ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

গত কয়েকদিন ধরে সংবাদ শিরোনামে শ্রমিক অসন্তোষের খবর টি আসছে। এ ব্লগেও বেশ লেখালেখি,তর্ক বিতর্ক হচ্ছে। বিষয়টি দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য বেশ দু:খ জনক। আজকের শিরোনামে দেখলাম —কারখানা বন্ধ,বেতনও বন্ধ করা হয়েছে। এটা মালিকদের মোক্ষম অস্ত্র। শ্রমিকদের শায়েস্তা করার মহৌষধ। এ ওষুধে আন্দোলনের চাকা বন্ধ করতে ভাল কাজ দেয়। কারণ শ্রমিকরা খাদ্য ও বাসস্থানের অভাবে অস্তিত্বহীন হয়ে স্থান ত্যাগে বাধ্য হয়। আর আন্দোলন করার সুযোগ থাকে না।

লেখার শিরোনামে শ্রম আইনকেই শ্রম(মালিক) আইন লেখা হয়েছে। বাস্তবে মালিক আইন নামের কোন আইন নেই। শ্রম আইনের লেবাসেই মালিক আইন সুপ্রতিষ্ঠিত। এই শ্রম আইনের ধারায় শ্রমিকদের যথা সামান্য অধিকারের কথা লেখা রয়েছে তার বিপরীতে মালিকের আইন রয়েছে যথেষ্ঠ। এ সব ব্যবহার করে মালিক শ্রেণী যে কোন অবস্থায় শ্রমিকের উপর অনাচার চালাতে পারে। আজকের কারখানা বন্ধের নোটিশ তারই একটি অংশ।

আমাদের দেশের বেশির ভাগ কলকারখানায কোন নিয়োগ পত্র দেয়া হয় না। শ্রমিকদের মৌখিক নিয়োগ দিয়ে বছরের পর বছর কাজ করতে দেখা যায়। এমন কি বিদেশী আন্তর্জাতিক কোম্পানী লিভার ব্রাদার্স এর মত প্রতিষ্ঠান ও এভাবে শ্রমিকদের অধিকার বঞ্চিত করার নজির রয়েছে। আর আজকের এই গার্মেন্টস শিল্প তো অনেকের কাছে শিল্প হিসেবেই বিবেচিত হয় না। অথচ এই শিল্পই বর্তমান দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অনন্য উত্স। এখানে যে শ্রমিকগুলো কাজ করে তাদের নিয়োগ দেয়ার সময় কোন প্রকার নিয়োগ/প্রমাণ পত্র দেয়া হয় না। এ কারণে তারা কেউ ট্রেড ইউনিয়ন দূরে থাক,প্রতিবাদ করার ও সাহস পায় না। কেউ কোন উচ্চবাচ্য করলেই পরদিন থেকে গেট বন্ধ হয়ে যায়। শ্রম আইনে শ্রমিকদের নিয়োগ পত্র দেয়ার বিধান,স্থায়ীকরণ সবকিছু রয়েছে। কিন্তু মালিক পক্ষ তা না দিলে তার কোন শাস্তির সুনির্দিষ্ট বিহিত নেই। শ্রমিকদের কাজের,চলন বলনের,কর্মে অবহেলার সকল প্রকার শাস্তির বিধান পরিষ্কার করা আছে। মালিক পক্ষের শাস্তির বিধান শুধু মরুভূমির মরিচিকার মত। সরকারিভাবে প্রত্যেক জেলা শহরে শ্রম দপ্তরের শাখা রয়েছে। তারা টাকার বিনিময়ে মালিক পক্ষের লেজুড়বৃত্তিতে আখের গোছান। তাহলে এই মেহনতি শ্রমিকের ভরসার জায়গা কোথায়!

আশুলিয়ায় সব কারখানা বন্ধ করে মালিক পক্ষ শ্রমিকদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। শ্রম আইনের ১৩(১) ধারায় এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করায় তাঁরা বেতন-ভাতা দিতে রাজি নন। ফলে যতদিন এসব শিল্পকারখানা বন্ধ থাকবে, তত দিন শ্রমিকেরা বেতন পাবেন না। শ্রম আইনের প্রয়োগে মতভেদ: বাংলাদেশ শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা অনুযায়ী, কোনো শিল্প-কারখানার কোনো শাখা বা বিভাগের শ্রমিকেরা যদি বেআইনিভাবে ধর্মঘট করেন, তবে ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক পুরো কারখানা বা আংশিক বন্ধ করে দিতে পারেন। এ জন্য বেআইনি ধর্মঘটে অংশ নেওয়া শ্রমিকেরা বেতন বা মজুরি পাবেন না।

