ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

একটা ভালো খবর দিয়েই লেখাটা শুরু করতে চাই। দুর্নীতি দমন কমিশন- দুদক একটা কাজের কাজ করেছে। সাবাসি তাদের দিতেই হয়। দুর্নীতির রাঘববোয়ালদের টিকিটা তারা ছুঁতে না পারলেও এক চুনোপুটিকে তারা জবরদস্তভাবে পাকড়াও করেছে।

অবশ্য আবদুর রহমান সাহেবকে চুনোপুটি বললে অপমানই করা হয়। তাকে চুনোপুটি বলা যায় না। তিনি বিশিষ্ট ব্যক্তি। তিনিও সরকারের একজন ‘সাহেব’। ‘রাঘববোয়াল’ দুর্নীতিবাজদের বর্ণাঢ্য উত্থান, দুরন্ত কাজকর্ম, দুর্নীতি-চুরিতে সুনিপুণ দক্ষতা, কথাবার্তার চাতুর্য দেখে আমরা চমত্কৃত হই। অখ্যাত এই আবদুর রহমানও ক্যারিশমা কম দেখাননি। তার কাহিনীও সুখপাঠ্য একটা ক্রাইম থ্রিলার লেখার মতো।
আবদুর রহমানের বর্তমান পরিচয় হলো—তিনি সিলেটের সহকারী উপকর কমিশনার। ধুরন্ধর আমলা হিসেবে সেবা দিয়ে চলেছেন মহাজোট সরকারকে।
তার অতীত পরিচয় হলো—তিনি ২২ বছর আগে নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার গয়াবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। ছিলেন জনপ্রতিনিধি। গ্রামের জনগণের সেবা করতেন। প্রশ্ন হলো—একজন ইউপি চেয়ারম্যান কেমন করে সহকারী ডেপুটি ট্যাক্স কমিশনার হলেন। এটা কেমন করে সম্ভব। তাও ক্যাডার সার্ভিসে। এই আত্তীকরণ কবে শুরু হলো; কারা শুরু করল? বিস্ময়ে ‘টাসকি’ খাওয়ার জোগাড় বৈকি!

ইউপি চেয়ারম্যান হিসেবেও আবদুর রহমান ছিলেন আলোচনার মধ্যমণি। ১৯৮৯ সালে তিনি জনপ্রতিনিধির গুরুদায়িত্বের পাশাপাশি সেখানে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির আওতায় নদী খনন ও মাছ চাষ প্রকল্পের চেয়ারম্যান ছিলেন। ওই কাজের জন্য বরাদ্দ ছিল ২৪০ মেট্রিক টন গম। এর মধ্যে নামকাওয়াস্তে কিছু কাজ করেন তিনি। অন্যদিকে ১১৫ টন তিনি একাই মেরে দেন। কোনো কাজ না করেই তিনি এই গমের টাকা আত্মসাত্ করেন। বেচারা আবদুর রহমানের কপালে ছিল—তিনি একজন ‘আইডল’ হয়ে উঠবেন। গ্রামেগঞ্জে পড়ে থাকবেন না। তাই সেই সময়েই দুদক তার পেছনে লাগে। ’৯৩ সালের ১৮ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা হয় ডিমলা থানায়। রংপুরের বিশেষ জজ আদালতে ২০০৪ সালের ৩০ নভেম্বর রায় হয়। তার তিন বছরের কারাদণ্ড, ৬ লাখ ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। আইন তার স্বাভাবিক গতিতে চলছিল। কিন্তু আবদুর রহমান তো স্বাভাবিক গতিতে চলর লোক নন। দুর্নীতির এত বড় প্রতিভা; তিনি বড় কোনো চ্যাম্পিয়ন নৈপুণ্য না দেখিয়ে জেলখানার ভাত খেতে যেতে পারেন না।
মামলার মালা তার গলায় উঠতেই তিনি অন্য ধান্দায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এ সময় ছিলেন অনেকটাই পলাতক। কথিত পলাতক জীবনে তিনি নিজের বুদ্ধিমত্তা আরও শাণিয়ে নিয়েছেন। তার জীবনেতিহাস ঘেঁটে অবাক হয়ে দেখতে পাচ্ছি যে, ২০০৪ সালে দণ্ড পাওয়ার আগেই তিনি সরকারি আমলা হয়ে গেছেন। ঢুকে পড়েছেন ক্যাডারে। নির্বিঘ্নে চাকরি করে চলেছেন আজ পর্যন্ত। কেমন করে এটা সম্ভব হলো!
আইন তার স্বাভাবিক গতিতে চলছিল; আর আবদুর রহমান দিব্যি দাপটের সঙ্গে চাকরি করে চলছিলেন। আর ওই চাকরি তিনি পেয়েছিলেন ’৯৬-এর শেখ হাসিনার ঐকমত্যের সরকারের মহত্তম উদ্যোগ—‘মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী’দের চাকরিদানের বদৌলতে। আবদুর রহমান মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী ছিলেন। একদিকে তার নামে মামলাবাজি চলছে। আর তিনি ঐতিহাসিক সুনাম কাজে লাগিয়ে ধান্দাবাজিতে ছিলেন ব্যস্ত। ঐতিহাসিক ওই সরকারের ঐতিহাসিক এই কর্মচারীকে তো এইসব ছোটমোটো চুরি-দুর্নীতির দায়ে জেল খাটলে চলে না। গম চোর কথাটাও তো একটা বেইজ্জতি কারবার।
একদিকে পুলিশ, সরকার-প্রশাসন ও দুদক পলাতক আবদুর রহমানকে খুঁজছিল। আর মুজিবনগর কর্মী দিব্যি প্রকাশ্যে সরকারের অন্দরমহলে ঢুকে একের পর এক প্রমোশন বাগিয়ে শীর্ষে উঠে চলছেন। মহাজোট সরকারের একান্ত বিশ্বাসভাজন হিসেবে তরতরিয়েই উঠছিলেন। কিন্তু বাগড়া দেয় স্বাভাবিক গতির আদালত। ২০১১ সালের ১৭ অক্টোবর রংপুরের বিশেষ আদালত তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি করেন। তিনি তখন সিলেট সার্কেল-১ কর অফিসে জবরদস্ত কর্মকর্তা হিসেবে জমিয়ে বসেছেন।

