ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

একটা ভালো খবর দিয়েই লেখাটা শুরু করতে চাই। দুর্নীতি দমন কমিশন- দুদক একটা কাজের কাজ করেছে। সাবাসি তাদের দিতেই হয়। দুর্নীতির রাঘববোয়ালদের টিকিটা তারা ছুঁতে না পারলেও এক চুনোপুটিকে তারা জবরদস্তভাবে পাকড়াও করেছে।

অবশ্য আবদুর রহমান সাহেবকে চুনোপুটি বললে অপমানই করা হয়। তাকে চুনোপুটি বলা যায় না। তিনি বিশিষ্ট ব্যক্তি। তিনিও সরকারের একজন ‘সাহেব’। ‘রাঘববোয়াল’ দুর্নীতিবাজদের বর্ণাঢ্য উত্থান, দুরন্ত কাজকর্ম, দুর্নীতি-চুরিতে সুনিপুণ দক্ষতা, কথাবার্তার চাতুর্য দেখে আমরা চমত্কৃত হই। অখ্যাত এই আবদুর রহমানও ক্যারিশমা কম দেখাননি। তার কাহিনীও সুখপাঠ্য একটা ক্রাইম থ্রিলার লেখার মতো।
আবদুর রহমানের বর্তমান পরিচয় হলো—তিনি সিলেটের সহকারী উপকর কমিশনার। ধুরন্ধর আমলা হিসেবে সেবা দিয়ে চলেছেন মহাজোট সরকারকে।

তার অতীত পরিচয় হলো—তিনি ২২ বছর আগে নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার গয়াবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। ছিলেন জনপ্রতিনিধি। গ্রামের জনগণের সেবা করতেন। প্রশ্ন হলো—একজন ইউপি চেয়ারম্যান কেমন করে সহকারী ডেপুটি ট্যাক্স কমিশনার হলেন। এটা কেমন করে সম্ভব। তাও ক্যাডার সার্ভিসে। এই আত্তীকরণ কবে শুরু হলো; কারা শুরু করল? বিস্ময়ে ‘টাসকি’ খাওয়ার জোগাড় বৈকি!

ইউপি চেয়ারম্যান হিসেবেও আবদুর রহমান ছিলেন আলোচনার মধ্যমণি। ১৯৮৯ সালে তিনি জনপ্রতিনিধির গুরুদায়িত্বের পাশাপাশি সেখানে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির আওতায় নদী খনন ও মাছ চাষ প্রকল্পের চেয়ারম্যান ছিলেন। ওই কাজের জন্য বরাদ্দ ছিল ২৪০ মেট্রিক টন গম। এর মধ্যে নামকাওয়াস্তে কিছু কাজ করেন তিনি। অন্যদিকে ১১৫ টন তিনি একাই মেরে দেন। কোনো কাজ না করেই তিনি এই গমের টাকা আত্মসাত্ করেন। বেচারা আবদুর রহমানের কপালে ছিল—তিনি একজন ‘আইডল’ হয়ে উঠবেন। গ্রামেগঞ্জে পড়ে থাকবেন না। তাই সেই সময়েই দুদক তার পেছনে লাগে। ’৯৩ সালের ১৮ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা হয় ডিমলা থানায়। রংপুরের বিশেষ জজ আদালতে ২০০৪ সালের ৩০ নভেম্বর রায় হয়। তার তিন বছরের কারাদণ্ড, ৬ লাখ ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। আইন তার স্বাভাবিক গতিতে চলছিল। কিন্তু আবদুর রহমান তো স্বাভাবিক গতিতে চলর লোক নন। দুর্নীতির এত বড় প্রতিভা; তিনি বড় কোনো চ্যাম্পিয়ন নৈপুণ্য না দেখিয়ে জেলখানার ভাত খেতে যেতে পারেন না।
মামলার মালা তার গলায় উঠতেই তিনি অন্য ধান্দায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এ সময় ছিলেন অনেকটাই পলাতক। কথিত পলাতক জীবনে তিনি নিজের বুদ্ধিমত্তা আরও শাণিয়ে নিয়েছেন। তার জীবনেতিহাস ঘেঁটে অবাক হয়ে দেখতে পাচ্ছি যে, ২০০৪ সালে দণ্ড পাওয়ার আগেই তিনি সরকারি আমলা হয়ে গেছেন। ঢুকে পড়েছেন ক্যাডারে। নির্বিঘ্নে চাকরি করে চলেছেন আজ পর্যন্ত। কেমন করে এটা সম্ভব হলো!
আইন তার স্বাভাবিক গতিতে চলছিল; আর আবদুর রহমান দিব্যি দাপটের সঙ্গে চাকরি করে চলছিলেন। আর ওই চাকরি তিনি পেয়েছিলেন ’৯৬-এর শেখ হাসিনার ঐকমত্যের সরকারের মহত্তম উদ্যোগ—‘মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী’দের চাকরিদানের বদৌলতে। আবদুর রহমান মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী ছিলেন। একদিকে তার নামে মামলাবাজি চলছে। আর তিনি ঐতিহাসিক সুনাম কাজে লাগিয়ে ধান্দাবাজিতে ছিলেন ব্যস্ত। ঐতিহাসিক ওই সরকারের ঐতিহাসিক এই কর্মচারীকে তো এইসব ছোটমোটো চুরি-দুর্নীতির দায়ে জেল খাটলে চলে না। গম চোর কথাটাও তো একটা বেইজ্জতি কারবার।
একদিকে পুলিশ, সরকার-প্রশাসন ও দুদক পলাতক আবদুর রহমানকে খুঁজছিল। আর মুজিবনগর কর্মী দিব্যি প্রকাশ্যে সরকারের অন্দরমহলে ঢুকে একের পর এক প্রমোশন বাগিয়ে শীর্ষে উঠে চলছেন। মহাজোট সরকারের একান্ত বিশ্বাসভাজন হিসেবে তরতরিয়েই উঠছিলেন। কিন্তু বাগড়া দেয় স্বাভাবিক গতির আদালত। ২০১১ সালের ১৭ অক্টোবর রংপুরের বিশেষ আদালত তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি করেন। তিনি তখন সিলেট সার্কেল-১ কর অফিসে জবরদস্ত কর্মকর্তা হিসেবে জমিয়ে বসেছেন।

