ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

ঠিকই ধরেছেন, শিরোনামে কোপানোর কথাটা এসেছে কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া খাদিজার ওপরে হামলার ঘটনায় কারণে। আর বিবস্ত্র করে ক্যাম্পাস ঘোরানোর কথাটা এসেছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনা থেকে, যেটা খাদিজাঘটিত ডামাডোলে চাপা পড়েছে। অবশ্য ঘটনাটা খাদিজার ঘটনার মতো এতোটা মারাত্মকও না।

 

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক ছাত্রী হলের সামনে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন ছাত্রলীগ কর্মীর বাজে মন্তব্যের শিকার হয়। এটার প্রতিবাদ করে ছাত্রীটি, আর তাতে যে বচনামৃত বর্ষিত হয় সেটা এরকম “তোর দেমাগ বেশি। তোকে ক্যাম্পাসে বিবস্ত্র করবো। বিবস্ত্র করে ঝাল তুলবো, তোকে ক্যাম্পাসে পেটাবো। কারও কাছে কোনও অভিযোগ করলে গুম করে ফেলবো” (বিস্তারিত পড়ুন)। ঘটনাচক্রে খাদিজার ওপরে আক্রমণের মতো এখানেও জড়িত লোকজন ছাত্রলীগের, কিন্তু আমরা এই পর্যালোচনা এই নিবন্ধে অল্পই করবো।

 

প্রতিদিন আমাদের চারপাশে যা যা ঘটে এগুলো সব তো আসলে উপসর্গ, রোগ নয়। তাই আমরা যারা এক মুহূর্তের মধ্যেই এইসব অভিযুক্তের বিচার চাই, সেটা আসলে উপসর্গ কমানোর দাবী। এটা মানি, যে কোন রোগের চিকিৎসায় উপসর্গ কমানোর ঔষধও দরকার, কিন্তু মূল রোগ নির্মূলের ওষুধটাই হলো প্রধান ঔষধ।

 

খাদিজার জীবনে যা ঘটেছে, বা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীটি যার মুখোমুখি হয়েছে এসব আমাদের সমাজে আদৌ কোন অভাবনীয় ঘটনা নয়। প্রেম প্রস্তাবে প্রত্যাখ্যাত হয়ে খুন, এসিড নিক্ষেপ, নিদেনপক্ষে রাস্তায় উত্যক্ত করা আমাদের সমাজের নিত্যনৈমিত্যিক ব্যাপার। একটা বিশেষ অর্থনৈতিক শ্রেণীতে যৌতুকের দাবিতে নারীর ওপর নির্যাতন, হত্যা প্রায় প্রতিদিনই ঘটে এই দেশে। আর ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে বিবাহিত নারীদের শতকরা ৮০ জনই কোনো না-কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হন এই একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশেও (বিস্তারিত পড়ুন)। আর প্রতি মাসে নানা কারণে অন্তত ১৬ জন নারী খুন হয়ে যান স্বামীর হাতে (বিস্তারিত পড়ুন)।

 

বেশ কিছুদিন আগে কিছু বান্ধবী আর কাজিন মিলে আড্ডা হচ্ছিল। আড্ডার এক পর্যায়ে নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য নিয়ে কথা হচ্ছিল। তখন একজন উদাহরণ দিয়ে বলছিল এমন একটি পরিবারের কথা, যেখানে নারীটি তার স্বামীর চাইতে অনেক ভালো একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড এর অধিকারী, করেনও খুব ভালো একটা চাকুরী। আসলে ওই পরিবারটি পরিচালিত হয় মূলত ওই নারীর উপার্জনেই; তার স্বামী এমনকি একটা চাকুরী নিয়মিতও করতে পারেন না, মাঝে মাঝেই বেকারই থাকেন। কিন্তু মজার ব্যাপার ওই পরিবারের যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ নিতেন কিন্তু স্বামী। এই পরিবারের কথা বলার উদ্দেশ্য হল এটা শুনে আমার এক চাচাতো বোন এর একটা ব্যাঙ্গোক্তি এখানে শেয়ার করা। সে বলেছিলো, “যাই হোক ভাই, পুরুষ মানুষ তো…..পদে বড়”।

 