কি করা! আবদুর রহমান সিলেটেই কলুর বলদকে খুঁজে পান। বলির পাঁঠার নাম আবদুর রউফ। তার সঙ্গে ৫০ হাজার টাকায় রফা হয়। রউফ ব্যাটা রহমান সেজে ২৯ জানুয়ারি ২০১২ রংপুর গিয়ে আত্মসমর্পণ করে জেল খাটতে শুরু করে। মুজিবনগর কর্মচারী আবদুর রহমান তার ক্যারিশমা ভালোই দেখাচ্ছিলেন। কিন্তু আবার বাগড়া বেরসিক দুদক। রংপুরে প্রতিষ্ঠানটির নির্লোভ সত্ আইনজীবী, দুদক পিপি শামীমা আখতার ৬ ফেব্রুয়ারি আদালতে সব জারিজুরি ফাঁস করে দিয়েছেন। তিনি রউফকে শনাক্ত করে বলেছেন—ইনি দণ্ডপ্রাপ্ত আবদুর রহমান নন।
কি আর করা! সিলেটের সহকারী উপ-ট্যাক্স কমিশনারের চাকরি ছেড়ে, অফিস ছেড়ে আবার পালিয়েছেন রহমান। পালাতে ওস্তাদ তিনি। পালিয়ে পালিয়ে কাম বাগাতেও ওস্তাদ। নিশ্চয়ই তিনি চলতি-পলাতক জীবনে অন্য ধান্দা করবেন।

এই গল্পের শেষ কোথায়! আমি দু’ভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারি। এক. মুজিবনগর সরকারের কর্মচারীর দুর্নীতি বলে কথা। মহাজোট সরকার ব্যাপারটা খুব সিরিয়াস নিতে পারে। ইজ্জত কা সওয়াল। তাকে চিরুনি অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করে জেলে দিতে পারে। সেটা দিলেই ইজ্জত বাঁচে ‘মুজিবনগর ও মহাজোট সরকারের।’ কিছুদিন জেল খাটিয়ে এই ‘সোনার কর্মচারী’কে আবার দেশসেবার দায়িত্বে লাগাতে পারেন তারা। আবদুর রহমান ইতিহাসের অংশ। তাকে ‘টোটেম’ বানিয়ে রাখাই উত্তম।

দুই. পলায়ন-ওস্তাদ আবদুর রহমান যদি ধরা না দেন! নিশ্চয়ই তিনি ধান্দা বানিয়ে নেবেন। টাকা-পয়সা যা কামিয়েছেন, তা নিয়ে মওকামত আবার নেমে পড়বেন জনসেবায়। জনপ্রতিনিধি হবেন তিনি। ভোল পাল্টে অচিরেই তিনি রাজনীতিতে নামবেন।

