ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

একবিংশ শতাব্দীর এই সভ্য দুনিয়াকে আবারও লজ্জা দিয়েছে বিএসএফ। এবার বর্বরতা, নৃশংসতা, পাশবিকতার এমন কলঙ্কজনক নজির দেখাল ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী—আধুনিক বিশ্ব ইতিহাসে যার তুলনা মেলা ভার। শেম! শেম! কিংবা লজ্জা লজ্জা। কোনো উচ্চারণই আর তাদের ধিক্কার জানানোর জন্য যথেষ্ট নয়। আবুগ্রাইব কারাগারে বন্দিদের ওপর মার্কিন সেনাদের নিষ্ঠুরতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে হয়েছিল তোলপাড়, ঘৃণা-ধিক্কার ও প্রতিবাদের ঢেউ জেগেছিল বিশ্ববাসীর মাঝে। সেই আবুগ্রাইবের অত্যাচারের দৃশ্যাবলীকেও হারিয়ে দিয়েছে বিএসএফের নগ্ন নিষ্ঠুরতা। সম্প্রতি এক বাংলাদেশীকে উলঙ্গ করে বিএসএফ কর্তৃক নিষ্ঠুর নির্যাতন সমকালের সবচেয়ে ঘৃণ্য কলঙ্কতিলক। আবুগ্রাইব কলঙ্ককাণ্ড হয়েছিল কারাগারের ভেতরে; চার দেয়ালের ঘেরাটোপে। আর বিএসএফ মহাকলঙ্কের ঘৃণ্যতম দৃষ্টান্তটি দেখাল খোলা আকাশের নিচে; প্রকাশ্যে—একদল রক্ত উন্মাদ নেকড়ের সশব্দ উল্লাসে। একদিকে হিংস্র নেকড়ের উপর্যুপরি অত্যাচার; তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হায়েনাদের অবিরাম হাসি। আর সেই বিকট-বীভত্স উল্লাসের নিচে চাপা পড়েছে বাংলাদেশী তরুণ বিবস্ত্র হাবিবুরের করুণ গোঙানি ও বাঁচার আকুতি।

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুয়াশাছন্ন শীতের দিনে ওরা বধূবেশী কিশোরী ফেলানীকে নির্মম অত্যাচার করে হত্যা করেছিল। তারপর লাশ ঝুলিয়ে রেখেছিল সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ায়। ফেলানীর সেই লাশ ছিল অরক্ষিত বিপন্ন অনিরাপদ সীমান্তের জ্বলন্ত সাক্ষ্য। বিশ্ব বিবেক ক্ষুব্ধ, লজ্জিত অবমানিত হয়েছিল সেই ঘটনায়। তার রেশ না কাটতেই ২০১১ সালের ৯ ডিসেম্বর বিএসএফ চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সতের রশিয়া গ্রামের হাবিবুর রহমানকে উলঙ্গ করে যে কায়দায় তার ওপর নিষ্ঠুরতা চালিয়েছে—তা হার মানিয়েছে মধ্যযুগীয় পাশবিকতাকে। হিটলারের নািস বাহিনীর অত্যাচারও তার কাছে তুচ্ছ।

এরই মধ্যে এই ‘বিএসএফ ব্রুটালিটি’ নিন্দা ও ঘৃণার ঝড় তুলেছে বিশ্বজুড়ে। ভারতীয় স্যাটেলাইট গণমাধ্যম এনডিটিভি সম্প্রতি ওই নৃশংসতার যিকঞ্চিত্ কিছু মুহূর্তের ফুটেজ সম্প্রচার করাতেই আহত ক্ষতাক্ত রক্তাক্ত বিশ্ববিবেক। একবার ভাবুন, এই নির্যাতন চলেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে। একটানা পেটানো হয়েছে প্রায় ১ ঘণ্টা। তারপর থেমে থেমে বসিয়ে বসিয়ে প্রবল মজাদার ভঙ্গিতে বিএসএফ চালায় অত্যাচার। কিভাবে আরও কঠিন ‘আজাব’ দেয়া যায় তা নিয়ে হানাদাররা চালিয়েছে গবেষণা। টর্চারের সব রকম অসভ্য পদ্ধতি তারা প্রয়োগ করে প্রায় ৫ ঘণ্টা ধরে। তাদের এ টর্চার উদ্ভাবন ক্যাম্পে বাংলাদেশী হাবিবুর ছিল অসহায় গিনিপিগ। এ টর্চারের টার্গেট কোনো ব্যক্তি হাবিব নয়। টার্গেট সীমান্ত জনপদের অরক্ষিত অনিরাপদ কোটি বাংলাদেশী। তারা সবাই মৃত্যু-ঝুঁকির মুখে। সুশৃঙ্খল সুনিয়ন্ত্রিত ট্রেইন্ড বিএসএফ সদস্যরা জোর গলায় সাফাই দিয়েছে বাংলাদেশীদের ‘সবক’ দিতেই এ নিষ্ঠুর জঘন্য শাস্তি। সবক-এর মাধ্যমে তারা পরিষ্কার ম্যাসেজ পৌঁছে দিয়েছে বাংলাদেশের নিরীহ নিরস্ত্র নাগরিকদের অস্ত্রবাজ বিএসএফ কোন নজরে দেখছে। তাদের দৃষ্টিতে নিরস্ত্র বাংলাদেশীমাত্রই যেন টর্চার সেলের গিনিপিগ।

