ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

আমাদের মনে থাকার কথা, বেশ কিছুদিন আগে ধর্ষণ মামলার কারণে শিরোনামে এসেছিল বনানী। কয়েকদিন আগে বনানী আবার শিরোনামে এলো একটি ‘ধর্ষণ’ মামলার কারণেই। এবারকার ‘ধর্ষণ’টির সাথে যেহেতু একজন বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পীর ভাই এর নাম এসেছে, তাই এটাও পত্রিকায় যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে। পাঠক হয়তো এর মধ্যেই খেয়াল করেছেন আমার প্রথম বাক্যটির ধর্ষণ স্বাভাবিকভাবে লিখা থাকলেও পরের ক্ষেত্রে শব্দটি কোট-আনকোট এর মধ্যে লিখেছি। কেন সেটা করেছি সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি।

ধর্ষণ কাকে বলে?

বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারা ধর্ষণের সংজ্ঞা দেয়। সেটা অনুযায়ী পাঁচটি অবস্থায় ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বলা যায়। সেগুলো হলো—

১. নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে
২. নারীর সম্মতি ছাড়া
৩. মৃত্যু বা জখমের ভয় দেখিয়ে
৪. নারীর সম্মতি নিয়েই, কিন্তু পুরুষটি জানে যে সে ওই নারীর স্বামী নয় এবং পুরুষটি তাও জানে, নারীটি তাকে এমন একজন পুরুষ বলে ভুল করেছে যে পুরুষটির সঙ্গে তার আইনসঙ্গতভাবে বিয়ে হয়েছে বা বিবাহিত বলে সে বিশ্বাস করে।
৫. নারীর সম্মতিসহ কিংবা সম্মতি ছাড়া যদি সে নারীর বয়স ১৬ বছরের কম হয়। অর্থাৎ ১৬ বছরের চেয়ে কম বয়সী মেয়ের সঙ্গে তার মতে বা অমতে যেকোনো ভাবে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে তা ধর্ষণ বলে গণ্য হবে।

এই আইনের কোথাও ছিলো না, কাউকে কোনো কিছুর প্রলোভন দেখিয়ে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে, পরে সেটা পূর্ণ না হলে সেটাকে ধর্ষণ বলা হবে। অথচ পরবর্তীতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০, ধারা ৯(১) বলছে –

যদি কোন পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ১. [ষোল বৎসরের] অধিক বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তাহার সম্মতি আদায় করিয়া, অথবা ২. [ষোল বৎসরের] কম বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তাহা হইলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে।

উক্ত আইনের ভিত্তিতে আজকাল অনেকেই এধরনের মামলায় উৎসাহী হচ্ছে। “বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ” এরকম অদ্ভুত ও হাস্যকর একটি বাক্য যে এবারই প্রথম সামনে এসেছে তা নয়, ক্রিকেটার রুবেলের বিরুদ্ধে চিত্র নায়িকা হ্যাপি যখন এ ধরনের একটি মামলা দায়ের করেছিলেন এই আইনটি তখন বিশদভাবে প্রকাশিত হয়।

আমি জানি এবং মানি আইন আর নৈতিকতা সব সময় একসাথে মিলে যায় না। আইনগতভাবে বৈধ বিষয় যেমন অনৈতিক হতে পারে, তেমনি আইনগতভাবে অবৈধ বিষয়ও হতে পারে নৈতিক। যেমন কিছুদিন আগেই সরকার বিশেষ বিবেচনায় বিয়ের বয়স ষোলোতে অনুমোদন দিয়েছে আইনগত ভাবে। অথচ সাবলকত্বের বয়স রাখা হয়েছে আঠারোই। নাবালক স্বীকার করে বিয়ের আইনটা যেমন হাস্যকর, একইভাবে কোনো প্রাপ্ত বয়স্ক নারী যদি প্রলোভনে পড়ে (বিয়ে বা অন্য কিছুর) স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে পরে সেটা না পেলে এসে ধর্ষণ মামলা করতে পারেন সেটাও আমার একইরকম হাস্যকর মনে হয়।

আমরা শুনে থাকি আজকাল নাকি চাকরির ক্ষেত্রে বা নাটক, সিনেমা কিংবা মডেলিংয়ে সুযোগের প্রলোভনেও নাকি কিছু কিছু মেয়ে যৌন আপস করে থাকে। এই আইনের ভিত্তিতে তারাও ধর্ষিত। প্রতিশ্রুতি দিয়ে শারীরিক সম্পর্ক করে তারপর তাদেরকেও প্রতারণা করা হতে পারে, আমার মনে হয় ধর্ষণ না বলে সেটাকে প্রতারণা বলাই যুক্তিযুক্ত।