নিশ্চয়ই তিনি রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলার নিষ্ঠুর শিকার হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে সক্ষম হবেন। তিনি মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী ছিলেন বলেই মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী এরশাদ সরকার তখন তাকে হয়রানিমূলক, ভুয়া দুর্নীতি মামলায় ফাঁসিয়েছিল। তারপরও তিনি দমেননি। মিথ্যা মামলা, মিথ্যা শাস্তি মাথায় নিয়েও তিনি মহাজোট সরকারের সেবায় নিজের জান কবুল করেছেন।
আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান সাহেব অত্যন্ত ক্ষমাশীল, দয়াশীল ব্যক্তি। আশা করা যায়, তিনি বিষয়টি কৃপাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। লক্ষ্মীপুরের আলোচিত নূরুল ইসলাম হত্যা মামলার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত তাহের-পুত্র খুনি বিপ্লবকে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন। গামা হত্যা মামলার আসামীরাও তার মার্জনা পেয়েছে। ক্ষমার পর ক্ষমা করে তিনি ইতিহাসের পাতায় স্থান পেতে চলেছেন। জলজ্যান্ত খুনিদের রাজনৈতিক হয়রানি মামলার অজুহাতে যিনি ক্ষমা করে মশহুর, আবদুর রহমানের মামলা তো সে তুলনায় নস্যি। রাজনৈতিক হয়রানি মামলার ফ্রেমে এগুলে রহমানও মাফ পাবেন আশা করি। হয়তো দু’চার-দশদিন জেলে থাকতে হবে এই যা। এরপর বেরিয়ে ‘সরকারি চাকরি আর করব না’ অকাল অবসরের ঘোষণা দিয়ে রাজনীতিতে নামলে ভালো করবেন। আগামীতে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এলে আমরা তাকে এমপি—এমনকি দুর্নীতি বিরোধী দৌড়মন্ত্রী হিসেবে পাব—এমন আশা দুরাশা নয়!

২.
এবার দুর্নীতি নিয়ে ২/১টা খুচরা গল্প। এ গল্প সবারই জানা। আমাদের পানি উন্নয়ন বোর্ড-পাউবো কিংবা সড়ক ও জনপথ-সওজের প্রচলিত গল্প হলো—একটা ধানি জমি ছিল। বরাদ্দ করা হলো ওখানে রাস্তা হবে। মোটামুটি টাকা কামানোর রাস্তা বের করার জন্য দেখানো হলো এখানে খাল রয়েছে। তারপর খাল ভরাট, ইট ফেলা, সোলিং দেখিয়ে পুরো পয়সা এমপি ও নির্বাহী প্রকৌশলী মিলে খেয়ে ফেলেছেন। এক ফোঁটা কাজও হয়নি। দুদক সবসময় আছেই। তারা একটু নড়াচড়া করতেই কর্তাবাবুরা খানিকটা উদ্বেগে। এক পয়সারও কাজ হয়নি। কি করা যায়! স্থানীয় চতুর সড়ক ঠিকাদার এসে বুদ্ধি দিল—স্যার একটু পরিবেশের ধুয়া তুলে দিই। নেতাকে বলেন, রাস্তার বিরুদ্ধে মানববন্ধন করিয়ে দিতে। আলটপকা লোকজন জুটে গেল। তারা রাস্তা নয়, খাল চায়। ধানের জমিতে চাষের জন্য খাল দরকার। তাতে পরিবেশ বাঁচে, চাষীও বাঁচে।

রাতারাতি প্রজেক্ট বাতিল। এমপি সাহেব স্বয়ং হস্তক্ষেপ করলেন। নতুন পিপিপিতে (প্রজেক্ট প্রপোজাল অ্যান্ড প্রি-রিভিউ) দেখানো হলো রাস্তাটি নির্মাণের শেষ পর্যায়ে প্রবল জনমতের সহিংস আপত্তির মুখে বাতিল হলো। এই স্থানে একদা খরস্রোতা নদী ছিল। জনদাবির মুখে সেই নদীকে খনন প্রয়োজন বিধায় নতুন বরাদ্দ প্রয়োজন।

খাল কোথায়—এবার আস্ত একটা নদী খননের টাকা বরাদ্দ করিয়ে ধুরন্ধর ঠিকাদারের পরামর্শে নতুন করে টাকা খাওয়া-খাওয়ায়ির মৌজ-মাস্তি শুরু হলো।
এবার আন্তর্জাতিক গল্প। বিষয় সেতু নির্মাণ। এক বহুজাতিক সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন তারা। তিন দেশের ধুরন্ধর তিন প্রেসিডেন্ট এক মনোরম নদী তীরের অবকাশ কেন্দ্রে ককটেল পার্টিতে আনন্দ-ফুর্তি করছেন। এক উন্নত গণতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট বললেন, প্রায় দেড় মাইল লম্বা একটা সেতু করেছেন সম্প্রতি। ছবি দেখালেন। বললেন, এটিতে যা খরচ তার মাত্র ৮০ পার্সেন্ট ব্রিজের নির্মাণে খরচ করেছি। বাকি ২০ পার্সেন্ট তিনি সুকৌশলে নিজের অ্যাকাউন্টে নিয়েছেন।

দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট উদীয়মান গণতন্ত্রের। তিনিও তার দেশের এক মাইল লম্বা ব্রিজের ছবি দেখালেন। বাহবা নিতে বললেন, আমাকে অত খরচ করতে হয়নি। ৬০ শতাংশ ব্রিজে লেগেছে। বাকিটা আমার পকেটে।
তৃতীয় জন ইউটোপিয়ার প্রধানমন্ত্রী। তিনিই হোস্ট কান্ট্রি। প্রমোদ কেন্দ্রের জানালা দিয়ে অদূরের নদীটিকে দেখালেন। বললেন, এটি দু’মাইল লম্বা হবে। কাজ শুরু করিনি আমরা। জনগণকে সেতুর স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছি মাত্র। বলছি—এই হবে সেই হবে। রেল হবে, স্যাটেলাইট সিটি হবে।

—তার মনে তুমি তো কানাকড়িও কামাই করতে পারনি—দুই দুর্নীতিবাজ প্রেসিডেন্টের টিটকিরি।
ইউটোপিয়ার প্রধানমন্ত্রী হাসলেন। বললেন, আমি এক ধুরন্ধর ঠিকাদারকে ব্রিজের দায়িত্ব দিয়েছি। ওস্তাদ লোক। সে তো সেতুর কম্পিউটারাইজড ছবি দেখিয়েই আমাকে বিলিয়ন ডলার কমিশন তুলে দিয়েছে।

৩.
বয়োজ্যেষ্ঠ অর্থমন্ত্রীকে নিয়ে মহাজোট সরকার মহাবিপদে পড়েছে দেখছি। ঘরে-বাইরে আগুন লাগার দশা হয়েছে। শেয়ারবাজার, মুদ্রাবাজার, অর্থনীতি সেই যে গহীন খাদে পড়েছে—শুধু অতলে তলিয়েই যাচ্ছে। এখন আর এই চোরাবালি থেকে টেনে তোলা সম্ভব নয়। অর্থ মন্ত্রণালয়, মন্ত্রীর দফতর সিলগালা করে দেয়াই উত্তম।

অর্থমন্ত্রীকে নিয়ে শেয়ারবাজারের স্লোগান, পোস্টার—পত্র-পত্রিকার পাঠক কলামে যা বলা ও লেখা হচ্ছে, তা রীতিমত বে-ইজ্জতি কারবার। তার ওপর সরকারি দলের এমপিরাও সংসদে আগুন হয়ে উঠেছেন। আর দশচক্রে ভগবান ভূতের মতো অর্থমন্ত্রীও আবোল-তাবোল বকতে শুরু করেছেন। ৩১ জানুয়ারি তিনি সংসদে বললেন, আমরা এখন অর্থনৈতিক দিক থেকে কালো ছায়ার মধ্যে রয়েছি।

এদিন তার চোখে ছানি পড়েছিল কি-না কে জানে। কেননা পরদিনই কালো ছায়া কেটে গেল। ১ ফেব্রুয়ারি তিনি বললেন, অর্থনীতিতে কোনো সঙ্কট নেই। দেশ খুব ভালো চলছে। ১৬ কোটি মানুষের ক্ষোভ, কষ্ট ও প্রতিক্রিয়াকে বোগাস, রাবিশ ও ফালতু বলে আখ্যা দিয়ে অর্থমন্ত্রী এরই মধ্যে অতি সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। দেশের কোথাও তিনি কোনো সমস্যা দেখেন না। খালি দেখেন উন্নতি। স্বাধীনতার পর এখন অর্থনীতির সবচেয়ে সুসময় চলছে—দাবি করেও লোক হাসিয়েছেন তিনি।

ডলারের দাম ৭০ থেকে ৮৫/৮৬ টাকা হলো। সমস্যা দেখেন না তিনি। মূল্যস্ফীতি এক লাফে ১১.৫৯ শতাংশ বাড়লেও তার দৃষ্টিতে তা সুলক্ষণ। ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি-অবনতির চমকদার বিজ্ঞাপন—শেয়ারবাজার চোরাবালিতে তলিয়ে গেলেও তিনি চিন্তিত নন।

