ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

বাংলাদেশ এনজিও ব্যবসায় (NGOism) চালু হবার গোঁড়া হাতড়ালে আমরা দেখব সামাজিক কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এর যাত্রা শুরু। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেল অধিকাংশ এনজিও ঋণ ব্যবসাকে তাদের প্রধান কার্যক্রমে পরিণত করছে। ক্ষুদ্রঋণ প্রদানের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন করার বিপ্লব শুরু হল চারিদিকে। আর এই বিপ্লবের যিনি স্বপ্নদ্রষ্টা তিনি আমাদের ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ইউজারি ক্যপিটালের সাথে উন্নয়নের সম্পর্ক একেবারেই ডায়ালেক্টিক- এটা খুব ভালোভাবে জানা সত্ত্বেও তিনি ক্ষুদ্রঋণের নামে সেই প্রথাকেই আবার চালু করলেন। শুরু হল ক্ষুদে-
মহাজনী প্রথা। এদেশে ঋণ গ্রহীতাদের দৃশ্যমান বিকাশ হোক আর না হোক এসব মহাজনেরা সবাই ফুলে ফেঁপে ঢোল, আর কর্পোরেট মায়াজগতের ঢোলকনাথ হয়েছেন বৈকি।

বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে বোঝার জন্য এনজিওগুলোর ভূমিকা নিরূপণ করা এখন অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সমস্যা হল সেই ফান্ডামেন্টাল ভূমিকা অনুসন্ধান না করে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যক্তিগত ক্ষোভের আগুন নেভাতে এক আত্মঘাতী খেলায় মেতেছে। সেই প্রসঙ্গে আজকে কিছু লিখবো না। এই নোটের প্রতিপক্ষ শুধুই প্রথম আলো আর আমাদের সুশীল সমাজের কিছু সুশীল।

প্রথমে আসা যাক ড. ইউনূসের নোবেল প্রাপ্তি প্রসঙ্গে। একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে ড. ইউনূসের খুব ভালো করেই জানা ছিল নোবেল শান্তি পুরস্কারের স্বতন্ত্র রাজনীতি, অর্থনীতি ও আদর্শগত পজিশনটা কী। তবুও তিনি তা সানন্দে গ্রহণ করেছেন। আমরাও আনন্দে গা ভাসিয়েছি, দিগ্বিদিক কোনও চিন্তা না করেই। “রাজাই কইছে চুদিরভাই, আনন্দের আর সীমা নাই”- ব্যাপারটা অনেকটা এই রকম আর কি। বাংলাদেশে কর্পোরেট জগতের প্রধান এবং সুপ্রতিষ্ঠিত মুখপাত্র প্রথম আলো গ্রামীণ ব্যাংকজনিত সকল ইস্যুতে এই একই গান গেয়ে যাচ্ছেন। তবে গায়ক ভিন্ন ভিন্ন; কখনও গায়ক তাদের হুমায়ূন আহমেদ, কখনও জাফর ইকবাল, কখনো বা আনিসুল হক, কখনও বা ফরেন মাল হাসান ফেরদৌস। তাদের সকলের একই বয়ান ড. ইউনূস বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্মানিত মানুষ। সুতরাং তাঁকে এভাবে হেনস্তা করা যাবে না। হ্যাঁ, তাদের সাথে আমিও একমত। সরকার যে পদ্ধতিতে গ্রামীণ ব্যাংক প্রসঙ্গটা নাড়াচাড়া করছে তা অবশ্যই নিন্দার দাবি রাখে। কিন্তু আপনারা খালি মুদ্রার এক পিঠ নিয়ে কথা বলবেন তা কেন? ড. ইউনূস কিংবা গ্রামীণ ব্যাংক প্রসঙ্গে আপনারা কেন ক্রিটিক্যাল হচ্ছেন না? ড. ইউনূসের বিদেশি খেতাবের আড়ালে আপনারা লুটপাট- শোষণকে লুকিয়ে ফেলছেন কেন? তাঁকে শান্তিতে যে নোবেল দেওয়া হয়েছে সেটা আসলে কার শান্তি? রাস্তার ভিখারিদেরও তিনি পুঁজিবাদী ব্যাংক ব্যবস্থার সুদদাতা বানাতে পেরেছেন এটাই তার সবচেয়ে বড় অবদান। এর জন্য সকল কর্পোরেট পুরস্কার তো তার পাওনা।

