ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

রাস্তায় বেরোলেই মানুষের মুখ দেখি, অভ্যাসটা অনেকদিনের। আমার মনে হয় মানুষের মুখ পাঠযোগ্য বিষয়গুলোর মধ্যে সবচাইতে রহস্যময়। সব বয়সের সব ক্লাসের সব জেন্ডারের মানুষের মুখ আমি দেখি, আর বুঝতে চেষ্টা করি তাদের মনের অবস্থা – মানুষ কতটা সুখে আছে বা কষ্টে। বেশ কয়েক বছর আগে, যখন এটা দেখতে শুরু করি, তার সাথে আজকের বাংলাদেশের অনেক পার্থক্য – অনেক বেড়েছে রাষ্ট্রের সম্পদ, ব্যক্তির সম্পদ। আমরা এখন রীতিমত মধ্যম আয়ের দেশ হবার পথে। কিন্তু ক্রমাগত আর্থিক উন্নতি কি আমাদের সুখ/শান্তি আদৌ বাড়াতে পেরেছে?

জ্যাম এ পড়লেই এপাশ ওপাশ থেকে উফ আহ শব্দ শুনতে পাই। মনে হয় সবার মনে ভীষণ অবিরত অস্থিরতা চলছে। শুধু জ্যাম আর রোদ ঝড়েই না চমৎকার মেঘাচ্ছন্ন রোম্যান্টিক দিনেও দেখি মানুষের মুখে তীব্র বিরক্তি। হয়তো পরিচিত কারো সামনে গেলেই এই মানুষ গুলোর মুখ বদলে যায়, একটা সুখ সুখ ভাব করে রাখতে হয়। কিন্তু এই মানুষগুলোই আনমনে যখন রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় তখন তাদের মনটা লুকিয়ে ঘুরতে দেখি না। হৃদয় খুলে মুখের সামনে নিয়েই ঘুরতে দেখি। আমার কেন যেন মনে হয় সব মানুষ গুলোর হৃদয় ভাঙা। মুখ দেখলেই বোঝা যায় সে কোনো প্রত্যাশার অপূর্ণতায় ভুগছে।

রাস্তায় হেঁটে যাওয়া মানুষ, রিকশা-বাস-মোটরসাইকেলে চড়া মানুষ, সব প্রকার মানুষ দেখে মাত্র কয়েকটা জায়গা ছাড়া আমি সাধারণত কারো মুখে প্রশান্তি পাই না। এমন কি এসি গাড়িতে চড়ে যে ঘুরে বেড়াচ্ছে তারও না। সারাক্ষণ মুখে দুশ্চিন্তার চাপ। বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে আছে সবাই, কারণে অকারণে এখানে সেখানে এর তার সাথে ঝগড়া বাধিয়ে দিচ্ছে। অতি সামান্য কারণে বাসের কন্ডাক্টর বা রিকশাচালক কে চড় মেরে দিচ্ছে, চিৎকার চেঁচামেচি করছে। বাসের কন্ডাক্টর বেচারা ভিড় ঠেলে ভাড়া নিতে এসেছে, কিন্তু ভাড়া না দিয়ে তাকে আবার পরে আসতে বলছে! এই অদ্ভুত ঘটনাটিও দেখি প্রায়ই।

আসলে মানুষগুলো কোনোভাবে নিজে শান্তি পাচ্ছে না, তাই অবচেতনেই নিজের অশান্তি উগরে দিচ্ছে যেখানে সেখানে আর তৈরি করছে অন্যের অশান্তি, কষ্ট।

মানুশের অশান্তির মূলে রয়েছে তার প্রত্যাশার অপূর্ণতা। রোদ ঝড় বৃষ্টি যানজট সবই নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার, এ নিয়ে সারাক্ষণ বিরক্ত হতে হলে এদেশে জীবনযাপন যে তেজপাতা না হয়ে আর কোনো উপায় থাকে না সে তো সবাই জানে। তবু সর্ব অবস্থায় সবাই অসন্তোষ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রতিটা দিন, সারাটা বছর! এ আসলে পারিপার্শিক কারণে নয়, এটা বাহ্যিক কোনো ব্যাপার নয়। এটা আসলে তার নিজের মনের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ। মানুষগুলোর কিছু প্রত্যাশা পূরণ হয়নি হয়তো, সেই অসন্তোষ নিয়ে সারাটা জীবন সবাই ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথচ আরো কত প্রত্যাশা যে তার পূর্ণ হয়ে গেছে আরো কতগুলো প্রত্যাশা পূরণের স্বপ্নটা বুকে রয়ে গেছে তা নিয়ে কেউ তৃপ্ত নয়। অন্তত মুখ দেখে তা মনে হয় না।

তুলনামূলক তৃপ্তিময় কিছু মুখের সন্ধান আমি পাই গুটিকয়েক জায়গায়। তার মধ্যে আছে শপিংমল, রেস্টুরেন্ট, বিউটি পার্লার। সাধারণ কান্ডজ্ঞানেই বোঝা যায় এটা স্রেফ বাজার অর্থনীতির খেলা – অনেক ‘ভাড়াটে’ বিশেষজ্ঞকে দেখি মন খারাপের সময় মানুষকে শপিং ও সাজ সজ্জার পরামর্শ ও দিয়ে থাকেন! যদিও সুখের মূল তত্ত্বটি লুকিয়ে থাকে অন্য কোথাও। আর একটু প্রশান্ত মুখ আমি দেখি যখন কোনো ইয়াং কাপলকে ডেইটিংরত অবস্থায় দেখা যায়। আবার এদেরই মুখ কখনো মলিনও দেখি, হয়তো তাদের একে অপরের কাছে প্রত্যাশাটি পূরণ হয় নি। কেননা অসুখ অশান্তি অস্বস্তি অতৃপ্তি সব কিছুর কারণ ই তো প্রত্যাশা।