তারপরও না হয় একদিনের জন্য তিনি ‘কালো ছায়া’ দেখার ভ্রম করেছিলেন। আবার পরদিনই তোতা ময়না পাখি হয়ে গেলেন। এ কি বয়স ভারের বিভ্রম, না-কি অন্য কিছু।
সম্প্রতি তিনি সিলেটে বলেছেন, পদত্যাগ করার অভ্যাসটি তার রয়েছে। খুবই রাশভারি কণ্ঠে বললেন। ভাবখানা দলের ভেতরে-বাইরে, সংসদে- মাঠে-ময়দানে এইসব কটু মন্তব্য না থামালে পদত্যাগ করে তিনি মহাজোট সরকার ও জোটকে মহাবিপদে ফেলে দেবেন।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত স্বাধীনতা-উত্তর এ যাবতকালের শ্রেষ্ঠতম অর্থমন্ত্রী (তার ভাষায়) হওয়া সত্ত্বেও পদত্যাগের কথা কেন ভাবছেন?
মনে হচ্ছে জটিল অর্থনীতির দেখভালের ফাঁকে তিনি পত্র-পত্রিকাতেও নজর দিচ্ছেন। ৭ ফেব্রুয়ারির আমার দেশ-এর নাগরিক প্রতিক্রিয়া পাতায় কয়েকশ’ বিশিষ্ট নাগরিক অর্থমন্ত্রীর কীর্তিকাণ্ড মূল্যায়ন করেছেন।
এই মূল্যায়নের সারসংক্ষেপ হলো অর্থমন্ত্রী পাগলের প্রলাপ বকছেন। তার উচিত ক্ষমতা ছেড়ে জনগণকে মুক্তি দেয়া। তিনি গবু রাজার হবু মন্ত্রী। ডিজিটাল সরকারের ডিজিটাল অর্থমন্ত্রী। ডিজিটাল অর্থহীন কথা। ডিজিটাল তাচ্ছিল্য সরকারের পতন-পূর্ব পাগলামির ডিজিটাল লক্ষণ। অর্থমন্ত্রীর কথায় কথায় ‘ইংরেজিপ্রীতি’কে অনেকে বলছেন চরম দুর্দশাগ্রস্ত অর্থনীতিকে আড়াল করতে ভেজাল ইংরেজির চতুরতা। অনভিজ্ঞ অর্থমন্ত্রীর উদ্ভট বক্তব্যের জন্য অর্থনীতির এই বেহাল।

সংসদেও কথার তুবড়ি ছুটছে। তোফায়েল আহমেদ বলেছেন আর নীরব বসে থাকা যায় না। ৮ হাজার পয়েন্টের শেয়ারবাজার কীভাবে ৩ হাজার পয়েন্টে নামল। লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে শত শত কোটি টাকা নেয়া হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ নিঃস্ব। বিনিয়োগকারীদের পুলিশ দিয়ে পেটানো হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সমন্বয়হীন। হাসানুল হক ইনু বলেছেন, শেয়ারবাজার কারসাজির হোতাদের জেলে পোরা হচ্ছে না কেন। রাশেদ খান মেনন বলেন, পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বিরোধী দলবিহীন সংসদে ট্রেজারি বেঞ্চেই চলছিল অর্থমন্ত্রী বিরোধী ধুন্দুমার। এমপিরা বলেন, টাইমস পত্রিকা বিশ্বের নিকৃষ্টতম পুঁজিবাজার বলে যে আখ্যা দিয়েছে বাংলাদেশকে তা সর্বাংশে সত্য।
এসব কটু অথচ সত্য মন্তব্য শুনে অর্থমন্ত্রীর ঘুমন্ত ব্যক্তিত্ব অবশ্যই জেগে ওঠা উচিত। পদত্যাগ করার অভ্যাস তার আছে—তিনি বলছেন বটে, কিন্তু এরশাদ জমানার কথাই যদি ধরি বাস্তবতা হলো তিনি সবসময় ঠেকায় পড়ে সরে দাঁড়িয়েছেন। যখন পায়ের নিচের মাটি পুরোটা সরে যায়, তখন ত্যাগেই শেষ রক্ষা। কেননা এখন শুধু অর্থমন্ত্রীর পায়ের নিচের মাটি সরে যায়নি; খোদ মহাজোট সরকারের পায়ের নিচের মাটি আলগা হচ্ছে প্রতিদিন।

অর্থমন্ত্রী যদি সত্যই পদত্যাগের অভ্যাসটা বাস্তবায়ন করেন, তাতে খুব বেশি বিপদে পড়বে কী মহাজোট সরকার। একদমই মনে হয় না। পাইপলাইনে তাদের অতি সুদক্ষ মন্ত্রী রয়েছেন। যে যাই বলুক, আমি বলব, আবুল মাল আবদুল মুহিত দশচক্রে ভগবান ভূত হয়েছেন। তিনি দশ দস্যুগোষ্ঠীর ঠেলায়-গুঁতায় টানাহিঁচড়ায়—শেয়ারবাজার দুর্নীতি ও পদ্মা সেতু দুর্নীতির কারণে আজ দেশের ইতিহাসের ব্যর্থতম অর্থমন্ত্রীতে পরিণত হয়েছেন। তিনি দস্যুতাকে ঠেকাননি। দস্যুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি; শুধু চেয়ে চেয়ে দেখেছেন আর ‘আমিই সেরা’ বলে জপ করে চলেছেন। কিন্তু তিনি নিজে দস্যুদের কেউ নন।
মহাজোট সরকারের আকণ্ঠ ব্যর্থতার নিষ্ঠুর বলি হওয়া এখন তার নিয়তির লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন আমাদেরও দেখার পালা—তিনি সরে দাঁড়ান; না-কি তাকে সরিয়ে দেয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি তার প্রশংসা করেছেন। বলেছেন, মুহিত সাহেব ভালো অর্থনীতি বিশ্লেষক।
প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিতে মুহিত ভালো অর্থমন্ত্রী কি-না, সে প্রশ্ন অজানাই রয়ে গেল।