নোবেল লরিয়েটদের কি সাত খুন মাফ? এই ড. ইউনূস যদি গ্রামীণ জনপদের কথা এতটাই ভেবে থাকেন তবে ১৯৯৮ সালে জেনেটিক কৃষি প্রযুক্তির বাজারজাতকারী হিসেবে সারা দুনিয়ায় ধিকৃত এবং উন্নত বিশ্বে কোণঠাঁসা হওয়া প্রতিষ্ঠান মোনসান্তোর কাছ থেকে গ্রামীণ-মনসান্তো সেন্টার খোলার জন্য দেড় লাখ মার্কিন ডলার কেন নিয়েছিলেন? জিএম প্রযুক্তির কৃষি ও আগাছানাশক বাংলাদেশে বাজারজাতকরণের মাধ্যমে দেশের দরিদ্রতাকে জাদুঘরে পাঠানোর জন্য?

বাঙ্গালীর ভাগ্য ভালো ছিল যে ভারতীয় দার্শনিক ও পরিবেশবাদী কর্মী বন্দনা শিবা, বাংলাদেশের প্রয়াত কবি ও আমলা আবু জাফর ওবায়দুল্লাহদের ‘নয়া কৃষি আন্দোলন’ সেবার তাঁকে পিছু হটিয়ে ছিল ( দেখুন: ড. মুহাম্মদ ইউনূস : পুরস্কার প্রাপ্তির পেছনের রাজনীতি || ওমর তারেক চৌধুরী, দ্রোহ)। সে সময়েও আপনারা মুখে তালা এঁটেছিলেন। আজও আপনারা ঠিক ততটাই নিশ্চুপ। আবাল জনগণ শ্রদ্ধা করে আপনাদের পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল বানায় আর আপনারা পাবলিকের মুখে লাথি মেরে পক্ষ নেন ইউনূসের মতো রক্তচোষাদের! কোথায় থাকে আপনাদের বদলে যাওয়ার বুলি, যখন এই ইউনূস হাত মেলায় গণহত্যাকারী সিমন পেরেজের সাথে? হোলসিম ফাউন্ডেশন, প্লানেট ফাইনান্স, সিটি ব্যাংক, সিটিগ্রুপ, কেইন প্রপার্টি কোম্পানি, গাইডস্টার, মাইক্রোসফ্ট- এরকম শত শত বিতর্কিত পুঁজিবাদী শক্তির সাথে মিত্রতা করে তিনি দারিদ্র্যকে কোন জাদুঘরে পাঠাতে চেয়েছেন?