নির্যাতিত হাবিবুর ১৯ জানুয়ারি আমার দেশ সহ বাংলাদেশী মিডিয়ার কাছে তুলে ধরেছে সেদিনের ঘটনা। সে জানায়, ৫ ঘণ্টা ধরে চলে অমানুষিক নির্যাতন। বিএসএফের বর্বরতার সচিত্র ফুটেজ এখন ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে মোবাইলে মোবাইলে। ইউটিউবসহ ইন্টারনেটে পাওয়া যাচ্ছে এ ঘটনার বিস্তারিত ভিডিও।

যাদের হৃদয় দুর্বল, যারা নিষ্ঠুরতা সহ্য করতে পারেন না—তাদের জন্য আগাম হুশিয়ারি জানিয়ে রাখি, বিএসএফ ব্রুটালিটি (BSF BRUTality) শিরোনামের ১১ মিনিট ৫৬ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যের এই বীভত্স নৃশংসতা তাদের না দেখাই ভালো। দেখে আপনি হয়ে পড়তে পারেন গুরুতর অসুস্থ। যা আপনার মননে শরীরে ডেকে আনবে অশনি।

গত ৯ ডিসেম্বর রাজশাহীর পবা উপজেলার খানপুর সীমান্ত দিয়ে গরু আনার সময় হাবিব বিএসএফের নির্যাতনের শিকার হয়।
এখনও শরীরে ক্ষত নিয়ে দুঃসহ জীবনযাপন করছে সে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে হাবিবুর বড়। তার বাবা সাইদুর রহমান হতদরিদ্র কৃষিজীবী। নিয়মিত গরু আনার জন্য রাজশাহী সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলায় যেত হাবিবুর। ৯ ডিসেম্বর রাজশাহীর খানপুর সীমান্ত দিয়ে গরু আনার জন্য আরও কয়েকজন গরু ব্যবসায়ীর সঙ্গে ভারতে প্রবেশ করে। গরু নিয়ে বাংলাদেশে আসার সময় ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার চর মৌরুসি বিএসএফ ক্যাম্পের কয়েক জওয়ানের হাতে আটক হয় হাবিবুর। ‘তার কাছে মোবাইল ফোন সেট, টর্চ লাইট ও ১ হাজার টাকা দাবি করে বিএসএফ সদস্যরা। এসব দিতে অসম্মতি জানালে জওয়ানরা তাকে একটি ট্রাক্টরে তুলে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে ৬-৭ জওয়ান মিলে টানা ১ ঘণ্টা ধরে মারধর করে। তারপরও মারধর চলতে থাকে, তার পরনের লুঙ্গিও খুলে নেয় তারা।’ জীবন রক্ষার্থে সে বিএসএফ সদস্যদের কাছে কাকুতি-মিনতি করলেও শেষরক্ষা হয়নি। তার ওপর প্রায় ৫ ঘণ্টা অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে মৃত ভেবে তাকে সীমান্তবর্তী রানীনগর এলাকায় কাঁটাতারের বেড়ার পাশে একটি খেলার মাঠে ফেলে রেখে চলে যায় বিএসএফ সদস্যরা। পরে তার জ্ঞান ফিরে এলে সে কোনো রকমে ওই সীমান্ত দিয়ে দেশে ফিরে আসে।

বিবস্ত্র-সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে নিষ্ঠুরতা চালানো হয়েছিল হাবিবুরের ওপর। সেই নৃশংসতা আজও তার কাছে কবর আজাব-এর মতো দুঃস্বপ্ন। লজ্জায় ঘৃণায় আতঙ্কে এখনও বাড়ির বাইরে যেতে ভয় পায় সে।
কিন্তু সাংবাদিকদের কাছে ৯ ডিসেম্বরের সেই বর্বরতার কাহিনী কিছুই তেমন বর্ণনা করতে পারেননি বাকরুদ্ধ হাবিবুর।

