ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

একমাত্র মেয়েটার বয়স দেড় পেরোলো। খুব অস্থির আর সদা ব্যস্ত। ভাবলাম ওর এখন এটাসেটা নতুন খাবারের অভ্যাসটা গড়ে তোলা দরকার। বাজার করি নিজেই। গড় চাকরিজীবীদের যা অবস্থা আমারও তাই। মাসের শেষের দিনগুলো অনেক দীর্ঘ হয়ে দেখা দেয় প্রতিবারেই। নিচের ঘটনাগুলো আমার নিজেরই; হয়ত আপনারাও তার মুখোমুখি হয়েছেন:

১। বাজার ভর্তি আম, রাজশাহী, চাঁপাই… আরো কত জায়গার, কত জাতের আমে সয়লাব। প্রথম দিকে যখন বেরিয়েছে তখন কিনিনি, ভেবেছিলাম অপরিণত অথবা ভারতীয় আম, কি না কি দিয়ে রেখেছে। আর এত দাম দিয়ে কিনে খাবার কি দরকার? এখন যখন বাজার ভর্তি, তখন দেশের আম কিনতে আর কি সমস্যা! অবশেষে কিনেই বাড়ী ফিরলাম। একদিন পর মৌ মৌ গন্ধ পেয়ে খেতে গিয়ে আবিস্কার করলাম ভেতরে ঝাঁঝাঁলো গন্ধ। বুঝতে আর বাকি রইল না, এ আম ঔষধ দিয়ে পাকানো।

২। আমের দোকানে যখন কিনছিলাম, পাশেই এক ঘর্মাক্ত লোক এসে হাজির। এসেই দোকানদারকে অভিযোগ করল, ভাই একটু আগে যে ১০০ লিচু কিনেছিলাম তার ৫টিও খেতে পারিনি। উপরে দেখতে ভালো হলেও ভেতরে সব পঁচা। যে লিচুগুলো তখনো ঐ দোকানে সাজানো ছিলো, দেখতে ভালই টাটকা আর লাল দেখাচ্ছিল। যেন লাল রংয়ের আগুন জ্বলছে! তখন যদিও ততটা খেয়াল করিনি, কিন্তু এখন আর বুঝতে বাকি রইল না, ওগুলোতেও ঔষধ দেয়া ছিল।

৩। আম, লিচুর যখন এই অবস্থা, অন্য একদিন বাজার থেকে ফ্রেশ সবুজাভ চাঁপা কলা কিনে নিয়ে আসলাম। ভাবলাম, এতো তেমন উচ্চ জাতের কলা নয়, অনেকেই পছন্দ করেনা। এর একদিন না যেতেই সব কলা একসাথে পেকে গেল! আর তার পরদিন…… অতি পাকা কলায় আবার সেই পুরোনো ঝাঁঝাঁলো গন্ধ! এবারো না বুঝে উপায় আছে বলুন?

৪। বিদেশী ফল আংগুর, কমলা, আপেলের কথা না হয় বাদ দিলাম, গত কয়েকদিন আগে, পেপারে ছবি দেখে জানতে পারলাম, পেঁপে, কাঁঠালও নাকি কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো হচ্ছে ইদানিং। পাঠক, এখনো বেল মাথা হইনি যে এরপরও আবার কাঁঠাল কিনতে যাব।

৫। আমার বাড়ী চট্টগ্রাম না হলেও, মা-বাবার সরকারী চাকুরীর কারনে জীবনের প্রায় পুরোটাই কেটেছে সেই শহরে। বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু সাগরের মাছের সাথে পরিচয় সেখান থেকেই। তাই বাচ্চার জন্য আয়োডিনের ভাল উৎস হবে মনে করে ঢাকার বাজারে সাগরের মাছ কিনতে যাওয়া। যদিও সাগরের মাছ ঢাকায় একটু কম পাওয়া যায়, তবু যা পেলাম তা দেখে আমার চোখ কপালে ওঠার যোগাড়! সেগুলো এতই তাজা দেখাচ্ছে, যেন আমার দিকে জীবিত তাকিয়ে আছে, যেন এই মাত্র সাগর থেকেই উঠে এসেছে! যে মাছ সাগর থেকেই বরফ দিয়ে ট্রলারে করে স্হলে আসতে সময় লাগে কমপক্ষে ৫-৭ দিন, তাও আবার ঢাকা শহরে এলো এত তাজা অবস্থায়! ফরমালিনের ভয়ে সাগরের মাছ আর কেনা হলনা।

