ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

প্রিয়তমা, এ চিঠি তোমার কাছে পৌঁছাবে কি না জানি না। কেননা, ওরা আমার সর্বস্ব সঞ্চয় লুটে নিয়ে আমাকে নিঃস্ব, সর্বহারা করে দিয়েছে, ওদের হাত অনেক লম্বা, চাইলে ওরা আমার পত্রটিও লুটে নিতে পারে।

পত্র-পত্রিকায়, টিভিতে নিশ্চয়ই দেখেছ, সোমবার মতিঝিলে শেয়ারবাজারে মিছিল হয়েছে লাশ নিয়ে। তোমাকে বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে, ওই লাশটি ছিল আমারই। আমার লাশকে ঘিরে খাটিয়ার পাশে আমার শেয়ারবাজার-স্বজনদের সেকি আকাশ ফাটানো কান্না। ওদের আহাজারিতে নিশ্চয়ই খোদার আরশ কেঁপে ওঠার জোগাড় হয়েছিল। ওখানে আমাকে ঘিরে কাঁদছিল আমার মতিঝিল পাড়ার বোনেরা, ভাইয়েরা। ওদের কান্না ছিল এমনই মর্মভেদী—আমিও খাটিয়ার লাশ হয়ে গুমড়ে গুমড়ে কাঁদছিলাম। এমন গণকান্না তুমি কি কোথাও দেখেছ কভু! এ-তো দু’চার পাঁচশ’ মানুষের কান্না নয়; এ কান্না ৫৬ হাজার বর্গমাইলজুড়ে আজ ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েক কোটি মানুষ আজ একযোগে কেঁদেই চলেছে। কিছুতেই তাদের চোখের জল শুকাবার নয়। মতিঝিলের শেয়ারবাজারে লাশ আমি একা হইনি। শহীদ আমি একা নই। আজ সর্বস্ব হারিয়ে ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারী অকালে শহীদ হতে চলেছে। ডেডম্যান ওয়াকিং বলে একটা ইংরেজি ছবি আছে। মৃত মানুষ হাঁটছে, চলছে, ফিরছে। হ্যাঁ, এই ৩৩ লাখ মানুষ আজ জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে আছে। তাদের এক লাখ কোটি টাকা লুটে নিয়ে লুটেরা মহিষাসুর চক্র সুইজারল্যান্ড, আমেরিকায় সম্পদের পাহাড় গড়ছে—আমাদের টাকায় বানাচ্ছে তাজমহলের মতো সুরম্য অট্টালিকা। আর দেশের অশ্রু-যমুনায় আমাদের চোখের পানিতে যে অথৈ উচ্ছ্বাস, সে কথা কেউ দেখেও দেখে না।

প্রিয়তমা, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের বিনিময়ে পাকিস্তানি হানাদারদের পরাধীনতাকে চিরতরে কবর দিয়ে আমরা অর্জন করেছিলাম স্বাধীনতা; সেই স্বাধীন দেশে আজ ৪০ বছর পর মহিষাসুর চক্র জিন্দা লাশ বানিয়েছে ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারীকে—এর কি কোনো বিচার নেই? বিশ্বে কি এই হানাদার-লুটেরাদের ফাঁসির জন্য কোনো মানবাধিকার ট্রাইব্যুনাল নেই?

প্রিয়তমা, এই নব্য হানাদারদের ফাঁসি না দেখা পর্যন্ত আমার আত্মা কোনো দিন শান্তি পাবে না। ৩৩ লাখ পরিবারের ক্ষত যে কোনো দিন সারবে না। আমরা যে মরেও মরিনি, আমরা যে ক্ষুধিত পাষাণ হয়ে আছি, তার খবর কি এই রাষ্ট্র, এই সরকার জানে?

আমাদের কান্নায় আল্লার আরশ কেঁপে উঠছে, আর তুচ্ছ মানব সন্তান মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী তাদের অন্তরে কি এতটুকুও অনুশোচনা জাগছে না?