৪.
সরকারি দল, বিরোধী দল যে যার মতো বলুক—মহাজোট জমানায় অর্থনীতির হাল কেমন, সেটির নিরপেক্ষ মূল্যায়ন জানতে আমরা ৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে অংশ নিতে পারি। প্রেস ক্লাবে ওই গোলটেবিলে প্রধান বক্তা ছিলেন জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আবুল বারাকাত।

বারাকাত ভাই বিরল মেধাবী মানুষ। তার সূক্ষ্ম স্যাটায়ার ছাত্রজীবনে দারুণ উপভোগ করেছি। তিনি বলেন কম, বুঝিয়ে দেন বেশি।
সেমিনারে তিনি নিজে তত্ত্ব কপচাতে যাননি। ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট শীর্ষতম মেধাবী সত্ত্বেও সেটা দাবি করে লোক হাসাতে যাননি; বরং তিনি প্রদর্শন করেন হাল অর্থনীতির এক তৃণমূল মুখকে।
এই তৃণমূল বক্তাটি হলেন গুলিস্তানের ছেঁড়া নোটের অখ্যাত কারবারি সানোয়ার হোসেন। ফুটপাতের মানুষ।

সানোয়ার তেমন কিছু বলেননি। শুধু জানিয়েছেন বিচ্ছিন্ন কিছু তথ্য।
তিনি জানান, দেশে বর্তমান বাজারে প্রচলিত ৫০ টাকার নোটের বেশির ভাগই জাল। এগুলো সাধারণত ১০ টাকার নোটের ওপর ৫০ টাকার ছাপ মারা। ছোট নোট বলে কেউ ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না।
কিভাবে এই লাখ-কোটি ৫০ টাকার জাল নোট ছড়িয়ে পড়ল?

জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবুল বারাকাত বলেন, জাল টাকা চক্রের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে সাতটি মামলার আসামি হয়েছেন সানোয়ার। আজ তাকে আমি এনেছি কথা বলার জন্য, আগামীকাল তাকে খুঁজে পাওয়া না গেলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না।

বারাকাত বলেন, মাত্র ১২ পয়সা বাঁচানোর জন্য নানা মানের টাকার সাইজ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা একই করা হয়েছে। এতে দেশের অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়েছে।

সানোয়ার বলেন, ‘১০ টাকার নোট এবং ৫০ টাকার নোট সমান মাপের হওয়ায় ১০ টাকার নোটে কেমিক্যাল দিয়ে সাদা করে ৫০ টাকার ছাপ মারা হচ্ছে। ছিঁড়ে যাওয়ার পর আমার কাছে বদলে নিতে আসা নোটের ৮০ ভাগেই জাল দেখা যাচ্ছে।’

১০০ এবং ৫০০ টাকার নোট একই মাপের করাটাই ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের ঐতিহাসিক ভুল। ১০০ টাকার নোটকে বিশেষ ধরনের কেমিক্যাল দিয়ে সাদা করে ৫০০ টাকার ছাপ দেয়া হচ্ছে। এতে করে নিরাপত্তা চিহ্ন এবং কাগজের মান একই থাকায় সাধারণ মেশিনেও এই জাল টাকা ধরা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সানোয়ার বলেন, ১০০ টাকার নোটের ওপর ছাপ মেরে ৫০০ টাকা করা নোট জাল আমার কাছে ধরা পড়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের সব পর্যায়ের কর্মকর্তাকে অবহিত করি।
বাংলাদেশ ব্যাংকে ছেঁড়া টাকা বদল করে দেয়ার পর পুড়িয়ে ফেলার নিয়ম থাকলেও আংশিক পোড়ানো হচ্ছে, বাকি টাকা আবার পরিবর্তন করা হচ্ছে বলেও বিষয়টি নিয়ে তিনি অভিযোগ করেন।
২০০৮ সালে লিখিতভাবে গভর্নরকে জানাই। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা খন্দকার মাযহারের সঙ্গে দেখা করে কথা বলি।

তিনি আরও দাবি করেন, বর্তমান আইনে কোনো নোটের ৬৫ শতাংশ জমা দিতে পারলেই তাকে ওই নোটের সমপরিমাণ টাকা দিতে বাধ্য বাংলাদেশ ব্যাংক। এই আইনটির অপব্যবহার করছে চোরাকারবারিরা। এর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা জড়িত।

