ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

কেউ খারাপ ব্যবহার করলে তার সাথে ঠিক ততোটুকু খারাপ ব্যবহার করাই এক ধরণের ভালো ব্যবহার। আপনি বলতে পারেন যে, কেউ খারাপ ব্যবহার করলেও আপনি তার সাথে খারাপ ব্যবহার করবেন না। ভালো কথা।

ফরাসী দার্শনিক মন্টেষ্কু বলেছেন, সবকিছুর একটা সীমা থাকা দরকার, এমনকি মহৎ গুণেরও। কথাটা কতোটুকু যৌক্তিক? বলতে পারেন যে, মহৎ গুণের কোনো সীমা থাকা উচিত নয়। আসলে এটাই সবাই বলবে। মহৎ গুণ মানুষের মধ্যে যতো বেশী থাকবে দুনিয়ায় শান্তি ততো বেশী প্রসারিত হবে। এটাই তো যুক্তিযুক্ত। তাই না?

তাহলে ঐ ফরাসি দার্শনিকের কথাটা কি ভুল ধরে নিবো? আসলে দুনিয়া বড় বন্ধুর পথ। এখানে মহৎ গুণ যে যতো দেখাবে সে ততো বেশী বিপদে পরবে। তাকে ততো বেশী লাঞ্চনা বঞ্চনা সইতে হবে। আপনি যদি পারেন আপনার সব মহৎ গুণের দ্বারা দুনিয়া আলোকিত করবেন তবে আপনি মহামানব। কিন্তু আপনাকে অবশ্যই অনেক অপমান ও অত্যাচার সহ্য করতে হবে।

আপনি সমাজে একটা ভালো কাজ করতে গেলে প্রথমেই আপনাকে একটা হাসির পাত্র হতে হবে। কারণ আমাদের সমাজের অধিপতিরা খুবই নিকৃষ্ট জাত। এরা কারো ভালো কাজে প্রথমেই নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে থাকে। সমাজের ঐ ধনী শ্রেণিরা ধনে বড় হলেও তাদের হৃদয় খুবই সংকুচিত, তারা বর্বর অসভ্য ও ইতর। আর সমাজের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই।

একটা ভালো কাজ, ভালো একটা সিদ্ধান্ত, নৈতিকতা যুক্তি ও আইনের মিলন ঘটিয়ে যে কোনো একটা ভালো সিদ্ধান্ত নিতে গেলে আপনি আপনার পরিবার থেকেও বাধার শিকার হবেন। আপনার পরিবারেও কোনো একজন সদস্য আছে যে আপনার ভালো কাজে উৎসাহ না দিয়ে বরং আপনাকে নিরুৎসাহিত করে সারাক্ষণ। পরিবার ও সমাজ এদের জন্যেই এগিয়ে যেতে পারছে না।

আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার জনক নিকোলা ম্যাকিয়াভেলী বলেছেন, যদি আপনি সবদিক থেকে ভালো হতে চান তবে অসাধু সংখ্যাধিক্যের মধ্যে অচিরেই আপনার ধ্বংস অনিবার্য। এই মহান দার্শনিকের কথা মতে, আপনি সবদিক দিয়ে ভালো হলে আপনার ধ্বংস অনিবার্য। কথাটা কিন্তু মোটেই ভুল নয়।

আসলে আমরা দেখতে পাই যে- যারা সমাজে প্রতারক, ভন্ড, মিথ্যাবাদী, লোভী, মোনাফেক, বেঈমান, দূর্নীতিবাজ তারাই সবচেয়ে ভালো আছে। তাদের লোকেরা সালাম দেয়, সম্মান করে, বড় চেয়ার ছেড়ে দেয় বসতে। তারা সমাজের নেতা। আর যারা নীতি যুক্তি ও আইনের ধার ধারে, সত্যভাষী, ঈমানী শক্তিতে বলীয়ান, দূর্নীতিবাজ নয় তারাই খারাপ আছে। তারা নিগৃহিত অপমানিত। সব দিক দিয়ে যারা ভালো তারা কোনঠাসা হয়ে পরে। তাদের মিথ্যা অপবাদও ঘাড়ে নিতে হয়। এমনকি আপনি যদি অতিরিক্ত ভালো হয়ে চলতে চান তাহলে আপনার কোনো অস্তিত্বও থাকবে না এ দুনিয়ায়। অসাধু সংখ্যাধিক্যে আপনি হারিয়ে যাবেন।

