ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

বাংলাদেশের ইতিহাসে হাতেগোনা যে কয়েকটি রাজনৈতিক পরিবার পুলিশকে ব্যক্তিগত কাজে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার তেমন করেনি তার একটি হলো তাজউদ্দীন পরিবার। তাজউদ্দীন রাজনৈতিক প্রতিপত্তির মাস্তানি থেকে শতহস্ত দূরে ছিলেন; তার ছেলে সোহেল তাজ স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী হয়েও ভরযৌবনেও পুলিশি ক্ষমতার উত্তাপকে কাজে লাগিয়ে বাড়াবাড়ি করেননি। আর তাজউদ্দীনের মেয়েরা দেশে-বিদেশে সবসময় চলেছেন লো-প্রফাইলে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর ছেলে-মেয়ে হওয়ার দেমাগ-দর্প তাদের আচরণে কখনও প্রকাশ পায়নি। যখন শুনলাম নিভৃতচারী-স্বল্পভাষী তাজউদ্দীনের নাতি প্রহার ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন গুলশান থানা পুলিশের হাতে—সত্যি অবাকই হয়েছিলাম।

প্রত্যক্ষদর্শী নানা অভিজ্ঞতায় জানি, সাম্প্রতিককালে নয়া সড়ক যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের রাস্তায় গাড়ি পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে কট্টর অবস্থান নিয়েছেন। পার্কিং স্পটবিহীন এই বিশাল নগরীতে এখন কোথাও দাঁড়ানোই দায়। করিত্কর্মা পুলিশ এসে ফাইন স্লিপ ধরিয়ে দিচ্ছেন। আইনসঙ্গতভাবেই তারা কাজ করছেন।

তেমন ঘটনা নিয়েই তাজ-দৌহিত্রের সঙ্গে পুলিশি হাঙ্গামা। পার্কিং করতে না করতেই ছুটে আসে পুলিশ অফিসার। অভিযোগ—তাজ-দৌহিত্রকে তারা তুই তোকারি করেন। থানায় নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। দৌহিত্র তার পরিচয় দেন। বলেন, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজেরও তিনি ভাগ্নে। তাতে নাকি আরও ক্ষেপে যান পুলিশ সদস্যরা। ব্যাঙ্গোক্তি করেন- শালা, সোহেল তাজের ভাগ্নে! আরও বেশি করে হেনস্থা করা হয় ভুক্তভোগীকে। বিষয়টি অনেক দূর গড়িয়েছে। ৫ পুলিশকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। আদালতও রুলনিশি জারি করেছে।

গুলশান পুলিশের যেসব সদস্য বাড়াবাড়ি করেছেন তারা এখন মাশুলও গুনছেন। কিন্তু বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—কেন তারা ওই বাড়াবাড়ির দুঃসাহস দেখালেন।
সরকার বাহাদুরের মন রক্ষা করতে তারা বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী-এমপিদের গরুপেটা করেন, সে ঠিক আছে। কেননা সরকার তাতে খুশি হয়। কিন্তু সরকারি ঘরানার এমন প্রভাবশালী পরিবার সদস্যকে তারা লাঞ্ছনার সাহস কোত্থেকে পেলেন! সোহেল তাজ ও তাজউদ্দীনের রেফারেন্স শুনে তারা আরও ক্ষেপে গেলেন কেন? এরা তো কখনও পুলিশের বাড়া ভাতে ছাই দেননি।

