ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

বেসরকারি একটা টেলিভিশনে দেয়া সাক্ষাৎকার এ শুনছিলাম সেদিন, মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী বলছেন, যে কোন গল্প নিয়ে তিনি যখন ভাবেন তখন উনার একরকম জ্বর আসে। প্রচন্ড জ্বর নিয়ে তিনি নিজের মতো করে গল্পটা বলেন। সিনেমাটা বানান। দর্শকের জন্য উন্মুক্ত করেন। নিজের জ্বর দর্শকের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তারপর তিনি সেই জ্বর থেকে মুক্তি লাভ করেন। এবং নতুন করে অন্য কোন জ্বরে আক্রান্ত হন।

কথা সত্য। উনার ‘ডুব’ জ্বরে সচেতন আধুনিক দর্শক সমাজ এখন আক্রান্ত। মোটামুটি আক্রান্ত না, প্রবল ভাবে আক্রান্ত। ১৬ কোটি মানুষের দেশে ১ কোটি সিনেমার দর্শক নাই, কিন্তু ১৬ কোটি সিনেবোদ্ধা আছে যা রীতিমত মুগ্ধ হওয়ার মতই বিষয়। এমন বিপুল পরিমাণ সিনেবোদ্ধা থাকা সত্ত্বেও বাংলা সিনেমার এমন প্রায়ভঙ্গুর অবস্থা থাকার কারণটা আসলে পরিস্কার না।
'ডুব' ছবির পোষ্টার

প্রতিটা সৃষ্টিকর্মই একজন পরিচালকের কাছে সন্তানতূল্য। ফারুকী সাহেব সন্তান জন্ম দিয়েছেন। সন্তানের নাম #ডুব। এবার তিনি ঘটা করে সবাইকে দাওয়াত দিয়েছেন সন্তানের মুখ দর্শন করে দোয়া করে যেতে। সবাই উনার সন্তানকে দেখছেন কিংবা হয়তো দেখছেন না, কিন্তু সবাই উনার সন্তানের খুঁত ধরতে ব্যস্ত। নাকটা বোঁচা, রঙটা চাপা, চোখগুলো চাইনিজদের মতোন ইত্যাদি ইত্যাদি। ফারুকী সাহেবের সন্তান উনার মতো হবে, আমার আপনার মতো খুঁত বিহীন হবে না, সেটাই তো স্বাভাবিক। আপনার আমার তবে সেই সন্তানের খুঁত ধরে কি ফায়দা? তারচেয়ে বরং একটা খুঁতবিহীন সন্তান পয়দা করে জাতিকে দেখায়ে দেই, কী বলেন?

বিশ্ব মন্দার বাজারে একটা সন্তান নিতে হিমশিম খান, উনি তো মাশাল্লাহ্ সাহস করে একটার পর একটা সন্তান জন্ম দিয়ে যাচ্ছেন। সেই সাহসের মূল্যই বা কম কিসে? আসেন আমরাও সন্তান জন্ম দিয়ে উনার সন্তানের সাথে প্রতিযোগিতায় নামায়ে দেই। সন্তানে সন্তানে প্রতিযোগিতা হবে। বাংলা সিনেমার ভোল পাল্টাবে। আল্টিমেট চাওয়াতো এটাই, নাকি?

ডুব এর নির্মাণ আপনাকে আমাকে আপামর জনগণকে বিদগ্ধ সিনেবোদ্ধা বানিয়ে ছেড়েছে। এটাই পরিচালক হিসাবে ফারুকী সাহেবের বড় অর্জন। উনি আমজনতাকে সিনেমা নিয়ে ভাবতে শেখাচ্ছেন। এই শিক্ষাটা বরং কাজে লাগান। এভাবে বছরে মুক্তি পাওয়া সবগুলো সিনেমা নিয়ে হইচই করেন। ভুলত্রুটি ধরতে থাকেন। এদেশের সিনেমার সোনালী দিন আসতে বাধ্য। অনাগত সেই সোনালী দিনে কিছু অগ্রপথিকের অবদান আপনি চাইলেও অস্বীকার করতে পারবেন না। অবশ্যই ফারুকী সাহেব তাদেরই একজন।
'ডুব' ছবির পরিচালক