সমাজকর্মী থেকে তিনি নিজেকে একজন প্রধান সারির ব্যবসায়ী, লবিস্ট, ব্রোকারে পরিণত করেছেন। প্রভাবশালী ব্যবসায়ী হিসেবে বিল গেটস, ওয়ারেন বাফার্ট, মাইকেল ডেলদের সাথে তার নামও এসেছে বহুবার। ব্যবসাই যদি করবেন তবে গরিবি হাটানোর মুখোশ পরে কেন? আমার আপত্তিটা এখানেই। স্পষ্টত তিনি দেশ-জাতি, দেশের অভাব, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, সর্বোপরি গ্রামীণ ব্যাংকের সকল ঋণগ্রহীতার সাথে প্রতারণা ও জোচ্চুরি করেছেন। দেশের মেইনস্ট্রিম রাজনীতি ও গণমাধ্যমে যদি সত্যিকারের ক্রিটিক্যাল পজিশন থেকে আলাপ-আলোচনা হতো, তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস সকল বিশেষণকে ছাপিয়ে একজন জাতীয় বেঈমান ও অপরাধীতে পরিণত হতেন। এই গরিব দেশকে আমরা সারা বিশ্বদরবারে চেনাতে চাই অবশ্যই, তবে তাকে বিক্রি করে নয়, দেশের দারিদ্র্যকে নগ্ন করে নয়, দেশের সার্বভৌমত্বকে MNC গুলোর হাতে লগ্নি করে নয়। আমার, একজন স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে এমনিতেই অহংকার করার মতো অনেক কিছু রয়েছে, আমি এমন কোন তাৎক্ষণিক ইতিবাচক বিষয় নিয়ে গর্বে বুক উঁচু করতে রাজি নই, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ এবং নেতিবাচক। যদি তিনি এদেশের মানুষের অভাব আর শান্তি নিয়েই ভাবতেন তবে এদেশের সম্পদ যখন সেভরন, এশিয়া এনার্জি, কনোকো-ফিলিপ্স’র কাছে বিক্রিকালে একজন জাতীয় প্রতিনিধি হয়ে তিনি হুংকার ছাড়তেন। তিনি তা করেন নি, বরং এরূপ হাজারটা বিজনেস জায়ান্টের সাথে মৈত্রী করেছেন, দেশের সবক্ষেত্রে প্রাইভেটাইজেশনের পাঁয়তারাকে ত্বরান্বিত করেছেন। যদি তাত্ত্বিকভাবে আলোচনা করা হয়, তবে দেখা যাবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে বাঙালি প্রলেটারিয়েতদের আসলে গর্ব করার কিছু নেই। তিনি আর যাই হোক কখনও ভুখা-পিছনে পড়ে থাকা মানুষের নায়ক হতে পারেন না। তাঁর মতো দেশের আপামর জনতা নিয়ে, ভিখারি নিয়ে, অবুঝ নারীদের নিয়ে ব্যবসা আর কেউ করতে পারেনি, নিজের দেশকে নিয়ে বিকিকিনি আর কে বা করতে পেরেছে তাঁর মতো?

সে বিবেচনায় তিনি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান তো ননই বরং মুখোশের আড়ালে তিনি জাতির সবচেয়ে বড় দুশমন। কিন্তু আফসোস তিনি দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক শক্তির উপরে ভর করে মুখোশের আড়ালেই থেকে গেলেন।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মত সাম্রাজ্যবাদী শক্তির যারা এ্যাম্বেসডর তাদের অকুণ্ঠ সহায়তা যোগাতে প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের মতো শক্তিশালী মিডিয়া যেমন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরেকটি তুলনামূলক ভাবে নবীন কিন্তু অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং তাৎপর্যপূর্ণ এক শক্তির নাম সুশীল সমাজ।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রথম আলো এবং সুশীল সমাজের প্রতিষ্ঠা দুটোই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফেনোমেনা, এগুলোকে ভিতরে না ঢুকে শুধু খালি চোখে অবলোকন করে গেলে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার অদূর ভবিষ্যতে বারোটা বাজবেই।

গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানা প্রসঙ্গে প্রথম আলো এবং সুশীল সমাজের একটি অংশের অপ-তৎপরতা দেখানোর জন্য আমি সাম্প্রতিক একটি টিভি টক শোর সাহায্য নেব।