আমাদের নেতানেত্রীরা কি এমনই নিষ্প্রাণ পাষাণ— প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য কত কিছুই না করছে এই জীবন্ত লাশেরা। মতিঝিল এখন বাণিজ্য কেন্দ্র নয়; মতিঝিল এখন শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের বধ্যভূমি। আর সেই বধ্যভূমিতে ৩৩ লাখ পরিবার দিনের পর দিন গণমাতম করে চলেছে। কান্নাতে কাজ হয়নি, তারা মিছিল করেছে। বিক্ষোভ দেখিয়েছে। টায়ার জ্বালিয়ে আগুনের হলকায় শুকিয়ে নিয়েছে অনিরুদ্ধ অশ্রু। যারা এই লুটেরা চক্রে জড়িত—সালমান, লোটাস তাদের গডফাদার উপদেষ্টা মহিষাসুর; অথর্ব অর্থমন্ত্রী, বিবি গভর্নর— তাদের কুশপুত্তলিকা পুড়িয়েছে, তাদের বিচার দাবিতে মুখর হয়েছে স্লোগানে—মাসের পর মাস গেল টনক নড়েনি কারও।

সরকারের তরফ থেকে কেবলই মিলেছে ভণ্ডামি। বিশ্ব বেহায়াকেও লজ্জা দিয়েছে তারা। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও আশ্বাসের ফুলঝুরি হয়েছে অনেক। মতিঝিল বধ্যভূমির জীবন্ত লাশদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ; ইনটেনসিভ—জীবন্মৃতের দেহে লাইফ সাপোর্ট দেয়ার প্রতিশ্রুতি।

কিন্তু সেসব কিছু কেবল কথার কথাই রয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রীর অভয় বাণী আমরা পেলাম; কিন্তু নেক নজর কখনও পেলাম না। প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগস্থল মতিঝিল যখন কবরস্থান হয়ে উঠলো তখন তিনি কেমন করে বলেন, শেয়ারবাজারে যারা টাকা খাটিয়েছে লাভক্ষতির দায়িত্ব তাদেরই নিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে এ কথা শোনার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না আমরা। কেননা, তিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। তিনি সরকারের মধ্যে শেষ ভরসাস্থল। এর আগে লুটেরা চক্রের পৃষ্ঠপোষকরা যে কথা বলে এসেছে, সেই কথা তার মুখেও শুনলে আমরা যাব কোথায়! এখন তো খোদার আরশ কাঁপিয়ে গণমাতম ছাড়া আর কোনো বিকল্প হাতে রইল না।

সোমবারের দৃশ্যগুলো নিশ্চয়ই তুমি দেখেছো! এদিন একান্ত নিরুপায় হয়ে আমার ভাইয়েরা-বোনেরা প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। অনাস্থা জানিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এখন শোকে পাগলপারা হতে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী কিছু করবেন, এই আশায় যখন গুড়েবালি, তখন তারা তার বিরুদ্ধেও স্লোগান দিতে কসুর করছে না। তবুও তাদের প্রত্যাশা—প্রধানমন্ত্রীর ঘুম ভাঙ্গুক।

সোমবার লাখো শেয়ারবাজার-শহীদ প্রতীকী গণআদালত বসিয়েছিল মতিঝিলে। ’৯৪ সালে একাত্তরের গণহত্যার বিচার—গোলাম আযম গংয়ের ফাঁসির দাবিতে গণআদালত বসেছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে— কুশপুত্তলিকা দাহ করে সেই গণআদালতে প্রতীকী বিচার ও ফাঁসির রায় হয়েছিল। তখন শীতের দিন ছিল।

এবার ২০১২ সালে আরেক শীতের দিনে মতিঝিল বধ্যভূমিতে গণআদালত বসেছিল শেয়ারবাজার থেকে এক লাখ কোটি টাকা লুটে নেয়া মহিষাসুর চক্রের বিরুদ্ধে।
এই ৩৩ লাখ পরিবারের গণআদালতেও ফাঁসির রায় হয়েছে লুটেরাদের। আর সেই ফাঁসিপ্রাপ্ত লুটেরাদের লাশ বহনের জন্য প্রতীকী খাটিয়াও আনা হয়েছিল সেখানে।

