ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

ছোট বেলায় দেখেছি অনেকেই অকারণে একটা ফুটফুটে দুরন্ত কুকুর ছানার গায়ে ঢেলে দিচ্ছে গনগনে গরম পানি। কুকুর ছানার আর্তনাদ ও দগদগে ঘা নিয়ে অনন্ত কাল ঘুরে বেড়াতে দেখাতেই বুঝি ওদের তৃপ্তি! আমাদের সমাজেরই শিশু কিশোররা স্কিৎজোফ্রেনিক মানুষকে পেলে তাড়া করে বেড়ায়। যে মানুষটা রাস্তায় আপন মনে ঘুরে বেড়ায়, কাউকে কোন উপদ্রব ও করে না, তাকে তাড়িয়ে বেড়ানোর কারণ টা কি হতে পারে? ভেতরের মনস্তত্ত্বটা কি এই যে আমাদের অন্তর্গত প্রবৃত্তিতে অন্যকে তাড়িয়ে বেড়ানোর একটা অশ্লীল তাড়না রয়েছে, যেটা আমরা সব খানেই কাজে লাগাতে পারি না? তাই দুর্বল কাউকে পেলে ভেতরের পশুটা বেরিয়ে আসে?

কথাগুলো মনে পড়লো হিরো আলমকে নিয়ে ফেইসবুকে ঘটে যাওয়া কান্ডকারখানা দেখে। হিরো আলম কে, এর মধ্যেই প্রায় সবারই জানা হয়ে যাবার কথা। গত কয়েকদিন ফেইসবুক সয়লাব হয়ে গেছে হিরো আলম এর নানা ভিডিওর শেয়ার দিয়ে, সাথে আমাদের নানা রকমের বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য তো ফ্রি ছিলোই। যারা এখনও হিরো আলমকে চিনতে পারেননি তাদের জন্য একটি জাতীয় পত্রিকার এই (কে এই হিরো আলম?) খবরটি কাজে লাগবে। সাথে দেখে নিতে পারেন কয়েকটি মিউজিক ভিডিও যেখানে আলম মডেল হিসাবে কাজ করেছেন – ভিডিও ১;   ভিডিও ২

প্রতিভা সবার থাকবে না, প্রতিভা প্রত্যেকের থাকবার বস্তু নয়। শুধু তাই নয়, প্রতিভা উপলব্দি করার ক্ষমতাও সব মানুষের থাকে  না। কেউ কেউ না বুঝেই নিজেকে ভূলভাবে মূল্যায়ন করে ফেলে। সেটা ভীষণ বোকামি তা মানি, তবু  দোষের কিছু নিশ্চয়ই না। নিজের মনের একটা নির্দোষ ইচ্ছেকে নিজের গাঁটের টাকা খরচ করে বাস্তবে রূপ দিয়ে এতো বড় অপরাধ হয়ে গেছে আলম এর! তাঁকে আমরা ক্রমাগত চড়িয়ে চলছি বিদ্রুপের শূলে!

অথচ প্রকৃত দোষের দোষীকে শূলে চড়াচ্ছি কজন? তথাকথিত শিক্ষিত শিল্পী নামধারী কিছু মানুষ ও এর সাথে জড়িত মানুষ জেনে বুঝে শুধু মাত্র বাণিজ্যের ফন্দিতে মত্ত থেকে বিকৃত শিল্পের জন্ম দিয়ে থাকেন। এই বেনিয়াদের অনেকেই আবার প্রকৃতই শিল্পের জ্ঞানে সমৃদ্ধ। ঘৃণা হয় যখন এই জ্ঞান পাপীদের কাছ থেকেও সম্মৃদ্ধ আলোকিত শিল্পের পরিবর্তে বিকৃত শিল্প পাই। আবার এক সময়  দারুন সব শিল্প নির্মাণ করা গুণী মানুষরা বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের সৃষ্টির খোলসটুকু দক্ষতার সাথে বদল করে বাজারের দাঁড়িপাল্লায় চড়ে যা ইচ্ছে তাই করে খাচ্ছেন। তাদেরকে নিয়ে কেউ হাসি তামাশা করছি না কিন্তু! যারা জ্ঞানে ও গুণে পরিপূর্ণ থাকা সত্ত্বেও নিজ হাতে প্রতিবন্ধী শিল্পের জন্ম দিয়ে যাচ্ছেন তাদের নিয়ে লোক হাসছে না! হাসছে এমনি এক নাদান নালায়েককে নিয়ে যার এটাই বোঝার ক্ষমতা নেই যে – লোকে তাকে নিয়ে আদৌ হাসছে কিনা, বা কেন হাসছে।

