ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

বাংলাদেশের সমাজ এবং রাজ ও রাষ্ট্রনীতিতে এখন অসুন্দর এবং অসভ্যতার মহোৎসব চলছে বলে আমার ধারনা। এই ধারনাটি বেশ অনেকদিন ধরেই আমার মাথায় জেঁকে বসেছিল; বেরিয়ে আসতে পারছিলনা, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশে অনেকগুলো নিরীহ মানুষের আগুনে পুড়ে খুন হওয়া এবং সর্বশেষ বিরোধী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে জনাব আরাফাত রহমান কোকোর অকাল মৃত্যুকে ঘিরে অসুন্দর এবং অসভ্যতার অবারিত প্রবাহ দেখে মনে হল আমিও না হয় কিছু অসুন্দর কথাই আজ বলি। এই অসুন্দর কথাগুলো শুরু করবো একজন সুন্দর কথা বলা রাজনীতিক কিভাবে অসুন্দরকে আলিঙ্গন করেন তার একটি বয়ান দিয়ে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাপূর্ব ইতিহাস এবং জনাব তোফায়েল আহমেদের সেইসময়কার রাজনৈতিক জীবনের আলেখ্য প্রায় এক। একজন তরুণ প্রতিভাবান এবং অবশ্যই দেশপ্রেমিক রাজনীতিকের উঠে আসার কাল সেই সময়। তোফায়েল আমার কাছে ঊনসত্তুর এর গণআন্দোলন এবং তারুন্যের প্রতীক; এবং অবশ্যই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীকার আন্দোলনের একজন তরুণ মহীরুহ। পরবর্তী কালের ঘটনা যাই ঘটুকনা কেন তোফায়েল তাঁর ওই সময়ের ভুমিকার জন্য ইতিহাসের একটি গৌরবজ্জ্বোল অংশ হয়ে গেছেন বলে আমার মনে হয়। এমনকি পরবর্তী কালেও তাঁর কথায় তুলনামূলকভাবে অনেক বেশী যুক্তির প্রাধান্য দেখেছি অন্য অনেক রাজনীতিকের চেয়ে। কিন্তু আমি কিছুতেই এই মানুষটিকে মেলাতে পারিনি কোকোর মৃত্যুকে নিয়ে দিন দুয়েক আগে তাঁর বক্তব্যের সাথে। আমি অবাক হয়ে গেছি ভেবে যে, এই মানুষটি তোফায়েল!! কী করে তিনি বললেন যে, খোদার আরশ কেঁপে ওঠায় খালেদা তাঁর ছেলেকে হারিয়েছেন? যিনি আগুনে পোড়া ছেলেদের মায়ের দুঃখ বোঝেন তিনিতো সব মায়েরই এই কষ্ট টুকু বোঝার কথা। নয় কি? এভাবে বলা কি সম্ভব? বাংলাদেশে সবই সম্ভব। এখানে মানুষের কথা বলার অসীম অধিকার। এ যেন কথা বলার যথেচ্ছাচার চলছে বাংলাদেশে।

এতগুলো মানুষ খুন হল পেট্রোল বোমায় এবং আগুনে, কিন্তু সরকার নড়ে চড়ে বসেনি এই কদিন আগ পর্যন্ত। আমারতো মাঝেমাঝে এই প্রবাস থেকে মনে হয়েছে, সরকার আরো কিছু মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছিল যেন বিরোধীদল আরো অজনপ্রিয় হয়, এবং বর্তমান সরকার মোটামুটি ক্ষমতায় থাকতে পারে আরো অনেকগুলো বছর। এই যে রাজনৈতিক দৈন্য তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের কথাবার্তায়। এতগুলো মানুষের খুন হওয়ার পেছনে বিএনপি-জামাতসহ বিশ দলীয় জোটের দায়িত্বটিই বেশী বলে আমি মনে করি, কিন্তু সরকারের একগুঁয়েমি এবং একধরনের বালখিল্য আচরণ কম দায়ী বলে আমি মনে করিনা। সেটি একটি ভিন্ন আলোচনা। এখানে এর প্রাসঙ্গিকতা একটু বুঝিয়ে বলি।

