ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

আপনি পরিবহন ব্যবস্থার যে দিকেই তাকাবেন সমস্যা খুঁজে পাবেন। এই পরিবহন সমস্যার যেন অন্ত নেই। রাস্তার বেহাল দশা সর্বত্র। প্রতিটি মোড় সকাল-সন্ধ্যা জ্যাম লেগেই থাকে। মোড়গুলোতে কোন প্রকার ট্রাফিক সিস্টেম নেই বললেই চলে। সময়ে সময়ে যখন জ্যাম তুঙ্গে উঠে তখন কিছু পোশাকধারী ট্রাফিক পুলিশ হঠাৎ দৃশ্যমান হয়। তারা এসে গাড়ির গায়ে ডান্ডা মেরে গাড়ির চালকের সাথে কানাকানি করে হাত মিলিয়ে সরে পড়ে।

তিন রাস্তা বা চৌরাস্তার মোড়ে জ্যামে আটকে গাড়িতে বসে এক মিনিট ভাবলে যে কারো মাথায় এই সমস্যার সমাধান আসবে। সমস্যা চিহ্নিত করতে গিয়ে আপনি দেখবেন, যেদিকে রাস্তা খোলা রাখলে গাড়ি অনায়াসে যেতে পারবে সেদিকে রাস্তা বন্ধ করে রাখা হয়েছে, আর যেদিকে গেলে সমস্যা হবে সেদিকেই খোলা রাখা হয়েছে! এ এক অদ্ভূত ট্রাফিক ব্যবস্থপনার খেলা! যে খেলায় মত্ত হয়ে ট্রাফিকওয়ালাদের পকেট ভারী করার মোক্ষম সুযোগ তৈরি হয়।

 

 

অদ্ভূত! যেখানে মহাকাশে গিয়ে বাড়ি বানানোর পরিকল্পনা চলছে, সেখানে রাস্তায় ট্রাফিক সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা আমাদের মাথায় আসে না! অকল্পনীয় ব্যাপার। পাবলিক বাসগুলোর কোনো প্রকার জবাবদিহিতা কি আছে? কোথায় দাঁড়াবে (স্টপেজ), কোথায় দাঁড়াবে না, লাইসেন্স আছে কি না, গাড়ি কে চালায় (ড্রাইভার না হেলপার), কোথায় ওভারটেক করে, কোথায় কি সিগন্যাল মানতে হয় এসব শতকরা দুই ভাগ গাড়িচালকও বলতে পারবে না।

এতো গেল ‘কম জানা’ চালকদের কথা, কিন্তু কর্তৃপক্ষের কি অবস্থা? এসব সমস্যা দেখার জন্য কোন সংস্থা কি বিদ্যমান আছে? অহরহ দুর্ঘটনা ঘটছে, মানুষ পশুর মতো মরছে। অথচ টেলিভিশনে দেখি বিজ্ঞজনের মতো মন্ত্রী মশাই বা সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা বলেন, দেশের প্রচলিত আইনে দোষীদের বিচার হচ্ছে। কিন্তু প্রচলিত আইনে বিচার হচ্ছে কোথায়? হলে মানুষ ভয় করছে না কেন? ভিন দেশে তো মানুষ আইনকে ভয় পায়, তাহলে এখানে ভয় পায় না কেন? কারণ একটাই, এখানে স্বজনপ্রীতি বা টাকার বিনিময়ে আইনের ফাঁদ বিকিকিনি হয়। মোদ্দাকথা, এটা যতক্ষণ না বন্ধ হবে, ততক্ষণ সড়কে মৃত্যুর এই মিছিল চলতেই থাকবে।

কর্মস্থল গ্রামে হলেও চট্টগ্রাম শহরেই আমার বসবাস। শহরের সব রাস্তা সারা বছর ধরেই খোঁড়াখুঁড়িতে ব্যস্ত থাকে। সিটি কর্পোরেশন, সিডিএ, ওয়াসা, গ্যাস, এভাবে একেকবার একেক সংস্থার কাজ। এখানে কোনো সমন্বয় নেই। শহর থেকে ১০-১২ কিলোমিটার দূরে আমার কর্মস্থলে যেতে স্বাভাবিকভাবে সময় লাগার কথা ৩৫-৪০ মিনিট। কিন্তু সেখানে সময় লাগে প্রায় দেড়-দুই ঘন্টা। তাহলে আসা যাওয়ায় মোট তিন-চার ঘন্টা যায়।

সরকার মফস্বলে ডাক্তার বা বড় কোনো কর্তাকে নিয়োগ দিলেও তারা থাকতে চান না কিংবা কর্তব্য পালনে ঠিকভাবে সময় দিতে পারেন না, তার একমাত্র কারণ এই সমস্যাসংকুল যোগাযোগ ব্যবস্থা। চিত্রটি শুধু চট্টগ্রামের একার নয়, সারা দেশেই এমন সংকটাপন্ন অবস্থা। এই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন না হলে বর্তমান সরকারের ভিশন ও মিশন পূরণ হবার নয়- এই বিষয়টা দায়িত্ব পালনরত কর্তা ব্যক্তিরা কোনভাবেই বুঝতে পারছেন না। যদি পারতেন, তবে একটু বাস্তবসম্মত উপায়ে চেষ্টা করলে অবশ্যই ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতো। কিন্তু আমরা তা দেখছি  না। এসব কারণে যে মানুষ দিন দিন সরকারের প্রতি আরো নাখোশ হয়ে পড়ছে সেটা হয়তো সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল বুঝতে পারছেন না।

বর্তমান সরকারের অনেক অর্জন দেশে এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসা পেয়েছে তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু সাধারণ মানুষ বড় অর্জনগুলো বোঝার শক্তি রাখে না। তারা চাল-ডাল-তেল-পেঁয়াজ কিংবা রাস্তা-ঘাট, গাড়ি-ঘোড়া ও দৃশ্যমান আইন-কানুনের মাধ্যমেই দেশের অর্জনের পরিমাপ করে। বিষয়টা সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা মাথায় রেখে দেশ পরিচালনা করলে আর কোনো চিন্তার কারণ থাকবে না। চাটুকারদের জন্য সব সরকারের ভরাডুবি হয়। চাটুকার বিহীন বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে চাইলে হযরত ওমর (রা.) এর মতো ছদ্মবেশ ধারণ করে কখনো কখনো বাস্তব পরিস্থিতি একটু বুঝে নিলে আশা করি আপনারা দেশ পরিচালনায় সফল হবেন।

অবশ্য চাটুকারেরা সামান্য ধৈর্য ধরে সাময়িক স্বার্থ ত্যাগ করলে তারাও কিন্তু আজীবন সাফল্যের সাথে কাটাতে পারে। তারা তড়িৎ সোনার ডিম পাওয়ার লোভে দেশের এবং তার নিজেরও বারোটা বাজাচ্ছে। সেটা যখন তারা বুঝবে তখন আর সোনার ডিম পারা হাঁস বেঁচে থাকবে না। তখন পরিতাপ ছাড়া বিকল্প আর কোনো পথ খোলা থাকবে না। তাই সময় থাকতে একটু চিন্তা করলে নিঃসন্দেহে দেশ ও দশের মঙ্গল আসবে।