ক্যাটেগরিঃ জনজীবন, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার বৈলতলী ইউনিয়নের জলদাস পাড়া। এ পাড়ায় শত বছর ধরে জেলে সম্প্রদায়ের বসবাস। নদীবেষ্টিত এ গ্রামে নদীতে মাছ ধরাই তাদের মূল জীবিকা। প্রায় শতাধিক পরিবারের সিংহভাগ পুরুষেরাই মাছ ধরা ও বিক্রির সাথে সরাসরি জড়িত।

প্রকৃতি এ গ্রামকে নিজের সবটুকু ঢেলে সাজালেও সময়ের সাথে সাথে এই এলাকার জেলে পরিবারের দুঃখ-দুর্দশা বেড়েছে কয়েকগুণ। মাছের অন্যতম ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত শঙ্খ নদীতে মাছ কমে গেছে অনেকগুণ। নদীতে এখন আর আগের মতো মাছ ধরা পড়ে না।

স্থানীয়দের মতে, নদীতে একসময় বোয়াল, পাবদা, গুলশা, চিংড়ি, ইলিশসহ অনেক প্রজাতির মাছ পাওয়া গেলেও এখন কিছু কাচকি মাছ আর চিংড়ি ছাড়া তেমন মাছ পাওয়া যায় না সবসময়।

এর মূল কারণ হিসেবে তারা দায়ি করেছেন স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীর বছর জুড়ে কাচকি জাল (এক ধরনের ছোট মেশের জাল, যেখানে ছোট মাছ ধরা পড়ে) দিয়ে মাছ ধরার প্রবণতা। এর ফলে  লাখ লাখ মাছের পোনা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ আর অভিযোগ করেন তারা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, দিনের অধিকাংশ সময়ই  নদীর কোনো না কোনো জায়গায় অবাধে চলছে কাচকি জালের চিরুনি অভিযান।

সহকারি অধ্যাপক ড. শেখ আহমাদ আল নাহিদের তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের একদল শিক্ষার্থীর  শঙ্খ (যাকে অনেক সাঙ্গু বলে থাকে) নদী পাড়ের জেলেদের জীবনযাত্রা নিয়ে চালানো জরিপে ধরা পড়ে এমন চিত্র।

‘জেলে সম্প্রদায়ের জীবন-জীবিকা অনুসন্ধান’ জরিপের আওতায়  সেখানকার কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায় জেলে পরিবারের জীবনযাত্রার বেহাল অবস্থা। জীর্ণ পোশাক, কোনোমতে থাকার জন্য বেড়া বা টিনের ঘর বা নিছক পলিথিনের চালাঘরই তাদের অবলম্বন।

কয়েকজন যুবকের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের এলাকার শিক্ষার হার খুবই নগণ্য। কাছাকাছি নেই ভালো কোনো স্বাস্থ্যসেবা। শুষ্ক মৌসুমে বা যখন মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা চলে তখন তাদের অবস্থা আরো করুণ হয়ে যায়।

জলদাস পাড়া ঘুরে দেখা গেছে তাদের স্যানিটেশন ব্যবস্থাও উন্নত নয়। প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি পরিবারের খাবার পানির জন্য রয়েছে মাত্র একটি টিউবওয়েল।

বর্ষাকালে তাদের আরেক ত্রাসের নাম হলো বন্যা। বন্যার সময় তাদের অনেকেরই হতে হয় ঘরছাড়া অথবা আশ্রিত। নদী ভাঙ্গনের করুণ ইতিহাসও তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি অনেকটা দুর্বল করে দিয়েছে বলে আক্ষেপ করলেন অনেকে।

এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সরকারি সহায়তার প্রচলন থাকলেও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে তাদের এলাকায় তা ঠিকমতো এসে পৌঁছায় না। তাছাড়া নেই তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা যা তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সহায়তা করবে।

এই এলাকায় মাছ চাষের জন্য প্রচুর জলাশয় ও উপযোগিতা থাকলেও উপযুক্ত দিকনির্দেশনার অভাবে তাও পিছিয়ে রয়েছে। এলাকার মানুষ বহুবছর ধরে মাছ ধরার সাথে জড়িত থাকার ফলে মাথাপিছু চষের জমির পরিমাণ প্রায় নগণ্য।  ফলে তাদের বিকল্প আয়ব্যবস্থার জন্য যেতে হয় শহরে কলকারখানা, গ্যারেজ কিংবা গার্মেন্টসে শ্রম দিতে।

পড়ালেখার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও  অভাবের সংসার শিশু বা কিশোর বয়সেই তাদের বাধ্য করে পরিবারের হাল ধরতে।

এই অবস্থায় তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার জন্য সরকারি নজরদারি ও ব্যবস্থাপনা খুবই প্রয়োজন। কাচকি জাল দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ করার জন্য সরকারি ও আইনগত ব্যবস্থাপনা ও তদারকি তাদের স্বাভাবিক আয়ের উৎস সমৃদ্ধ করতে পারে। দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলা বাংলাদেশের মূলস্রোতে তাদের যুক্ত করাও এখন সময়ের দাবি।

মন্তব্য ৬ পঠিত