ক্যাটেগরিঃ সুরের ভুবন

প্রতীক্ষার অবসান হলো অবশেষে। লুৎফর হাসান আমাদের সামনে হাজির হয়েছেন তাঁর নতুন গান নিয়ে। ‘খরচাপাতির গান’ শুনেই বুঝলাম এই গান তৈরি হয়েছে বহুদূর যাবার জন্য, অনেকদিন বেঁচে থাকার জন্য, লাখ লাখ মানুষের মুখে মুখে ফেরার জন্য।

এ যেন কেবল একটি গান নয়, কেবল প্রেম-বিরহের সুর নয়। এ আমাদের চির চেনা শহরের কোটি মানুষের যাপিত জীবনেরই গল্প; এ যেন প্রতিটি জীবনের দীর্ঘশ্বাস।

মধ্যবিত্ত জীবন জানে  সংগ্রাম কাকে বলে। এই গান সেই কোটি জীবনের সংগ্রামেরই প্রতিচ্ছবি। যে জীবনে হাহুতাশ কখনো পিছু ছাড়ে না। এ শহর কেবল স্বপ্ন দেখাতেই জানে, স্বপ্ন পূরণের স্বাদ কোনোদিন মেটে না এ শহুরে জীবনে। কেবল মৌলিক চাহিদাটুকু মেটানোর তাগিদে ছুটতে ছুটতে হাঁপিয়ে মরে আর বাঁচে যে জীবন সে জীবনে প্রেমচর্চা, অনুভূতি চর্চার অবকাশ আর মেলে না।

যে জীবনে অপ্রাপ্তির ফর্দ করে শেষ করা কঠিন, বরং প্রাপ্তিটাই সীমিত। আবার জল, স্থল ও আকাশ পথে অহরহ দুর্ঘটনায় অকস্মাৎ প্রাণ নাশ, তছনছ হয়ে যায় অনেক সংগ্রামের সাজানো সংসার। এমন ঝড়ের মধ্যে দিয়েই বহমান বাস্তব জীবনের প্রাণস্পর্শী গল্প রয়েছে এই গানে ও চিত্রায়নে।

একালের গানের সাথে ভিডিও থাকা একটা ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। এটা ট্রেন্ড হবার সমস্যার দিক হলো যেনতেনভাবে একটা ভিডিও বানিয়ে গানের সাথে জুড়ে দেয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ফলে গান শোনার সাথে দেখা যুক্ত হয়ে যে সিনার্জিস্টিক এফেক্ট তৈরি হবার আদি উদেশ্য নিয়ে ভিডিও তৈরির চেষ্টা হয়েছিল, সেটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত এখনকার গানের ভিডিওতে। খরচাপাতির গানের ভিডিওটি এর এদিক থেকে ব্যতিক্রম।

এই শহরের অনেক তরুণ-তরুণীর জীবনের খুব কমন গল্প দিয়ে শুরু হয় ভিডিওটি। চাকরি না পাওয়া তরুণ সামাজিকভাবে বিয়ে করতে পারে না তার প্রেমিকাকে। তাই নিজেরা বিয়ে করে কাজী অফিসে। এরপর মেয়েটির চাকুরি পাওয়া আর ঘর বাঁধার সুখের দৃশ্য আমাদেরও  ছুঁয়ে যায়।

সন্তানের আগমনে তাদের সংসারের পরিপূর্ণতা আমাদের যখনই রূপকথার মতো ‘অতঃপর তাহারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিলো’ মনে হতে শুরু করলো তখনই আমরা মুখোমুখি হই ভয়ঙ্কর নিয়তির।

প্রতিটা দৃশ্য খুব যত্ন নিয়ে ধারণ করা হয়েছে। সুন্দর সিনেমাটোগ্রাফি, এবং পোস্ট প্রোডাকশন এর কাজ আছে ভিডিওটিতে।

লুৎফর হাসান বহুমুখী প্রতিভাধর মানুষ। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে ‘জুতা সেলাই থেকে চণ্ডি পাঠ’; একজন লুৎফর হাসানকে না চিনলে বোঝা যায় না এই প্রবাদের মর্ম।

গান লেখা, সুর, গাওয়া থেকে শুরু করে গল্প, কবিতা, উপন্যাস রচিত হয় যার হাতে তার প্রতিভার আরেকটা অজানা দিক উন্মোচিত হলো এবার। এই ভিডিওটির খুব বড় আকর্ষণ একজন অভিনেতা লুৎফর হাসান।

আমার অনেকেই জানি না থিয়েটার ব্যাকগ্রাউন্ডও আছে তার। তাই স্বভাবতই দারুন অভিনয় করেছেন তিনি। চাকরি না পাওয়া একজন হতাশ তরুণ, একজন প্রেমিক তরুণ,  কেয়ারিং  এবং একজন বিরহে কাতর স্বামী – এরকম অনেকগুলো ভিন্ন ধরনের আবেগ প্রকাশের জায়গা ছিল এই চরিত্রে। লুৎফর হাসান প্রতিটা এক্সপ্রেশনেই রেখেছেন নিপুণ দক্ষতার পরিচয়।

গায়ক থেকে বিখ্যাত অভিনেতা হয়ে যাবার কয়েকটি উদাহরণ আছে আমাদের দেশে। আমার মনে হয় সেই তালিকায় আরেকটি নাম যুক্ত হতে দেখবো অচিরেই।

আরও কয়েকজন ব্যক্তির শ্রমে ও সৃজনশীলতায় এই অসাধারণ গানটি সৃষ্টি হয়েছে। গানের জীবনভিত্তিক  কথা লিখেছেন সোমেশ্বর অলি।  এতে সুর দিয়েছেন যুগ্মভাবে সোমেশ্বর অলি, ডলার এবং লুৎফর হাসান।  সঙ্গীত পরিচালনায় ছিলেন আমজাদ হোসেন।  মিউজিক ভিডিও পরিচালনা করেছেন পিকলু চৌধুরী।