ইউটিউবের ১২ মিনিটের ভিডিওতে যা দেখেছি- তা অবিশ্বাস্য অকল্পনীয়। হাবিবুরের পক্ষে তো নয়ই— নিপুণ কোনো কথাশিল্পীর পক্ষেও তার বিবরণ লেখা অসাধ্য।

বিএসএফ ব্রুটালিটির ভিডিও-তে আমরা দেখতে পাই—কয়েকজন বাংলাদেশীকে ধাওয়া করছে বিএসএফ। একপর্যায়ে মুরগি ধরার মতো কয়েকজন মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ধরে ফেলে হাবিবুরকে। এ যেন মানুষ শিকারের দৃশ্য। ট্রাক্টরে করে বিএসএফ টর্চার ক্যাম্পে আনার পর তাকে কিছুক্ষণ বসিয়ে রাখা হয়। হাবিবুরের তখন অসহায় অভিব্যক্তি। কিংকর্তব্যবিমূঢ় সে। আতঙ্কে জড়ো সড়ো। তার ভাগ্যে কি ঘটতে যাচ্ছে—তার কিছুই আন্দাজ করতে পারে না সে। তার চোখে মুখে ক্রমশ গাঢ় ভয় দানা বাঁধতে থাকে। ও দিকে এক অসহায় বাংলাদেশীকে শিকার করতে পেরে বিএসএফের সদস্যদের কণ্ঠে উল্লাস। বাংলাদেশবিরোধী বিভিন্ন কটূক্তি শ্লেষ মাখানো সংলাপ। মাদার চোদ ইত্যাদি গালি বারবার উচ্চারণ করতে থাকে তারা। সর্বভারতীয় নানা জনপ্রিয় চ্যানেলে যে হিন্দি সিরিয়ালগুলো দেখে আমরা নিত্য আপ্লুত, আবেগাক্রান্ত- সেই হিন্দিতেই উচ্চারিত হয় বাংলাদেশ, মুসলমানবিরোধী নানা খিস্তিখেউর।

জবাইয়ের আগে যেভাবে গরুকে বাঁধা হয় হাবিবুরের পা সেভাবে রশি দিয়ে বাঁধা হয়। পা বাঁধা অবস্থায় লাথি দিয়ে বলা হয়—হাঁট শালা হাঁট। হাবিবুর অসহায় ভঙ্গিতে হাঁটার চেষ্টা করে। সঙ্গে সঙ্গে লাথি। এ পর্যায়ে মোটরসাইকেলের আওয়াজ। উন্মত্ত-উল্লসিত বিএসএফ সদস্যদের সঙ্গে যোগ দেয় আরও একজন টর্চার এক্সপার্ট। নির্যাতনস্থল ক্যাম্পটি সীমান্তবর্তী খোলা জায়গায়। এ পর্যায়ে নির্যাতনের ধরন নিয়ে হানাদারদের মাঝে বািচত চলে। তারা চা খেতে খেতে চূড়ান্ত করে কোন পদ্ধতিতে টর্চার হবে। একপর্যায়ে হাবিবুরের যৌনাঙ্গে পেট্রোল বা গরম কিছু ঢেলে দেয় তারা। আতঙ্কে ককিয়ে ওঠে হাবিবুর।

এ পর্যায় হাবিবুরকে লাথি গুঁতা চলতে থাকে। কেউ একজন শিকার হাবিবুরকে চা খেতে দেয়া যায় কিনা তা নিয়ে রসিকতাপূর্ণ মন্তব্য ছুড়ে দেয়।
উচ্চহাস্য সহকারে আরেক বিএসএফ সদস্য হিন্দিতে জবাব দেয়—শালা মুসলমান। এ শালারা গরু জবাই করে খায়। এই শালাদের ‘চা মাত পিলা’—অর্থাত্ এগুলোকে চা খাওয়াস না।
নিষ্ঠুর নির্যাতকদের চা পান পর্ব শেষ। এরই মধ্যে হাবিবুরের লুঙ্গি জামা অন্তর্বাস সব খুলে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করা হয়েছে। ভিডিওতে পা বাঁধা হাবিবুরের যৌনাঙ্গসহ সবকিছু খোলামেলা দেখা যায়। দাঁড়াতে বলা হয় তাকে। হাঁট হাঁট। হাঁটার উপায় নেই হাবিবুরের। তখন এক বিএসএফ সদস্য তার পরনের লুঙ্গি ছিঁড়ে পাকিয়ে রশি বানায়। একজন অন্তর্বাস দেখিয়ে নানা অশ্লীল মন্তব্য খিস্তি করে।
হাবিবুরের দু’হাত পেছনে নিয়ে পিঠমোড়া করে বাঁধা হয় বানানো রশি দিয়ে। তারপর বাঁধা হাতের ফাঁক গলিয়ে ঢুকিয়ে দেয়া হয় বাঁশ।

