ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

কুকুরের মত গন্ধ শুঁকে শুঁকে ক’টা মিউজিশিয়ান খুঁজছি, খুঁজেই চলেছি। ফিমেইল মিউজিশিয়ান, বারুদের মত তুখোড় ক’টা মেয়ে চাইছি। উদ্দেশ্য একটা ব্যান্ড করব, যেখানে শুধু মেয়েরা থাকবে। মেয়েরাই লিখবে, মেয়েরা কম্পোজ করবে, গাইবে, মেয়েরাই সবকটা ইন্সট্রুমেন্ট বাজাবে। দেখিয়ে দেব মেয়েরা কোনো দিক দিয়েই আর পিছিয়ে নেই। তন্নতন্ন করে খুঁজেই চলেছি, যেমনি কাউকে পাচ্ছি অমনি তাকে নিয়ে বসছি, ছাই উড়িয়ে উড়িয়ে রত্ন খুঁজছি। কিন্তু ছাই বৈ রতন আর মিলছে না!!

অডিশনে বসে কান্না পাচ্ছে, কোয়ালিটি দেখে চাবকাতে ইচ্ছে করছে। এক ডাক দিলে পুরুষ মিউজিশিয়ান মুহূর্তেই একশ জন পাওয়া যাবে, আর তন্নতন্ন করে খুঁজেও তুখোড় দূরে থাক মোটামুটি মানের পাঁচটা মাত্র ফিমেইল মিউজিশিয়ান পাওয়া যাচ্ছে না!! কোথায় নাকি এগিয়ে যাচ্ছে মেয়েরা, কিন্তু সেটা কোথায়? গার্মেন্টস সেক্টরে? কিন্তু সেখানেই বা লিড দিচ্ছে কারা? মেয়েরা? তাও তো না। এই যে মেয়েদের মুখে এত বড় বড় নারীবাদী বুলি শুনি রোজ রোজ, সেটা কীসের ভিত্তিতে!!

না হয় বুঝতাম জীবন যৌবন উৎসর্গ করে আর সব বাদ দিয়ে অন্তত রান্নাটা শিখেছে মেয়েরা। আমার পুঁচকে ভাতিজিটাও কৌতুহল ভারাক্রান্ত হয়ে আমাকে প্রায়শই প্রশ্নবিদ্ধ করে এই বলে যে “মেয়েরা তো সব বাদ দিয়ে এত রান্না করে জীবন উৎসর্গ করে দেয়, কিন্তু বিশ্বের সব মাস্টার শেফ গুলোকেও তো দেখি পুরুষ!!” এই ভাবনা একটা শিশু হৃদয়কেও আহত করে যে ‘মেয়েদের প্রথম স্থান অধিকারের জায়গাটা তাহলে কোনটা?’

রাস্তার মোড়ে চায়ের দোকানে বসে সিটি বাজানো বখাটে ছেলেগুলোও তো দেখি রাস্তার মোড়ে বসে গিটারটা বেশ ভালোই বাজায়। আমি নিজে গিটারটা শিখেছি বলে জানি ওটুকুর জন্যও কতটা সাধনা লাগে, কত কাঠখড় পুড়িয়ে রাস্তার চায়ের দোকানের বখাটে ছেলেটার মত গিটার বাজানো যায়। ওটুকর জন্য কতখানি পরিশ্রম করতে হয় তা আমার জানা। সে জন্য ওই রাস্তার ছেলেটার জন্যও যেটুকু রেসপেক্ট কাজ করে, বাবা/স্বামী/বয়ফ্রেন্ডের পয়সায় মদ/সিগারেট খেয়ে বিউটি পার্লারে গিয়ে রূপের ঝলক লাগিয়ে ইন্ডিয়ান সিরিয়াল দেখতে দেখতে বৈষম্যের বুলি আউড়ে যে নারীগুলো নারীবাদী সাজে, কিন্তু নিজের কোয়ালিটি গেইন করার কোনো চেষ্টা করে না তাদের জন্য মন থেকে সেই রেসপেক্টটুকুও আসে না। যোগ্যতা ছাড়া কোনোদিন বৈষম্য ঘুচবে না। কেউ কোনোদিন অযোগ্য কাউকে করুনা করে তো জায়গা ছেড়ে দেবে না। জায়গাটা তৈরি করে নিতে হবে সমান যোগ্যতা অর্জন করে তারপর।