এখন কথা হচ্ছে অতিরিক্ত ভালো হলে কি ধ্বংস হতে হবে? আসলে তেমনটি নয়। যুক্তি, নীতি ও আইন এই তিনটার মাধ্যমে আমরা আমাদের জীবনের যে কোনো সমস্যার সমাধান বের করতে পারি। সবক্ষেত্রে যুক্তি, নীতি ও আইন মেনে চলতে হবে। তার পরেও যদি কোনো আঘাত আসে তবে সেটা মোকাবেলা করা সহজ হবে। কারণ যুক্তি, নীতি ও আইন এই তিনটিই আপনাকে রক্ষা করবে।

প্রথমেই উল্লেখ করেছি যে, কেউ খারাপ ব্যবহার করলে তার সাথে ততোটুকু খারাপ ব্যবহার করা যায়। হ্যাঁ আপনি খারাপ ব্যবহার না করেই বা কিভাবে টিকে থাকবেন? কেউ খারাপ ব্যবহার করলো আর অপনি মুখ বুঝে থাকলেন, এটা করলে আপনাকে সে আরো পেয়ে বসবে। তখন আপনার জীবন অতিষ্ট হয়ে উঠতে পারে। তাই যে যতোটুকু খারাপ ব্যবহার করবে তাকে ঠিক ততোটুকু দিয়ে দিন। তবে খেয়াল রাখবেন বেশী না হয়ে যায়।

আর আপনার সাথে কেউ ভালো ব্যবহার করলো, বিনিময়ে আপনি তার সাথে খারাপ ব্যবহার করে দিলেন। তাহলে তাঁর হৃদয় ভেঙ্গে যেতে পারে। হৃদয় ভাঙ্গার মতো বড় পাপ আর কি হতে পারে? যদি কেউ এভাবে ভালো ব্যবহার করার বিপরীতে খারাপ ব্যবহার করে আপনার হৃদয়ে আঘাত হানে তবে আপনি তাকে ক্ষমা করে দিন। আপনি হাসুন হৃদয় ভরে। আপনি ধরে নিন, ভালো ব্যবহার করলে প্রতিদানে খারাপ ব্যবহার পেতেই হয়।

অপরের সব ধরণের অনাকাঙ্খিত আচরণ থেকে রক্ষা পেতে হলে অনধিকার চর্চা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে। যেখানে কথা বলা আপনার অধিকার নেই, আগ বাড়িয়ে সেখানে কথা বলতে গেলেই আপনি এমন আচরণ পেতে পারেন যা আপনার কাছে অনাকাঙ্খিত ও অনভিপ্রেত মনে হতে পারে। যদিও আপনি ভালো উদ্দেশ্য নিয়েই সেখানে গিয়েছিলেন। যেমন ধরুন- রাস্তায় কোনো মেয়ে পা পিছলে পড়ে গেছে, আর আপনি তাকে ভালো উদ্দেশ্য নিয়েই টেনে তুলতে গেলেন। অমনি এমন কোনো মিথ্যা অপবাদ অথবা অন্য কোনো ঝামেলায় আপনি পরে যেতে পারেন।

এই সমাজ সংসারে যারা অপরের উপকার কম করে তারাই দেখি বেশি ভালো থাকে। আবার উপকার করার আগেও ভাবতে হবে আপনাকে। কিছু কিছু উপকার আছে যেগুলো করতে এগিয়ে যেতে নাই। কিছু কিছু মানুষ আছে যাদের উপকার করতে গেলে তারা শত্রু মনে করবে আপনাকে। মনে করবে আপনি তাদের ক্ষতি করতে এসেছেন। তাই এ ধরণের উপকারের কি দরকার আছে?

তারপরেও আপনার দায়িত্ব কাজ আপনি করে যাবেন। কে কি ভাবলো, কে কি বললো সেটা চিন্তা না করে আপনি ভালো কাজ করে যান। কেউ আপনার মূল্যায়ণ না করলেও মহান আল্লাহ তা করবে। আবার দুনিয়ায়ও আপনি কোনো একজন ভালো মানুষের মূল্যায়ণ পেতেও পারেন।