ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

বেশ ঘটা করে হকার উচ্ছেদ চলছে ঢাকায়। দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে নানা হাঙ্গামার খবর তো প্রতিদিনই আসছে পত্রিকায়। পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা চলছে পত্রিকায়, টিভির টক শো’তে এবং অবশ্যই ফেইসবুকে।

এর আগেও বহুবার দেখেছি, শহরের যাবতীয় সমস্যার জন্য হকার আর রিকশাচালকের ‘নন্দঘোষ’ বানানো হয়েছে। ঢাকার জ্যামের জন্য মূল দায়ী প্রাইভেট কার হলেও রিকশাকে ‘নন্দ ঘোষ’ বানিয়ে নানা রাস্তা থেকে তুলে দেয়া হয়েছে। আর হকারদের উচ্ছেদের গল্প তো নিয়মিত বিরতিতেই আমাদের সামনে আসে। আবার কিছুদিন পরই যথারীতি তারা ফুটপাতে বসে যান। সাধারণ কান্ডজ্ঞান বলে, অতি ক্ষমতাশালীদের সাথে আঁতাত থাকা ছাড়া হকারদের এভাবে ফিরে আসতে পারার কোন কারণ নেই। পত্রিকায়ও আমরা অনেক রিপোর্ট দেখেছি, সরকারি দল আর সরকারি বাহিনী পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করেই ফুটপাথে দোকান চালাতে হয়।

আমি নীতিগতভাবে কখনোই মনে করি না, ফুটপাথ হকারদের দখলে থাকা উচিত। এই শহরের একজন বাসিন্দা, বিশেষ করে একজন মেয়ে হিসাবে আমি দেখি কম দূরত্বে যেতে বা জ্যামে পড়ে সময় বাঁচাতে হাঁটতে যাওয়া কী ভয়ঙ্কর ঝক্কির ব্যাপার। তাই ফুটপাথের মূল কাজ, মানুষের হাঁটার জন্য এটাকে উন্মুক্ত করে দেয়াই উচিত। কিন্তু আমি এটাও কোনোভাবেই ভুলি না, রাস্তায় বেরুলে আমার একটা সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য যা করতে হচ্ছে তাতে অসংখ্য পরিবার তাদের জীবিকার অনিশ্চয়তায় পড়ছে – হকারদের ভাষায় তাদের ‘পেটে লাথি পড়েছে’। তাই যারা মনে করেন এভাবে হুট করে হকার উচ্ছেদ করা হকারদের ওপর অন্যায় হচ্ছে, আমি তাদের পক্ষে আছি। এই আলোচনা আর বাড়াচ্ছি না; আমার আলোচনার অন্যদিক আছে।

06_Hawker_Eviction_Gulistan_160117_0001

ঢাকায় ফুটপাথে মানুষের স্বাভাবিক চলাচলে হকারদের চাইতে মোটেও কম বাধা সৃষ্টি করে না মোটর সাইকেল চালকরা। রাস্তায় জ্যাম দূরে থাকুক সামান্য সিগন্যাল পড়লেই বাইকাররা ফুটপাথে উঠে পড়ে, আর পথচারীদের জন্য প্রচন্ড ঝামেলা তৈরি করে। সরে তাদের পথ ছেড়ে দিতে সামান্য দেরি হলেই বিচ্ছিরি কর্কশ হর্ণ বজায়। আমি এমনিতেও খেয়াল করেছি রাস্তায় অহেতুক বেশি হর্ণ বাজানোর প্রবণতা বাইকারদেরই। বাইকারদের নিয়মের মাথা খেয়ে ফুটপাথে উঠে যাওয়ার ঘটনা আকছারই ঘটে ট্রাফিক পুলিশের সামনে, কিন্তু এটা নিয়ে পুলিশের কোন বাধা/জরিমানা তো নেই-ই, ন্যূনতম বাধাও নেই।

এবার ধরে নেই আমাদের ‘নগর পিতা’রা এবার সত্যি সত্যি স্থায়ীভাবে হকার উচ্ছেদ করে ফেলতে পারলেন; এরপর আগের মতো হকাররা ফুটপাথে আর বসলেন না। তো ‘মুক্ত ফুটপাথ’ এর সুবিধা কি পাবে ফুটপাথের আসল মানুষ, পথচারীরা? আমি অন্তত সেটা বিশ্বাস করি না।

দু’দিন আগেই পল্টন এলাকা দিয়ে যাবার সময় দেখি হকারমুক্ত ফুটপাথ দিয়ে আরামে চলছে বহু মোটর সাইকেল। হকার উচ্ছেদের ফলাফল অন্তত এরা পেয়েছেন হাতেনাতে। এই দেশে একজনের উদ্দেশ্যে করা কাজের ফায়দা অনেক ক্ষেত্রেই আরেকজন নিয়ে নেয় বলেই আমাদের দেশে কথ্য প্রবচন আছে ‘লাভের গুড় পিঁপড়ায় খায়’। আমি মোটামুটি নিশ্চিত ‘মুক্ত ফুটপাথ’ এর লাভের গুড় খাবে মোটর সাইকেল চালক ‘পিঁপড়া’গণ।

সমস্যা হলো আমাদের চোটপাট চলে দুর্বল, ক্ষমতাহীনদের ওপর। তাই একদিন সরকার হকারদের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেও আমি নিশ্চিত বাইকারদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে না। তাই হকার উচ্ছেদ কার্যত একটা স্থায়ী মোটর সাইকেল ট্র্যাক তৈরি করায় কর্মকান্ডে পরিণত হচ্ছে।

হকার উচ্ছেদের পর আমরা যারা ফুটপাথে শান্তিতে চলাচলের স্বপ্ন দেখছি, আসুন তারা একটু মাটিতে নেমে আসি। সত্যিই যদি আমরা নির্বিঘ্নে ফুটপাথে চলাচল করতে চাই, তাহলে আরও বড় কাজ বাঁকি আছে – ফুটপাথে মোটর সাইকেল ওঠা বন্ধ করতে হবে। আর এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ শুরু করার এটাই সময়। করছি তো আমরা?

facebook: https://www.facebook.com/Ana.nasrin.7