কি করা! আবদুর রহমান সিলেটেই কলুর বলদকে খুঁজে পান। বলির পাঁঠার নাম আবদুর রউফ। তার সঙ্গে ৫০ হাজার টাকায় রফা হয়। রউফ ব্যাটা রহমান সেজে ২৯ জানুয়ারি ২০১২ রংপুর গিয়ে আত্মসমর্পণ করে জেল খাটতে শুরু করে। মুজিবনগর কর্মচারী আবদুর রহমান তার ক্যারিশমা ভালোই দেখাচ্ছিলেন। কিন্তু আবার বাগড়া বেরসিক দুদক। রংপুরে প্রতিষ্ঠানটির নির্লোভ সত্ আইনজীবী, দুদক পিপি শামীমা আখতার ৬ ফেব্রুয়ারি আদালতে সব জারিজুরি ফাঁস করে দিয়েছেন। তিনি রউফকে শনাক্ত করে বলেছেন—ইনি দণ্ডপ্রাপ্ত আবদুর রহমান নন।

কি আর করা! সিলেটের সহকারী উপ-ট্যাক্স কমিশনারের চাকরি ছেড়ে, অফিস ছেড়ে আবার পালিয়েছেন রহমান। পালাতে ওস্তাদ তিনি। পালিয়ে পালিয়ে কাম বাগাতেও ওস্তাদ। নিশ্চয়ই তিনি চলতি-পলাতক জীবনে অন্য ধান্দা করবেন।

এই গল্পের শেষ কোথায়! আমি দু’ভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারি। এক. মুজিবনগর সরকারের কর্মচারীর দুর্নীতি বলে কথা। মহাজোট সরকার ব্যাপারটা খুব সিরিয়াস নিতে পারে। ইজ্জত কা সওয়াল। তাকে চিরুনি অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করে জেলে দিতে পারে। সেটা দিলেই ইজ্জত বাঁচে ‘মুজিবনগর ও মহাজোট সরকারের।’ কিছুদিন জেল খাটিয়ে এই ‘সোনার কর্মচারী’কে আবার দেশসেবার দায়িত্বে লাগাতে পারেন তারা। আবদুর রহমান ইতিহাসের অংশ। তাকে ‘টোটেম’ বানিয়ে রাখাই উত্তম।

দুই. পলায়ন-ওস্তাদ আবদুর রহমান যদি ধরা না দেন! নিশ্চয়ই তিনি ধান্দা বানিয়ে নেবেন। টাকা-পয়সা যা কামিয়েছেন, তা নিয়ে মওকামত আবার নেমে পড়বেন জনসেবায়। জনপ্রতিনিধি হবেন তিনি। ভোল পাল্টে অচিরেই তিনি রাজনীতিতে নামবেন।

নিশ্চয়ই তিনি রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলার নিষ্ঠুর শিকার হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে সক্ষম হবেন। তিনি মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী ছিলেন বলেই মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী এরশাদ সরকার তখন তাকে হয়রানিমূলক, ভুয়া দুর্নীতি মামলায় ফাঁসিয়েছিল। তারপরও তিনি দমেননি। মিথ্যা মামলা, মিথ্যা শাস্তি মাথায় নিয়েও তিনি মহাজোট সরকারের সেবায় নিজের জান কবুল করেছেন।

আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান সাহেব অত্যন্ত ক্ষমাশীল, দয়াশীল ব্যক্তি। আশা করা যায়, তিনি বিষয়টি কৃপাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। লক্ষ্মীপুরের আলোচিত নূরুল ইসলাম হত্যা মামলার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত তাহের-পুত্র খুনি বিপ্লবকে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন। গামা হত্যা মামলার আসামীরাও তার মার্জনা পেয়েছে। ক্ষমার পর ক্ষমা করে তিনি ইতিহাসের পাতায় স্থান পেতে চলেছেন। জলজ্যান্ত খুনিদের রাজনৈতিক হয়রানি মামলার অজুহাতে যিনি ক্ষমা করে মশহুর, আবদুর রহমানের মামলা তো সে তুলনায় নস্যি। রাজনৈতিক হয়রানি মামলার ফ্রেমে এগুলে রহমানও মাফ পাবেন আশা করি। হয়তো দু’চার-দশদিন জেলে থাকতে হবে এই যা। এরপর বেরিয়ে ‘সরকারি চাকরি আর করব না’ অকাল অবসরের ঘোষণা দিয়ে রাজনীতিতে নামলে ভালো করবেন। আগামীতে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এলে আমরা তাকে এমপি—এমনকি দুর্নীতি বিরোধী দৌড়মন্ত্রী হিসেবে পাব—এমন আশা দুরাশা নয়!