যে পরিচালক শ্রমজীবী মানুষের বিনোদনের জন্য ‘দুলাভাই’ জাতীয় সিনেমা বানান, বা যেই পরিচালক অান্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসা পাবার জন্য ছবি বানান। দু’জনের কাজই যথাযথ সম্মান পাবার অধিকার রাখে। কারণ একটা সিনেমা বানানো ছেলে হাতের মোয়া বানানোর মত বিষয় নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশে এই ইন্ডাস্ট্রির প্রেক্ষাপটে। এখানে একটা সিনেমা বানিয়ে গিয়ে নাকে খত দিয়েছেন, এমন বহু মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। এখানে সিনেমাপাড়া জিম্মি হয়ে থাকে গুটিকয় মানুষের স্বার্থের কাছে। এখানে সিনেমা হল জিম্মি হয়ে থাকে কিছু ব্যবসায়ীর হাতে। এখানে দর্শকের ভেতর পছন্দ অপছন্দের বিভেদ খুব সুস্পষ্ট। সিনেমা বানানো এখানে জেনে বুঝে অনেকটা নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারার মতো। এখানে একটা সিনেমা বানিয়েই অনেক প্রযোজক দেউলিয়া হয়ে যান, অনেক পরিচালক কর্মহীন হয়ে পড়েন। এতকিছুর পরও ফারুকী সাহেব একটার পর একটা বাংলা সিনেমা বানানোর সাহস দেখিয়ে যাচ্ছেন। এক্সপেরিমেন্ট করে চলেছেন। অান্তর্জাতিক পরিমন্ডলে একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাকে দিয়ে বাংলা সিনেমার সাথে পরিচিত হচ্ছে, বাংলা সিনেমার বিষয়ে কথা বলছে। যখন ফারুকীর সিনেমা নিয়ে ভ্যারায়টিতে রিপোর্ট হয়, যখন বুসান ফিল্ম ফেয়ারে তার সিনেমা দেখানো হয়, তখন কেবল একজন ব্যক্তি ফারুকী বিশ্বমঞ্চে গিয়ে দাঁড়ান না, দাঁড়ায় পুরো বাংলাদেশ। আর এই বাংলাদেশ প্রতিনিধিত্ব করে ১৬ কোটি মানুষকে। এর মানে কিন্তু এই দাঁড়ায় যে ১৬ কোটি মানুষের মুখপাত্র হয়ে তিনি মাইক হাতে হাজারো ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে যান। দাঁড়ায় বাংলা চলচ্চিত্র।

অথচ এই সত্যিটা মানতে আমরা নারাজ। এসব প্রকৃতই যেন আমাদের কাছে মূল্যহীন। আমাদের ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দই আমাদের কাছে সব। তাই জন্যেই ফারুকীর সব অর্জন, সব চেষ্টা, এক্সপেরিমেন্ট, সিনেমার প্রতি ভালোবাসা সবকিছুই দিনদেশে হয়ে যায় কেবলই তার ব্যক্তিগত অর্জন। আর আমরা যেন পড়ে থাকি প্রদীপের আলোর নীচে, অন্ধকারে।

আমাদের দেশে আগাগোড়ায় সমালোচনা করার মানুষ বেশি। আমরা নিজেরা উঠতে পারি বা না পারি, কাউকে টেনে হিঁচড়ে নামানোর চেষ্টাতে আমাদের উৎসাহের তুলনা মেলা ভার। জুম্মায় জুম্মায় আট দিন বয়সের ছেলে বা মেয়েটাও বড় অবলীলায় এদেশের একজন বিশিষ্ট চলচিত্র বোদ্ধা বনে যেতে পারে। আর ঠিক এই কারণেই বুঝি এদেশের চলচিত্র এক পা এগিয়েও ৩ পা পিছিয়ে পড়ে। কোথায় দর্শক হিসাবে নির্মাতাদের বেশি বেশি এক্সপেরিমেন্টাল সিনেমা নির্মাণে আমরা উৎসাহ দেব, তা না, বরং যারা ভালবেসে নিয়মিত সিনেমা বানাতে চান, তার কাজের মান যাচাই এ এমন কট্টর সমালোচকের ভুমিকায় আমরা অবতীর্ণ হই যে তারা এ পথ মাড়াতে সহসা আর সাহস করেন না। এক্ষেত্রে ফারুকী সাহেবের সাহসের প্রশংসা না করাটা হবে ঘোরতর অন্যায়। উপর্যুপরি সমালোচনায় জর্জরিত হওয়া সত্ত্বেও উনি যে ডেডিকেশন নিয়ে উনি ঘাড় তেড়ার মত বাংলা সিনেমা নিয়ে পড়ে আছেন, তাতে করে উনাকে স্যালুট দিতেই হয়। এদেশের ১৬ কোটি কট্টর বিদগ্ধ সমালোচকের বিপরীতে ফারুকীর মত দাঁত কামড়ে পড়ে থাকা আর ৫ জন পরিচালক দাঁড়াতেই পারলেই বাংলা সিনেমা দিন বদলে যেত!

সমালোচনা গঠনমূলক হওয়া উচিত, আক্রমনাত্বক নয়। সঠিক সমালোচনা একজন পরিচালকের সুন্দর সৃষ্টকর্মের ক্ষুধা কে তীব্র করে, তার সৃজনশীলতাকে করে ধারালো। পরিচালককে অনুৎসাহিত করা, হেয় করা বা তার সৃষ্টিশীল মননের বীজটাকে উপড়ে ফেলতে চেষ্টা করে যে সমালোচনা, সেটা আর যাই হোক, সমালোচনার হয় না। ওটা হয় আবর্জনা। আর নাগরিক যেখানে থাকে, আবর্জনাও তো সেখানে থাকবেই। আবর্জনার দূর্গন্ধ এড়াতে একজন সুনাগরিক কখনো ঘরের কোনায় লুকিয়ে থাকেন না। বরং সে আবর্জনা সরিয়ে নিজেকে আর চারপাশকে বাসযোগ্য করে তোলেন।

ফারুকী সাহেবও একইভাবে কথাকথিত প্রচারসুলভ সমালোচনাকে পাশ কাটিয়ে নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে নিজের সৃষ্টিশীল প্রয়াসকে অব্যাহত রাখবেন, বিশ্বের দরবারে মাথা উচুঁ করে বাংলা সিনেমাকে তুলে ধরবেন সেই প্রত্যাশা আর বিশ্বাস রইল।