আবারও হাঁট হাঁট নির্দেশ। লাথি গুঁতা মারতে মারতে ঘানির বলদের মতো হাঁটানোর চেষ্টা চলে তাকে। কৌতুক তামাশার আসর বসে হাবিবুরকে নিয়ে। একজন উল্লসিত কণ্ঠে বলে, পায়ে ওর রশি; হাঁটবে কেমনে শালা। রশি খোল। লাথি দিয়ে ফেলে দেয়া হয় হাবিবুরকে। হ্যাঁচকা টানে পায়ের রশি খুলে দেয় একজন। হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ে হাবিব। তারপর শুরু কয়েকজন বিএসএফ সদস্যের সম্মিলিত হামলা। বিরামহীনভাবে বিবস্ত্র হাবিবুরকে পেটাতে থাকে তারা। পেটাচ্ছে আর পেটাচ্ছে। এ নিষ্ঠুরতা যেন থামার নয়। হাবিবুর তখন গুমরে কাঁদছে। গোঙাচ্ছে। চিত্কার করে মাকে ডাকছে। বলছে—মা রে, মাগো, মোরে মাইরা ফালাইল। গোঙাতে গোঙাতে বলে, সে আর কখনও আসবে না। মায়ের নামে কসম কাটে। বলে, কেন আমি এদিকে আসলাম।
একদিকে নির্যাতন চলছে, আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে হাবিবুর কাঁদছে, অন্যদিকে বিএসএফ সদস্যরা একদল নেকড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে শিকারের ওপর। অন্যরা হায়েনার মতো হেসেই চলেছে। পিটুনি থামছে না। হাসিও থামছে না। গোঙানিও তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।

শোনা যাচ্ছে নানা ভর্ত্সনামূলক সংলাপ—হাবিবুর যে ঘুষ দেয়নি তা নিয়ে বিএসএফের খেদোক্তি।
বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই বীভত্স নির্যাতনের সময় বিএসএফের একজন পরিচালকও ছিল সেখানে। তার নির্দেশে চলছিল পরিকল্পিত নিষ্ঠুরতা। ওদিকে নির্মম নির্যাতনের দৃশ্য ভিডিও করা হচ্ছিল। ভিডিওকারীকে নিয়ে হাসিঠাট্টা চলে। বলা হয়, ভিডিও করা থামিয়ে তাকে পেটানোর কাজে যোগ দিতে। তবুও চলতে থাকে ভিডিও করা। এখানে আবুগ্রাইব অত্যাচারের ভিডিও ধারণের সঙ্গে মিল লক্ষণীয়। আবুগ্রাইবেও ইরাকি বন্দি অত্যাচারের ভিডিও ধারণ করেছিল মার্কিন দখলদার নির্যাতকরা।

একপর্যায়ে টর্চার টিম লিডার অর্ডার দেয় পিটুনি থামাতে। সামান্য বিরতি। ওরা আলোচনা করে নেয় নতুন কিভাবে টর্চার হবে। এরই ফাঁকে ফাঁকে হাবিবুরের যৌনাঙ্গ লক্ষ্য করে, গুহ্যদ্বারে লাঠির গুঁতা চলতে থাকে। দেখা যায়—তার বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রক্তাক্ত। এক পর্যায়ে হাবিবকে শোয়ানো হয়। এক বিএসএফ তার বুকের ওপরে চেপে বসে। বিএসএফ সদস্যটি হাবিবুরের দু পা বেঁধে দু’পায়ের তালু এক করে ধরে। আবার শুরু হয় তালুতে ভয়ংকর পিটুনি। গোঙাচ্ছে তরুণটি। নিষ্ঠুরতার চরম পর্যায়ে তার জ্ঞান হারিয়ে যাওয়ার জোগাড়। শোনা যায় চাপা কান্না।
এখানেই শেষ নয়। টর্চার পরিচালনাকারীর নির্দেশে এরপর উল্টানো হয় হাবিবুরকে। আবার উপর্যুপরি পিটুনি।

