ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

অস্তিত্ববাদীদের মত আমিও আমার অস্তিত্ব নিয়ে ভাবি। বিপন্ন ব্যক্তি-মানুষের জীবনে কান্টের দর্শন আর হেগেলের দ্বান্দ্বিক মতবাদ সবকিছুই যেমন অর্থহীন হয়ে যায় তেমনি আমার ব্যক্তি জীবনে অস্তিত্ববাদী মূল বক্তব্য খুব বেশী খাটছে না।

কিয়ার্কেগার্দ বলেছিলেন ব্যক্তির সিদ্ধান্ত দ্বারা নাকি ঘটনাবলীর গতি-প্রকৃতি নিয়ন্ত্রিত হয়। আবার নীতশে ব্যক্তি বিশেষের ইচ্ছা, উদ্দেশ্য, আশা, সিদ্ধান্ত কেই পরম সত্য বলে মনে করতেন। কিন্তু আমার মত ক্ষমতা হীন মানুষদের ইচ্ছা-চেতনা দ্বারা আসলেই কি কিছু নিয়ন্ত্রিত বা পরিচালিত হয়, যেখানে প্রকৃতপক্ষে ব্যক্তি হিসেবে আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছা গুলোকে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বিভিন্ন বেড়াজালের জন্য বাইরেই আনতে পারছিনা সেখানে আমার মানবিক অবস্থা আমার ইচ্ছার বা আমার কর্মের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত থাকতে কিভাবে পারে? আমি কি আমার অস্তিত্বকে উদ্ভাসিত করতে পারি? তাই আমার কাছে হাইডেগারই শ্রেয়। তিনি সঠিক ভাবেই বলেছেন মানব অস্তিত্ব উদ্বেগ ও ভয়ের। যদিও তিনি এই ভয় কে শুধুমাত্র মৃত্যুভয়ের মাঝেই সীমাবদ্ধ করেছেন কিন্তু ভয় আসলে সার্বিক; ভয় চিরন্তন। আজকের দুনিয়াতে সবচেয়ে বড় ভয় হল “আমি কি ভোগবাদী হতে পারবো না??”, “মৃত্যুর মাঝে বিলীন হবার আগে আমি কি দুনিয়ার সব সাধ-আল্লাদ ভোগ করতে পারবো না?” আমি খুবই বাস্তব একটি উদাহরণ দিতে চাই, যারা সমাজবিজ্ঞানে পড়ে তাদের প্রায় সবার মাঝেই একটা ভয় আমি দেখেছি, তারা সবাই বিশ্বাস করে বিপর্যস্ত এই পৃথিবীকে মুক্ত করতে সমাজবিজ্ঞানই একমাত্র ভরসা কিন্তু ভয় আর উদ্বেগ তাদের অন্য জায়গায়, সমাজবিজ্ঞানে পড়ে আসলেই কি কোন ভবিষ্যৎ আছে? ভুখা পৃথিবীকে মুক্ত করতে গিয়ে আমাকে আবার ভুখাদের কাতারভুক্ত হতে হবেনা তো?

হাইডেগার বললেন মানুষের অস্তিত্বের এসব সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যক্তির বাইরে অন্য কোন অতিপ্রাকৃত(transcendental) শক্তির উপর ভরসা করা অর্থহীন। তিনি সবকিছুর শেষ দেখেছেন ‘শূন্যতার’ মাঝে। যদি সবকিছুর মানে শূন্যই হয় তবে আমার বেচে থাকার কি অর্থ? আমি কি তবে শুধু পরাধীন হতেই পৃথিবীতে এসেছি? এর উত্তর দিলেন অস্তিত্ববাদী দর্শনের আরেক প্রবাদপুরুষ জ্যাঁ পল সার্ত। তাঁর মতে মানুষ জীবনে সব দিক থেকেই ক্রমাগত চাপের সম্মুখীন হয়, এবং একধরণের অর্থহীন জগতেই তার বসবাস। কিন্তু তিনি পয়গম্বরের মত আমাদের আশার বাণী শুনালেন- যত নিপীড়নের মাঝেই থাকুক তার ভাগ্যের ও জীবনের নিয়ন্ত্রক সে নিজে। মানুষ স্বাধীন, সে তার সচেতন কাজের জন্য দায়ী কারণ সে বিবেক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, কোন অতীন্দ্রিয় সত্ত্বার দ্বারা নয়। এখানেও আমার অস্তিত্ব গোলমেলে হয়ে গেল। আমি আরেফিন ফিডেল নাহয় আমার সচেতন কর্মকাণ্ডের দায়ভার নিজের উপর বর্তালাম, কিন্তু আমি তো আমার অস্তিত্ব কে প্রকাশ করতে গিয়ে নানাবিধ অসচেতন কাজও করে ফেলি, এবং এটাই স্বাভাবিক, সেইসব কাজের দায়ভার তাহলে আমি কাকে দিব? পরমাত্মা বা ঈশ্বরের অস্তিত্বকে খারিজ করে সার্ত মানুষের স্বাধীনতাকে মুখ্য হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু সবচেয়ে গোলমাল বোধ করছি এখানে। আরেফিন ফিডেল যদি এত স্বাধীনই হবে তবে সে কি নিজের ইচ্ছায় মরতে পারবে, হাইডেগারের চরম শুন্যতায় আমার পৌঁছানোটা আসলে কার হাতে? যে অস্তিত্বকে আমি সারা জীবনভর নানা তুলির আঁচড়ে মিনিংফুল করার চেষ্টা করে গেলাম সেই অস্তিত্বের যবনিকাপাতটা কেন আমার ইচ্ছা অনুযায়ী হবেনা? আমার অস্তিত্বের শেষ তুলির আঁচড়টা তাহলে কে দিবে??