তিনি বলেন, বিশেষ কায়দায় ১০০০ টাকার ৬৫ শতাংশ আলাদা করা হচ্ছে। একইভাবে অপর ১০০০ টাকার নোট ৬৫ শতাংশ আলাদা করে ব্যাংক থেকে টাকা নেয়া হচ্ছে। পরে দুটি টাকার অবশিষ্ট ছেঁড়া ৩৫ শতাংশ একত্রে যোগ করে ৭০ শতাংশ করে আরও ১০০০ টাকা নেয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে তিনি হাইকোর্টে রিট করেছেন বলেও দাবি করেন।
জানান, ২০১০ সালের ২৫ জুলাই ডেপুটি গভর্নরের সঙ্গে সব বিষয়ে কথা বলার পর আমার নামে সাতটি মামলা হয়েছে।

দেশের অর্থনীতি কোন পথে, কীভাবে হাঁটছে ভাবুন। পুঁজিবাজারের মুরব্বি ভাইকিং দস্যুরাই কি কেবল শেয়ারবাজার লুটে চলেছে। দস্যুবৃত্তি চলছে ছেঁড়া নোটের ক্ষুদ্র কারবারেও। সেখানেও একজন সত্ ক্ষুদে কারবারি মৃত্যু পরোয়ানা হাতে নিয়ে ঘুরছেন। সরকার সমর্থক একজন শীর্ষ অর্থনীতিবিদ, যিনি কি-না একটি বিশাল ব্যাংকের কর্ণধার, তিনিও সানোয়ারের নিরাপত্তার গ্যারান্টি হতে পারছেন না।
শোনা যায়, অর্থনীতির এই নিহত দশাকে সামাল দিতে অকাতরে নোট ছেপে চলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সে জন্য মূল্যস্ফীতি আকাশছোঁয়া। ১০ টাকা ও ৫০ টাকা, ১০০ টাকা ও ৫০০ টাকার নোট একই মাপের করা হয়েছে কার বুদ্ধিতে। ১২ পয়সা বাঁচাতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক নোটের নিয়ন্ত্রণ তুলে দিল জাল কারবারিদের হাতে। বাংলাদেশ ব্যাংক যে পরিমাণ টাকার অংকের নোট ছেপে তাদের হিসাবপাতি করছে, বাস্তবে একই সংখ্যক নোটের সরবরাহে বাজারে টাকা রয়েছে কয়েকগুণ বেশি।

গুলিস্তানের তুচ্ছ টাকা কারবারি ফুটপাতে বসে যে সত্য জানছেন; অর্থনীতিকে যেভাবে তিনি বুঝতে পারছেন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সচিবালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক হেড অফিসে বসে মেধাবী অর্থমন্ত্রী ও অনন্য মেধাবী গভর্নর কি তার ছিটেফোঁটাও অনুধাবন করতে পারছেন!

অপ্রিয় সত্যকে বলে সানোয়ার তার জীবনকে বন্ধক রেখেছেন দস্যুদের হাতে। আগামীকাল পর্যন্ত তার জীবনের গ্যারান্টি নেই—তারপরও সত্য বলতে তিনি অকুতোভয়।
সেখানে অর্থমন্ত্রীর বিবেক কি একটুও দংশিত হয় না। তার চোখের সামনে এক লাখ কোটি টাকা লুটপাট; জ্বালানি তেলের দাম, রেন্টাল বিদ্যুতের নামে লুট—সব জেনেশুনে তিনি কেবল ছড়া কাটছেন—আই অ্যাম দ্য বেস্ট। একদিন একরত্তি সত্য বললেন, পরদিন আবার তা প্রত্যাহার।
পদের মোহ, মন্ত্রীর গাড়ি-বাড়ি, আরাম-বিলাসের তিনি এতই কাঙাল! শিখুন সানোয়ারের কাছে। সত্যের অসঙ্কোচ প্রকাশে তার কি দুরন্ত সাহস! ৭টি মামলা দিয়েও ভয় খাওয়ানো যাচ্ছে না। সেখানে একটু চোখ রাঙানি দেখেই মুখের কথা একরাতের মধ্যে উল্টে ফেলেন মন্ত্রী।

৫.
হ্যাঁ, মহাজোট সরকারের সুযোগ্যতম গুণধর মন্ত্রীর পাইপলাইনে সৈয়দ আবুল হোসেন সাহেব একরকম তৈরি হয়েই আছেন। তার তুলনা হয় না। তাকে যে কোনো গুরুদায়িত্ব অবশ্যই দেয়া যায়। চাইলে ২/৪টা মন্ত্রণালয় দিলেও ক্ষতি নেই।