অথচ নারীর মেধা, মনন, একাগ্রতা, শারীরিক সক্ষমতা কোনোদিক থেকেই প্রকৃতিগতভাবে কোনো অংশে পুরুষের চেয়ে কম তো নয়ই বরং বেশি। একজন নারীই পারেন একই সাথে কর্মক্ষেত্র, সংসার, সন্তান, পরিবার দুর্গার মত দশ হাতে সবটা একাই সামলাতে। যাকে বলা হয় মাল্টি টাস্কিং, বিজ্ঞানও স্বীকার করে এক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের চেয়ে অনেক অনেক এগিয়ে। এমনকি নারীর বিচক্ষণতা ও দুরদৃষ্টির কাছে পুরুষ বরাবরই হার মেনেছে। আর শারীরিক শক্তির কথা তো বলার অপেক্ষাই রাখে না। অর্ধাহারে অপুষ্ট নারীগুলোও সারাদিন ঘাম ঝরিয়ে উপার্জন করে নিয়ে বাড়ি গিয়ে বেকার, মাতাল, জুয়াড়ি স্বামীকে রেঁধে বেড়ে খাইয়ে তার পরিবর্তে আচ্ছা মত লাথি ঘুষি কিলে পিষ্ট হয়ে সারারাত কুঁকিয়ে কুঁকিয়ে পরদিন আবার খোঁড়াতে খোঁড়াতে কাজে যায়!! তাহলে কি বলব অক্ষমতাটা শারীরিক? নাকি মানসিক?

এতদিকে এত সক্ষমতা, এত সম্ভাবনা থাকার পরেও নারীরা কেন কেবলই শ্রমিক শ্রেণির আওতাভুক্ত হয়েই এগিয়ে আছে? কেন নেতৃত্বে যেতে পারছে না? কেবল সুতোয় টান পড়লে নড়চড় করতে শিখছে? কেন সূত্রধর হতে পারছে না? ক’টা গার্মেন্ট, ফ্যাক্টরী, কর্পোরেট হাউজ, ব্যাংক-বীমা এর টপ পজিশন গুলো এচিভ করতে পেরেছে নারীরা? ক’টা পত্রিকার সম্পাদক নারী? সাহিত্যিক-চিত্রশিল্পী কয়জন আছে নারী? ক’টা ফিল্মের ডিরেক্টর আছে নারী? কয়জন নারী নিজ যোগ্যতায় (পুরুষ রাজনীতিকের উত্তরাধিকার নয়) রাজনীতির সর্বোচ্চ পর্যায়ে গেছেন? কয়জন নারী শিল্প/ব্যবসায় উদ্যোক্তা হয়েছেন? কয়জন শীর্ষ বিজ্ঞানী আছে নারী?

এইসব সেক্টরগুলো যখন পুরুষদের দখলে তখন খুব স্বাবভাবিকভাবেই পুরুষতন্ত্র মাথা চাড়া দিয়ে উঠবেই। কালে কালে পুরুষতন্ত্রকে সচল রাখার জন্য নানান রকম কায়দা-কানুন ফন্দি-ফিকির হবেই। যে কারণে আমরা দেখতে পাই মিডিয়াগুলো পর্যন্ত পুরুষতান্ত্রিক আচরণ করে। মেইনস্ট্রিম ফিল্মগুলোতে আজীবন দেখেছি শাবানা/রোজিনাকে চোখের পানি স্বামীর পায়ে ফেলে জীবন কাটাতে, কথায় কথায় নায়কের পায়ে লুটিয়ে পড়তে। সন্ধ্যা মুখার্জির অসংখ্য গান শুনলেও একই অনুভূতি হয়, কেননা সেই গান গুলোর রচয়িতা তো একজন পুরুষ, সেই ফিল্মের ডিরেক্টরও পুরুষ। শাবানারা, কবরীরা তো রং মেখে সং সেজে শুধু পুতুলের মত নাচতে শিখেছে। সমাজ বদলানোর হাতিয়ার তো আর তাদের হাতে নয়। সেটা যাদের হাতে সেই সূত্রধরেরা সবাই একচেটিয়া পুরুষ হওয়াতে তারা আমাদের শেখাতে চেয়েছে এই শাবানা/ববিতারাই হলো আদর্শ বাঙালি নারীর রূপ।