কিন্তু পেটোয়া পুলিশের পিটুনি দিয়ে কি শেষ পর্যন্ত এই প্রতিবাদকে পণ্ড করা সম্ভব? লাখো মানুষের কান্না, ক্ষোভ- অন্তর্জ্বালা—পুলিশের জলকামান দাগিয়ে-পিটিয়ে মেরে-কেটে টিয়ারশেল ছুড়ে দমন করা যাবে না। কখনোই যায়নি। আজকের যেটি প্রতীকী গণআদালত; কাল হোক পরশু হোক, দু’বছর পরে হোক, সত্যি সত্যি জনতার আদালতে এই লুটপাট ও লুটেরা চক্রের বিচার হবেই হবে।

সেই বিচার যতদিন না হচ্ছে, আমার অতৃপ্ত আত্মার ততদিনে শান্তি নেই। জনতার বিচারের দিনে লুটেরারা নিউইয়র্ক, জুরিখ— কোথায় গিয়ে লুকাবে জানি না; কিন্তু আমাদের দীর্ঘনিঃশ্বাস এই ইয়াজুজ মাজুজদের অবসান ঘটিয়ে ছাড়বে। ওরা জানে না, খোদা কোনো বিচারই পেন্ডিং রাখেন না। নিয়তির পরিণতি না যায় লঙ্ঘন।

প্রিয়তমা, আমার এই অন্তর্জ্বালা তোমার কাছেই লিখে যাচ্ছি। কেননা, এই সরকার ও প্রধানমন্ত্রী—তারা বধির, অন্ধ। তারা ক্ষমতাবিলাসী। তারা চারপাশের এই প্রলয় মাতম দেখেও দেখেন না।
তোমাকে আমি এরই মধ্যে বলেছি, অঢেল টাকা আর বিত্ত বিলাসিতার লোভে আমি রাতারাতি ঝাঁপিয়ে পড়িনি শেয়ারবাজারে। অতি সুকৌশলে টোপ ফেলে—নানারকম আয়-উন্নতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে টেনে আনা হয়েছে আমাদের। বর্তমান অর্থমন্ত্রী—উনি একজন মহান বুদ্ধিজীবী, অর্থশাস্ত্রবিদের অভিনয় করেছেন দক্ষতার সঙ্গে। ইংরেজি, বাংলা মিলিয়ে কত সুন্দর সুন্দর বোল-চাল করেছেন। তার সরল-প্রবীণ চেহারা দেখে নিরীহ মানুষ বুঝতেই পারেনি কী ‘ঘুঘুর ফাঁদ’ তৈরি হয়েছে তাদের ঘিরে।

মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসতেই যিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হলেন—ওরে বাবা, তিনিও এক বিশাল বুদ্ধিজীবী। সুশীল সমাজের সুশীল অর্থনীতিবিদ।

কত গালগল্প ছড়ানো হলো বাজারে। মহাজোট সরকারের অন্যরা অসততার বরপুত্র হতে পারে, কিন্তু অর্থমন্ত্রীর মতো ব্যক্তিগত জীবনে সত্-নির্লোভ নিরহঙ্কার আর কেউ হয় না।
আর বিবি গভর্নর, তিনি তো উত্থানের কিংবদন্তি। ছিলেন সত্যিকারের রাখাল। তার হতদরিদ্র পিতার পড়ানোর সঙ্গতি ছিল না। এলাকার মানুষের সামষ্টিক অনুগ্রহে তার লেখাপড়া চলেছে। গোপালক রাখাল থেকে তিনি অর্থনীতির রাখাল হয়েছেন। তিনি নিজেও সাক্ষাত্কার দিয়ে বলেছেন, সাধারণ মানুষের সামষ্টিক দানে তিনি বড় হয়েছেন; নিজেকে তিনি সামষ্টিক কল্যাণেই উত্সর্গ করবেন। কী ঋষিতুল্য বচন। আমরা বিশ্বাস করেছি তাদের এই ইমেজ। ভেবেছি, সত্ মানুষ এবং গরিবের প্রতিনিধি অর্থনীতিবিদরা অর্থ বিভাগের কর্ণধার থাকলে দেশের অর্থনীতির শনৈঃশনৈ উন্নতি হবে। অর্থনীতি দেশের ইতিহাসের স্বর্ণযুগে পৌঁছে যাবে।

