ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

উত্তরের হাওয়া বলে শীত আসছে। ভোরের আকাশ হালকা কুয়াশার চাদরে নিজেকে ঢেকে যেন বলছে, আর ক’দিন পর আমায় বেলা করে দেখতে পাবে। আমি লুকাবো।

দুপুর চড়া হলে তবেই দেখা মিলবে আমার! শেষ রাতে ঘুমের ঘোরে গায়ে কাঁথা টেনে দিয়ে একটু ওম খুঁজে পাওয়া কিংবা স্নানে গায়ে জল ঢালতে গিয়ে থমকে থেমে যাওয়াই বলছে, শীত দুয়ারে! মাঠে মাঠে সোনালি ধানের বন্যা। কৃষকের ধান কাটার ধুম। কৃষকের বুক উথলে উঠছে খুশি, মুখে সুখের গান। কৃষকের উঠোন ভর্তি নতুন ধান যেন বলছে, এসো অতিথি নতুন ধানের পিঠে খাওয়াবো। খেঁজুর রসে ডুবিয়ে পায়েশ খাওয়াবো।

কৃষকের আহ্বানে না হলেও প্রকৃতির টানে বাংলাদেশে আসতে শুরু করেছে হাজার হাজার অতিথি পাখি। এরই মধ্যে  অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠেছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবছরই বাংলাদেশের বিভিন্ন জলাশয়ে এসে জড়ো হয় এরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এর অন্যতম একটি। অতিথি পাখির কিচিরমিচির শব্দে প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের ঘুম ভাঙে। লেকজুড়ে হাজার হাজার লাল পদ্মের মাঝে পাখিদের ওড়াউড়িতে চোখ জুড়িয়ে যায় ঘুরতে আসা পাখি প্রেমীদের।

প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের শেষেই হিমালয়ের উত্তরে শীত নামতে শুরু করে। তখন সেখানে পাখিদের পক্ষে টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে ওঠে। তারা তখন পাড়ি জমায় দূর-দূরান্তের উদ্দেশ্যে। নাতিশীতোষ্ণ এলাকার খোঁজে সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া, চীন, নেপাল, জিনজিয়াং ও ভারত থেকে পাখিরা উষ্ণতার আশায় পাড়ি জমায় বিভিন্ন দেশে। এ সময় দক্ষিণ এশিয়ার নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল বাংলাদেশে হাজারো অতিথি পাখির আগমন ঘটে। জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাস ছাড়াও মিরপুর চিড়িয়াখানা ও বোটানিক্যাল গার্টেন এলাকা সংলগ্ন জলাশয় এবং হাওরে অতিথি পাখিরা এসে জড়ো হয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট বড় প্রায় ১৭টি লেকের মধ্যে পরিবহন চত্বর, রেজিস্ট্রার ভবনের সামনের লেক ও বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টারের লেকেই অতিথি পাখির সমাগম ঘটে সবচেয়ে বেশি। অক্টোবরের শেষ ও নভেম্বরের শুরুতে এরা বাংলাদেশে আসতে থাকে আর মার্চের শেষ দিকে ফিরে যায় আপন ঠিকানায়।

দুই ধরনের পাখির আগমন ঘটে জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে। এক ধরনের পাখি ডাঙ্গায় শুকনো স্থানে বা ডালে বসে বিশ্রাম নেয়। আরেক ধরনের পাখি বিশ্রাম নেয় পানিতে। এদের বেশিরভাগই হাঁস জাতীয়। এর মধ্যে সরালি, পচার্ড, ফ্লাইফেচার, গার্গেনি, ছোট জিরিয়া, পান্তামুখী, পাতারি, মুরগ্যাধি, কোম্বডাক, পাতারী হাঁস, জলকুক্কুট ও খয়রা পাখি অন্যতম। এছাড়া মানিকজোড়, কলাই, ছোট নগ, জলপিপি, নাকতা, খঞ্জনা, চিতাটুপি, বামুনিয়া হাঁস, লাল গুড়গুটি, নর্দানপিনটেল ও কাস্তেচাড়া প্রভৃতি পাখির দেখাও মেলে এখানে। এরা ডানায় ভর করে হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এ অঞ্চলে আসে।

একটু আশ্রয়ের আশায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যে পাখিরা এসে আশ্রয় নেয় বাংলা মায়ের বুকে তারা যেন কোনো ধরনের বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতির কবলে না পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখা আমাদের সবার কর্তব্য। অতিথি যে লক্ষ্মী। এর হেনস্তা হতে নেই যে!

ছবি : লেখক

পূর্বে প্রকাশিত এখানে