাকে দক্ষিণ এশিয়ার লেস ওয়ালেসা বলে আখ্যা দিয়ে কভার স্টোরি করত।

সেখানে আমাদের নেতারা নিতান্তই পুষি-ক্যাট। তারা কালেভদ্রে মিউ মিউ করেন। তারপর কেউ চায়ের দাওয়াত দিলেই তাদের সেই রোমান্টিক কুহুতান অনির্দিষ্টকালের জন্য থেমে যায়।
আমাদের কোনো কোনো সাংবাদিক ইউনিয়ন নেতার দেখি খুব গোস্বা, সড়ক শ্রমিক নেতাকে পূর্ণমন্ত্রী করলেন শেখ হাসিনা আর ওনারা দেশের ফোর্থ স্টেটের নেতাজি, ওনাদের কেন মহাজোটের এমপি বানিয়ে আনা হলো না। যদি ভোটে হেরেও যান, ওনাদের কেন টেকনোক্র্যাট কোটায় আবুল মাল মুহিত, শফিক আহমদের মতো মন্ত্রী বানানো হচ্ছে না। বলতে হাসিও পাচ্ছে, আবার লজ্জাও লাগছে—ইউনিয়ন লিডার হিসেবে এই যোগ্যতা নিয়ে আবার মন্ত্রী হওয়ার স্বপ্নও দেখেন তারা! প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবার হাঁড়ির খবর রাখেন। কোথায় কে কখন ফোন করেন, তার রেকর্ড রয়েছে তার টেবিলে।

এইভাবে একের পর এক সাংবাদিককে মারা হচ্ছে অথচ নেতাজিদের টুঁ শব্দটি করার সাহস নেই। এইসব গৃহপালিত, গৃহলালিতদের মূল্যায়ন করলেও-বা কি, না করলেও-বা কি! মহাজোট নেত্রীর কি আসে যায় তাতে। মেনন- ইনুর মতো নেতাকেও মন্ত্রী না বানিয়ে দিলীপ বড়ুয়াকে বানিয়েছেন। কি আসছে যাচ্ছে তাতে।

দেশজুড়ে থাকা কলম-মজুরদের বিশাল নেটওয়ার্ককে যারা একটি গতিশীল কার্যকর ডাইনামিক পেশাজীবী সংগঠনে রূপান্তর করতে পারে না, তাদের মূল্যায়ন না করায়, মন্ত্রীফন্ত্রী বানিয়ে মহাজোট মন্ত্রিসভাকে আরও পচা দুর্গন্ধযুক্ত নর্দমায় পরিণত না করার জন্য আমি আক্ষরিকভাবে শেখ হাসিনাকে স্যালুট জানাই।

পরিশেষে ইন্টারনেট থেকে পাওয়া একটি গল্প :
গৃহপালিত একটি ছাগলকে বেঁধে রাখা হয়েছে গৃহস্থ বাড়ির আঙ্গিনায় কাঁঠাল গাছের নিচে। গাছ থেকে কাঁঠালপাতা পড়ে। ছাগলটি খায়। কাঁচা পাতা খায়। পাকা পাতা খায়। ছাগলটি সর্বভুক। কেউ কলার খোসা দিলে তাও খায়। পলিথিনও খায়।

খেয়ে-দেয়ে ছাগলটি নাদুসনুদুস। গা চকচকে। থুতনিতে দাড়িও ফ্রেঞ্চকাট। গৃহস্থ বাড়িতে যারা বেড়াতে আসেন ছাগলটির দাড়ি ধরে তারা টানেন। মজা করেন আর কি। ছাগল কিছু বলে না। বাড়ির ছেলেপেলেও লাথি-গুঁতা দেয়। ছাগল কিছু বলে না। রাস্তার ছিঁচড়ে ছেলেপেলেরা লাঠি দিয়ে গুঁতা দেয়। ছাগলটি ভ্যা-ও করে না। রান্নাঘরের পাচক ছুরি দেখায়। লেজে পোঁচ দেয়। ছাগল কিছু বলে না। তারপর একদিন গৃহস্থ ছাগলটিকে জবাই করে ভূরিভোজ করেন। এবারও ছাগল কিছু বলে না।

ঈশপের বাণী : মরা ছাগল কখনও প্রতিবাদ করতে পারে না। প্রতিবাদ করতে হলে মরার আগেই করতে হয়।
* আমরা সাংবাদিকরাও কি এই মরা ছাগলের ভাগ্যবরণ করতে চলেছি!