এই ‘প্রত্যাশা’ বিষয়টি এমন অদ্ভুত চরিত্রের কেন হয়! তার যত টুকু পূর্ণ হয়, ততটুকু ক্ষনিকেই মিলিয়ে যায়; আর যত টুকু অপূর্ণ থাকে কেবল ততটুকুই দীর্ঘ কাল ধরে রয়ে যায়! কেননা মানুষ যখন কোনো কিছু প্রত্যাশা করে তখন সে নিজেকে তার প্রাপ্য দাবিদার মনে করে, দাবিদার মনে করে বলেই সেটা পাওয়ার পর কিছুক্ষণ বাদেই তা ভুলে যায়। আর সেই দাবিদারিত্বের বোধটার জন্যই যখন কোনো প্রত্যাশা পূরণ হয় না, তখনই সে নিজেকে বঞ্চিত মনে করে। অথচ এই একই যুক্তিতে সেই বঞ্চিত মানুষটিই কাউকে না কাউকে নিশ্চয়ই বঞ্চিতও করে থাকে। নিশ্চয়ই সবার সব প্রত্যাশা পূরণ করা তার পক্ষেও সম্ভব হয়নি যারা তার কাছেও নিজেদের কিছু প্রত্যাশা পূরণের দাবিদার। এই যুক্তির ভিত্তিতে মানুষের মুখে বিরক্তির মত কিছু সময় অপরাধ বোধেরও তো ছাপ পড়ার কথা। কিন্তু রাস্তা ভরা মানুষগুলো সব মুখে বিরক্তি নিয়েই ঘুরে বেড়াচ্ছে, কারও মুখে কোনো অপরাধ বা অনুশোচনার ছাপ দেখি না! কেননা তারা নিজেদের কোন কোন প্রত্যাশা পূরণ হয়নি কেবল তাই নিয়ে ব্যস্ত, অন্যের কোন কোন প্রত্যাশা তিনি নিছক অবহেলায় অপূর্ণ রেখেছেন তা ভাববার সময় এবং মানসিকতা কারো নেই তো!

যদিও ভাবলেও খুব বেশি কিছু যে হয়ে যেত তা নয়। কারো সব প্রত্যাশা কখনোই কারো পক্ষে পূর্ণ করা সম্ভবও নয়। আবার কিছু প্রত্যাশা থাকে যা অন্য কারো ওপরও নয়, নিজের কাছেই নিজের। কিছু প্রত্যাশা থাকে কেবল পরিস্থিতির ওপর। যে পরিস্থিতিকে প্রচলিত ভাষায় সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য বলা হয়। সে যেমন প্রত্যাশায় হোক না কেন এই “প্রত্যাশা” নামের চোরাবালিটার ফাঁদে যে একবার পা দিয়েছে তার আর ডুবে না মরে উপায় থাকে না। কেননা প্রত্যাশার কোনো শেষ নেই। একটি প্রত্যাশা পূরণ হওয়া মাত্রই আরেকটি প্রত্যাশা। কিছু কিছু প্রত্যাশা এমন হয় যে মানুষ ভাবে এটিই তার সুখের চাবি কাঠি, এটি পূরণ হলেই সে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষটিতে রূপান্তরিত হবে। কিন্তু সুখী ততক্ষণ আর হতে পারে না যতক্ষণ সে প্রত্যাশার পেছনে ধাওয়া করতে থাকে। কিছুদিন আগে যে ব্যক্তির মনে হয়েছিল কনোরকম নিজের একটি ফ্ল্যাট আর একটি যেনতেন রকম নিজের একটি গাড়ি হলেই সে সুখি হতে পারবে। আজকে তার বিলাসবহুল কয়েকটি ফ্ল্যাট অনেক নামি দামি ব্র্যান্ড এর গাড়ি থাকার পরও সে সুখি না। আজ তার মনে হচ্ছে তার দামি গাড়িটিকেও তো রাস্তার যানজট অতিক্রম করেই পার হতে হয়। যদি তার জন্য প্রাইম মিনিস্টারের মত রাস্তা ফাঁকা করে দেয়া হত তাহলে সে শান্তি পেত।

সুখ শান্তি আসলে এরকম কোনো ব্যাপার নয় যে ধাওয়া করে পাওয়া সম্ভব। ক্রমাগত প্রত্যাশা করা আর সেটা পূর্ন করার জন্য দৌড়ে বেড়ানো যে সুখী করে না এটা অতি প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ জানতো। তাই কী করলে আসলে সুখী হওয়া যাবে, সেটা নিশ্চয়ই স্পষ্ট আমাদের কাছে; ইচ্ছে হলে একটু দেখে নিতে পারি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম দার্শনিকদের পরামর্শগুলোও – সুখ নিয়ে যা বলেছেন ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ১২ দার্শনিক

Facebook: https://www.facebook.com/Ana.nasrin.7