ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

মানুষ বিশ্বাস করে পৃথিবীতে প্রত্যেকটা কাজের মতোই মানুষের আবেগ অনুভূতি ভিত্তিক প্রায় সব আচার আচরণেও কোনো না কোনো কারণ থাকে। রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা, বিদ্বেষ, ঈর্ষা, সুখ, দুঃখ, আশা, হতাশা এই সব অনুভূতিরই মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কোনো না কোনো কারণ অবশ্যই থাকে। শুধু যে আবেগটার শত ভাগ কারণের প্রমাণ মেলে না তার নাম ভালোবাসা।

ভালোবাসা পৃথিবীর সব চেয়ে রহস্যময় বিষয়গুলোর একটি। কাউকে ঘৃণা করতে কোন না কোন কারণ অবশ্যই থাকতে হয়। কাউকে ভালোবাসায় অনেক সময়ই কোন কারণ থাকে না। তবে সেই ক্ষেত্রে মানুষ নিজের মনে কোন কারণ খুঁজে নেয়। রবীন্দ্রনাথ তার ছোট গল্প সমাপ্তিতে লিখেছিলেন যখন মানুষ কোনো কিছু মেনে নিতে চায় তখন সেটা মেনে নেয়ার জন্য নিজেই কোনো যুক্তি খুঁজে নেয়। কিন্তু সেই যুক্তিটাই আসলে সেটা মেনে নেয়ার প্রধান বা অপ্রধান কোনো কারণই না। মেনে নেয়ার কারণ হল তার মন সেটা মেনে নিতে চায়। পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় বস্তু গুলোর আরেকটি হল ‘মন’।

মন নামের বস্তুটা যে কখন কী চায়, বা চায় না, কাকে ভালোবাসে বা বাসে না, তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। রাস্তায় অহরহ খুব সুন্দর একটা মেয়ের সাথে অদ্ভুত দেখতে একটা ছেলের সাথে অন্তরঙ্গ ভাবে চলতে দেখে কখনো কখনো কারো মনে প্রশ্ন জাগে “এইটা কী দেখলাম!”। অথচ এই মেয়েটিই যে কত কত সুদর্শন যুবকের প্রেমে সাড়া না দিয়ে, কত যোগ্য ‘রাজপুত্র’কে প্রত্যাখ্যান করে এই ছেলেটিকেই বেছে নিয়েছিল তা পরিচিতজনেরা হয়তো জানে; পাছে নিন্দাও হয়তো করে। মেয়েটি কিন্তু সব্বাইকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ওই ছেলেটিকেই বেছে নিয়েছে। কারণটা সে নিজেও হয়তো জানে না স্পষ্টভাবে।

পরিচিত অসাধারণ যোগ্য ও সুদর্শন একটা ছেলের সাথে তার তুলনায় কিছুই না টাইপ একটা মেয়ের বিয়ে হতে দেখে অনেকেই বলে বসে “কীসের সাথে কী, পান্তা ভাতে ঘি”। অথচ এই ছেলেটি চাইলে হয়তো সুন্দরীকন্যার কোনও অভাব হত না। বহু ‘রাজকন্যা’র পিতাই হয়তো তাকে অর্ধেক রাজত্বসহ ‘রাজকন্যা’ তুলে দিতে চেয়েছিল। সেসব প্রলোভনকে পায়ে দলে কেন এই মেয়েটার হাত তার ধরতে ইচ্ছে করলো সেই কারণটা সে জানে না। হাতটা ধরে রাখতে যে না জানা কারণ, যে অদৃশ্য দুর্বার শক্তিটা তাকে ঠেলে দিয়েছিল ঠিক এই শক্তিটারই নামই ভালোবাসা।

হ্যাঁ, অনেক সময়ই ভালোবাসার মানে কিন্তু পান্তা ভাতে ঘি। ভালোবাসা কখনো তুলনা করে পাল্লা পাথরে মেপে কারণ খুঁজে-বুঝে-জেনে হয় না। কারণ জেনে যেটা হয় সেটার নাম অন্য অনেক কিছুই দেয়া যেতে পারে তবে ভালোবাসা নয়। আমাদের সমাজে বা সব সমাজেই এই অন্য কিছুও হয় না যে তা না। বরং বেশি ই হয়। আগের কালে হিসেব-নিকেশ করে অংক কষে যেমন সেটেলড ম্যারেজ হতো, এখন প্রণয়ের সম্পর্কগুলোও অহরহ হয় সেরকম একটা হিসেব-নিকেশ মনের ভেতর ঢেকে রেখে। সেই সম্পর্কটাকেও লোকে ভালোবাসাই নাম দিয়েছে। কিন্তু পার্থক্য হল কারণ খুঁজে যে ভালোবাসাটা হয় কখনো কারণটা হারিয়ে গেলে ভালোবাসাটা স্থানচ্যুত হয়ে যায়। আর যে ভালোবাসাটা কারণ জেনে হয় না সে ভালোবাসাটা টিকে থাকার কোনো কারণ খুঁজে না পেলেও টিকে থাকে।

মানুষটা একসময় খুব মিষ্টি করে কথা বলত, এখন আর বলে না। তবু সম্পর্কটা টিকে থাকে! মানুষটা একসময় সুন্দর ছিল, এখন হয়তো আর তেমন নেই। তবু টিকে থাকে। মানুষটা সারা জীবন সুখে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতিটা রাখে নি, বলতে গেলে কোনো প্রতিশ্রুতি ই রাখে নি। সেসব নিয়ে আর ভাবেই না, তবু টিকে থাকে! এখন আর হয়তো তাকে ভালোবাসতে ইচ্ছেও করে না, ঘৃণাই করতে ইচ্ছে করে, তবু টিকে থাকে। দূরে চলে যেতে ইচ্ছে করে, হয়তো চলে যেতেও হয়। তবু মনের মধ্যে কিছু যেন একটা টিকে থাকে, যা স্বস্তি দেয় না, ভুলতেও দেয় না। কোন না কোনো যুক্তি খুঁজে নিয়ে মানুষটার কাছে ফিরে যেতে, মানুষটাকে ফিরে পেতে ইচ্ছে করে। না চাইলেও মানুষটার জন্য কোন একটা অনুভূতি টিকে থাকে। এই টিকে থাকাটার নাম ভালোবাসা।

কারণবিহীন, প্রাপ্তিবিহীন একটা সম্পর্ক অনন্তকাল কেন টিকে থাকে, বা সম্পর্ক ফুরিয়ে গেলেও নাছোড় বান্দা অনুভূতিটা কেন টিকে থাকে, টিকিয়ে রাখতে না চাইলেও তা কিভাবে টিকে থাকে, কীসের ভিত্তিতে টিকে থাকে তা কেউ জানে না, হয়তো খোঁজেও না। খোঁজে একটা যুক্তি – আবেগটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য কোনো রকম একটা যুক্তি। কোন যুক্তি খুঁজে না পাওয়া যাক, তবুও টিকে থাকে! এই টিকে থাকার নাম ভালোবাসা; এই নাছোড়বান্দা অনুভূতিটার নাম ভালোবাসা।
Facebook: https://www.facebook.com/Ana.nasrin.7