নির্যাতনের এই ভিডিওটি যেন শেষ হওয়ার নয়। দৃশ্যাবলী দর্শন ও সহ্য করা যে কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষেই দুষ্কর।
ভিডিওটি দেখেছেন- এমন একাধিক খ্যাতিমান কবি, সাংবাদিক-সাধারণ দর্শক জানিয়েছেন- দেখতে গিয়ে তারা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। নানা দৈহিক মানসিক পীড়নের শিকার হয়েছেন।

বিশিষ্ট কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজের অনুভূতি- এটি দেখে আমি অসুস্থতা বোধ করছি। বাংলাদেশীদের ওপর প্রতিবেশী ভারতের সীমান্তরক্ষীরা এইভাবে বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতা চালাতে পারে- তা ভেবে আমি আতঙ্কে শিহরিত হয়ে উঠেছি।

ভিডিওটি যারা দেখেছেন তাদের অনেকেরই এ অনুভূতি হয়েছে নরকযন্ত্রণার মতো অনিমেষ এ নির্যাতন। এ যেন সবকিছু উজাড় করে দিয়ে নিঃস্ব রিক্ত হয়ে পড়া বাংলাদেশের প্রতি বিশাল গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের নিত্য ‘ভালোবাসা’র কৌতুকপ্রদ চিত্র।

প্রতিদিনই সীমান্তের জনপদে পাখির মতো গুলি করে মারা হচ্ছে বাংলাদেশীদের। ভারত বড় গলায় বলছে, এরা ক্রিমিনাল, চোরাচালানি। তাদের এই গোয়েবলসীয় প্রচারণার দৃষ্টান্ত মিলেছে গতকাল। কুমিল্লা সীমান্তে কথিত চোরাকারবারি প্রচারণার ডামাডোলে বিএসএফ অপহরণ করে নিয়ে গেছে বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ-বিজিবি’র হাবিলদারকে।

২০১১-এর ৭ জানুয়ারি তারা বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রীর স্মারক হিসেবে বর্ষ শুরুর উপহার দিয়েছিল কাঁটাতারের ঝোলানো কিশোরী ফেলানীর লাশ। তারপরও আমরা একের পর এক কাঁধে তুলে নিয়েছি অসংখ্য লাশ। বিএসএফের হামলায় আহত পঙ্গু হয়েছে হাজারও বাংলাদেশী। সুদৃঢ় মৈত্রীচুক্তির সম্মানার্থে বারবারই বসেছে পতাকা বৈঠক। হয়েছে ঢাকা-দিল্লি বিজিবি-বিএসএফ শীর্ষ বৈঠক।

বিএসএফের পাবলিক সার্ভেন্ট ডিজি প্রতিবার অম্লান কণ্ঠে বলেছেন, কোনো বাংলাদেশীকে আর গুলি করে হত্যা করা হবে না। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তকে নো কিলিং জোন করার কথাও সাড়ম্বরে বলেছেন। বিজিবি ডিজি সেই প্রতিশ্রুতির মাল্য গলায় বয়ে এনে আত্মতৃপ্তিতে ভুগেছেন। কিন্তু থামেনি হত্যাকাণ্ড। থামেনি নিষ্ঠুর নির্মম অত্যাচার। বছরের শুরুতে উপহার পেয়েছি লাশ। বছর শেষে মিলেছে হাবিবুরকে উলঙ্গ নির্যাতন কাণ্ডের মতো ‘সবক।’

সীমান্তের বাংলাদেশীদের গিনিপিগ বানিয়ে এই সবক ও লাশ ফেলা সহসা থামছে না বলেই ধারণা বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃসম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের। ভারতীয় হাইকমিশনার সঞ্জয় ভট্টাচার্যের গতকালের তাত্পর্যপূর্ণ মন্তব্যই এখানে প্রমাণ হিসেবে প্রণিধানযোগ্য। নড়াইলে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী ও সুসম্পর্কের বর্তমান ধারা ১০০ বছরের মধ্যে সেরা।

আবার একই অনুষ্ঠানে তার ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্যও আমলে না নিয়ে উপায় নেই। যখন ফেলানী হত্যা ও হাবিবুর নির্যাতন কলঙ্ক নিয়ে সারা দুনিয়ায় তোলপাড় ঠিক তখনই তিনি সাফাই গাইছেন সীমান্তে যাদের মারা হচ্ছে তারা ক্রিমিনাল। অর্থাত্ নিষ্পাপ কিশোরী ফেলানীই হোক কিংবা হতদরিদ্র হাবিবুর — এরা সবাই ক্রিমিনাল। এরা সকলেই গুলি করে হত্যার যোগ্য। এরা সবাই বিএসএফ টর্চার ক্যাম্পের গিনিপিগ।