ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

ভাষান্তরঃ নাজমুল আরেফিন ফিডেল

পূর্বাভাস
জন স্টুয়ার্ট মিলের প্রস্তাব ছিল ইংরেজ শাসন না থাকলে ভারতমুল্লুক সভ্য হতনা। “জঙ্গল বুক” খ্যাত রুডিয়ার্ড কিপ্লিংও ভাবতেন ইংরেজরা চলে গেলে ভারত খণ্ড-বিখন্ড হয়ে যাবে। আরেক প্রথিতযশা জোসেফ কনরাডও বলেছিলেন, সামাজ্যবাদ জিনিসটা যতই খারাপ হোক অসভ্যদের এইতো নিয়তি। এমনকি মহাত্মা কার্ল মার্ক্সও ১৮৫১ সালে ফরাসি চাষিদের প্রসঙ্গে বলেছিলেন-ওরা নিজেদের কথা বলতে পারেনা, ওদের কথা ওদের হয়ে অন্য কাউকে এসে বলতে হয়(দ্রষ্টব্যঃ এডোয়ার্ড সায়িদ, ওরিএন্টালিজম)। সায়িদের কিতাব পড়লে আমরা দেখবো তিনি এইসব কথাবার্তার জন্য তাঁদের ইউরোপ-আমেরিকান মননকে দায়ী করেছেন, যার নাম তিনি দিয়েছেন ‘প্রাচ্যব্যবসায়’(সলিমুল্লাহ খান)। আজ আমরা রবীন্দ্রনাথের ১৫১তম জন্মবার্ষিকী নিয়ে আত্মহারা কারণ তিনি আমাদের লোক-এই প্রাচ্যের লোক।জন্মবার্ষিকী-মৃত্যুবার্ষিকী আসে যায়, তাঁর বিরাট কীর্তি নিয়ে আমরা মেতে উঠি আলাপ-আলোচনায়।নিয়মভাঙ্গা যে এখানে বড়ই কঠিন। কেউ তাই রবীন্দ্রনাথকে কাঠগড়ায় হাজির করেননা। ব্রিটিশ আমলে সামাজ্যবাদের পক্ষ নেওয়ার অপরাধে কেউ তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করতে জোরালোভাবে এগিয়ে আসেননা। কিন্তু সেই ১৯২২ সালে একজন মার্ক্সবাদী চিন্তাবিদ তাঁকে কাঠগড়ায় তুলেছিলেন। তুলোধুনো করেছিলেন তাঁর প্রতি-বিপ্লবী ভূমিকাকে। তিনি গিয়োর্গ লুকাচ।

লুকাচের এই লেখাটির ব্যাপারে জ্ঞাত হই আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ডঃ এ আই মাহাবুব উদ্দিন মারফত। আমি লেখাটি সেদিনই আকাশপাড়া থেকে নামিয়ে দেখি। কিছুটা একচোখা লেখা মনেহলেও লুকাচের কিছু প্রশ্নের কাছে হার মানতেই হয়। প্রকৃতপক্ষেই লেখাটি অত্যন্ত মূল্যবান এবং জরুরী। রবীন্দ্রনাথ তৎকালীন সময়ে যেভাবে ব্রিটিশদের ঢোলকনাথে পরিণত হয়েছিলেন তার সোসিওলজিক্যাল বিশ্লেষণ দাঁড় করানোটা আসলেই অনেক জরুরী ( যদিও এটা অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল)।

লুকাচের Tagore’s Gandhi Novel লেখাটি প্রথম প্রকাশিত (১৯২২) হয় বার্লিনের Die rote Fahne নামক সাময়িকীতে। লেখাটি বেশ কঠিন এবং দুর্বোধ্য। তাই এটাসবার বোধগম্য করার জন্য যথাসাধ্য সহজ ও প্রাঞ্জলভাবে ভাবানুবাদ করার চেষ্টা চালিয়েছি। কোন কোন স্থানে ভাবানুবাদ করতে গিয়ে মূল অর্থ থেকে সরে আসতে পারি, ভুল-ক্রুটিও থাকতে পারে সেজন্য আগে-ভাগে ক্ষমাপার্থী।
সবশেষে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি ডঃ এ আই মাহাবুব উদ্দিন,সলিমুল্লাহ খান,এবং লেভিন আহমাদ এর প্রতি।