বিশ্ব ব্যাংকের ষড়যন্ত্রের কারণে তিনি সাময়িক বিড়ম্বনার শিকার হয়েছিলেন। তাতে কি! দুর্নীতি দমন কমিশন দুদকের চেয়ারম্যান মহোদয় দুঃসময়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি সাবেক যোগাযোগমন্ত্রীকে সার্টিফিকেট দিয়েছেন, পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
এবার আবুল হোসেনের পোয়াবারো। এবার তাকে পায় কে! এমনিতেই বেমক্কা যোগাযোগমন্ত্রিত্ব খুইয়ে তিনি খুব গোস্বা করেছিলেন। তথ্যপ্রযুক্তি-আইসিটি—কি একটা মন্ত্রণালয় তাকে দেয়া হয়েছে বটে, কিন্তু তিনি যেমন ‘অতিরিক্ত কর্মবীর’ মন্ত্রী তাতে ওইসব নামকাওয়াস্তে মন্ত্রণালয়ে তাকে মানায় না।

তার কাজেকর্মে জনগণ, আওয়ামী লীগ তথা মহাজোটের লোকজন যতই ক্ষুব্ধ-ক্ষিপ্ত হোক—খোদ সরকার বাহাদুর এবং ডাইনেস্টি খুবই সন্তুষ্ট। তিনিও সন্তুষ্ট করতে প্রাণান্ত।
দুদকের ‘দুর্নীতিমুক্ত’ সার্টিফিকেট পেয়ে তিনি আবার কথাবিহারে ভাসতে শুরু করেছেন। ধান ভানতে নানা শিবের গীত গাইছেন। তার কথামৃত হলো—তিনি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে ৩ বছরে যত কাজ করেছেন, ১০ বছরেও এত কাজ হয়নি। তা তো বটেই। সারাদেশের রাস্তাঘাট তার প্রমাণ। নতুন যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিভিন্ন স্থানে সরেজমিন ঘুরতে গিয়ে হাড্ডিতে হাড্ডিতে টের পাচ্ছেন। রাস্তা নয় যেন খাল বা নর্দমা। তাতে খাবি খেতে খেতে ওবায়দুলের হাড্ডিগুলো ভাঙার দশা হয়েছে। আবুল কত প্রকার ও কি কি কাজ করেছেন; রাস্তাঘাট ও পদ্মা সেতু ডিল করতে গিয়ে ওবায়দুলের কিন্তু বুঝতে বাকি নেই। তিনি নিজে বাক্যবীর হওয়া সত্ত্বেও আবুলের কর্ম ও বাক্যচাতুর্যে বাক্যস্ফূর্তি হারাতে চলেছেন। ওবায়দুলের মুখে তাই এক রা—বেলা শেষের দিনে আর কত দিনবদল সম্ভব!
কিন্তু আবুল মোটেই হতোদ্যম নন। তার কণ্ঠে নতুন গান—রাজনীতি থেকে অবসর নিতে চান তিনি। আর না-কি রাজনীতি করবেন না।
হায় হায়—এত বড় একজন বাক্যবীরকে হারালে মহাজোট সরকারের কী দুর্দশাই না হবে!

হতে পারে আবুল সাহেব খুবই বুদ্ধিমান। রাজনীতির হাওয়া কোন দিকে যাচ্ছে—একজন দেশশীর্ষ ঠিকাদার-ব্যবসায়ী হিসেবে তা তিনি আগামই টের পাচ্ছেন—মহাজোটের জমানাশেষে গলায় ফুলের মালা, না হাতে লোহার মালা; সেটা তিনি যথেষ্ট অনুধাবন করতে পারছেন। আর তাই তিনিও অবসরের গীত গাইছেন। যাতে অন্তত মান-ইজ্জতটা বাঁচে।
আবার হতে পারে—এসব তার অভিমানেরই কথা। সরকার বাহাদুর তার পক্ষে। ‘দুর্নীতিমুক্ত’ সিল দিয়েছে দুদক। এখন তাকে কোনো ফালতু মন্ত্রণালয়ে অযত্নে ফেলে রাখা ঠিক নয়; বরং জবরদস্ত কোনো মন্ত্রণালয় দিয়ে তাকে আশু সম্মানিত করা উচিত।

মন্ত্রিসভায় রদবদলের কথা মাঝে-মধ্যেই শুনছি। একটা প্রস্তাবনা দিয়ে রাখি—আবুল মাল মুহিত যদি সত্যিই পদত্যাগের অভ্যাসটা হঠাত্ চর্চা করে বসেন; তখন সৈয়দ আবুলকে অর্থ মন্ত্রণালয় যেন দেয়া হয়। মুহিত তো চল্লিশ বছরে সেরা মন্ত্রী; আবুল শতাব্দীর সেরা হবেন—তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

-আ মী ন কা দী র