ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, সেলুলয়েড

doob+top

সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী নির্মিত ‘ডুব’। সিনেমাটি যারা দেখে এসেছেন এদের মন্তব্যে অনেকেই সিনেমা দেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। যদ্দুর শুনেছি, তার বেশ কিছু যদি সত্যি হয়, তবে আমি নিজেও যথেষ্ট হতাশ হবো। তবু আমি সিনেমাটি অবশ্যই দেখতে যাব।

কিছুদিন আগেও মূলধারার বাইরের একজন পরিচালকের একটা সিনেমা সম্পর্কেও খুব বাজে ধারণা নিয়েই দেখতে গেছি। যথেষ্ট বিরক্তি নিয়েই পুরো সিনেমাটা দেখেই বেরিয়েছি। ‘আয়নাবাজি’ বা ‘মনপুরা’ বা ‘ঢাকা অ্যাটাক’ এর মত দর্শকনন্দিত সিনেমা সারা বছর কিংবা সব বছর তৈরি হয় না, হবে না এটাই স্বাভাবিক। একটা বাবার সকল সন্তানও কিন্তু সমান সম্ভাবনাময় হয় না। একটা দেশের সব কয়টা সিনেমাও সমান দীপ্তি ছড়ায় না। তা বলে বাবা তো আর কম সম্ভাবনাময় সন্তানকে ফেলেও দেয় না।

বিশ্বমানের যেসব ধ্রুপদী সিনেমা আজও আমাদের মন কাড়ে তার তুলনায় আমরা অনেক পিছিয়ে আছি তা মানতেই হয়, তার পেছনে অনেক অনেক কারণও আছে। প্রতিটি সিনেমার একটা টার্গেট ভিউয়ার থাকে, সেই শ্রেণীর মানুষদের মেধা, মনন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, রুচি অনুসারেই নির্মাতাকে চলচিত্র নির্মাণ করতে হয়। সব ক্ষেত্রে নির্মাতাও যে দায়ী তাও কিন্তু নয়। তাকেও নির্ভর করতে হয় প্রযোজকের ওপর, লগ্নিকৃত অর্থ তুলে দিতে না পারলে পরবর্তীতে তার পক্ষে আবার প্রযোজক পাওয়া খুব কঠিন বা অসাধ্য হয়ে পড়ে। সেজন্যই একজন পেইন্টার বা একজন কবি যতটা স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারেন একজন নির্মাতা তা পারেন না। কারণ এই শিল্পের পেছনে রয়েছে প্রচুর অর্থের লগ্নি।

চলচ্চিত্রের পেছনে বড় অংকের লগ্নি আর সেটা তুলে আনার দায়বদ্ধতার কারণে এত কাল ধরে আমরা নাচানাচি, মারিমারি, সস্তা গল্প আর সংলাপের প্রচলিত ধারার সিনেমাই নির্মিত হতে দেখে এসেছি। আমাদের দেশের মত স্বল্পোন্নত একটি দেশে যেখানে শিক্ষার হার এখনো অতি নগণ্য সে দেশে যে তবু মেইনস্ট্রিম সিনেমার বাইরে আরো কিছু সিনেমা হচ্ছে সেটাই আশার কথা।

তাই সিনেমা যেমনই হোক, অল্টারনেটিভ কোনও একটা সিনেমা আসলেই তা আমি সদলবলে দেখে থাকি। দায়িত্ব মনে করেই দেখি। কেননা মৃতপ্রায় এই চলচিত্র শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা তো আমাদেরই দায়িত্ব। লগ্নির টাকা যদি উঠে না আসে প্রযোজক সম্প্রদায় এই শিল্পে অর্থ লগ্নি করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। নির্মাতারাও বেশি কাজ করার সুযোগ হারাবেন। এতে তাদের শিল্প নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার পথ বন্ধ হয়ে আরও পরিণত শিল্প সৃষ্টির পথরুদ্ধ হবে। এভাবে শিল্পটি আরো ধ্বংসের মুখে পড়ে যাবে। যা একটি দেশের শিল্প-সংস্কৃতির জন্য ভীষণ সংকটময় হবে।