রবীন্দ্রনাথের গান্ধীবাদী উপন্যাস
জার্মান কুলীন সমাজে রবীন্দ্রবাবুর উত্তরোত্তর (অপ)যশ বৃদ্ধির ঘটনা এদেশের সংস্কৃতি জগতে বড়ধরনের কেলেঙ্কারিগুলোর অন্যতম।এরুপ কেলেঙ্কারির পুনরাবৃত্তি জার্মান কুলীন সমাজের অন্তসারশূণ্যতার নিদর্শন বৈকি।তাঁর এইরূপ যশপ্রাপ্তি আর কিছুই নয় বরং প্রকৃত আর জালিয়াত লেখনীর মাঝে ফারাক করতে পারার আদিসামর্থ্য নাশের বহিঃপ্রকাশ।

একজন সৃজনশীল লেখক এবং চিন্তক হিসেবে রবীন্দ্রবাবু পুরোপুরি গৌণ কাতারের অধিভুক্ত। তাঁর সৃজনশীলতার জোর অস্তিত্বহীন, তাঁর রূপায়িত চরিত্রগুলো ছকেবাধা-ফ্যাকাশে, গল্পগুলো অতি ব্যবহারের দরূন আকর্ষণহীন-নীরস, তাঁর অনুভবশক্তিও দুর্বল এবং অসংহত। তিনি তাঁর কর্মের মাঝে উপনিষদ আর ভগবত-গীতার কিছু জঞ্জালের টুকরো আর নিজস্ব একঘেয়েমি-নিষ্ক্রিয়মূলক চিন্তাকে গোঁজামিল পাকিয়ে টিকে আছেন। সমকালীন জার্মান পাঠকদের নৈসর্গিকবুদ্ধি এতটাই আত্মপ্রত্যয়হীন হয়ে পড়েছে যে তারা কোনটা গ্রন্থমূল আর কোনটা উদ্ধৃতি তা শনাক্ত করতে পারেনা-এবং এটা রবীন্দ্রবাবুর টিকে থাকার আরো একটি কারণ। ফলশ্রুতিতে ভারতীয় দর্শনের এই জরাজীর্ণ উচ্ছিষ্টগুলো সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট হয়না, উল্টো তারা(জার্মান)এসব অগণ্য বিষয়বস্তুকে দূর হতে দীক্ষিত ব্যক্তির বোধগম্য, নিগূড় জ্ঞান হিসেবে অনুমোদন দিয়ে বিশেষ আকার প্রদান করে। এটা চমৎকারিক কিছু না। যখন জার্মান মুল্লুকের শিক্ষিত জনগণ নিজদিগকে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকল্পের সাথে সমন্বয় করে চলেছে, যখন তারা ধ্রুপদী ও স্পেংলারীয় দর্শনের ফারাক করতে পারেনা এমনকি ইয়ার্স, হফম্যান, পো (এডগার এলান) এবং আর সবার মাঝের পার্থক্য বোঝেনা তখন ভারতমুল্লুক থেকে এত সুদূরে অবস্থান করে আসল সোনা তারা চিনবে কি করে?রবীন্দ্রবাবুকে বড়জোর বলা যেতে পারে ভারতীয় ফ্রেঞ্জেন(গুস্তাব ফ্রেঞ্জেন ১৮৬৩-১৯৪৫), যদিও বা তাঁর প্রতিভার জোর ফ্রেঞ্জেনের চেয়ে কম তথাপি তিনি তাঁকে তাঁর তৈলাক্ত একঘেয়েমি রচনাবলীতে কদাচিৎ ই স্মরণ করেছেন।আসলে তাঁর এই বিশাল সফলতার তাৎপর্যের মাঝে আমরা সমকালীন জার্মান মনোবৃত্তির(অন্তঃসারশুন্য)প্রতিচ্ছবিকে দেখতে পাই।

