ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে বর্ধমান জেলায় (আবার কারও মতে বাঁকুড়ায়) ভৃগুরাম দাস নামে একজন পণ্ডিত ছিলেন। তিনি পাটীগণিতের অনেক জটিল সমস্যা শিশুদের জন্য সরলভাবে কবিতায় রচনা করেন। এই জন্য তিনি ‘শুভঙ্কর’ উপাধি লাভ করেছিলেন। এই পদ্ধতিতে শুভঙ্কর গণিতের মতো কঠিন বিষয়কে শিশুদের কাছে হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছিলেন, যেগুলো পরিচিতি লাভ করে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ নামে।

বোঝাই যাচ্ছে আদিতে এটার ব্যবহার পজিটিভ অর্থেই হতো, কিন্তু এরপর এটা নেগেটিভ অর্থে আমাদের প্রবচন হিসাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে, যার মানে কোনকিছুকে আপাতদৃষ্টিতে ভালো মনে হলেও তার মধ্যে প্রতারণাপূর্ণ বিষয় আছে।

না, প্রবচনের ঠিকুজি নির্ধারণ করা এই রচনার উদ্দেশ্য কোনভাবেই না। তবে এই প্রবচনটা মনে পড়লো সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনা প্রসঙ্গে। কোন সমাজে প্রচলিত প্রবচনগুলো সেই সমাজের চিন্তা-মূল্যবোধ সম্পর্কে একটা ধারণা দেয় আমাদের। আলোচিত প্রবচনটিও আমাদের দেশের নানা ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিকভাবে ব্যবহার করাই যায়; বিশেষ করে এই দেশের যে কোন সরকারের প্রায় সব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে।

দেশে বাল্যবিবাহের সংখ্যা সরকারের ভাবমূর্তিতে আঘাত হানছে, তাই সরকার এটাকে আমলে নিচ্ছে, এবং সেটাকে কমাতে চাইছে – এটুকু ভালোই হতো এই রাষ্ট্রের জন্য। এর জন্য মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি, প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা, আর সেটার কঠোর বাস্তবায়ন করাটা কার্যকরি হতে পারতো। কিন্তু কিছুদিন আগে সরকার সোজা পথে না গিয়ে গেলো ধূর্ত পথে – মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ থেকে ১৬ নামিয়ে আনলেই তো এক ধাক্কায় অনেক বাল্যবিবাহ কমে যায়!

স্বাভাবিকভাবেই তখন দেশের নানা ব্যক্তি, সংগঠন এই আইনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। এবং এই চাপের মুখে সরকার এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা থেকে পিছিয়ে আসে। দুইদিন আগে চূড়ান্ত হয় ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন’। এই আইনে মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮-ই রাখা হয়েছে, তবে আছে একটা নোংরা ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’। ওই আইনের নীচের ধারাটা পড়ে নিলেই স্পষ্ট হবে সেটা –

“এই আইনের অন্যান্য বিধানে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোনো বিশেষ প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারীর সর্বোত্তম স্বার্থে আদালতের নির্দেশনাক্রমে এবং মাতা-পিতার সম্মতিক্রমে বিধি দ্বারা নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণক্রমে বিবাহ সম্পাদিত হইলে উহা এই আইনের অধীন অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে না।”

পরবর্তী আলোচনার আগে আরেকটা ব্যাপার একটু দেখে নেয়া যাক। এই আইন প্রনয়ন করার আগে, নানা চাপের মুখে সরকার আরেকটা অবস্থান নিয়েছিলো। সেটা হলো, মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮-ই থাকবে, তবে বাবা-মা চাইলে ১৬ বছরেও মেয়ের বিয়ে দেয়া যাবে (বিস্তারিত পড়ুন)।  অর্থাৎ ওই ক্ষেত্রে মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স এর একটা নিম্নতম সীমা ছিল – ১৬ বছর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আইনে যা আছে, তাতে আক্ষরিক অর্থেই বাবা-মা দুগ্ধপোষ্য শিশুকেও বিয়ে দিতে পারেন। বাবা-মা চাইলে ১৬ বছরে বিয়ে হতে পারে জেনে আমরা যারা আঁতকে উঠেছিলাম, এবার তাদের অবস্থা কী হবে?

বাংলাদেশ “United Nations Convention on the Rights of the Child” এর অনুস্বাক্ষরকারী দেশ, অর্থাৎ আমরা মেনে নিয়েছি ১৮ বছরের কম বয়সের সব মানুষ শিশু। তাই আমরা যদি বিশেষ কোন পরিস্থিতিতেও ১৮ বছর বয়সের নীচে বিয়েকে আইনগত বৈধতা দেই, তাহলে তো আমরা শিশুকে বিয়ে দিচ্ছি। এই ক্ষেত্রে সেই মেয়ের বিবাহোত্তর যৌনতা কি ‘Statutory rape’ হবে না?

এ ক্ষেত্রেও আছে হাস্যকর স্ববিরোধিতা। ১৮ এর নিচে নারীকে আমরা শিশু বলছি, কিন্তু যৌন সম্পর্ক স্থাপনের জন্য সম্মতি প্রদানের ন্যূনতম বয়স, ‘Age of consent’ আমাদের দেশে মাত্র ১৪, যদিও পাশের দেশ ভারতে এই বয়স যৌক্তিকভাবেই ১৮ (বিস্তারিত পড়ুন)। আমাদের দেশের আইন মতো, আমরা একজন শিশুকে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের সম্মতি দেবার যোগ্য মনে করছি। আমাদের দেশের ‘Age of consent’ যে কোন বিচারেই অযৌক্তিক, আপত্তিকর, তাই আইন যাই বলুক, ১৮ এর নিচে বিয়ে হলে সেই বিবাহোত্তর যৌন সম্পর্ককে ‘Statutory rape’ বলাই যায়।

অথচ একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত ছিল বিয়ের জন্য ১৮ ও যথেষ্ট বয়স কিনা। ওই বয়সের একটা মেয়ে শারীরিকভাবে ম্যাচিওরড হয়, কিন্তু মানসিকভাবে? এক্ষেত্রে একটা খুবই কৌতূহলোদ্দীপক গবেষণা বলছে মানুষের শারীরিক-মানসিক সব দিক মিলিয়ে মানুষের এডাল্টহুড এর বয়স হওয়া উচিৎ ২৫ (বিস্তারিত পড়ুন)

শুধুমাত্র গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষা করার জন্য দেশের অসংখ্য মেয়েকে অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিয়ে দেবার পথ করে দিয়ে ভীষণ শারীরিক-মানসিক সঙ্কট সৃষ্টির পথ করে দিচ্ছি আমরা! যেখানে কঠোর কঠোর সব ধারা রেখে আইন করেও যথাযথ প্রয়োগের অভাবে এই দেশে কোন আইনের উদ্দেশ্য সফল হয় না, সেখানে নোংরা ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ রেখে এমন একটা আইন এই দেশে বাল্যবিবাহের মহোৎসবের সূচনা করবে। আমাদের চোখের সামনেই আমাদের শিশুরা ধর্ষিত হবে, বাবা-মা এর অনুমতির অজুহাতে।
পূর্ব প্রকাশিত: উইমেন চ্যাপ্টার
Facebook: https://www.facebook.com/Ana.nasrin.7