গত ২৭ আগস্ট একাত্তর সঞ্চালন শিরোনামের লাইভ টকশোতে অতিথি ছিলেন অধ্যাপক পিয়াস করিম, মিজানুর রহমান খান, অধ্যাপক মনোয়ার উদ্দিন আহমেদ এবং নাইমুল ইসলাম খান।
প্রসঙ্গ গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানা বিতর্ক। দৈনিক আমাদের অর্থনীতির সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খান এবং অধ্যাপক মনোয়ার বেশ আইন-কানুন দেখিয়ে বললেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি যেমন আইন অনুযায়ী সমাজ সেবার দোহাই দিয়ে আরেকটি প্রাইভেট ভার্সিটি খুলতে পারেন না, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর যেমন গরিব-দুঃখী মানুষের স্বার্থ দেখিয়ে আরেকটি ব্যাংক খুলতে পারবেন না, ঠিক তেমনি একই আইনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসও ৫২-৫৩ টা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পারেন না। আর যদি করেও থাকেন, তবে সেসব প্রতিষ্ঠান আইন অনুযায়ী, বাই ডিফল্ট প্যারেন্টাল অর্গানাইজেশনের অধীনস্থ হয়ে যাবে।

এ বক্তব্যের রি-এ্যাকশনে আমাদের সুশীল সমাজের প্রগতিশীল সন্তান অধ্যাপক পিয়াস করিম কর্মকাণ্ডে চরম প্রতিক্রিয়াশীলদেরও হার মানিয়ে মহাত্মা লেনিনের থিসিসকে আরেকবার সঠিক প্রমাণিত করলেন। তিনি আসলে কীসের সমাজবিজ্ঞানী দর্শককে তা বোঝার তিনি সুযোগ দিলেন না। অনুষ্ঠানে মোটেও একজন সমাজবিজ্ঞানী তথা সমাজ বিশ্লেষকের ভূমিকা পালন করেননি। কারো পোষা কুত্তাও বোধহয় এতটা অযৌক্তিকভাবে ঘেউ ঘেউ করে না। তিনি নাঈমুল ইসলামের যুক্তিতে বা দেখানো আইনে যদি ভুল থেকেই থাকে তা তুলে ধরতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে রীতিমতো গালাগাল করা শুরু করলেন। নাঈমুল ইসলামের নানা সমস্যা রয়েছে, ধরলাম, তিনি ওই আইনের কিছু বোঝেন না। কিন্তু পাশেই বসে ছিলেন আইন বিশেষজ্ঞ প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক মিজানুর রহমান খান। তিনি তো দেখি বঙ্গবন্ধুর হত্যা থেকে শুরু করে সব ব্যাপারেই আইনের হাজারটা ধারা দেখান। তিনি কেন নাঈমুল ইসলামের দেখানো আইনটাকে চ্যালেঞ্জ করলেন না? গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠাকালে যে অর্ডিন্যান্সটা বানানো হয় সেটাতো ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণেই হয়েছে, স্বেচ্ছায় তিনি সরকারের চাকুরে হয়েছেন, একটি ব্যাংকের এমডি হয়েছেন। তাহলে এটা বলতে যাওয়া কি মিথ্যা নাকি ভণ্ডামি? কোন দিক বিবেচনা করে পিয়াস করিম নাঈমুলকে আঙুল উঁচু করে মিথ্যাবাদী, ভুল ব্যাখ্যাকারী ইতি আদি বললেন? সঠিক ব্যাখ্যাটি তাহলে দিলেন না কেন? নিজেকে এত সত্যবাদী সাধু যখন মনে করেন নাঈমুল ইসলাম খানের তর্কের আমন্ত্রণই বা অগ্রাহ্য করলেন কেন?

মিজানুর রহমানকে উপস্থাপিকা জিজ্ঞেস করলেন গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক তাহলে কে? ব্যাপারটা পুরোপুরি এড়িয়ে তিনি অধ্যাপক মনোয়ারকে পাল্টা প্রশ্ন করলেন ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার বিনিয়োগকে আজকের মহীরুহে পরিণত করার পেছনে ৮০ লাখ নারী সম্পৃক্ত ইতি আদি। আমার প্রশ্ন হল এই ৮০ লাখ নারী তার বিনিময়ে কত টাকা লভ্যাংশ পেয়েছে, আপনাদের ত্রাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছ থেকে?