ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

একেবারে মোক্ষ/নির্বাণ লাভ করা মানুষ ছাড়া কোন মানুষ সম্ভবত নেই, যে কখনো কখনো নিজের সীমাবদ্ধতা নিয়ে হা-হুতাশ করেনি। জীবনের নানা পরিস্থিতিতে কখনো প্রজাতি হিসাবে আমাদের সীমাবদ্ধতা, আবার কখনো ব্যক্তি হিসাবে আমাদের সীমাবদ্ধতা আমাদের হতাশ করে, কষ্ট দেয়। সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠতে না পারার অনিবার্য ফলরূপে তৈরি হয় ফ্যান্টাসী – সীমাবদ্ধতাহীন জীবনের। কিন্তু সীমাবদ্ধতাহীন জীবনই কি আমাদের অনির্বচনীয় সুখের উৎস হতে পারতো? না; এ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য, এজন্যই সৃষ্টি হয় “নদীর এপার কহে………..সকলি ওপারে” এর মত অমর কণিকা।

একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যায় সীমাবদ্ধতার কারণেই মানুষ অনেক ক্ষেত্রে সুখী হয়। জীবন স্বল্প মেয়াদী বলেই জীবনকে মানুষ উপলব্ধি করে। আবার আকস্মিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে মৃত মানুষটি মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত হেসে খেলে আনন্দে মেতে থেকে পরের মুহূর্তে হুট করে মরে যায়। মৃত্যুর খবরটি আগে ভাগে জানতে না পারে সেই মানুষটি সুখী ছিল।

এমন অনেক কিছুই আছে যা আমাদের কোন জাদুবলে জেনে ফেলতে ইচ্ছে করে; এর কিছু কিছু হয়তো ভয়ঙ্কর অনধিকার চর্চাও। এক পরিচিত মেয়ে একদিন আমাকে বললো “আমি যদি অলৌকিকভাবে এমন একটা ক্ষমতা পেয়ে যেতাম যে আমার বয়ফ্রেন্ড কোথায় যাচ্ছে, কী করেছে, সাথে না থেকেও সব দেখতে পারতাম! জানতে পারতাম আমি যতটা বিশ্বাস করি সে ততোটা বিশ্বাসের যোগ্য কিনা। কত জন যে বিশ্বাস করে ঠকছে, তাহলে আমাকে অন্তত ঠকতে হতো না”। মেয়েটি বুঝতেও পারেনি, মনে মনে সে কী ভীষণ অভিশাপ এর ফ্যান্টাসি করছে!

মানুষ বিশ্বাস করে প্রতারিত হয় তা ঠিক, কিন্তু সেই ভুল জানার সময়টুকু যে সুখটুকু দেয়, কোন জাদুবলে প্রিয়জনের সব পদচারনা জানতে পারলে সেই সুখটুকু আবার হারাতাম। এই যে চারপাশ জুড়ে কত শুভাকাঙ্ক্ষী গুণগ্রাহী বন্ধু, ওই অলৌকিকতাটার বলে যদি জানতাম সামনে যে মানুষ গুলো এত ভালো ভালো কথা বলে আড়ালে-আবডালে তাদের অনেকেই নিন্দার বুলি আওড়াচ্ছে, তবে সেই মানুষগুলোকে আপন ভাবার যে সুখ তা কি আর পেতাম?

কত সন্তান স্বাবলম্বী হয়ে বাবা-মা, ভাই-বোনদের খোঁজ রাখে না, অথচ এই সন্তানগুলোই কোনো এক সময় ঘরটাকে মাতিয়ে রেখেছিল। মা-বাবা, ভাই-বোনদের সাথে বন্ধনটা ছিল এমন যা আপাতদৃষ্টিতে অবিচ্ছেদ্য। সেজন্যই এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি চারপাশে দেখেও প্রত্যেকটি পরিবার মনে করে – তাদের পরিবারটি হবে ব্যতিক্রম। সব পরিবারের ভাবনাটি এমনই, তারপরও অনেক পরিবারের ক্ষেত্রেই এমন হয় না। আগেভাগেই সব জেনে যেতে পারলে ওই যে অনেকগুলো বছর আস্থা ও বন্ধনের আত্মতৃপ্তিটা ছিল সেটা হারাতে হতো।