রবীন্দ্রনাথকে এতটা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করার উদ্দেশ্য হল তাঁর আন্তর্জাতিক খ্যাতিকে (বিশেষ করে ব্রিটিশ খ্যাতিকে) প্রশ্নবিদ্ধ করা। ইংরেজ বুর্জোয়া গোষ্ঠীর কাছে রবীন্দ্রবাবুকে ধন ও মান(নোবেল পুরুষকার) দ্বারা ভূষিত করার জন্য যথেষ্ট কারণ ছিল।এটা তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিনিধিকে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার প্রতিদান। পূর্ণসম্মতি কিংবা অহিংসতা মতবাদের মত প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞানমণ্ডলের বিভিন্ন জঞ্জালের টুকরো যখন স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে সংযুক্ত করা হয় তখন তা ব্রিটিশদের জন্য অবশ্যই অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং বাস্তব অর্থ বহন করে। রবীন্দ্রবাবুর নাম-যশ, দাদাগিরি যতই বাড়বে ততই কার্যকর ভাবে তাঁর লেখনী দ্বারা স্বদেশী মুক্তি আন্দোলনকে দমিয়ে রাখা যাবে।

আখ্যান রচনা করতে রবীন্দ্রনাথ তাঁর একঘেয়েমিপনা আর প্রাণশূন্য উপন্যাসে খুবই নিম্নমানের নিন্দামূলক লেখনীর আশ্রয় নিয়েছেন। এই নিন্দাভরা আখ্যানগুলো জ্ঞানসম্পন্ন পাঠকের কাছে বিস্বাদময় ছাড়া আর কিছুই নয়। তারা যতই প্রজ্ঞা দ্বারা নিজেদের পরিব্যপ্ত করেছেন ঠিক ততই রবীন্দ্রবাবু প্রতারণামূলক চেষ্টা চালিয়ে “চিরন্তন মনুষ্যত্ব” নামক জটিল দর্শনের ভিতর মুক্তি সংগ্রামের প্রতি তাঁর যে নপুংসক ঘৃণা তাকে আড়াল করেছেন।

উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে রচিত বুদ্ধিবৃত্তিক সংঘর্ষগুলো কিন্তু সহিংসতার প্রশ্নের সাথে জড়িত। ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করার সংগ্রাম চালানো, একে ভারতীয় বাজার হতে ঠেস দিয়ে বিতাড়িত করা এবং স্বদেশী পণ্যকে এর স্থলাভিষিক্ত করা- রবীন্দ্রবাবু তাঁর উপন্যাসে জাতীয় সংগ্রামের সূত্রপাতকে চিত্রায়িত করেছেন এভাবে। এবং ঠিক পরেই রবীন্দ্রবাবু তাঁর লাখ টাকার প্রশ্ন উত্থাপন করলেন-মুক্তি সংগ্রামে সহিংসতার প্রয়োগ কি নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য? এখান থেকে তাঁর মনোভাবকে অনুমান করা যায় যে- ভারতমাতা অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে ক্রীতদাসে পরিণত হলেও ব্যাপারগুলো তাকে কোন নাড়া দেয়নি। তিনি এসব প্রশ্নের প্রতি কোন আগ্রহ না দেখিয়ে একজন দার্শনিক এবং নীতিবিদ হিসেবে শুদ্ধ “পরকালীন সত্য” নিয়েই চিন্তিত ছিলেন। তিনি মনেকরেন ব্রিটিশরা এসে যা খুশি করুক, হিংস্রতার আশ্রয় নিয়ে তাদের আত্মাকে দূষিত করে করুক-তাতে আমাদের কী? তাঁর দায় হল ভারতীয়রা যাতে মুক্তি সংগ্রামে তাদের মত সহিংসতা, প্রবঞ্চনার ব্যবহার করে নিজেদের আত্মাকে দূষিত নাকরে সেদিকে দৃষ্টি রাখা, এবং এর সাথে জড়িত বিপদ থেকে তাদের আত্মাকে রক্ষা করা। তিনি লিখেছেন, যারা সত্যের জন্য প্রাণ বিলীন করে তাঁরা অমর; এবং যদি সমস্ত মানবসন্তানেরা সত্যের তরে জীবন দান করে তবে মানুষ সভ্যতার ইতিহাস হবে চিরন্তন, অক্ষয়।

