ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

তথ্যপ্রযুক্তি এখন এগিয়ে চলছে দুর্বার গতিতে।সেই সাথে তাল মিলিয়ে মানুষও হয়ে যাচ্ছে যথেষ্ট আরামপ্রিয়। কাগজের পত্রিকার চাইতে অনলাইন পত্রিকা পড়তেই সবাই এখন বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এদের মধ্যে তরুন,শিক্ষার্থী, চাকুরীজীবীদের সংখ্যাই বেশি।কাগজের পত্রিকার চাইতে অনেক বেশি সহজপ্রাপ্যতা, বৈচিত্র্যতা অনলাইন পত্রিকাকে জনপ্রিয় করে তুলেছে।জায়গা করে নিয়েছে মানুষের হাতের মুঠোয় মুঠোয়।এটা নি:সন্দেহে প্রশংসনীয়।

কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য এতে করে মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে মৌলিক এবং বস্তুনিষ্ঠ খবর থেকে। শুধুমাত্র দৃষ্টি আকর্ষণ, ব্যক্তিগত ব্যবসা কিংবা ভিজিটর বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে গড়ে উঠেছে সহস্রাধিক বেনামি,সস্তা, ফেইক নিউজপেপার। ব্যাঙের ছাতার মতো ছড়িয়ে পরেছে এগুলো। মুখরোচক এবং আকর্ষণীয় হেডলাইন ব্যবহার করে খবরের আংশিক, বানোয়াট,মনগড়া এবং অপ্রাসঙ্গিক তথ্য দিয়ে খবর প্রচার চলছে। যা সাধারণ পাঠকদের সাথে রীতিমতো প্রতারনা এবং হয়রানীর শামিল। যা তথ্যাধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন।

বর্তমানকালে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো হয়ে উঠেছে এদের অভয়ারণ্য এবং বিচরণস্থল । বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় মানুষ খবর সরাসরি নিউজ সাইট গুলোতে গিয়ে না পড়লেও বিনোদন, রাজনীতি,খেলাধুলা সব ধরনের নিউজ পেয়ে যান এখানে অনায়াসে, যা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দ্বারা শেয়ারকৃত।লিংক-এ গিয়ে দেখা যায় সেখানে হেডলাইনের সাথে পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক এবং অপ্রয়োজনীয় তথ্য সংবলিত,উদ্ভট সব খবর সরবরাহ করা হয়েছে অথবা ই-কমার্সের কোনো সাইটে প্রবেশ করিয়েছে। খবরের প্রথমাংশে কিংবা শেষাংশে কোথাও কোনো প্রতিবেদকের নাম খুজে পাওয়া যায়না। একজনই প্রতিবেদক আছেন তিনি হচ্ছেন ” নিজস্ব প্রতিবেদক”। এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে শুধু ইমেইল আইডি ছাড়া এদের কার্যালয় কোথায়,এরা কারা এমন কোনো তথ্যই আপনি পাবেন না সেখানে!

বর্তমানে অল্প কিছু টাকা দিয়েই একটি ওয়েবসাইটের ডোমেইন কেনা যায়। সেখানে উল্লেখনীয় নয় যে এই ক্রয়কৃত ওয়েবসাইটটি কি কাজে ব্যবহার করা হবে!! কাজেই ব্যক্তিগতভাবে যে কেউ চাইলেই তার পছন্দের যেকোনো নামে ডোমেইন কিনে নিজেই পত্রিকা খুলে,নিজেই সম্পাদক,প্রতিবেদক, কলামিস্ট বনে যেতে পারেন। ঘরে বসে তখন তিনি যা লিখবেন তাই হয়ে যাবে খবর!

তবে খবরগুলো নিয়ে কোনো জবাবদিহিতা কথিত পত্রিকা কর্তৃপক্ষের আছে কিনা সে বিষয়ে আমার জানা নেই। থাকলে অবশ্যই দু-এক জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও নিশ্চয়ই দেখা যেতো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিভিন্ন আলোচিত ঘটনা নিয়ে প্রচার করা হয় বিভ্রান্তিকর তথ্য। এতে করে পাঠক শুধুমাত্র বিপথগামীই হননা বরং পরতে হয় বিব্রকর পরিস্থিতিতেও।এদের কিছু নমুনা নিচে দেয়ার চেষ্টা করলাম:

১.জীবিত মানুষকে মৃত বলে হেডলাইন

সম্প্রতি চিত্রনায়িকা অপু বিশ্বাসের মৃত্যুর সংবাদ একাধিক অনলাইন পত্রিকার মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পরে এবং নিকটাত্মীয়রা ফোন করে তার জীবিত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হন। এমনটিই বলছিলেন অপু বিশ্বাস একটি টিভি অনুষ্ঠানের সাক্ষাৎকারে। যা ছিল তাঁর জন্য খুবই বিব্রতকর একটি পরিস্থিতি।

সম্প্রতি অন্য একটি অনলাইন নিউজপেপারের হেডলাইন চোখে পরলো ” না ফেরার দেশে চলে গেলেন তরুণ পেসার রবিউল ”

২. খবরের পেছনের খবর,

কিছু কিছু খবর আছে যেগুলো অন্য কোনো পত্রিকায় পাওয়া যায়না শুধুমাত্র সেই পত্রিকাতেই পাওয়া যায়।বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খবর গুলোতে কোনো শক্ত রেফারেন্স ব্যবহার করা হয়না। সেক্ষেত্রে ‘শোনা গেছে’, “ধারনা করা হয়”, “প্রতক্ষ্যদর্শীরা বলেছে”, “তথ্য আছে” ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে খবরের ক্ষেত্রফল বাড়ানো হয়। এবং আজগুবি গল্প লিখে পাঠকদের বিভ্রান্ত তথা সময় নষ্ট করা হয়।