অতি সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান বলে “প্রলোভন” ও “ধর্ষণ” শব্দ দু’টি বিপরীতমুখী। ধর্ষণ হচ্ছে জোরপূর্বক কারও সাথে যৌনাচার করা। অন্যদিকে “প্রলোভন” শব্দটাতেই একটা আপসের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কারও সাথে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপনের জন্য কেউ কাউকে কখনও প্রলোভন দেখায় না। প্রলুব্ধ করার উদ্দেশ্যই মূলত অপর পক্ষকে আগ্রহী করার ইচ্ছা। আর প্রলোভনে পড়ে কেউ যখন আপসে যৌন সম্পর্কে সম্মতি দেয় তখন আর জোর প্রয়োগের কোনও প্রশ্ন আসে না। এ ধরণের পরিস্থিতিতে ভিকটিম নিজেও জানবে যে এই ক্ষেত্রে বিয়ের বিষয়টি পুরোপুরি সুনিশ্চিত নয়, এখানে একটা অনিশ্চয়তা থেকেই যায়। কেউ নিশ্চয়ই মুখের কথায় অন্য কাউকে জমি-জমার দখল দিয়ে দেন না, নগদ অর্থ বুঝে নিয়ে তবেই সম্পদ হস্তান্তর করে থাকে। সুতরাং বিয়ের পূর্বে যদি কেউ যৌন সম্পর্কে সম্মতি দেন তবে তিনি হয় ঝুঁকি নিয়েই তা করেন অথবা তথাকথিত সামাজিক অানুষ্ঠানিকতায় তিনি শ্রদ্ধাশীল নন।

তবে যে কোনও রকম প্রতিশ্রুতি কাউকে দিয়ে তা ভঙ্গ করাটা নিশ্চিতভাবেই ভীষণ অন্যায় ও প্রতারণা। আর যেকোনো প্রতারণাই একটা ক্রিমিনাল অফেন্স। সেক্ষেত্রে মামলা হতেই পারে। তবে সে মামলাটি ধর্ষণ মামলা না হয়ে প্রতারণা মামলা হওয়াই অধিক যৌক্তিক বলে আমি মনে করি। তাছাড়া প্রতারণা বা প্রলোভন শব্দটিও যথেষ্ঠ প্রমাণ সাপেক্ষ। বিয়ের প্রতিশ্রুতি ছাড়া আমাদের সমাজের কোনও মেয়েই যে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে না তা তো নয়। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে যৌন চাহিদা পুরুষের যেমন থাকে নারীরও থাকে। তাই নারীর পক্ষেও সম্ভব কেবল সাময়িক শারীরিক প্রয়োজনেই যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা। আর তা নিশ্চয়ই নারী অথবা পুরুষ কারো জন্যই অপরাধ কিংবা অনৈতিক কোনোটাই নয়।

আমার মনে হয় এধরনের মামলার মধ্যে তিনটির যেকোনো একটি উদ্দেশ্য থাকতে পারে। প্রথমত, অভিযুক্তের নিকট হতে আর্থিক সুবিধা লাভ। দ্বিতীয়ত, সামাজিক চাপে ফেলে বিয়ের সম্ভাবনার পথ তৈরি। তৃতীয়ত, নিতান্ত প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে অভিযুক্তের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন করা।

অভিযুক্ত যদি সম্ভ্রান্ত পরিবারের কেউ হয় সেই ক্ষেত্রে বাদীর সুফল বেশি। আর যদি বিখ্যাত কোনও ব্যক্তিত্ব হয় তাহলে তো পোয়া বারো। কোনও একটি মামলায় কোনোভাবে বিখ্যাত কোনও ব্যক্তিকে জড়াতে পারলেই সেক্ষেত্রে মিডিয়া হয়ে ওঠে অতি উৎসাহী। আর মিডিয়ার উৎসাহ মানেই পাবলিসিটি। আর জনগণের কাছে সেই খবরটি হয়ে উঠে অতি মুখরোচক খাবার।

শুরুতেই বলেছি বনানীর সাম্প্রতিক ঘটনাটিতে অভিযুক্ত ব্যক্তির বোন বিখ্যাত গায়িকা হবার সুবাদে এই মামলাটির রিপোর্টে দেখলাম অনেক পত্রিকা অভিযুক্তের বোনের নাম তুলে হেড লাইন করেছে। খুব স্পষ্ট যে বিখ্যাত নামটিকে ব্যবহার করে তারা তাদের খবরটিকে মুখরোচক করারই হীন চেষ্টা করেছে। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেই অভিযুক্ত কুশান ওমর সুফি এক্ষেত্রে অপরাধীই, সে ক্ষেত্রেও তার অপরাধটি কিন্তু তারই। তার ভাই, বোন বা জ্ঞাতি-গুষ্টির কারও অবশ্যই নয়। অথচ বারবার তার বিখ্যাত বোনটির নামই হাইলাইটেড হয়েছে প্রায় সবখানে! কি তার উদ্দেশ্য হতে পারে?