এরূপ চিন্তা-চেতনা ভারতমাতার চিরন্তন পরাধীনতার ভাবাদর্শকেই প্রকাশ করে। কিন্তু রবীন্দ্রবাবু এই মনোভাবকে আরো সরাসরি প্রকাশ করেছেন তাঁর উপন্যাসের চরিত্র এবং ঘটনাবলীর মাধ্যমে। এগুলোতে যে মুক্তি আন্দোলনের চিত্র তিনি এঁকেছেন তা বুদ্ধিজীবীদের কাছে রোম্যান্টিক আন্দোলনের বাড়া বৈ কিছু না। পারিপার্শ্বিকতায় পুরোপুরি অমিল থাকায় খুব বেশি সাদৃশ্য না পেলেও ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন আমাদেরকে ইতালির কারবোনারি আন্দোলন, রুশদেশের নারোদিক আন্দোলনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই সংগ্রামগুলিতে রোম্যান্টিক ইঊটোপিঅবাদ, অতিরঞ্জিত ভাবাদর্শ এবং ক্রুসেডিয় স্পৃহার মত বিষয়গুলি অবিছিন্ন অংশের ন্যায় ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এগুলিকে রবীন্দ্রবাবু কেবলমাত্র তাঁর নিন্দামূলক আখ্যানের সূত্রপাত হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ক্রুসেডিয় রোম্যান্টিকতার আদর্শ প্রতিনিধিরা নিঃসন্দেহে মৌলিক ভাববাদ এবং আত্ববিসর্জনের চিন্তা দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন কিন্তু রবীন্দ্রবাবু তাদের বানালেন দুঃসাহসিক অপরাধী। তাঁর চিত্রায়িত নায়ক একজন গৌণ ভারতীয় কুলীন যে তাঁর মতবাদের ঢোলক হিসেবে কাজ করে। সে দেশপ্রেমের অন্যায়মূলক বন্ধনীর লোভকে উপেক্ষা করায় অন্তঃ-বাহির উভয় দিক থেকেই বিপর্যস্ত এক মানুষ। তাঁর ঘরেও সুখ নাই। সে প্রায়শই দেশপ্রেমের পীড়াই পীড়িত হয়ে নিজের বিবেকের সাথে যুদ্ধ করে। রবীন্দ্রবাবুর নিকট তিনি অবশ্য জাতীয় আন্দোলনের কোন শত্রু নয় বরং জাতীয় শিল্পব্যবস্থার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী। রবীন্দ্রবাবু এরকম ভাবেই স্বদেশী উদ্ভাবনীসমূহ নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন যদিও এসবের জন্য তাঁকে কোন মূল্য গুনতে হয়নি। তিনি দেশপ্রেমিকদের নেতা মহাত্মা গান্ধীর ঘৃণ্য পথ অনুকরণ করেছেন-তাকে নিরাপদ ছাউনি দিয়েছেন। কিন্তু বরফ যখন আর গলিল না, তিনি তখন সহিংসবাদী দেশপ্রেমিকদের দ্বারা আক্রান্ত গোষ্ঠীকে তার নিজস্ব ক্ষমতাবল এবং ব্রিটিশ পুলিশ মারফত রক্ষা করলেন।

এহেন প্রচারণামূলক, লোকখ্যাপানো একপেশী ভঙ্গিমা তাঁর উপন্যাসের শৈল্পিক দিককে পুরোপুরি মূল্যহীনভাবে উপস্থাপন করেছে। তাঁর নায়কের প্রকৃতপক্ষে কোন প্রতিপক্ষ নেই। মূলত তার প্রতিপক্ষ হল একজন রোমাঞ্চভিলাসী-সে নায়কের স্ত্রীকে মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে, দেশের স্বার্থ দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে কিন্তু সেগুলো সে দেশের আন্দোলনে খরচা করেনা বরং স্বর্ণের দীপ্তিময় দৃশ্যকে সে উপভোগ করতে থাকে। স্বাভাবিক ভাবেই একসময় তার ছলনায় বিপথে যাওয়া নর-নারীদের সামনে তার মুখোশ খুলে যায় এবং তারা রাগে-বিরক্তিতে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

