ক্যাটেগরিঃ কৃষি, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

ছাদকৃষি যখন কারো জন্য এক চিলতে অবসরের শখ তখন  অনেকে আবার  তাদের আয়ের ঠিকানা খুঁজছেন ছাদকৃষিকে ঘিরে।

আজ থেকে ২০ বছর পরের কথাও যদি চিন্তা করি ঢাকা শহর হবে প্রায় আবাদজমি শূন্য এবং নগরায়ণ হবে আরো অসংখ্য গ্রামের। বাংলাদেশকে যদি এসডিজি  অর্জন করতে হয় তাহলে ন্যূনতম ২২ শতাংশ বনভূমির অধিকারী হতে হবে। অথচ নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে আমাদের বনভূমি ভয়াবহভাবে কমে আসছে। তাই ছাদকৃষি এই লক্ষ অর্জনে রাখবে অকল্পনীয় ভূমিকা।

জার্মানিতে ১২ শতাংশ ছাদ সবুজ এবং টোকিও আইনে সব নতুন ছাদে ২০ শতাংশ সবুজ থাকতে হবে এমন নীতিমালা প্রণিত রয়েছে। জাপান সরকারের বিবেচনায় যদি অর্ধেক ছাদ সবুজ হয় তাহলে প্রতিদিন এয়ার কন্ডিশনে ব্যবহৃত জ্বালানি বাবদ এক মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর আইন ও নীতিমালা ছাদকৃষিকে উৎসাহিত করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।

ছাদকৃষির সফলতায় চট্টগ্রাম জেলার পটিয়ার পারভীন আক্তার ও পাহাড়তলী থানার শবনম আরা বেগমের জাতীয় বৃক্ষরোপণ পুরষ্কার অর্জন করার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। এইসব উদ্যোক্তারা ও সেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলো ছাদকৃষিকে অণুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছে।

ছাদকৃষিতে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি যেমন হাইড্রোপনিক্স, অ্যাকুয়াপনিক্স ব্যবহার করে গ্রিনহাউস তৈরির মাধমে অনেক প্রজাতির বিদেশি ফুল ও ফলমূল চাষ করা সম্ভব যা সাধারণ জমিতে চাষ করা দুষ্কর। এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ছাদের উপর ভারের পরিমাণ সিংহভাগ কমে যাবে এবং ভবনের অবকাঠামোতেও বিরুপ কোনো প্রভাব পড়বে না।

শুধুমাত্র ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে যতগুলো বহুতল ভবন রয়েছে তাদের ছাদ্গুলোর প্রতিটির এক তৃতীয়াংশ জুড়েও যদি উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে বিদেশি প্রজাতির ফলমূল চাষ করা হয় তাহলে তা দেশের  চাহিদা বহুলাংশে মেটাবে কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের সাথে কোনো প্রতিযোগিতা না করে।

বর্তমানে যারা ছাদকৃষি করে থাকেন তাদেরকে  জৈবসার ও গৃহস্থালী বর্জ্যকেই গাছের পুষ্টিগুণ হিসেবে ব্যবহার করা  এবং  ঘরোয়া ও সহজলভ্য পদ্ধতি ব্যবহারে পোকামাকড় দমন করতে হবে। প্রতিদিনই ব্যপক হারে গৃহস্থালী বর্জ্যের দুষণের কারণে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ। জৈব গৃহস্থালী বর্জ্যসমূহকে ছাদে স্বল্প পরিসরে কম্পোস্ট করে তা যদি গাছে প্রয়োগ করা হয় তবে তা শহরে গৃহস্থালী বর্জ্যের চাপ অনেকাংশে কমিয়ে দেবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এরকম উদ্যোগের অনেক উদাহরণ চাইলেই আমরা পেতে পারি ইন্টারনেটে। আমাদের দেশে প্রচলিত ছাদকৃষিতে ঋতুভিত্তিক ফলমূল, সবজি এবং ফুল চাষের সংখ্যাই অধিক যেখানে বহুবর্ষীয় বৃক্ষ জাতীয় ফলগাছের কলম করা স্বল্পদৈর্ঘ্য ও ওজনের গাছ লাগানো যেতে পারে। চীন, জাপানসহ পৃথিবীর শীর্ষ দেশগুলো গ্রীণহাউসভিত্তিক হর্টিকালচারের মশাল হাতে এগিয়ে চলেছে ছাদ ও ভবনভিত্তিক বাণিজ্যিক কৃষির মাধ্যমে।

ছাদে মাছ চাষের প্রসঙ্গে বলতে হয়- ছাদে যে শুধু খাদ্যপোযোগী মাছ চাষ করতে হবে এমনটা নয়, ছাদে স্বল্পপরিসর থেকে শুরু করে বাণিজ্যিকভাবেও রঙিন মাছ চাষ করা সম্ভব এবং অনেকেই তা করা শুরু করেছেন। রঙিন মাছ চাষ করার জন্য উন্নতমানের স্বল্পধারণক্ষমতা সম্পন্ন ট্যাঙ্ক ব্যবহার করা যায় যেগুলো থেকে পানি নির্গত হওয়া ও ছাদের অবকাঠামোতে ক্ষতির প্রভাব অত্যন্ত নগণ্য।