ওই সময় আমরা কেমন করে বুঝবো—লুটেরা মহিষাসুর চক্র ওই দু’জনকে লোভনীয় বিজ্ঞাপন হিসেবে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরে চুপি চুপি লক্ষ-কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার ভয়ঙ্কর ফন্দি এঁটেছিল।
ওরা ওদের নীল নকশা অনুযায়ী এগুচ্ছিল। অর্থনীতির নানারকম বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধনের ওয়াদায় টিভি সেট মাতিয়ে তুললেন অর্থমন্ত্রী। অন্য দশটা ব্যবসার মতো গড়পড়তা লাভ-লোকসানে শেয়ারবাজার তখন আপন গতিতে চলছিল। আমার বন্ধু দীপঙ্কর-বদিউলের মতো কেউ কেউ টাকা খাটিয়ে বাড়ি-ফ্ল্যাট করার মতো লাভ করছিল। কেউ একটু বেশি; কেউ একটু কম। কখনও লোকসানও হচ্ছিল। পরে আবার লাভ। লাভক্ষতি নিয়ে কোনো বাড়াবাড়ি ছিল না। তাই তখন শেয়ারবাজারে কারও পথে বসতে হয়নি।
কিন্তু মহাজোটের দেশ-মহাজনরা যখন এলেন, তারা শেয়ারবাজারকে চাঙা, ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তুললেন।

তখন কেউই বোঝেনি, এরা সবাই দাদনের মহাজন। দাদন ব্যবসায় যেমন ১০০ টাকার মূলধনে প্রতি মাসেই ১০/১৫ টাকা সুদ; এরা তার চেয়েও বেশি দাদন লুটতে এসেছে। এরা ১০০ টাকা খাটিয়ে প্রতি মাসেই ১০০ টাকা সুদ ধরে ২/১ বছর পর সুদাসলে ষোলআনা লুটতে এসেছে।

কেউই তখন মহাজন চক্রের মহাচক্রান্ত আঁচ করতে পারেনি। সততার বরপুত্র অর্থমন্ত্রী ব্যাংক-ডাকঘরের সফল সঞ্চয়পত্র খেদিয়ে শেয়ারবাজারে পাঠানোর মহত্ কর্মে নামলেন। সঞ্চয়পত্রের লাভ দিলেন কমিয়ে। উেস কর- নানা ট্যাক্স বসিয়ে সাধারণ সঞ্চয়কারীদের পাগলা করে তুললেন। আমার যা কিছু সঞ্চয় ৪/৫ লাখ টাকা হবে— খাটিয়ে ছিলাম সঞ্চয়পত্রে, আগে যেখানে মাসে ৫ হাজার টাকা পেতাম, তা অর্থমন্ত্রীর নানা তত্পরতায় ৪ হাজার টাকায় নেমে গেল।

আমার এই দুরবস্থায় খুব কষ্ট পাচ্ছিল সহকর্মী বন্ধু বদিউল ও দীপঙ্কর। ওরা অনেক আগেই লেজ কাটিয়েছে শেয়ারবাজারে। আমাকেও নিতে তাদের বড় হাপিত্যেশ।
ওরা বললে, তুই অন্তত ১ লাখ টাকা খাটিয়ে দেখ সঞ্চয়পত্রের তুলনায় লাভ না লোকসান হয়।

সত্যি বলতে কি—সঞ্চয়পত্র নিয়ে খুব হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। সঞ্চয়ে লাভ বাড়ে। কিন্তু সরকার সে লাভ ও সঞ্চয় ছেঁটে দেয়, আমরা ব্যাংকাররা কেউ কখনও শুনিনি।
বন্ধুদের পীড়াপীড়িতে ১ লাখ টাকা শেয়ারবাজারে লাগালাম। বি.ও. একাউন্ট করলাম। বিস্মিত হয়ে দেখলাম, লাখ টাকার শেয়ারগুলোর দাম কয়েক মাসেই কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। আর বাকি ৪ লাখ টাকায় মাত্র ১২ হাজার টাকা বাড়তি জমা হয়েছে।

