ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

ধানমণ্ডি ১৫ থেকে বাসে উঠলাম। খুব সম্ভবত সন্ধ্যা ৬:১৫ এর দিকে। ঠেলাঠেলি করে বাসে উঠতে হল। উঠে দাঁড়িয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ।লোকাল বাসে বসার চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকাটাই উপভোগ্য মনে হয় ইদানীং। বড় বড় অক্ষরে লেখা ’মহিলা শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ৯ সিট’।তারমানে এখানে বসা যাবেনা। যদিও আমি কখনই কোন প্রতিবন্ধীকে বাসে তুলতে দেখিনি। মধ্যবয়সী চালকের ঠিক পিছনে দুটি সিট পাতা। মনে হচ্ছে এখানে কোন রেস্ট্রিক্শন নাই। অর্থ্যাৎ বসা যেতে পারে। লোকাল বাসের সিটে বসতে পারাটাই এক ধরনের প্রশান্তির ব্যাপার।

দাঁড়িয়ে থাকা চল্লিশোর্ধ একজন মহিলা  বললেন, ’এই ছেলে উঠোতো’।আমি কিছুক্ষনের মধ্যে বুঝতে পারলাম আমাকেই বলা হচ্ছে। যেহেতু মহিলা সিট না এটি, সেহেতু আমি উঠবনা। তাই শান্ত ভাবেই জিজ্ঞেস করলাম ’কেন উঠতে হবে আমাকে?’ জবাবে মহিলাটি বলল, ’তুমি তো বাচ্চা ছেলে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে,আমাকে বসতে দাও’। বাচ্চা ছেলে বলাতে আমি ডান-বাম তাকালাম। না কেউ অন্যরকম ভাবে তাকাচ্ছেনা আমার দিকে। আমি উঠে গিয়ে বসতে দিলাম। লজ্জিত হতে যাচ্ছি মনে হলে আমি এদিক ওদিক তাকাই। কেউ অন্যরকম দৃষ্টিতে না তাকালে আমি আর লজ্জিত বোধ করিনা!

ঢাকার জনসংখ্যার ঘনত্ব আর সেই অনুপাতে পাবলিক ট্রান্সপোর্টের পরিমাণ নিয়ে কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করছি না। কম-বেশি সবাই জানে এবং ভুক্তভোগীও। জাতি হিসেবে আমরা কর্মঠ। বাসে ঠেলেঠুলে, লটকিয়ে, ঝুলে চলাফেরা করার কঠিন অভ্যাস আমাদের আছে। মোট কর্মজীবী মানুষের ৩৩ ভাগই নাকি নারী! স্কুল,কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীরর মধ্যে ৪০ ভাগই ছাত্রী। মোহাম্মাদপুর থেকে মতিঝিল, কাকরাইল, রামপুরার দিকে যাতায়াতকারি বড় বাসগুলোর সিট সংখ্যা খুব সম্ভবত ৭০-৭৫টি। ছোটগুলোর ৪০-৪৭টি। প্রতি ২০০ জনে ৩৩+৪০=৭৩ জনই নারী যারা কিনা প্রতিনিয়ত পড়াশোনা, কাজকর্মে পুরুষদের সাথে সমানভাবে জড়িত। অথচ এতসংখ্যক নারীর জন্য বাসে মাত্র ৯টি সিট!

চট করে কয়েকটি উপায় মাথায় আসল-  (১)সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় কোন বিশেষ সিট থাকার প্রয়োজন নাই।একে ওপরের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলা যেতে পারে। (২) ৯টি সিট দিয়ে কার্যত কিছুই হয়না। নারীদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তাই সিটের সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে। (৩)আর না হয় ঢালাও ভাবে মহিলা বাস নামিয়ে দেয়া যেতে পারে।

হেলেদুলে বাস ভালই যাচ্ছিল। হঠাৎ ব্রেক চাপ দেয়ায় এতক্ষন ধরে যত্ন করে যা ভাবছিলাম তা থেমে গেল। ইদানীং যত্ন করে ভাবতে ভালই লাগে। ৯টি বিশেষ সিটের বামে দরজার পাশের ১টি সিট খালি হতে যাচ্ছে। আমি আশপাশ তাকিয়ে বুঝতে পারলাম তিন থেকে চার জনের চোখ সিটের সঙ্গে বেঁধে আছে।বাসে সিট দখলের যুদ্ধে আমি ভালই পারদর্শী। সেটা আরেকবার প্রমাণ করতে পেরে গর্বিত বোধ করলাম। অবশেষে একটু ছেড়ে বসা যাবে। ঠাসা মানুষের ভিড়ে হেডফোন লাগিয়ে একটা গান শুনলে খারাপ হয়না।মমতাজের লোকাল বাস গানটাই পারফেক্ট।

সিটি কলেজের সামনে বাস থামল। নামার সময়ে আমরা সাধারণত হুড়োহুড়ি করিনা।এক কথায় করতে পছন্দ করিনা।আমি একটু সামনে নামব তাই বসে রইলাম। পিছন থেকে কয়েকজন নারী সামনে আগাচ্ছে। দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে টপকে এগিয়ে আসা এতটুকু জায়গার মধ্যে একটু কষ্টসাধ্য ব্যাপারই বটে। মহিলা বলে কষ্টটা বেশি হচ্ছে বুঝতে পারছি। নেমে যাওয়ার সময় আমার মনে হল হিটলার কখনো লোকাল বাসে যদি চড়তেন তাহলে একটি রণকৌশল তিনি আবিষ্কার করতে পারতেন। আর সেটি হতে পারত কোমর (পশ্চাদ্দেশ)। সম্ভবত সব দেশের মিলিটারি তা রপ্ত করতেন। ভেবে সাময়িক বিনোদন পেলাম। যদিও আমার ডানপাশের চোয়ালটা এখনো ব্যাথা করছে। ভাগ্য ভাল কোমর এবং গালের ঘর্ষনের ফলে তৎক্ষনাৎ কোন তাপ উৎপন্ন হয়নি। বাস থেকে নেমে গেলাম। বেশিক্ষন এক বিষয় নিয়ে ভাবা যাবেনা । তাই অল্প কিছুক্ষনের মধ্যে এটাই ভাবলাম যে নারীদের জন্য বিশেষভাবে মাত্র ৯টি সিট রাখার চেয়ে না রাখাই ভাল!