ক্যাটেগরিঃ কৃষি, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

বাংলাদেশে সবুজ ঝিনুকের চাষ পদ্ধতির উন্নয়ন ও বিস্তারের লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার জেলার রেজুখাল, মহেশখালী, কুতুবদিয়া চ্যানেলের প্রতিটিতে পাঁচটি রিসার্চ স্টেশন ও নাফ নদীতে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন  চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের  মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (বিভাগ-মেরিন বায়ো-রিসোর্স সায়েন্স)  ড. মো. আসাদুজ্জামান ও সহকারী অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান (বিভাগ-ফিশারিজ রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট) ড. মো. শেখ আহমাদ আল নাহিদ।

মহেশখালী চ্যানেল থেকে আহরিত সবুজ ঝিনুকের তোলা ছবি

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের   এনএটিপি-২  প্রকল্পের অর্থায়নে দেড় বছর মেয়াদি এ গবেষণা প্রকল্পে সবুজ ঝিনুকের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ, প্রজনন, চাষ উপযোগী জায়গা ও পরিবেশ নির্বাচন, গড় মৃত্যুহারসহ আরো নানামুখী বিষয় নিয়ে গবেষণা করা হবে।

এ গবেষণা প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো আমাদের দেশে নীল অর্থনীতির সর্বোত্তম উন্নতি সাধন করা ও বাংলাদেশে সবুজ ঝিনুক (Green mussel) চাষের প্রসারণের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়া অদূর ভবিষ্যতে।

ড. মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে প্রকল্প নিয়ে আলাপকালে তিনি বলেন,  “যদি আমাদের দেশে সবুজ ঝিনুক চাষের প্রসার ঘটানো যায় তাহলে দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ইউরোপীয় দেশগুলোতে আমাদের দেশের নতুন একটি রপ্তানি বাজার তৈরি হবে এবং বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।”

প্রকল্প নিয়ে  জানতে চাইলে প্রকল্পের অন্যতম পরিচালক ড.  শেখ আহমাদ আল নাহিদ বলেন, “আমাদের উপকূলীয় এলাকাসমূহ লবণাক্ততা ও প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার কারণে অন্যান্য কৃষিজ ফসল চাষের অনুপযোগী। তাই সবুজ ঝিনুক চাষের মাধ্যমে উপকূলীয় লবণাক্ত জলাভূমিগুলো আমাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে।”

বাংলাদেশে সবুজ ঝিনুক  চাষ এখনো ততটা প্রচলিত হয়ে ওঠেনি কিন্তু এদের মাংস ও খোলসের প্রচুর চাহিদা থাকায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেমন চীন, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও ভারতে  সুলভ প্রোটিনের উৎস হিসেবে সবুজ ঝিনুকের চাষ করা হয়।

এমনকি সিঙ্গাপুরের মতো একটি উন্নত দেশের মৎস্য সম্পদ উৎপাদনের প্রায় ৭০.৪ শতাংশ জুড়েই রয়েছে সবুজ ঝিনুক। থাইল্যান্ড হলো বিশ্বে সবুজ ঝিনুকের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদক।

প্রকল্প পরিচালক ড. মো. আসাদুজ্জামানের  দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে সবুজ ঝিনুক (Green mussel) চাষের সম্ভাবনাসমূহ:

– প্রায় ২০ লাখ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিয়মিত খাবার হিসেবে আমিষের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখবে।
– এদের খোলস মাছ ও পোলট্রি খাদ্যে ক্যালসিয়ামের উৎস হিসেবে ও চুন তৈরিতে কাজে আসবে।
– উপকূলীয় এলাকার প্রাকৃতিক জলসম্পদের লাভজনক ব্যবহার নিশ্চিত হবে।
– বেকার জনগোষ্টীর নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।
– রপ্তানি চাহিদা অনেক বেশি হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে অর্থনীতিতে ভুমিকা রাখবে।
– জাটকা এবং অবৈধভাবে মাছ ও চিংড়ীর পোনা আহরণকারীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।
– সবুজ ঝিনুক (Green mussel) এর বিলুপ্তি রোধ করতে ভূমিকা রাখবে।
– দেশের মাৎস্যসম্পদ উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

 

ল্যাবরেটরিতে সবুজ ঝিনুকের বৃদ্ধি ও পরিপক্কতা পর্যবেক্ষণ

সবুজ ঝিনুকের চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে প্রকল্পের গবেষকরা জানান, সবুজ ঝিনুক উপকূলীয় এলাকায় প্রাকৃতিক লবণাক্ত জলাভূমিতে চাষযোগ্য ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন কম তাই স্বল্প বিনিয়োগেই চাষ শুরু করা যায়।

সবুজ ঝিনুক  প্রধানত নিমজ্জিত বা ভাসমান ভেলায়, খাঁচায়, লং লাইন বা সরাসরি তলদেশে চাষ করা যায়। তাছাড়া বিভিন্ন রকম অবকাঠামো নির্মাণ করেও এদের চাষ করা হয়।

সবুজ ঝিনুক চাষের জন্য প্রাকৃতিক উৎস হতেই বীজ পাওয়া যায়  এবং সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক খাবারের উপর নির্ভরশীল হওয়াতে এদের কোনও আলাদা খাবার দিতে হয়না।

সবুজ ঝিনুক আমাদের দেশের প্রায় ২০ লাখ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিয়মিত খাবার হিসেবে আমিষের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে রাখতে পারে যুগান্তকারী ভূমিকা। নিশ্চিত করতে পারে পারে দেশের উপকূলীয় জলাভূমির যথাযোগ্য ব্যবহার এবং ভূমিকা রাখতে পারে বেকারত্ব দূরীকরণে।

আমদের নীল অর্থনীতির সুদূরপ্রসারী যাত্রায় সবুজ ঝিনুক চাষ হতে পারে অন্যতম পথিকৃৎ বলে আশা প্রকাশ করেন প্রকল্পের গবেষকরা।

ছবিসূত্র: প্রকল্প প্রধান প্রফেসর ড. মো. আসাদুজ্জামান।