বন্ধুদের পরামর্শে লাখ টাকার শেয়ারপত্র কয়েক লাখ টাকায় বেচলাম। আমার জীবনে এক অভাবনীয় ঘটনা। দীপঙ্কর বলল, শেয়ারের দাম এভাবে বাড়তেই থাকবে বন্ধু। টাকা বানাতে চাইলে শেয়ারে টাকা খাটা।
আমি অনেক অনেক টাকা বানাতে চাইনি প্রিয়তমা। শুধু চেয়েছি তোমার-আমার জন্য নিজস্ব ঠিকানা; আর বোনদের ভালো বিয়ের খরচাপাতির সংস্থান।

আর তা করতে গিয়ে একদিন প্রায় ১০ লাখ টাকার পুঁজি খাটিয়ে আমিও মতিঝিলের শেয়ার মার্কেটের একজন হয়ে উঠলাম। আস্তে আস্তে শেয়ারবাজারের ফাঁদে আটকে যেতে থাকলাম। পরের মাসগুলো কেবলি মুনাফায় ফুলে ফেঁপে ওঠার বসন্ত দিন। পুঁজি কেবল বাড়ছে আর বাড়ছে। অর্ধ কোটিপতি হতে তেমন সময়ই লাগল না।
তখন মনে হলো, আমার স্বপ্ন বাস্তবায়ন বেশি দূরে নয়। আমি চাইলে স্বপ্নকে ছুঁতে পারি।

ওই দিনগুলো ছিল স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা। আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে গল্প ছড়িয়ে পড়ল—আমি শেয়ারবাজারের জাদুর চেরাগ পেয়েছি। আমি নাকি কয়েক কোটি টাকার মালিক বনে গেছি। যতই তাদের বলি, ১০ লাখ টাকার পুঁজি ৪০-৫০ লাখ হয়েছে। কেউ তা বিশ্বাস করে না। ভাবে বিনয় করছি। কোটিপতির বিনয় বলে কথা।

মিরপুরের রূপনগরের জমি ও বাড়ি নিয়ে আমার বাবা-চাচার মধ্যে এতো ঝগড়া-বিবাদ, মা-চাচী মুখ দেখাদেখি বন্ধ। একদিন দেখলাম, তারা বিবাদ মিটিয়ে আমার কাছে ধর্না দিচ্ছে—বাবা, বাড়িটা বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে শেয়ারবাজারে খাটা। ছোট চাচীর ইচ্ছা—টাকাটা কয়েক গুণ হলে দোতলা বাড়িটা ৬তলা করবেন।

আমি অনাগ্রহ দেখাতে চাচী বললেন, বংশের আর কেউ কোটিপতি হোক এটা আমি নাকি চাই না। চৌদ্দগোষ্ঠীর মধ্যে আমি একা বড়লোক হয়ে থাকতে চাই।
কি আর করা! একরকম বাধ্য হয়েই তাদের ইচ্ছায় নিজেকে সঁপে দিলাম।

বাড়ি বন্ধকে পাওয়া ৩০ লাখ টাকা শেয়ারবাজারে চলে গেল। সে টাকাও ফুলে-ফেঁপে উঠতে লাগল। জমি বন্ধক দিয়ে নেয়া টাকা। বাবা-চাচাকে বললাম, শেয়ার বেচে দিয়ে তোমরা বাজার থেকে বেরিয়ে যাও। বাড়ি বানাও। শেয়ারবাজারের কোনো কিছু হলে বাড়ি উঠবে নিলামে। তখন কোথায় আমরা থাকব।
কে শোনে কার কথা। তারা রাজি হলেন না।

একদিন তোমার বড় মামা ফোন করে কুশলাদি জানতে চাইলেন। কথা প্রসঙ্গে শেয়ারবাজারের কথা বললাম। দেখলাম, তার প্রচণ্ড আগ্রহ। টাকা নিয়ে তিনি একরকম মুখিয়ে। বললেন, ২০/৩০ লাখ টাকা তিনি আমার জিম্মায় দিতে চান। ব্যাংকের আমানতী লাভের চেয়ে একটু বেশি লাভ তাকে দিলেই হবে।