মিডিয়ার উদ্দেশ্য নিশ্চিত ভাবেই পত্রিকার কাটতি বাড়ানো, আর বাদীর উদ্দেশ্য বোধ করি অভিযুক্তের সামাজিক মর্যাদাকে হুমকির মুখে ফেলে উপরিউক্ত তিনটির মধ্যে কমপক্ষে একটি সুবিধা আদায় করা। এধরনের কূট কৌশলে একেবারেই যে কাজ হয় না তা অবশ্য নয়। আমরা অতীতের ইতিহাসে দেখেছি এরকম সমাজিক চাপে ফেলতে পারলে কাজ হয়। সংগীত পরিচালক শওকত আলী ইমন ঠিক এরকমই একটি চাপে পরে তার তথাকথিত প্রেমিকাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিলেন বলে গণমাধ্যমে জানা গেছে। এরকম আরও অনেকগুলো ঘটনা আমি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মাধ্যমে জেনেছি।

এই রকম বিকৃত সংস্কৃতি আমাদের এই অঞ্চলে বহু আগে থেকেই চর্চিত। শুধু ফর্মটা ভিন্ন। আগে গ্রাম ভিত্তিক সালিশ নালিশের মাধ্যমে অথবা কোন এক পক্ষের যোগসাজসে পাত্র-পাত্রীকে কোনও একটা নির্জন কক্ষে একান্তে ধরে ফেলতে পারলেই স্থানীয় দু-চারজন মাস্তানের সহযোগিতায় বিয়ে পড়িয়ে দেয়া হত। আর এখন সেটা হচ্ছে হয় মামলা করে, নয় মিডিয়ার স্বর গরম করে। অথচ এই প্রকৃতির নিম্ন মানসিকতার হতবুদ্ধির মানুষগুলো এটা বোঝে না যে এভাবে ধরে বেঁধে কাগজে কলমে কোনোরকমে নামমাত্র বিয়েটা সেরে ফেলতে পারলে আর যাই হোক সম্পর্ক নামের বস্তুটির দেখা মেলে না। সম্পর্ক তো দূরে থাক অনেক ক্ষেত্রে সেই কাগজের বিয়েটা পর্যন্ত টেকে না। আমার জানা এরকম অনেক ঘটনায় দেখেছি বিয়েটা বলতে গেলে প্রায় রাতারাতিই ভেঙে যেতে।

কেউ কেউ হয়তো ভেবে থাকতে পারে নারীর আর্থ-সামাজিক অবস্থান বা আত্মনির্ভরশীলতার অভাবই হয়তো এই সংষ্কৃতির জন্য দায়ী। আসলে কিন্তু তা নয়, এটি একটি অপসংস্কৃতি মাত্র। কেবলমাত্র লোয়ার ইকোনোমিক ক্লাসেই যে এমন সংস্কৃতির চর্চা রয়েছে তা কিন্তু না, সব শ্রেণীর মধ্যেই এরকম সুযোগ সন্ধানী অথচ মোটা মাথার অধিকারী হীন ব্যক্তিত্বের মানুষ রয়েছে। কিছুদিন আগেই আমরা দেখেছি চিত্রনায়িকা অপু বিশ্বাস মিডিয়াকে মাতব্বর মেনে অতি প্রাচীন সেই গ্রাম্য সালিশ সভা প্রক্রিয়ায় বিচার নালিশ করতে। যদিও সেটি ধর্ষণ মামলার সাথে মোটেও সম্পর্কিত নয় তবুও কৌশলগত মিল রয়েছে পুরোটাই। এরকম হীন কূট কৌশল অবলম্বন করে সাময়িক স্বার্থ সিদ্ধি হলেও দীর্ঘ মেয়াদে সেটা কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনে না তা যুগ যুগ ধরে বারবার প্রমাণিত।

ওমেন চ্যাপ্টারে পূর্ব প্রকাশিত (আংশিক পরিবর্তিত)।