একজন অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার কাছে বিষয়টি তুলতে তিনি বললেন, এটা পুলিশের বেলাশেষের মনস্তত্ত্ব। সোহেল তাজ, তাজউদ্দীন এখানে বিবেচ্য নয়। তার ধারণা, গত তিন বছর ধরে প্রতিটি কাজে, প্রতিটি পদক্ষেপে পুলিশ সদস্যরা অবৈধ হস্তক্ষেপ, তদবির, নেতা-নেত্রী-কর্মীদের ধমক-হুমকিবাজি; অমুক-তমুক মন্ত্রীর আত্মীয় ইত্যাদি রেফারেন্সের শিকার হয়ে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে গেছেন। কাজেই তাদের বিবমিষা ধরে গেছে। এখন সরকারের বিদায়ঘণ্টার শব্দ ক্রমেই উচ্চতর হচ্ছে। ক্লান্ত পুলিশ তাই দলবাজি, নেতাবাজি, ভাগ্নেবাজি থেকে মুক্তি খুঁজছেন। তারই অনাকাঙ্ক্ষিত হুজ্জোতির শিকার হয়েছেন তাজকন্যা সিমীন হোসেন রিমির নিরীহ ছেলে। সে ভেবেছিল মামার পরিচয় দিয়ে হয়তো একটু খাতির মিলবে। কিন্তু ত্যক্তবিরক্ত পুলিশ উল্টো লাগামছাড়া আচরণ করেছে।

সিলেটের এমপি মাহমুদুস সামাদ চৌধুরীর অভিজ্ঞতাও দেখুন। তিনিও আমজনতার বেলাশেষের মনস্তত্ত্বের শিকার হয়েছেন। ১১ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ সুরমায় নবারুণ উচ্চবিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন প্রধান অতিথি হয়ে। উপস্থাপক- যিনি একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক তার নামের জায়গায় ভুল করে অনুষ্ঠানের সভাপতি কফিল চৌধুরীর নাম উচ্চারণ করেন। আর যায় কোথায়! ক্ষুব্ধ এমপি চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে উপস্থাপক ফখরুলকে লাঞ্ছিত করেন; গলাধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেন। বেশ একখানা বাহাদুরির কাজ করেছেন ভেবে এমপি সাহেব যেই আত্মতৃপ্ত, ততক্ষণে পাবলিক গেছে ক্ষেপে। সাধারণ ছাত্ররা ঘেরাও করে এমপিকে। অবস্থা বেগতিক। না পালিয়ে উপায় কি! এমপি গিয়ে লুকান প্রধান শিক্ষকের রুমে। জনতা ও ক্ষুব্ধ ছাত্রদের রুখতে লেলিয়ে দেয়া হয় বশংবদ ছাত্রলীগ ক্যাডারদের। এমপি এই ফাঁকে প্রস্থান করেন। অন্যদিকে জনতা আরও সংগঠিত হয়ে সড়ক অবরোধ করে ও মিছিল করে। এমপিকে লক্ষ্য করে ছুড়ে মারে জুতা। সব মিলিয়ে কেলেঙ্কারীর এক শেষ।

সব মিলিয়ে মনবদল ঘটতে চলেছে জনগণের। এখন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী-এমপিদের একটু সামলে চলা উচিত। শিক্ষকদের চড়থাপ্পড় দিয়ে এই তিন বছর বেশ আলগা মাস্তানি করা গেছে। এখন হুশিয়ার। এখন পাবলিক উল্টা চড়থাপ্পড় দেয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে প্রতিদিন। আর আওয়ামী লীগের প্রবীণ সিনিয়র নেতা তোফায়েল আহমেদ এই ভূইফোঁড় চড়থাপ্পড়বাজদের মূল্যায়ন করেছেন যথার্থ। ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মাজহারুল বাকী স্মরণসভায় তিনি খোলাসা করে বলেছেন, আজ আর পরীক্ষিত ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন হয় না। আগে রাজনীতিতে প্রথমে কর্মী, এরপর নেতা, তারপর মন্ত্রী হতো। আর আজ আগে মন্ত্রী হন, তারপর তারা দলের কর্মী হন।

উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে রাজনীতি। এইসব ভূইফোঁড় মন্ত্রী, এমপি-নেতাকে অত্যাচার-নির্যাতনের মাশুল গুনতে হবে অচিরেই।