পৃথিবীতে অনেক মন্দের পেছনেই কিছু ভালো লুকিয়ে থাকে। এই যে মানুষ নিজের দৃষ্টি সীমানার বাইরে কিছু জানতে পারছে না, ভবিষ্যৎ জানতে পারছে না – মানুষের এই সীমাবদ্ধতাটা থাকা ভীষণ জরুরি ছিল।

সীমাবদ্ধতাও অনেক প্রকার, এই যে যা ইচ্ছে তাই আমরা পেয়ে যাই না, দু’জন মানুষের মধ্যে মতের অমিল হলে আমরা জাদু দিয়ে কারো মত ঘুরিয়ে দিতে পারি না, এটাই আমাদের সীমাবদ্ধতা। আমাদের অনেক যুক্তি-তর্ক দিয়ে, অনেক বাক্য ব্যয় করে তবে অন্যের মত পরিবর্তনের চেষ্টাটা করতে হয়। সে জন্যই আমাদের কাছে অন্যের মতের একটা দাম আছে।

পৃথিবীতে প্রায় সব কিছুই অর্জনযোগ্য। একটা ভালো চাকরি পেতে সারা জীবন পড়াশোনা করতে হয়, পরিশ্রম করতে হয়। যে কোনো প্রাপ্তির পেছনের শ্রমটা যতো হয়, প্রাপ্তিটাও ততোটাই আনন্দের হয়। ঘরে বসে অনলাইন শপিং এর চেয়ে দশ দোকান ঘুরে দশটা পণ্য দেখে দরাদরি করে কেনাকাটার মজাই আলাদা। ঠকা-জেতার একটা চ্যালেঞ্জ থাকে, জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই চ্যালেঞ্জটা থাকে। এটাও মানুষের একটা সীমাবদ্ধতা। মানুষ সব সময় জিততে চায়, সচেতন থাকে। তবু মানুষ ঠকে যায়, নানাদিকে নানাভাবে ঠকে যায়।

জাপানীদের কাছে কাঁচা পটকা মাছ এক দারুণ সুস্বাদু কিন্তু দুর্মূল্য খাবার। মজার ব্যাপার, এই অতি বিখ্যাত খাবারটি সম্রাটের জন্য নিষিদ্ধ, কারণ এটার বিষাক্ততা। পটকা মাছ বিষমুক্ত করে পরিবেশন করার জন্য যোগ্য হতে ৭ থেকে ১০ বছর প্রশিক্ষণ নিতে হয়। কিন্তু তারপরও প্রতি বছর ৩/৪ জন মানুষ এই খাবারের বিষক্রিয়ায় মারা যায়, অসুস্থ হয় অনেকেই। কিছুদিন আগে বিজ্ঞানীরা বিষমুক্ত পটকা মাছের চাষপদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, যার স্বাদ বিষাক্ত সামুদ্রিক পটকার মতোই। কিন্তু অবিশ্বাস্য সত্য হলো, এই ঝুঁকিমুক্ত পটকা মানুষ খায় না। মানে হলো, শুধু স্বাদই না, বাঁচা-মরার দোলাচলে থেকে বেঁচে যাবার থ্রিলটাও চায় পটকা মাছ খাওয়া ওই মানুষগুলো।

জীবনের পদে পদে মানুষকে নিতে হয় হার-জিতের চ্যালেঞ্জ। যেখনে চ্যালেঞ্জ যতো বেশি সেখানে জিতে যাওয়ার আনন্দটাও হয় ততোটাই বেশি। কিন্তু সব চ্যালেঞ্জ আমরা জিতবো না, এটা আমাদের সীমাবদ্ধতা। প্রজাতি হিসাবে আমাদের সীমাবদ্ধতাগুলো মেনে নিয়ে, ব্যক্তি হিসাবে আমাদের সীমাবদ্ধতাগুলোকে অতিক্রম করার চেষ্টা করে জীবনে এগিয়ে যাই আমরা, জীবনটাকে যতদূর সম্ভব সুন্দর করে তুলি।

Facebook: https://www.facebook.com/Ana.nasrin.7