আমি তখন এতটাই মতিঝিলমুখী টেরই পাইনি কখন আমাকে শেয়ারের প্রবল নেশায় পেয়ে বসেছে। আমাদের সরকার, অর্থমন্ত্রী তখন সেকি দিল দরিয়া। নানা সুযোগ-সুবিধা; কালো টাকা সাদা করার সুযোগ—মার্জিন লোন, টাকার উত্স নিয়ে ঝামেলা না করা, কত রকম লোভের ফাঁদ পাতলেন তারা।

পাগলা ঘোড়ার মতো বেড়েই চলেছে শেয়ারের দাম। আমি নিজের ব্যাংক থেকেও মোটা অংকের একটা ঋণ নিলাম। ভাবলাম, একটা বাজি ধরে দেখি না কেন! যদি জিতে যাই সুখের সাগরে অবগাহন করব তুমি আর আমি।

বছর না ঘুরতেই আমি শেয়ারবাজারে বাড়ি বন্ধক, নিজের সঞ্চয়, ব্যাংক লোন, তোমার মামার সারপ্রাইজ ভাউচার সব মিলিয়ে ১ কোটি টাকার ওপরে খাটিয়ে বসলাম। তখন বাজির ঘোড়ার মতো দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে শেয়ারবাজার তেজী থেকে তেজী হচ্ছে। আমারও তখন পেছন ফিরে তাকানোর কোনো সুযোগ নেই।

আমি, আমার বন্ধুরা, পিতামাতা—সবাই অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম, কোটি টাকার কষ্টার্জিত বেসিক ইনভেস্টমেন্ট ফুলে ফেঁপে দেড় কোটি, ২ কোটি, আড়াই কোটি টাকায় গিয়ে পৌঁছেছে। মনের মধ্যে কারা যেন অশনি সঙ্কেতের কড়া নাড়ছিল।

শেয়ার বেচে বাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কিন্তু শেয়ারবাজারের কারসাজি—কারিগররা নানাভাবে তাতে বাধা দিল। শেয়ারের দাম কাগজে-কলমে বেড়েই চলছে প্রতিদিন। এ সময় বিক্রি মানে বিরাট বোকামি—বাড়তি আরও কোটি টাকার লোকসান।

দীপঙ্কর, বদিউল, আমি—তিন বন্ধু তিন ভাগ হয়ে পড়লাম। দীপঙ্কর কিছু কিছু বেচে সরে পড়ছিল। আমি আর বদিউল—মাটি কামড়ে পড়ে থাকলাম। আমাদের টাকা শেয়ারের কাগজে কাগজে খালি বাড়ছিল। আমরা কোটিপতি থেকে বিলিয়নিয়ার হতে চলেছি।

তারপর সেই কেয়ামতের দিনগুলো এল। মতিঝিলের শেয়ারবাজারের কোটি কোটি টাকা দামের কাগজগুলো রাতারাতি ফালতু হয়ে গেল। শুরু দরপতনের পালা।
দীপঙ্কর বলল, বন্ধু আর নয়, এবার যে করেই হোক বেরিয়ে যা, সব শেয়ার বেচে দে।

কিন্তু কেমন করে শেয়ারবাজার থেকে বেরুবো। কয়েক কোটি টাকার শেয়ার যে রাতারাতি কোটি টাকার নিচে নামতে চলেছে। আতঙ্কিত হয়ে বেচতে গেলাম। লাভ চাই না, মূলধন বাঁচাও। কিন্তু বাজারে ক্রেতা নেই। দাম বাড়ার দিনে ক্রেতা মিলেছে; বিক্রেতা মেলেনি। আর এখন আমরা বেচার জন্য হন্যে হয়ে ফিরছি। কিন্তু ক্রেতা পাচ্ছি না। এই মহাপতনের দিনে কে কিনবে শেয়ার। কে এমন রাম বোকা!
বাজারে শুধু শেয়ার আর শেয়ার। কিন্তু ক্রেতার দেখা নেই। অথচ একটা সময় ছিল, বাজারে শুধু ক্রেতা আর ক্রেতা। শেয়ারের দেখা নেই।