৩. দেখুন ভিডিওসহ

আলোচিত অনেক সংবাদের এক্সক্লুসিভ ভিডিও থাকে তাদের কাছে যেগুলো প্রথম সারির টিভি সংবাদেও পাওয়া যায়না। উৎসুক পাঠকেরা লিংকে ক্লিক করার সাথে সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে যান অশ্লীল কোনো সাইটে। যা মোটেও কাম্য নয়।

এ ধরনের পত্রিকা ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলছে। যেগুলোতে লাগাম পরানো এখন সময়ের দাবি। নইলে মানুষ অনলাইন পত্রিকার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলবেন এবং পাঠকদের অনিহা চলে আসবে।

সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা যাঁরা ধীরে ধীরে তথ্য প্রযুক্তির দিকে নির্ভরশীল হচ্ছেন এবং সমসাময়িক বিষয়াবলী থেকে জ্ঞান নিচ্ছেন। তাঁরা বিভ্রান্তিকর তথ্য পাওয়া মানে তাদের ভিত্তি কে নষ্ট করে দেয়া এমনকি ভবিষ্যৎ ইতিহাস হুমকির মুখে।

গবেষনা,শিক্ষা, থেকে শুরু করে সকল ক্ষেত্রেই সংবাদপত্র একটি শক্ত রেফারেন্স। আর সেই রেফারেন্সই যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয় তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি গোলকধাঁধায় পরে যাবে এটা অন্তত নিশ্চিত।

একজন সাধারন নাগরিক হিসেবে বিশুদ্ধ,বস্তুনিষ্ঠ, এবং নির্ভরযোগ্য খবর প্রাপ্তি আমার অধিকার। এবং সকল বিভ্রান্তি দূরীকরণের দায়িত্ব সন্দেহাতীতভাবে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের উপর বর্তায়।

সেক্ষেত্রে সরকারের কাজকে সহায়তা করার জন্য আমার কিছু ব্যক্তিগত সুপারিশ জানাচ্ছি:

১. অনলাইন পত্রিকার জন্য একটি সরকারি নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা। যেখানে প্রয়োজনীয় যাচাই বাছাই সাপেক্ষে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
২. প্রতিটি অনলাইন পত্রিকার প্রচ্ছদে ভেরিফাইড / নিবন্ধিত হিসেবে একটি বিশেষ চিহ্ন প্রদান করা। যাতে করে পাঠকেরা বিভ্রান্তি এড়িয়ে আস্থা নিয়ে খবর পড়তে পারেন।
৩. শুধুমাত্র অনলাইন পত্রিকার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে আইন প্রণয়ন করা।
৪. যথোপযুক্ত আইন করে সকল পত্রিকার সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা।
৫. বেনামি পত্রিকাগুলোকে সনাক্ত করে এদের বন্ধের ব্যবস্থা করা।

পুনশ্চ:
আমি ব্যক্তিগতভাবে অনলাইন পত্রিকা পড়ার ক্ষেত্রে www.bdnews24.com এর খবর পড়তেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি এবং একজন নিয়মিত পাঠকও বলতে পারেন। নিত্যদিনের মতো আজও খবর পড়ার জন্য ওয়েবসাইটটিতে ঢুকলাম এবং দেখলাম চমকপ্রদ সব খবর। প্রতিটি খবরই বেশ সাম্প্রতিকতম এবং আলোচিত। সত্যিই অসাধারণ লোভনীয় কিছু খবর যেই টাইপের হেডলাইন দেখলে না পড়ে থাকতে পারবেনা কেউই, আমার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হলোনা। শুরুতেই যেটি পরলাম-

“আর দেশে ফিরছেন না খালেদা জিয়া : হাল ধরছেন বদরুদ্দোজা ” ১৭ জুলাই,২০১৭

খবরটি পড়ার পর খবরের লেখার ধরন এবং রেফারেন্স সবকিছু মিলিয়ে আমার মধ্যে কেমন যেনো এক ধরনের অতৃপ্তিকর অনুভূতি কাজ করলো।খানিকটা ধোঁয়াশা ধোঁয়াশা মনে হলো।খবরের সত্যতা নিয়েও মনে একটু একটু সন্দেহ আসছিলো কিন্তু পরক্ষনেই ভাবছিলাম নাহ এরকমটি হওয়ার কথা না।এই পত্রিকা আমি নিয়মিত পড়ি, সন্দেহজনক খবর তো আজ পর্যন্ত দেখিনাই এখানে! যাইহোক!

Screenshot_5

৫ মিনিট পর আবিষ্কার করলাম ভুলটা আমারই ছিল, টাইপ করতে গিয়ে ভুলে www.bdsnews24.com টাইপ করে ফেলায় আমি ভুল জায়গায় পৌছে গিয়েছিলাম। কিন্তু জায়গাটি একদমই অপরিচিত লাগছিলোনা আমার কাছে!!এর প্রচ্ছদ, লেখার ফন্ট, ডিজাইন,লেগো সবকিছু দেখে খুব দ্রুত বুঝা মুশকিল যে এটা bdnews24.com নয়।

মূলত এর পরই আমি এই লেখাটি লেখার প্রয়োজন অনুভব করি। আমার উদ্ধৃত পত্রিকাটি যে ভুয়া আমি সেরকম কিছু বলছিনা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কোনো পত্রিকার সাথে রুপের অভিন্নতা এবং উদ্ধৃত খবরের প্রেক্ষাপট এবং বস্তুনিষ্ঠতার আলোকে আমার একান্ত কিছু পর্যবেক্ষণ ও মতামত তুলে ধরার চেষ্টা করেছি,কারোর সাথে সাংঘর্ষিক হলে দু:খিত।