ক্যাটেগরিঃ সুরের ভুবন

 

কুসুম সিকদারের ‘নেশা’ গানটি দর্শকদের মনে কতোটা নেশা ধরিয়েছে জানি না, তবে কারো কারো মনে যে জ্বালা ধরিয়েছে, এটা নিশ্চিত। সম্প্রতি কুসুম সিকদারের ‘নেশা’ গানটির বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি আইনে মামলার কথা বলছি। মামলাকারীর মতে এখানে যৌনতাকে উপজীব্য করা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন আসে যৌনতা কি অশ্লীল? যৌনতা যদি অশ্লীল হয় তাহলে আমরা তা আমাদের বাস্তব জীবন থেকে বর্জন করছি না কেন? আর যদি তা না হয় তাহলে যৌনতাকে শিল্পে নিষিদ্ধ করতে হবে কেন?

সমাজ ও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র এবং ইন্দ্রিয়ের প্রতিটি সূক্ষ্ম অনুভূতিই শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমে অঙ্কিত হয়ে থাকে, তবে শুধুমাত্র যৌন অনুভূতিকেই আমাদের সমাজে নিষিদ্ধ মনে করা হয়। অথচ অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে যৌনতা ইন্দ্রিয় ভিত্তিক অন্যান্য অনিভুতির মতোই একটি প্রবৃত্তিগত, স্বতঃস্ফূর্ত, স্বাভাবিক অনুভূতি, যা লুকিয়ে চুরিয়ে ধামা চাপা দিয়ে কখনো ভ্যানিশ করে ফেলা সম্ভব নয়। এমন কি যৌনতা কোনও অপরাধও নয়।

আমাদের লুকোছাপা দেখলে ধারনা হয় যে এটা মানব সমাজ বিবর্জিত ঘৃণ্য, নিন্দনীয় কোনও নারকীয় কার্যকলাপ!! আমাদের দেশে যৌনতাকে উপজীব্য করে বই লিখলে তার নিন্দা হয়(লেখক নারী হলে তো কথাই নেই), যৌনতাকে ভিত্তি করে গান করলে দাঁড়াতে হয় কাঠগড়ায়! অতীত থেকে জেনেছি অনেক চলচ্চিত্রের অনেক দৃশ্য যৌনতার দায়ে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ সেন্সর বোর্ডের কাজ হওয়া উচিত চলচ্চিত্রকে(পুরো বা আংশিক) বাতিল করা নয়, শুধুমাত্র বয়সের উপযোগিতা অনুযায়ী রেটিং করা। আমাদের সেন্সর বোর্ডের সদস্যদের ও এই ধরনের অশ্লীলতার অভিযোগকারী প্রতিবন্ধী লইয়ারদের এমন কি কখনো কখনো সরকারের পদক্ষেপ দেখলে মনে হয় এই দেশে সব নাবালকের বসবাস; নাগরিকদেরকে যৌনতার ধারণা থেকে দূরে সরিয়ে না রাখলে দেশ রসাতলে যাবে।

অথচ উন্নত বিশ্বে নাবালকদের জন্য পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে যৌনতার ধারণা দেয়া হয়। আমাদের দেশে নাবালক দূরে থাকুক, বয়স্কদের জন্যও যৌনতা একটি নিষিদ্ধ ব্যাপার। যে কারণে সেক্স এডুকেশন রিলেটেড কোনো ড্রামা আমাদের চ্যানেল এখনো পর্যন্ত এক্সেপ্ট করে না! যে কারণে আমাদের দেশে নাবালক দূরে থাক, যৌনতা সম্পর্কে অনেক প্রাপ্ত বয়স্করা পর্যন্ত স্পষ্ট ধারণা রাখে না, যা অত্যন্ত জরুরি। জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত কোনও একটা দিককে শিল্প বিবর্জিত করা শুধু শিল্পের জন্য নয় একটি জাতির জন্যও ভয়ংকর ক্ষতিকর।

প্রসঙ্গক্রমে আমার গান ‘মেয়েবেলা’র  কথা বলছি, যার বিষয়বস্তু হলো আমাদের সমাজের মেয়েদেরকে শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত যে যে প্রতিবন্ধকতা এবং নিগৃহের শিকার হতে হয়। এই ভিডিওতেও আমাকে কম্প্রোমাইজ করতে হয়েছে আমাদের ‘নাবালক’ চ্যানেল কর্তৃপক্ষের হীন মনোভাবের কারণে। বিষয়বস্তু অনুসারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পয়েন্ট হলো মেরাইটাল রেইপ। যে বিষয়টা নিয়ে খুব একটা আলোচনা এখনো আমাদের গণমাধ্যমে হয় না, আমাদের দেশের আইনে এটা কোনো অপরাধের স্বীকৃতি পায়নি। আমি বিশ্বাস করি, একটি সভ্য সমাজে পরিণত হবার জন্য মেরাইটাল রেইপের স্বীকৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমার ‘মেয়েবেলা’র ভিডিওটিতে একটি মেরাইটাল রেইপ সিন ছিল, তাও আকারে ইঙ্গিতে। ওই দৃশ্যটি আমি শেষ পর্যন্ত এডিট করে বাদ দিতে বাধ্য হয়েছি চ্যানেলের চাপে। কেননা তারা কোনো এডাল্ট সিন থাকলে অন এয়ার করতে রাজি না, তা যত গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন।