কারণ আসলে সেটাই, আমাদের এই চরম পুরুষতান্ত্রিক সমাজে শুধু পুরুষ হবার কারণে একজন পুরুষ “পদে বড়” হয়ে যায় নারীর তুলণায়। তাই নারী পুরুষের প্রেম প্রত্যাখ্যান কেন করবে? প্রেমের সম্পর্ক থাকলে সেটাও কেন ভেঙে দেবে? আর পুরুষের ছুঁড়ে দেওয়া যে কোন মন্তব্য কেন সে হজম করবে না? এই ডিসকোর্স এ হালে ছাত্রলীগ এসেছে বেশ ভালোভাবেই, এটাও যৌক্তিক। এমনিতেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষমাত্রই ক্ষমতাশালী, এর সাথে যদি যুক্ত হয় অন্য কোন ক্ষমতা, আর্থিক বা রাজনৈতিক, সেটা তাকে স্বাভাবিকভাবেই আরো অনেক বেশি বেপরোয়া করে তোলে।

 

এটাই রোগ, যেটার উপসর্গ হিসাবে সমাজে নারীর ওপর নির্যাতন, নিষ্পেষণ ঘটে। আগেই বলেছি, কোন রোগ পুষে, সেটার চিকিৎসা না করে উপসর্গ নিয়ে কথা বলে, সেটাকে কমানোর চেষ্টা করে সেটা আদতে কোন টেকসই সমাধান দেবে, এই আশা করা ভীষণ বোকামি।

 

বিপদের ব্যাপার হলো, নানাক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অবদমন নারীকে প্রচণ্ড সংক্ষুব্ধ করে তুলছে। এককালে নারীদের পায়ের নিচে মাটি ছিল না বলে তারা পুরুষতন্ত্রের সবকিছু মেনে নিয়েছে বিনা বাক্যব্যয়ে, বিনা চ্যালেঞ্জে। আজ কিন্তু এর সেটা হয়ে উঠছে না। এতে সমাজ জুড়ে একটা অস্থিরতার আবহ ফুটে উঠছে। একদিকে পুরুষের অন্যায় অবদমন চলছে নারীর প্রতি, আবার একজন অবদমিত মানুষের প্রতিক্রিয়া সবসময় যৌক্তিক হবে বা থাকবে পরিমিতির মধ্যে এটা আশা করাও বোকামী। এর ফলাফল আমাদের সমাজের জন্য কোন বিচারেই ভালো না।

 

আমার কাছে খুব অবাক লাগে এটা দেখে, এই দু’টো জেন্ডার একটি অপরটিকে ছাড়া তো চলতে পারবে না, তাহলে এই সংঘাত করে লাভ কী, ক্ষতি ছাড়া? পুরুষ নারীকে ‘মেয়েমানুষ’ হিসাবে না দেখে একজন সম মর্যাদার মানুষের সম্মান দিলে লাভ নারীর তো বটেই পুরুষেরও – একটা সমাজের অর্ধেক মানুষ অবদমনমুক্ত জীবনযাপন করলে সেই সমাজ মুক্তভাবে শ্বাস নিতে পারে; সেই সমাজে বিশুদ্ধ রক্ত পরিসঞ্চালন হয়। জানি, সব ক্ষমতাশালীর ইগো অনেক বেশি হয়, কিন্তু ইগোলেস না হয়েও সেটাকে যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা সবার জন্য কল্যাণকর হবেই।
অনেকদিন আগের কথা না, এই দেশে সিনেমা তৈরি হয়েছে “মেয়েরাও মানুষ” নামে। এমন নামের সিনেমা স্পষ্টভাবেই আমাদের জানিয়ে দেয় এই সমাজে নারীর অবস্থান কোথায় ছিল সেই সময়। মানি, সেই সময়ের তুলণায় এই পরিস্থিতির কিছু উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমাদের মানসিকতার উন্নতি কি আরো দ্রুততর হবার কথা ছিল না?

 

এতোক্ষণ যা লিখলাম, জানি সবই বহুলশ্রুত কথা, নানাজন নানাভাবে বলেছে এর আগে। নিজের মতো করে আবার লিখলাম কারণ যেসব পরিস্থিতি, ঘটনা এসব কথা বলার প্রেক্ষাপট তৈরি করে সেসব তো ঘটেই চলেছে এই সমাজে। এটা সত্যি একটা পুরুষতান্ত্রিক পরিবারে, সমাজে জন্মে, বড় হয়ে একটা পুরুষ শিশুর জন্যও এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন, কিন্তু এটা হতেই হবে, এর কোন বিকল্প তো নেই আর।

পূর্ব প্রকাশিত: উইমেন চ্যাপ্টার

 

Facebook: https://www.facebook.com/Ana.nasrin.7