ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

 

রক্তে রাঙানো মহান একুশের মাসে এবার অন্তরে-বাইরে অনেক রক্ত ঝরছে। একুশের মঞ্চে একদিকে চলছে ‘মুন্নী বদনাম বেগম’দের খুল্লাম খুল্লা উদ্দাম নাচ। অন্যদিকে খুনের পর খুন—রক্তের হোলিখেলা চলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের ‘যুগসেরা ঐতিহাসিক আইন-শৃঙ্খলার জমানা’য় সাংবাদিকরাই যেন এখন মূল টার্গেট। সাগর-রুনি দম্পতি খুন হলো বেডরুমে আর রাজপথে খুন হচ্ছেন দীনেশদাসরা খানসেনাদের বাসের চাকার নিচে। সাহারা খাতুনের আইয়ামে জান্নাত কোথায়—এ তো আইয়ামে জাহেলিয়াত কায়েম হতে চলেছে।

২৪ বছর ধরে পূর্ব বাংলার ঘাড়ের ওপর নপুংসক শিখণ্ডির মতো চেপে বসে যে কাজ পশ্চিমা পাঞ্জাবি খান শোষক গোষ্ঠী পারেনি; জিন্নাহ-লিয়াকত-তাদের তল্পিবাহকরা যা পারেনি, আমরা রক্ত দিয়ে, সংগ্রাম-লড়াই করে উর্দুঅলা পাকিস্তানিদের তাড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের ৪০ বছর পূর্তিতে হিন্দুস্থানিরা ঠিকই অমর একুশের মঞ্চ দখল করে মাতৃভাষা বাংলাকে তাড়ানোর স্পর্ধা দেখাচ্ছে।
এমনটা কি কোনো দিন উর্দু ও পাঞ্জাবিঅলাদের দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করার দুঃসাহস হয়েছে— একুশের মাসে, আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো মাসে ঢাকার কোনো স্টেডিয়ামে-মঞ্চে ‘দমাদম মাস্ত কলন্দর’ বাজিয়ে উদ্দাম ঝাঁকিনৃত্যে মেতে ওঠার। অথচ কি আশ্চর্য বিষয়—হিন্দিঅলারা বাংলার বুকের ওপর চেপে বসে স্টেজ মাত করে দিয়েছে। প্রকাশ্যে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে—দেশের বৃহত্তম জাতীয় স্টেডিয়ামে লাখো ওয়াট আলোর নিচে লুটে নিয়েছে আমাদের সম্ভ্রম। হরণ করে ইজ্জত। যে কাজ হানাদার পাকিস্তানিরা পারেনি, সেই কাজ মিত্রবেশী হিন্দুস্থানিরা ঠিকই পারল। ‘দমাদম মাস্ত কলন্দর নয়, কিন্তু আরেকটি উর্দু-আশ্রয়ী গান মুন্নী বদনাম হুয়ি—দেশ কাঁপিয়ে বাজল।

পাঠকদের অনেকের জানা আছে মুন্নী বদনাম হুয়ি ডালিং তেরে লিয়ে—এটি মুম্বাই সিনেমায় ব্যবহার করা গান হলেও বাণী সংযোজনা, সুর সঙ্গীত সবই উর্দুঅলা পাকিস্তানিদের করা। মূল গান হলো—লাড়কা বদনাম হুয়ে হাসিনা তেরে লিয়ে। পাকিস্তানি কিংবদন্তি অভিনেতা ওমর শরীফের মিস্টার চার্লি ছবির গান এটি। ১৯৯২ সালের ছবি। সেই গানের সুর সঙ্গীত মেরে দিয়ে ও উর্দু মেজাজের লিরিকে হুবহু মুন্নী বদনাম হুয়ি সুর করেছেন বলিউডের সাজিদ-ওয়াজিদ।

পাকিস্তানিদের কাওয়ালী অঙ্গের গানটিই হিন্দুস্থানি মোড়কে ভাষার মাসে গিলিয়ে দিল বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের ধুরন্ধর কর্তারা। ওমর শরীফের ‘লাড়কা বদনাম’ সালমান খানের দাবাঙ-এর মুন্নী হতেই ঢাকাই দর্শকরা ঠিকই হজম করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলল। আমরা একবারও হিসাব করে দেখি না উর্দু-হিন্দি ওরা পরস্পর জাতভাই।

বলার অপেক্ষা রাখে না, একুশের মাসে উর্দুঅলারাই ঢাকার মঞ্চ নাচাগানায় মাত করল হিন্দুস্থানী মোড়কে। বলিউডের হিন্দি ছবির চোস্ত সংলাপ এবং বিশেষ করে গান উর্দু জবানকে প্রাধান্য দিয়েই হয়ে থাকে।
বিপাশা বসু, মালাইকা অরোরা, ঋতুপর্ণার অর্ধনগ্ন নাচ- তার মাঝেও চরম অপমানের ঠেকেছে বাংলাদেশের একজন ব্যান্ড শিল্পীর গাওয়া ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানটি। বিকৃত সুর, বিকৃত উচ্চারণ- কল্পনাই করা যায় না এটা একুশে ফেব্রুয়ারি রক্ত দানের সেই ঐতিহাসিক নগরীতে হচ্ছে। সত্যি বলতে কি, উর্দুঅলারা যা পারেনি- এ দেশেরই কিছু কুলাঙ্গার তারচেয়ে বেশি ক্ষতি করে চলেছে বাংলা ভাষার।

***
লেখাটি দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১২