ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

রাজা রাজকীয় পোশাকই পরবেন, এটাই তো স্বাভাবিক, কিন্তু এটা নিয়ে আমাদের দেশের মূলধারার মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়াও বেশ ‘গরম’ এই মুহূর্তে। হ্যাঁ, ময়মনসিংহ জেলার সদ্য-সাবেক জেলা প্রশাসক মোস্তাকিম বিল্লাহ ফারুকি’র ‘রাজকীয়’ বিদায়ের কথা বলছিলাম।

প্রায় আক্ষরিক অর্থেই তাঁকে রাজকীয়ভাবে বিদায় জানানো হয়েছে। পত্রিকার খবরে জানা যায়, তার বিদায় উপলক্ষে ৩ সেপ্টেম্বর থেকে  ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৩টি উপজেলা প্রশাসন, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রায় ৩৫টি সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। অনেক আয়োজনই ছিল ব্যয়বহুল। কোনটিতে ঘোড়ার পিঠে চড়েন মোস্তাকিম বিল্লাহ। ছিল ব্যান্ডপার্টি। মঞ্চে উঠেছেন রাজার পোশাক পরে। উপহার হিসেবে পেয়েছেন সোনার কোটপিনও। (বিস্তারিত পড়ুন)

এইসব কিছুর মধ্যে নাটক-সিনেমায় দেখা রাজার পোশাক পরা একটা ছবি সম্ভবতঃ সবাইকে খুব বেশি ক্ষুব্ধ করেছে। বিষয়টা আমাকে বেশ অবাকই করেছে। জেলা প্রশাসক (ডিসি) দেরকে কি আমরা রাজা হিসাবে মেনে নেইনি? পরবর্তী আলোচনায় যাবার আগে একটু চোখ বুলিয়ে নেই, জেলা পর্যায়ে একজন ডিসি’র কী কী ক্ষমতা আছে – জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব ও কার্যাবলী। অন্তত ৬২ টি সেক্টরে একজন ডিসি’র আছে নানাবিধ ক্ষমতা। দেশে আমাদের বসবাস, যেখানে কোন লিখিত ক্ষমতা না থাকলেও অলিখিত ক্ষমতার জোরে বহু মানুষ সমাজ ভয়ঙ্কর দাপট দেখিয়ে বেড়ায়। আর যে ব্যক্তির লিখিত ক্ষমতাই এমন, তার অলিখিত ক্ষমতাসহ তার দাপট কেমন হতে পারে সেটা কি অনুমেয় নয়?

গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, আমরা কি রাষ্ট্র পরিচালনায় এমন একটা ব্যবস্থাই চেয়েছিলাম? মোটেও না – যেহেতু আমাদের দেশ একটা এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র, আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম প্রশাসনের সকল স্তরে নির্বাচিত ব্যক্তিদের স্থানীয় সরকার দ্বারা মূলতঃ আমাদের রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। আসুন দেখা যাক আমাদের সংবিধান এই প্রসঙ্গে কী বলে।

স্থানীয় সরকারকে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশ সংবিধানে এ সম্পর্কে অনুচ্ছেদ ১১, ৫৯, ৬০ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ১১-তে প্রশাসনের সকল পর্যায়ে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণের ওপর জোর দেয়া হয়েছে।

সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান’ করার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। ‘প্রশাসন ও সরকারী কর্মচারীদের কার্য’ পরিচালনা, ‘জনশৃঙখলা রক্ষা’, ‘পাবলিক সার্ভিস’ বা জনকল্যাণমূলক সেবা ও ‘অর্থনৈতিক উন্নয়ন-সম্পর্কিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন’ স্থানীয় শাসনের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ সংবিধান স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ওপরই স্থানীয় পর্যায়ের প্রশাসন পরিচালনা থেকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কিত সকল কার্যক্রম, তথা, ‘স্থানীয় শাসন’ পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেছে।

অনুচ্ছেদ ৬০-এ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে স্থানীয় প্রয়োজনে কর আরোপসহ বাজেট প্রস্তুতকরণ ও নিজস্ব তহবিল রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষমতা প্রদান করেছে। তবে সংসদ আইনের দ্বারা অন্যান্য ক্ষমতা এবং দায়িত্বও স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠার ওপর অর্পণ করতে পারে। কেউ আগ্রহী হলে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে বিস্তারিত পড়ে নিতে পারেন – এখানে

এই দেশের জন্মের পর থেকে নানা হিসেব-নিকেশের কারণে কোন সরকারই স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করা দূরেই থাকুক, সেটাকে ক্রমাগত দুর্বল করে গেছে। এর অনিবার্য ফল হয়েছে আমলা নির্ভরতা, আর আমলাতন্ত্রের অসীম ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠা – তাই জেলায় আমরা আজ একজন প্রশাসক পাই না, দেখি একজন সাক্ষাৎ রাজাকে, বর্তমান ক্ষমতায় যার যার চলছে না, যিনি আবারও ফিরে পেতে চাইছেন ফৌজদারি বিচারিক ক্ষমতা (দেখুন), যদিও আমাদের একটি ‘স্বাধীন’ বিচারবিভাগ আছে।

এর বর্তমানে বাংলাদেশে এমন সরকার অধিষ্ঠিত, যে সরকার আইনগতভাবে বৈধ হলেও, নৈতিকভাবে অবৈধ। এমন সরকার স্বাভাবিকভাবেই অতিরিক্ত আমলাতন্ত্র নির্ভর হয়ে পড়ে। তাই প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা, এসব ডিসিরা আমাদের সামনে রাজার পোশাক পরে অহমিকা নিয়ে ছবির পোজ দেন; আর যারা সেটা করেন না, মনের দিক থেকেও তারা একই মানসিকতার।

আর আমরা, দেশের সাধারণ নাগরিকরাও তো এসব মেনেই নিয়েছি। সেটা না হলে তো আমরা সমাজের সকল স্তর থেকে স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করার দাবী তুলে যেতাম শক্তভাবে। সেটা যেহেতু করছি না, ডিসি’র বিদায়ে রাজকীয় পোশাক পরা নিয়ে এতো পিত্তি জ্বালিয়ে লাভ কী? বরং এটা চাই আমরা, রাজা রাজার মতোই থাকুন – অফিসে, বাসায় সব জায়গায়।

কেউ কখনো কোন কাজে ডিসি’র অফিসে ঢুকলে দেখবো মোস্তাকিম বিল্লাহ’র বহুল আলোচিত ছবির মতো একজন মানুষ রাজকীয় পোশাক, মুকুট পরে, পাইক-পেয়াদা পরিবেষ্টিত হয়ে বসে আছে একটা সিংহাসনে। আমরা ঢুকেই কুর্নিশ করে, করজোড়ে অতি বিনয়ের সাথে আমাদের আর্জি পেশ করবো। এখনও পরিস্থিতি একই, শুধু একটা তথাকথিত প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একটা মুখোশ আছে। আসুন ওই মুখোশটা ফেলে দেই।

 

Facebook: https://www.facebook.com/Ana.nasrin.7