ফেইসবুকে আলমের সাক্ষাৎকারের যে ভিডিওটি ‘ভাইরাল’ হয়ে উঠেছে, সেখানে প্রশ্নকর্তার বিদ্রুপাত্মক প্রশ্নের জবাবে হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে তার দেয়া সরল প্রত্যুত্তর, বাক্য ব্যবহার, বাচন ভঙ্গি, নিষ্পাপ হাসি সব মিলিয়ে তাঁকে আমার মনে হয়েছে একজন সরল, শিশুসুলভ মানুষ। আর তাঁর এই সারল্যের সুযোগ নিয়ে তাঁকে নানা রকম প্রশ্ন করে উপহাস-বিদ্রূপ করে যাচ্ছেন আমাদের মতো এক শহুরে ‘স্মার্ট’ মানুষ। ‘স্মার্ট’ উপস্থাপক সেটা করে যাচ্ছেন, কারণ তিনি আমাদের রুচি জানেন; জানেন এই ভিডিও দেখে লোকজন তার বর্বরতম অসভ্যতা নিয়ে সমালোচনা তো করবেই না, বরং ‘খাবে’ খুব। (পুরো সাক্ষাৎকার দেখুন)

হিরো আলমকে নিয়ে এই যে এত তোলপাড় তার কারণ নিশ্চয়ই হিরো আলমের নির্মিত ভিডিওচিত্রের অশ্লীলতা নয়; কারণটি মূলত তার অযোগ্যতা/অদক্ষতা ও সৌন্দর্যের অভাব। তোলপাড় দেখে কৌতূহলের বসে আমি নিজেও হিরো আলমের কিছু প্রোডাকশন দেখেছি। অশ্লীলতায় এর চেয়েও অনেক অনেক গুণে বেশি ও নির্মাণ শৈলীতে সম মানের অন্য কারো ভিডিও দিয়ে ইউটিউব কিন্তু সয়লাব হয়ে আছে, কিন্তু সেসব নিয়ে এত তোলপড় হয় না। যদি পাত্র-পাত্রী দেখতে মোটামুটিও হয় এবং আউটলুকে অতি সামান্য মাত্রার তথাকথিত স্মার্টনেস থাকে। যার কোনোটাই হিরো আলমের নেই। আর সেটাই হলো তাকে তাড়িয়ে বেড়ানোর প্রধান কারণ।

আলমকে নিয়ে যাবতীয় ঘটনায় দুঃখ পেয়েছি এটা দেখে যে, গ্রামের শেকড়ে বেড়ে ওঠা, উন্মুক্ত আলো বাতাসে গড়ে ওঠা সহজ-সরল প্রাণ মানুষটির ওই টুকু বোঝার ক্ষমতাটি পর্যন্ত নেই যে তাকে নিয়ে কী করা হচ্ছে! তিনি সানন্দে স্বচ্ছন্দে ‘বাঁশ খাওয়া’ সাক্ষাৎকারটি দিতে চলে এসেছেন। মাটির সঙ্গে গড়াগড়ি খেয়ে বেড়ে ওঠা প্রকৃত সরল প্রাণ মানুষটার উদার প্রশস্ত মনের পক্ষে এমন নীচ নির্মম উপহাস বোঝার কথাও তো না। সে জানে না নগর রাজ্যে মানুষকে আদর করে ডেকে এনে মিষ্টি হেসে মিস্টি কথায় কী করতে পারে! কী করে সে জানবে আমাদের এই নোংরা বীভৎস নাগরিক কদর্য আনন্দের রূপ!