অনেকে ছাদে সোলার প্যানেল বসানোর জায়গার অভাব হবে এই ব্যাপারে ছাদকৃষিকে নিরুৎসাহিত করে। ছাদে সোলার প্যানেল বসাতে ছাদকৃষির প্রভাব বিবেচনায় বলতে হয় ছাদের সবচেয়ে উঁচু জায়গা যেমন সিঁড়িঘরের উপরে কিংবা আলাদা কাঠামো তৈরি করে তার উপর সোলার প্যানেল বসানো হয়।

ছাদবাগানের তাপমাত্রা কমিয়ে দেওয়া ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ কমাতে সাহায্য করার সুফল অনেকেরই জানা। ক্রমশ বর্ধ্মান বৈশ্বিক উষ্ণায়ণের ফলে নিকট ভবিষ্যতে পৃথিবী বাসযোগ্যতা আরো হ্রাস পাবে। ছাদকৃষির প্রসার বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও গ্রিন হাউস ইফেক্ট কমাতে সাহায্য করছে বলে পরিবেশবিদরা বলে আসছেন।

ছাদকৃষির দেশব্যাপী প্রসার ও প্রযুক্তিগতকরণের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বাসভবনের ছাদে গড়ে উঠেছে সমন্বিত ছাদকৃষি ব্যবস্থাপনা গবেষণা কেন্দ্র। যার সার্বিক তত্ত্বাবধানে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান  ড. শেখ আহমাদ আল নাহিদ।

ড. শেখ আহমাদ আল নাহিদের সঙ্গে আলাপে বলেন,  এখানে ছাদকৃষির প্রসার ও বাণিজ্যিকিকরণের উদ্দেশ্যে ছাদকৃষিতে উন্নত প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির ব্যবহার নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে একদল উদীয়মান গবেষক।

“ছাদকৃষিতে পানির অপচয় রোধে পানির পুনঃচক্রায়ন, মাছ ও গাছের পুষ্টি চক্র স্থাপন, মাছের প্রাকৃতিক খাবারের চাষ, শোভাবর্ধক জলজ উদ্ভিদের চাষ, দেশীয় রঙিন মাছের প্রজাতি উদ্ভাবন, দেশীয় শোভাবর্ধক মাছের রঙ উন্নতকরণ, রঙিন মাছের প্রজনন, ড্রাগন ফলসহ অন্যান্য বিদেশি ফলমূল চাষ, ভার কমাতে গাছের জন্য মাটির বিকল্প হিসেবে তুষ ও নারিকেলের খোসার ব্যবহার, সহজলভ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে অ্যাকুয়াপনিক্স, ভার্টিপনিক্স ও হাইড্রোপনিক্স তৈরি, ছাদে পরিবেশবান্ধব কম্পোস্টিং ইউনিট তৈরিসহ নানাবিধ বিষয় নিয়ে গবেষণা চলছে যা দেশের ছাদকৃষিকে সমন্বিত করবে।”

গবেষণা নিয়ে আশাবাদী এই শিক্ষক বলেন,  “এই গবেষণা নগরায়নের সাথে সবুজায়নের স্বপ্ন দেখে যা প্রতিটি ছাদকে গড়ে তুলবে মৎস্য ও কৃষির এক একটি বিজ্ঞানাগার হিসেবে। যাতে যুবসমাজ সমন্বিত ছাদকৃষি থেকেই হতে পারে স্বাবলম্বী।”

২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে এফএও বাংলাদেশে ছাদবাগান নিয়ে একটি টিসিপি (ট্যাকনিক্যাল কো-অপারেশন প্রজেক্ট) সই করে। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সায়েদ খোকন ঘোষণা করেছেন, যে ব্যক্তি ছাদবাগান গড়ে তুলবেন তাকে ১০ শতাংশ হোল্ডিং ট্যাক্স ছাড় দেওয়া হবে।

ছাদে বাগান বাধ্যতামূলক করে নীতিমালা করার দাবি জানিয়ে আসছে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) এবং বাংলাদেশ গ্রিন রুফ মুভমেন্ট (বিজিআরএম) অগ্রণী ব্যাংকের গ্রিন ব্যাংকিং প্রকল্পসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ছাদবাগান গড়ে তুলতে সহায়তা করে থাকে।

ছাদে যদি স্বল্পপরিসরে কৃষিকাজের ক্ষেত্র তৈরি করা যায় তবে তা নতুন প্রজন্মে কৃষিকাজের চেতনাও বহাল থাকবে।

 

মন্তব্য ০ পঠিত