এই প্রসঙ্গে আরেকটি গল্প বলতে ইচ্ছে করছে, আমার এক ফিল্ম ডিরেক্টর বন্ধুর একটি নাটকের গল্প ছিল এমন – কয়েকটি ছেলে-মেয়ে নৌকায় করে কয়েক ঘন্টার জন্য হাওরে ঘোরার প্ল্যান করছে। ঘোরার আলোচনার সময় সেখানে নায়িকার মুখে একটি সংলাপ ছিল “আমরা তাহলে তখন বাথরুম করব কোথায়?” এই সংলাপটির কারণে প্রথম কাতারের একটি চ্যানেল এই নাটকটিকে বাতিল করেছিলো। যুক্তি হিসেবে বলেছে একটি মেয়ের মুখে বাথরুমের কথা শুনতে কেমন লাগে! গল্পটি শুনে আমার মনে প্রশ্ন এসেছিল ওই চ্যানেল কর্তৃপক্ষের ঘরের ফিমেইল পার্সনরা কি বাথরুম করে না?

এ ধরনের ইমম্যাচিওরড মেন্টালিটির কারণে আমরা আজকাল নাটকে সংলাপের মধ্যে এক প্রকার যান্ত্রিক শব্দ দিয়ে সেন্সরশিপ করতে দেখতে পাচ্ছি। এত সেন্সরের পরেও খুব বেশি রিয়ালিস্টিক সংলাপ আমরা ব্যবহার করতে পারি না। বাস্তব জীবনে বন্ধুর আড্ডায় যে ধরনের সংলাপ আসলে ব্যবহার হয় তার মধ্যে আমরা জানি যথেষ্ট পরিমাণ স্ল্যাং থাকে। সেগুলোকে শিথিল করে আমরা আমাদের নাটকের সংলাপকে বাস্তবতা বিবর্জিত করি।

শুধু যৌনতা নয় যেকোনো বাস্তবতাকে আমরা যদি শিল্প থেকে দূরে সরিয়ে রাখি তবে শিল্প দুর্বল হয়, কেননা শিল্প হবার কথা জীবনের আয়না। একটি দেশের শিল্পে সে দেশের পরিচয় পাওয়া যায়। আমাদের দেশের শিল্প অবলোকন করলে যে কারো ধারণা হবে আমরা যৌনতা বিবর্জিত কোনও অতিমানবের জাতি। এরকম রক্ষণশীল সমাজ শিল্পের জন্য হুমকি স্বরূপ। যৌনতার কারণে কোনও শিল্পকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো কোনো সভ্য জাতির কর্ম নয়। আর নিষিদ্ধ দাবির করার চেষ্টা তো রীতিমত বর্বরতা।

আলোচিত গানটির কথা, সুর, সঙ্গীতায়োজন বা ভিডিও চিত্র এসবের কোনও দিকের শিল্পমান সম্পর্কে যদি কেউ প্রশ্ন তোলে (যদিও “শিল্পমান” শব্দটিও অত্যন্ত আপেক্ষিক ও প্রমাণ অযোগ্য একটি শব্দ বা মতবাদ) সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। শিল্পের গুনগতমান নিয়ে ভিন্ন আরেকটি আলোচনা হতেই পারে। তবে আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু শিল্পমান নয়, কুসুম সিকদারও নয়। শিল্পের বিষয়বস্তু। আমার মতে প্রত্যেকটি বিষয় বস্তুকে ভিত্তি করে শিল্প হওয়া উচিৎ। প্রত্যেকটি বিষয়বস্তুকে শিল্পে স্থান না দেয়া শিল্পকে প্রতিবন্ধী করে রাখার অপচেষ্টা।

অফটপিক, অনুমান করি, গানটি কোনো পুরুষ যদি তৈরি করতো, গাইতো, গানের ভিডিওতে অভিনয় করতো, তাহলে সেটা নিয়ে এতটা উচ্চবাচ্য হতো না। আমরা মনে করতে পারবো, নারী বিষয়ে যে ধরনের লিখার জন্য তসলিমা নাসরিনকে জীবন বাঁচাতে এই দেশ ছাড়তে হয়েছিল, সেরকম বিষয়ে লিখার কারণে হুমায়ুন আজাদের কোনো সমস্যা হয়নি, দিব্যি ছিলেন তিনি। তিনি আক্রান্ত হয়েছিলেন মূলতঃ ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ বইয়ে জামাতের তীব্র বিরোধিতার জন্য।

প্রকাশিত: উইমেনচ্যাপ্টার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