ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর লাগামহীন বক্তব্য নিয়ে এসব তিক্ত কথা বলে খারাপও লাগছে। তিনি আছেন নানা ঝামেলার মধ্যে। অত্যন্ত তুচ্ছ হয়েও তার প্রতি সহানুভূতিও জাগছে। তিনি কিছুতেই তার কথা বলার জিহ্বাকে সম্বরণ করতে পারছেন না। এ নিয়ে অতীতে তাকে অনেক খেসারত দিতে হয়েছে। তির্যক কথা তার খুব প্রিয় নেশা। যাকে তিনি স্নেহ করেন, তাকে নিয়েও টিটকারি দেন তিনি। এটা একজন স্নেহময়ী বড় বোনের ক্ষেত্রে হয়তো মানা যায়—কিন্তু একজন প্রধানমন্ত্রীর জন্য মানানসই নয়। প্রধানমন্ত্রীকে একটা দেশ-রাষ্ট্রের বৃহত্তম সংসার চালাতে হয়। দেশটাকে নিজের ঘরের ড্রইংরুম ভাবা তার ঠিক নয়। সুধা সদনের ড্রইংরুমে যে কথা বলা যায়; রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন—গণভবনে বসে সে কথা বলা যায় না। এই পার্থক্য টুকু তাকে বুঝতে হবে। কথাগুলো সবিনয়ে বলছি।

২৬ ফেব্রুয়ারি গণভবনে তিনি মাইকের সামনেই বলেছেন—মিডিয়া যা ইচ্ছা তাই লিখছে। সত্য হোক, মিথ্যা হোক- স্বাধীনতা পেয়ে যা ইচ্ছা তাই লিখছে। কখনও কখনও একটু বেশিই লিখছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই কথার মধ্যে বেশ খানিকটা প্রশ্রয় আছে। মিডিয়ার যাচ্ছেতাই লেখা তিনি বুঝি বেশ উপভোগ করছেন।

উপভোগ তো তিনি করবেনই। কেননা মহাজ্ঞানী মহাজন যে পথে চলছে—মিডিয়া সে পথে হাঁটবেই। মিডিয়া সমাজ-সংসার, সরকার-রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। যে দেশের প্রধানমন্ত্রী যা ইচ্ছাতাই বলেন; সে দেশের মিডিয়া পর্দানশীন হতে পারে না। মিডিয়ার কাছ থেকে যদি তিনি সরকারের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা চান, তবে তাকেও ইতিবাচক হতে হবে। তাকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। যা মনে আসে তা বলার প্রবণতা থেকে সরে দাঁড়াতে হবে। ইদানীং মিডিয়া তো কিছু লেখে না। শেখ হাসিনা যা বলেন; তার হবুগবু মন্ত্রীরা যা বলেন, তাই পরিবেশন করে। নিজেদের ফালতু বাতচিতেই ঘায়েল হচ্ছে সরকার। মিডিয়া এখানে আগ বাড়িয়ে কিছু করছে না। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বেডরুম পাহারা দেয়া সম্ভব নয়। মিডিয়া তার বরাতেই হুবহু তার বাণী মোবারক ছেপেছে। যা ইচ্ছাতাই কিন্তু প্রধানমন্ত্রী স্বয়ংই বললেন। মিডিয়া তা প্রচার করেছে মাত্র। হ্যাঁ, তার কথার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া হয়েছে ভয়াবহ। মানুষের মুখে মুখে তার কথা। তিনি জনগণের নিরাপত্তা নিয়ে হাস্য-পরিহাস করেছেন, বাদশাহী মেজাজে রসিকতা করেছেন; জনগণ তাতে প্রবল নিরাপত্তাহীনতা বোধ করছে। তারা হিসাব করছে শেখ হাসিনাকে ভোট দিয়ে কী পেলাম! খুন হয়েও তার কাছ থেকে টিটকারি শুনতে হবে।

মানুষের মধ্যে যে এই অনাস্থা-ক্ষোভ—এগুলো মিডিয়া সৃষ্টি করেনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি একটু ধৈর্য ধরে আত্মবিশ্লেষণ করেন, নিশ্চয়ই তিনি অনুধাবন করতে পারবেন—এর জন্য দায়ী তিনি স্বয়ং। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ঐতিহাসিক মহত্ কাজ করেছেন তিনি। কিন্তু শত শত মানুষ খুন হচ্ছে, সে সবের বিচার হচ্ছে না। সঠিক তদন্ত হচ্ছে না। খুনিদের ফাঁসি হচ্ছে না। এই ব্যর্থতার দায়ভার কেমন করে খালেদা জিয়া-তারেক রহমানের হবে! উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে প্রধানমন্ত্রী কেমন করে দায়মুক্ত হবেন? তার দায় তাকেই নিতে হবে। খামোখা এই দায় খালেদা জিয়া-তারেক রহমানের দিকে ঠেলে দিয়ে তিনি তাদের তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রবল জনপ্রিয় করে তুলছেন। কেন তিনি ভুলে যাচ্ছেন সরকার তিনি চালাচ্ছেন; খালেদা নন।

এই যে কথাগুলো বললাম, আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতাকর্মীও তা বুঝতে পারছেন; তারা সাহস পাচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রীকে বলতে। ক্ষমতা কি তবে সত্যিই কোনো চোরাবালি, আত্মরতি, আত্মচারিতা—অহঙ্কার মানুষকে অন্ধ করে দেয়। একজন জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এমনই জনবিচ্ছিন্ন, একা হয়ে পড়েন যে, সত্যকে মুখ ফুটে বলার মতো তার পাশে কেউ নেই। সুরঞ্জিত-ওবায়দুল তবু ছিটেফোঁটা ছিলেন—মন্ত্রী হওয়ার পর তারাও গুম মেরে গেলেন! ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনা যে নিজের চেয়ারকে ক্রমেই শরশয্যা বানিয়ে তুলছেন; অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর শুভাকাঙ্ক্ষীরা এতই আখের গোছাতে ব্যস্ত যে—কেউ তা মুখ ফুটে বলছে না।