রবীন্দ্রবাবুর প্রতিভার জোর একটি রুচিসম্মত আখ্যানেও বিস্তৃতি লাভ করেনি। তিনি দৃঢ়প্রত্যয়ী হয়ে কার্যকর কিছু কুৎসা রচনা করতে চেয়েছিলেন কিন্তু সেখানেও তার কল্পনাশক্তির অভাব লক্ষণীয়। দস্তয়ভস্কি তাঁর প্রতি-বিপ্লবী উপন্যাসগুলিতে অন্তত কিছুটা হলেও তা করে দেখাতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর পেটি-বুর্জোয়া শ্রেণীদের নিয়ে লেখা নিম্নমানের গল্পসমূহের আধ্যাত্মিক দিকগুলি ভারতীয় প্রাজ্ঞতার ভূগর্ভ থেকে একেবারেই আলাদা-এবং এটা ছিল তাঁরই যোগসাজশ। এককথায় বলতে গেলে এগুলিতে তিনি চিত্রিত করেছেন গৃহকর্তার জটিল কষ্টকেঃ কিভাবে একজন নেহাত সৎ-ভালো মানুষের স্ত্রী আরেকজন রোমাঞ্চসন্ধানী পুরুষের যৌন ফাঁদে পা দেয়-পর্দাফাঁস হওয়ার পর বিবেকের দংশনে তাঁর আত্মউপলদ্ধি ঘটে এবং পুনরায় স্বামীর বুকে ফিরে আসে।

ইনি সেই ‘মহান’ ব্যক্তি যাকে জার্মান কুলীনসমাজ পয়গম্বর ভেবে পূজা করে- তাঁর সরূপ প্রকাশের জন্য এই সামান্য কিছু নমুনাই যথেষ্ট। যদিও জানি তাঁর গুণগ্রাহীরা এধরণের বাতিলমূলক সমালোচনার প্রতি অভিযোগের তীর ছুঁড়বে এবং রবীন্দ্রবাবুর লেখনীকেই অধিকতর সার্বলৌকিক হিসেবে গণ্য করবে। এই গোলমালের যুগে তারা এসব বিষয়গুলিকে বিনাবিচারে মেনে নেয় নাকি এসব উত্তেজনামূলক যুগোপযোগী প্রশ্নের জবাব দেয় তার দ্বারাই বর্তমান বুদ্ধিবৃত্তিক ধারার তাৎপর্য সূক্ষ্ম ও স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হবে। মূলত কোন তত্ত্ব বা দৃষ্টিভঙ্গির মূল্য বা মূল্যহীনতা যথাযথভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে দুঃখ-ক্লেশ কিংবা যুদ্ধ-বিগ্রহে তা মানুষের তরে কি বাণী প্রচার করে তার উপর। কোন বিশুদ্ধ তত্ত্বের প্রজ্ঞাকে শূন্যের মাঝারে (কিংবা কোন অভিজাত সমাবেশের চারদেয়ালের ভিতর) যাচাই-বাছাই করা কোন সহজসাধ্য কাজ নয়। এটা ঠিকি একসময় মানুষের দিকনির্দেশক হবার দাবি তুলবে। রবীন্দ্রনাথও তাঁর উপন্যাসকে পুঁজি করে সেই দাবি জানিয়ে সভ্যসমাজে এসেছেন। পূর্বেই বলেছি, তিনি তাঁর প্রজ্ঞাকে ব্রিটিশ পুলিশের বুদ্ধিবৃত্তিক সেবা প্রদানে নিয়োজিত করেছেন-তাঁর মত ব্যক্তির অবশিষ্ট প্রজ্ঞার প্রতি বিশেষ মনোযোগ নিবিষ্ট করার আর কোন প্রয়োজন আছে কি??