ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

‘কাজে নয়, কথায় বড়’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবার যথারীতি হাস্যস্পদ হয়েছেন রুনি-সারওয়ার হত্যার রহস্য উদঘাটন ও খুনিদের ধরার জন্য ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়ে। তিনি যোগ্য প্রশাসক নন, মাঠের রাজনীতি-হরতালে বড় করিত্কর্মা। সেই মেঠো অভ্যাসেই কিনা জানি না তিনি বিস্ময়করভাবে পুলিশকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিলেন। তিনি তো এখন বিরোধী দলের পারফর্ম করছেন না। যে পুলিশের বিরুদ্ধে এক সময় হরতালের দুপুরে ফার্মগেট গরম করে লম্বা লম্বা বক্তৃতা দিয়েছেন, এখন সেই পুলিশের মন্ত্রী তিনি। আলটিমেটাম তিনি কেন দেবেন—তিনি তো কাজ করে দেখাবেন। তার এই কৌতুককর পারফরমেন্সের ফল মিলেছে হাতে-নাতে। ১৩ ফেব্রুয়ারি তার আলটিমেটাম যখন শেষ হলো, তখন পর্যন্ত প্রসব হলো অশ্বডিম্ব। যেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই আগ বাড়িয়ে চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের পাকড়াও করে দেখাবেন। না, তিনি তা পারেননি। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারী তো দূরের কথা, তদন্ত কাজেও আশাব্যঞ্জক কোনো অগ্রগতি হয়নি।

বরং মন্ত্রীর বক্তব্য পুলিশের মধ্যেও হাস্যরসসহ মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (প্রশাসন) শহিদুল হক অত্যন্ত স্পষ্টভাষী, মেধাবী সোজা-সাপটা মানুষ। কোনো ঘোরপ্যাঁচের মধ্যে তিনি নেই। তেল-তোয়াজের তোয়াক্কা করেন না। ১২ ফেব্রুয়ারি রাতে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের টকশোতে তিনি কোনো রাখঢাক ছাড়াই ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম নিয়ে মুখ খোলেন। বলেন, সময় বেঁধে দিয়ে সঠিক তদন্ত হয় না। তদন্তে ২/১ দিন লাগতে পারে। আবার অপরাধী ধুরন্ধর হলে সেই অপরাধ রহস্য সমাধানে ২/৪ মাসও লাগতে পারে। অস্বীকার করার উপায় নেই, ন্যায্য কথাটাই তিনি বলেছেন।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের সময় বেঁধে দেয়া মানে পুলিশকে যেনতেন দায়সারা তদন্তে বাধ্য করা। মন্ত্রীর আলটপকা উস্কানি ও নির্দেশ মানতে গিয়ে পুলিশ অনেক সময় রাস্তা থেকে কাউকে ধরে এনে আসামি সাজিয়ে চাকরি রক্ষা করতে বাধ্য হয়।

রুনি-সারওয়ার হত্যার তদন্তও তেমনই কোনো কেলেঙ্কারীর জন্ম দিতে পারত। কিন্তু মিডিয়ার সার্বক্ষণিক সতর্ক চোখকে ফাঁকি দিয়ে কল্পকাহিনী ফাঁদা অসম্ভব। ১২ ফেব্রুয়ারি রাতে গোয়েন্দা ও তদন্তকারীরা পুলিশ মন্ত্রীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে ‘ধরেছি হুজুর, পেয়েছি হুজুর’ বলতেও শুরু করেছিল, কিন্তু বিচক্ষণ শীর্ষ কর্মকর্তারা সরকার ও মন্ত্রীর সস্তা বাগাড়ম্বরের চাপকে আমলে নেননি। তাই ১৩ ফেব্রুয়ারি আইজির সংবাদ সম্মেলনে আমরা পুলিশের ব্যর্থতার সরল কৈফিয়ত পেলাম। স্বল্পভাষী আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকারও ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা সম্পর্কে বললেন, সবসময় বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা যায় না। এ ধরনের হত্যা মামলার তদন্ত শেষ করা একটু সময়সাপেক্ষ। আইজি বলেন, তাড়াহুড়ায় আসল তথ্য-প্রমাণ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

পুলিশ মন্ত্রী ও আইজি এবং অতিরিক্ত আইজির বক্তব্যে এটা ধারণা করা যায়, পুলিশে সমন্বয়হীনতা বাড়ছে। একজন মন্ত্রী শুধু নির্দেশ বা আলটিমেটাম দিয়ে দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। তাকেও বিচক্ষণ হতে হবে। তিনি শুধু ব্যস্ত আত্মমহিমার বানোয়াট গল্প বয়ানে; অন্য মন্ত্রীরাও নানামুখী চাপ ও তদবিরে ব্যস্ত। সরকারদলীয় হাজার হাজার সন্ত্রাসী ক্যাডারকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রেখে কীভাবে পুলিশের পক্ষে সুষ্ঠু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা সম্ভব! যেখানে ছাত্রলীগের তুমুল তাণ্ডব-সন্ত্রাস, খুন-খারাবি দেখে মনে হয় পুলিশের ঘুম হারাম করতে তারা একাই একশ’।

গৃহাভ্যন্তরে খুন, কাজের ভৃত্য খুন-টেম্পোচালক খুন—যে কোনো খুনের ঘটনা তদন্ত করতে গেলেই তদন্তকারীদের হুশিয়ার থাকতে হয়, হত্যাকারী ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ-টেম্পো লীগের নেতাকর্মী কিনা, কারও ভাস্তা-ভাইগ্না কিনা, সরকার সমর্থক পেশাজীবী কিনা—এইসব দিক রক্ষা করে আসল খুনিদের পাকড়াও করা কিভাবে সম্ভব! আমরা সবাই জানি, পুলিশও জানে কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানেন কিনা সন্দেহ- পেশাদার খুনি, অপরাধী-হত্যাকারী নিজেকে বাঁচাতে সবসময় রাতারাতি সরকারি দলের ক্যাডার হয়ে যায়। সত্যিকারের আইন-শৃঙ্খলা কায়েম করতে হলে সবচেয়ে প্রথম দরকার সরকারি দলের সন্ত্রাসীদের কঠিন হাতে দমন করা। আর পুলিশ যখন আওয়ামী লীগ পুলিশ বা বিএনপি পুলিশ হিসেবে সরকারে বিলীন হয়ে যায়, তখন তাদের দিয়ে আর যাই হোক কাঙ্ক্ষিত আইন-শৃঙ্খলা কায়েম সম্ভব নয়।