বিজিএমইএ সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন গতকাল বলেন, অসহায়ত্ব ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে বাধ্য হয়ে ওই এলাকার তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ করা হয়েছে। অবৈধ ধর্মঘটের কারণে শ্রম আইনের আওতায় ১৩(১) ধারায় যত দিন এসব কারখানা বন্ধ রাখা হবে, তত দিনের বেতন বা মজুরি পাবেন না শ্রমিকেরা।

শ্রম আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাটির ব্যাখ্যা করে সৈয়দ সুলতানউদ্দিন আহমেদ জানান, শুধু বেআইনিভাবে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কোনো একটি শাখা বা বিভাগের শ্রমিকেরা যদি ধর্মঘট করেন আর সে জন্য যদি ওই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অন্য শাখা বা বিভাগের কার্যক্রম বিঘ্নিত হয় বা কার্যক্রম চালাতে না পারে, তবেই কেবল সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিক কারখানা বন্ধ করতে পারেন। এ জন্য শুধু বেআইনিভাবে ধর্মঘটে অংশ নেওয়া শ্রমিকদের বেতন বা মজুরি বন্ধ রাখতে পারেন মালিকেরা। ঢালাওভাবে সব শ্রমিকের বেতন কেটে রাখতে পারেন না। বেআইনি ধর্মঘটে অংশ নেননি এমন অন্য শ্রমিকদের বেতনভাতা দিতে হবে। মালিক পক্ষের এরূপ আচরণ তংচকতার পর্যায়ে পড়ে যা মালিক ধর্মঘটের সামিল।

আজকের দৈনিকে (প্রথম আলো, ১৯-০৬-২০১২) বিস্তারিত লেখা হয়েছে।

শ্রমিকদের নির্যাতনকে সহ্য করা ছাড়া যেন কোন গত্যন্তর নেই। তাই প্রতিবাদকারী হয়ে যায় সন্ত্রাসী। আর কিছু শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের দালালী/অপরিপক্ক আন্দোলন শ্রমিকদেরকে সমূহ বিপদের সম্মুখীন করে। সবচেয়ে বড় সংকট হল নির্দিষ্ট সময়ে বেতন ভাতা না পাওয়া। শ্রমিকদের চাহিদা অতি সামান্য। তারা শুধু বেতন ভাতা গুলো যথাসময়ে পেলে কোন প্রকারে বেচে থাকে। কিন্তু তাও যখন পায় না তখন নিরুপায় হয়ে রাস্তায় নামে। পোষক শিল্পে আজতক যতগুলো সহিংসতা হয়েছে প্রায় সবগুলোই বেতন ভাতা নিয়ে।

কিন্তু দু:খের বিষয় হলে ও সত্য যে, সরকার ও মালিকপক্ষের সংগঠন এ সংকট দূর করতে কোন বাস্তব পদক্ষেপ নিতে পারেনি। আন্দোলনের প্রয়োজনে বেতন বৃদ্বির কথাটা যুক্ত হয় মাত্র। বেতন কাঠামো ঠিক করা হলে ও তা অকার্যকরের ভাগই বেশি। তবু শ্রমিকরা নীরব থাকে। যখন বেতন ঠিক সময়ে না পেয়ে বাড়িওয়ালা, দোকানদারের গালি শুনতে হয় তখন আর ধৈর্য্য ধারণের সুযোগ থাকেনা। আর মালিকদের অভাব যেন শেষ হওয়ার নয়! একজন মালিক(সম্ভবত:) মন্তব্য করেছেন,গাড়ি বাড়ি সব তাদের পূর্ব পুরুষ কতৃক প্রাপ্ত থাকে। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে কি তাই? আমার জানামতে দু বন্ধু মিলে একটি গার্মেন্টস দিয়ে তারা বর্তমানে আলাদা ভাবে একেকজন ৪০ ও ৬০ টি কারখানার মালিক। কিন্তু এই মালিক ও ১০/১৫ তারিখের আগে কোন কারখানায় বেতন দেন না। তারা ও কি অভাবের কারণেই বেতন দেন না? সবিনয়ে প্রশ্নটির উত্তর কি মালিকপক্ষ দেবেন?

মালিকদের একত্রিত হয়ে কারখানা সব বন্ধ করে দেয়া মানে নিরীহ শ্রমিকদের শক্তি প্রদর্শন। এটির সুরাহা সরকার, মালিক, শ্রমিক মিলে শীঘ্রই করা উচিত। নইলে সমস্যা প্রকট হলে সবার ক্ষতি হবে। আর মালিক যদি মনে করেন শ্রমিক ছাড়া মালিক চলে,তবে এহেন চিন্তায় শ্রমিকদের ও একযোগে মালিক বিহীন চলার নীতিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেখিয়ে দিতে হবে। নচেৎ মালিক পক্ষের ইগো কাটবে না। কেননা এক পক্ষের মার খেয়ে সমস্যার সমাধান আসে না। তবু ও প্রত্যাশা করি,এক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক,শান্তি ফিরে আসুক।।