প্রিয়তমা, আমি চোখের সামনে দেখেছি, কয়েক হাজার কোটি টাকার শেয়ারবাজার রাতারাতি মাস-বছর না ঘুরতেই ৪ লাখ কোটি টাকার বৃহত্তম বাজারে পরিণত হয়েছিল। আবার সেই বাজার লাখের অংক ছেড়ে হাজারের অংকে এসে ঠেকল। আমরা ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারী রাতারাতি নিঃস্ব, সর্বহারা হয়ে পড়লাম।

ওই মহিষাসুর লুটেরা চক্র হাজার কোটি টাকার শেয়ারবাজারকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ৪ লাখ কোটি টাকার বাজার বানিয়েছিল। আর এই ফাঁকতালে নিজেরা মাত্র কয়েকদিনে ১ লাখ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে আমাদের হাতে কাগুজে শেয়ার ধরিয়ে দিয়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেল।

প্রিয়তমা, তোমাকে সারপ্রাইজ করবো বলে আমার এই হঠাত্ আমির হওয়ার গল্প—কখনও তোমাকে বলিনি। আজ আবার যখন আমির থেকে ফকির হলাম তখন তোমাকে শেষ চিঠি লিখে জানিয়ে যাচ্ছি সব কথা। এখন আকাশের ঠিকানায় চিঠি লেখা ছাড়া আমার আর কোনো মুখ নেই।

মিরপুরের রূপনগরের বাড়িতে যাওয়ার মুখ নেই—বাড়িটি এখন নিলামে ওঠার জোগাড় হয়েছে। বাবা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে।
দুঃসংবাদ এমনই ছোঁয়াচে। চাচাও মৃতপ্রায়। ঘরে শুয়ে-বসে বিলাপ করছেন। চাচী আমাকে শাপ-শাপান্ত করছেন। বাপের চিকিত্সার টাকাও জোগাড় করার মুরোদ নেই আমার।
আমার নিজেরই ব্যাংক বাটি চালান দিয়ে আমাকে খুঁজছে। চাকরির পুরো বেতন দাখিল করেও যে ঋণের কিস্তি মিটছে না।

তোমার মামার কাছে মুখ দেখানোর জো নেই। তিনিও টাকার চিন্তায় অস্থির। ফোন করেছেন অনেকবার। আমি ধরিনি। নিজের যা সঞ্চয় তাও হারিয়ে আমি মতিঝিলের দেউলিয়া হয়ে উঠলাম।
দিনের পর দিন বাড়িতে যাইনি। অফিসে যাইনি। পালিয়ে বেড়িয়েছি পথে পথে।

চেনা কাউকে দেখলেই ভয় পাই—মনে হয় পাওনাদার বুঝি। আমার নিজের বাড়ি, নিজের ব্যাংক, তোমার মামা—সবাই যেন বাইনোকুলার নিয়ে ধাওয়া করছে আমাকে।
এই দুঃসময় দিকশূন্যপুরের বাসিন্দা হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় আমি দেখছি না। তাই কাউকে কিছু না জানিয়ে নিজেকেই নিজে গুম করতে বাধ্য হলাম।
প্রিয়তমা, মতিঝিলের এই বধ্যভূমির শহীদ আমি। আমার স্মৃতিরক্ষায় কোনো দিন কোনো স্মৃতিস্তম্ভ হবে না জানি।
এই রাষ্ট্র, এই সরকার, ওই মন্ত্রীবর্গ— আমাদের ফটকা কারবারি বলে উপহাস করবে জানি।

কিন্তু ওরা জানে না, তেত্রিশ লাখ পরিবারের কান্না নিয়ে আজ ওরা যতই হাস্য-পরিহাস করুক; এই কান্না এবং কষ্টের শেষ নিঃশ্বাস যখন ওদের জীবনেও অভিশাপ হয়ে দেখা দেবে, সেদিন ওরা মর্মে মর্মে অনুভব করবে নিষ্ঠুর চক্রান্ত করে জনগণের প্রত্যাশাকে হত্যা করার কি পরিণাম!

***
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে: দৈনিক আমার দেশ, ২৭ জানুয়ারি ২০১২