এখনো পর্যন্ত আমরা নারীরা ইন্ডিয়ান সিরিয়ালগুলোতে কী দেখে তৃপ্তির সাথে গিলে নিচ্ছি? দেখছি সেই সকল চরিত্র গুলোই গর্বিত প্রধান চরিত্র(নায়িকা) হয় তারা যারা অঢেল অসীম অন্যায় উৎপীড়নকে অনন্তকাল মুখ বুজে হাসিমুখে মেনে নিয়ে মানিয়ে চলতে জানে। গোপনে শোষণের বীজটা কিন্তু ঢালা হয়ে যাচ্ছে এ প্রজন্মের নারীর অন্তরেও। হয়তো বুঝতেও পারছি না মনের গহীনে অবচেতনে ওই সিরিয়ালের নায়িকার জায়গায় নিজেকে বসিয়ে ট্রায়াল দিতে দিতে আর মানুষই হয়ে উঠতে পারছি না। আমাদের মা/চাচীদের মনে ঠিক যেভাবে গোপনে বোনা হয়েছিল শাবানার বীজ। একচেটিয়া কেউ যদি অন্যায়ভাবেও দীর্ঘকাল কোথাও রাজত্ব করার সুযোগ পেয়ে যায় তবে সে স্বেচ্ছাচারী উৎপীড়ক হয়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক।

নিজেদের সুযোগ-সুবিধা অটুট রাখার স্বার্থে ক্ষমতায় থাকা শ্রেণী বা জাতিগোষ্ঠী একধরনের সুপরিকল্পিত নোংরা রাজনীতির উদ্ভাবন করে থাকে আর সেই দুষ্টচক্র শোষিত শ্রেণীকে অনন্তকাল শোষণ করার প্রক্রিয়াটি উড়ন্ত প্লেনের ইঞ্জিনের মতই চালু রাখে। সেই প্রক্রিয়ার অন্তর্গত একটি ধূর্ত চক্রান্ত হলো নারীর ফোকাস নষ্ট করা। অফুরন্ত মেধা, শক্তি ও অসীম সম্ভাবনা থাকার পরও শুধুমাত্র ফোকাসের ঘাটতি থাকায় নারীরা আজও প্রান্তিক নগরীর বাসিন্দা। তারা রাতকানার মত নিজেদের জন্য অন্য কারো পূর্ব নির্ধারিত পথ গুলোই কেবল অনুসরণ করে শ্রেণী বিশেষের দাসত্ব করে চলেছে।

দাসত্ব যখন বহু জেনারেশনের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায় তখন সে মুক্তচিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। সব দিক থেকে পিছিয়ে পড়া নারীকুল এখনও সমান তালে এগিয়ে যাবার কথা ভাবতে পারছে না, নারীদের লেখার বিষয়বস্তু ও প্রকাশভঙ্গি দেখে মনে হয় তারা কেবল নিজেদের ওপর শারীরিক/মানসিক উৎপীড়নটুকু না হলেই বুঝি মোটামুটি তুষ্ট! যখন তাদের ঘাড়ের ওপর কোনো উৎপীড়ন নেমে আসে কেবল তখনই তারা একটু কাঁচুমাচু করে সামান্য নড়েচড়ে উঠে। তা নয়তো আর কোনো নড়াচড়া নেই! অবস্থান নিয়েও অবলা প্রাণীর বিশেষ মাথা ব্যথা নেই। কেবল দয়া করে অত্যাচারটুকু না করলেই যেন কোনোমতে চলে। কাঁধে কাঁধ মেলাবার কোনো চেষ্টা নেই। প্রত্যাশার জায়গাটা এতটাই নিম্নস্তরের।

শুধু যোগ্যতার কাঁধ সমান সমান হলেই যে বহুদিনের দখল হয়ে থাকা জায়গাটা আপসেই ফেরত পাওয়া যাবে তা নিশ্চয়ই নয়, তা স্বীকার করি। সেটার জন্য অবশ্যই আন্দোলনটা চালু থাকতে হবে। সামাজিক বিপ্লবের প্রয়োজন অবশ্যই আছে (বিশ্বের ইতিহাসে সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিপ্লব কতটা সফল সেটা ভিন্ন আলোচনা), তবু আন্দোলনটা আমরা করব, করেই যাব। কিন্তু কাদেরকে সাথে নিয়ে? রত্নবিহীন নিরেট ছাই নিয়ে? টকটকে ‘মাকাল ফল’ এর ঝুড়ি নিয়ে?

 

পূর্ব প্রকাশিত: উইম্যান চ্যাপ্টার