৬। বাজার থেকে মুরগী আর ডিম কেনেন সবাই। পেপারে একটা গবেষনা প্রতিবেদন পড়ে জানতে পারলাম, ফার্মের মুরগী আর মাছকে ট্যানারির ১২০ রকমের কেমিক্যাল মিশ্রত বর্জ্য মাংসের গুড়া খাওয়ানো হচ্ছে। তারা অনুসন্ধান করে ইতিমধ্যে বাজারের মুরগী ও ডিমে সেইসব ক্যানসারের জন্য দায়ী বিষাক্ত কেমিক্যাল এর উপস্থিতি পেয়েছেন। এটা জানার পরে, আপনার অনুভুতি কেমন হবে?

৭। ভাত আমাদের মুল খাদ্য। একটা প্রতিবেদনে এসেছে, আমরা বাজার থেকে যে দেশি চাল কিনে খাই, তাতে আর্সেনিক ও বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। আর্সেনিক এসেছে মাটি থেকে আর বিষাক্ত উপাদান এসেছে মুলত: ভেজাল সার, অপরিকল্পিত অতিরিক্ত সার প্রয়োগ ও কলকারখানার দূষণ থেকে।

৮। আমি শহরে বড় হয়েছি। গ্রামের খাঁটি অনেক কিছুর স্বাদই আমার জানা নেই। বছর দুয়েক আগের কথা, নবাবগন্জের এক গ্রামে বেড়াতে গিয়ে পেয়েছিলাম খাঁটি দুধের স্বাদ! সেই দুধের রং ছিল লালচে, মিষ্টি স্বাদ আর সদ্য দোয়া দুধের উপর ঘন ফেনার স্তর। আমি নিশ্চিত আমার মত যারা ছোটবেলা থেকে গরুর দুধ পান করতে পছন্দ করতেন না, তারাও একবার এমন খাঁটি দুধের স্বাদ পেলে জীবনে আর ভুলতে পারতেন না। যে কারণে এই প্রসঙ্গের অবতারনা, টিভি খুললেই নামি-দামি পরিচিত ব্র্যান্ডের চটকদার প্যাকেটজাত তরল দুধের কত কমার্শিয়াল, কিন্তু কোনটির স্বাদ-ই সেই খাঁটি দুধের ধারেকাছেও নেই। এগুলো আসলেই কি খাঁটি ?? হয়ত কিছুটা দুধ আছে, কিন্তু অনেক পুষ্টিগুণ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। আর বিদেশ থেকে আমদানী করা দুধের কথা আর নাই বললাম। মাঝে মাঝে গবেষনার জন্য তো তারা ‘মেলামাইন” কিংবা নিত্যনতুন কত কিছুই মিশ্রিত করে। আমাদের দেশে এত কম্পানি, এদের একটিও কি খাঁটি দুধ বাজারজাত করতে পারেনা? অন্তত শিশুদের কথা ভেবে??

ওপরের এই কথাগুলোর যেন শেষ নেই। আমরা এদেশের মানুষ তবে কি খেয়ে বাঁচবো? আমাদের সন্তানদের কি খাওয়াব? আমরা আমাদের সন্তানদের মুখে যা তুলে দিচ্ছি এতো বিষ ছাড়া অন্য কিছু নয়! আমরা তো জেনেশুনে এ কাজ করতে বাধ্য হচ্ছি। এতো যেন আত্মহত্যার শামিল। যারা খাদ্যে এই বিষ মেশাচ্ছে, বিষ মেশানো খাদ্য উৎপাদন করছে, তাদের কি বিবেক নেই? তাদের কি পরিবার নেই? তারা তো নিরবে হত্যা করে যাচ্ছে দেশের মানুষকে। আসুন আমরা এখুনি সোচ্চার হই, সচেতন হই। আমাদের সম্মিলিত আওয়াজই পারে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে রক্ষা করতে।

ট্যাগঃ:

মন্তব্য ৩ পঠিত