কিছু কাল আগেই মেইনস্ট্রিম সিনেমার বাইরে আর সিনেমাই ছিল না। এখন কিছু তরুণ মেধাবী নির্মাতা চলচ্চিত্রের দিকে ঝুঁকছেন। ভালো কিছু নির্মাণের চেষ্টা করছেন, অন্ততপক্ষে অল্টারনেটিভ একটা থট, ফর্ম দিচ্ছেন। এই সম্ভাবনাটাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়াটাও তো ঠিক হবে না। একটা বছরে পাঁচটি সিনেমা হলে পাঁচটি সিনেমাই কখনোই সমমানের হওয়া সম্ভব নয়, এটাই বাস্তবতা। এই বাস্তবতাকে আমরা যদি মেনে নিতে না পারি তবে বিপন্নপ্রায় দেশি চল্পচিত্র ধ্বংস হয়ে নিও কলোনিয়ালিস্ট শক্তি আরো আগ্রাসী হয়ে উঠবে। তাই আমার মনে হয় ভালো, মন্দ কিংবা একটু কম ভালো যেমনই হোক সবাই দেশি সিনেমা দেখা উচিৎ।

এই শহরে তো বলতে গেলে ঘুরতে যাবার জায়গাও তেমন নেই। বছরে চার-ছয়টা সিনেমা দেখার অজুহাতে না হয় পরিবার/বন্ধু বান্ধব নিয়ে একটু ঘোরাও হলো। সাথে একটা পিজা, কোল্ড ড্রিঙ্কস খাওয়া হলো। সিনেমা দেখার আগে পরে ফুডকোর্টে বসে দলবল নিয়ে একটু আড্ডাও হল। এটাও মন্দ কী? আমাদের এইটুকু সহায়তায় একদিন দেশি চলচিত্র আরও ম্যাচিওর্ড হয়ে উঠবে। আমরা যেমন ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার আশায় আমাদের শিশুটির হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যাই, একদিন সে তো বড় হয়ে আমাদের দায়িত্ব ঠিক ঠিক নিতে শিখেও যায়। প্রাপ্তিহীনতার দায়ে শৈশবেই যদি শিশুটি বা কিশোরের হাতটি আমরা ছেড়ে দেই তবে তার কাছ থেকে আমরা কি সেই স্বর্ণালী দিনকে অর্জনের আশা রাখতে পারি?

সেই সুন্দর সম্ভাবনার দিনটির অপেক্ষায় আসুন দেশিয় চলচ্চিত্রের পাশে থাকি। একদিন তার কাছ থেকে আমরা সত্যিই ভালো কিছু পাব। বিশ্বের দরবারে একদিন সে নিশ্চয়ই আমাদের মাথা উঁচু করবে। এই প্রত্যাশাটা আসুন বুকের মধ্যে রাখি। চলুন সিনেমা দেখি। মনে মনে প্রস্তুত থাকি, সব সিনেমা দেখে ‘পয়সা উসুল’ হবার অনুভূতি হবে না, হবে ‘পয়সা নষ্ট’ হবার অনুভূতি।

সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘বই কেনা’ প্রবন্ধে বই প্রকাশক, নাকি বইয়ের ক্রেতা কে বইয়ের দাম ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রেখে প্রকাশনা শিল্পকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে প্রথম দায়িত্ব নেবে, এই ‘অচ্ছেদ্য চক্র’ ভাঙার দায়িত্ব ক্রেতাকে নিতে বলেছেন। আর এই প্রসঙ্গেই তিনি দিয়েছিলেন তার বিখ্যাত যুক্তি “বই কিনে কেউ কোনোদিন দেউলিয়া হয়নি”। কোনো সিনেমা দেখলে ‘পয়সা নষ্ট’ হবার আশংকা আছে, ভেবে যারা সিনেমা দেখতে চান না, কিংবা এই যুক্তিতে অন্যকে সেই সিনেমা দেখা থেকে বিরত রাখতে চান, তাদের প্রতি সৈয়দ মুজতবা আলীর যুক্তি অনুসরণ করেই বলি ’সিনেমা দেখে কেউ কোনোদিন দেউলিয়া হয়নি’।