এই পর্যায়ে আসুন শিরোনামের আরেকজন মানুষ, চিত্রনায়ক অনন্ত জলিলের কথা ভাবি। এই ভদ্রলোক যখন নিজে সিনেমা প্রযোজনা করে নিজেই সেই সিনেমার নায়ক হয়ে অভিনয় করতে শুরু করেন, তখন তাঁর অনেক কিছু, বিশেষ করে উচ্চারন আর বাচনভঙ্গি নিয়ে অনেক ফান করেছিল অনেকেই – ফেইসবুকে এখনও হরহামেশাই দেখা যায় তাঁর ছবি আর উক্তি দিয়ে তৈরী ট্রল। কিন্তু এটা কি কল্পণাও কেউ করতে পারি, অনন্তকে ডেকে এনে আলমের মতো একটা সাক্ষাৎকারের মোড়কে উপহাস আর বিদ্রূপ করে যাবে কোন ‘স্মার্ট’ উপস্থাপক?

কোনোভাবেই সম্ভব না, কারণ অনন্তর উচ্চারণ আর বাচনভঙ্গি নিয়ে আমরা পেছনে হাসাহাসি করতে পারি, কিন্তু এটাও জানি অনন্ত মোটেও সমাজের প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষ নন; তিনি শিল্পপতি, অনেক ধনী একজন মানুষ। এই আমাদেরই আবার আলমের ক্ষেত্রে ভীন্ন চরিত্র – আমাদের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপেরও একটা শ্রেণী চরিত্র আছে। যেমন আছে আমাদের চড়-থাপ্পড় দেয়ারও। আমার গন্তব্যে যেতে রাজি না হলে রিকশা চালককে আমরা যত সহজে চড় মারি, সিএনজি বা ক্যাব চালককে একই ‘অপরাধ’ এ চড় মারি না। বিদ্রুপের মতো আমাদের চড় মারার ও একটা শ্রেণী চরিত্র আছে। যে যতো বেশি প্রান্তিক শ্রেণীতে থাকবে, আমাদের যাবতীয় অসভ্যতা, বর্বরতার সাক্ষী সে ততো বেশি হবে।

এমন একটা রাষ্ট্রে, সমাজে আমাদের বসবাস যেখানে মানুষের নানা রকম প্রতিবন্ধীত্ব, অক্ষমতা নিয়ে আমরা হাসি। শিশুকাল থেকেই একটা শিশু একজন তোতলা মানুষের কথা শুনে হাসতে শেখে, খুব খাটো, মোটা, শুকনো, অসুন্দর মানুষকে নানা বিদ্রূপ করে মজা করতে শেখে, একজন স্কিৎজোফ্রেনিক মানুষকে ক্ষেপিয়ে আর তার কথা শুনে হাসে। সে এইসব ধারণা এই সমাজ থেকে পায়, মিডিয়া থেকে পায়। আমাদের অসংখ্য সিনেমাও দেখবো ওপরে উল্লেখ করা মানুষদেরকে নিয়ে ফান করে মানুষদেরকে হাসানোর চেষ্টা করা হয়।

আলমের ভিডিও নিয়ে এই মুহূর্তে যা হচ্ছে সেটা আমাদের সমাজের এই অন্ধকার দিকেরই এক নতুন সংযুক্তি। এই ধরণের মানসিকতাকে আমাদের ধিক্কার জানানো উচিৎ, পাশে দাঁড়ানো উচিৎ সেই প্রান্তিক মানুষটির পাশে; সেটা হয়তো একটা মানবিক সমাজ গড়ে তোলার পথে আমাদের কিছুটা হলেও এগিয়ে দেবে।

Facebook:  https://www.facebook.com/Ana.nasrin.7