আমার মূল আপত্তিটি হচ্চে খালেদা জিয়ার ছেলে হারানোকে তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচীর সমালোচনার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করাতে। আমি খুব দুঃখের সাথে মানুষের হৃদয়হীন কথাবার্তা শুনে কষ্ট পেয়েছি। আমরা সবাই যখন প্রধানমন্ত্রীর সাথে বিএনপি দলের অসৌজন্যমূলক আচরণের নিন্দা করেছি তখন অবাক বিস্ময়ে আমি অনেক ভালো মানুষকে বলতে শুনেছি খালেদা জিয়া নাকি ছেলে হারানোতে অত কষ্ট পান নি যতটা একজন সাধারন মা পেয়ে থাকেন!!! এ ধরনের বক্তব্য শুনে আমার প্রতিবারই এই মানুষগুলোর প্রতি করুণা হয়েছে, আর কিছু নয়। ছেলের মুখখানির দিকে নেত্রীর শেষবারের মত আকুল নয়নে তাকিয়ে থাকার একটি ছবি সামাজিক মিডিয়াতে এসেছে। আমি খুব মর্মাহত হয়েছি সেটিতে শিক্ষিত মানুষের মন্তব্য দেখে। একজন লিখেছেন (অত্যন্ত নোংরাভাবে) যে, খালেদা ছেলেকে শেষবারের মত দেখতে এসেছেন “সেজেগুজে”!!! ধরণী দ্বিধা হও। যে মানুষটির (যার রাজনৈতিক মতাদর্শকে আমি প্রচন্ডভাবে অপছন্দ করি) দিকে তাকিয়ে আমার বুকের মাঝে কষ্ট হয়েছে, নিজের সন্তানের কথা মনে হয়েছে, সেই একই মানুষের ক্রন্দনরত মুখ দেখে আমার শিক্ষিত বন্ধুরা সেজেগুজে আসা সুন্দরী রমণী দেখেছেন, সন্তান হারানো মাকে দেখেননি। আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছি আমার অপরিপক্কতা নিয়ে। আমি কি দেখতে পাইনি খালেদের মাঝে আমার মাকে যিনি আমি চলে গেলে ভেঙ্গে পড়তেন আমার মৃতদেহের ওপর? এ দেখাটা কি ভুল ছিল? অন্যরা সবাই ঠিক দেখেছিল? কী পার্থক্য ছিল খালেদা নামের মায়ের সাথে আমার মায়ের? আমি জানিনা। আমার বন্ধুরা জানেন। এই যে অসুন্দর এর রাজত্ব চলছে বাংলাদেশের সমাজ এবং রাষ্ট্রজীবনে। খালেদার মা হওয়াটাও রাজনৈতিক বিষয়; তাঁর জন্য প্রধানমন্ত্রীর কষ্ট হওয়াটাও রাজনীতি ছাড়া কিছু নয়— এ ধরনের অতি সরলীকরনের ঘূর্ণাবর্তে পাক খাচ্ছে আমাদের বিবেক, আমাদের হৃদয়।

তোফায়েলের আরশ তত্ত্বে ফিরে আসি। ধরে নেয়া যাক খালেদা জিয়াই সব কিছুর মূলে। অন্যায়টি তাহলে তিনি করেছেন। কিন্তু এর জন্য কোকোকে চলে যেতে হবে কেন? কোকোতো এসবের মধ্যে ছিলনা। সে কেন এই পৃথিবীর এত সৌন্দর্য ভালোমত উপভোগ না করেই চলে গেল? না, সেটাও তার মায়ের দোষ!!! এত অযৌক্তিক কথা আমাদের এক সময়ের রাজনৈতিক আইকন বলতে পারলেন?

আরশ তত্ত্ব সামাজিক মিডিয়াতে প্রকাশ হওয়ার ফলাফল কিন্তু ততোধিক ভয়াবহ। আমার দেশী এবং প্রবাসী বিএনপি-জামাত পন্থী বন্ধুরা একটি পাল্টা এবং মর্মান্তিক যুক্তি নামের পাটকেল দিয়ে তোফায়েলের ঢিলের জবাব দিতে লাগলেন।  মোটা দাগে এঁদের বক্তব্য হল, কোকোর মৃত্যু যদি খোদার আরশ কেঁপে ওঠার কারনে হয়ে থাকে বঙ্গবন্ধুর (এরা এদের নিজস্ব কায়দা মোতাবেক বাংলাদেশের স্থপতিকে শুধুই শেখ মুজিব নামে ডাকেন) সপরিবারে নিহত হওয়াটাও একই আরশের কাঁপনজনিত কারনে ঘটেছে। আমার অন্যান্য বন্ধুরাতো বটেই, সবচেয়ে কাছের বন্ধুটিও এই যুক্তির শক্তি দেখে মুগ্ধ। আমি অতঃপর আরেকটি অসভ্যতার নমুনা দেখে নিজের অপরিপক্কতা আরেকবার পরিমাপ করলাম। এরপর আমি আশা করছি জিয়ার মৃত্যুর কথাটি আসবে। বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবার পরিজনের মর্মান্তিক হত্যাকান্ড নিয়ে লোকজনকে রসিকতা করতে দেখেছি অনেক। যার কষ্ট নিয়ে আজ লিখতে বসেছি তিনিও বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদিনে ঢাকঢোল পিটিয়ে জন্মদিন পালন করেন- এটিকেও আমি একটি বিশ্রী রুচির পরিচয় বলে মনে করি।

এই লেখাটি যখন শেষের দিকে তখন বাংলাদেশের তরুণ সাংসদ এবং মন্ত্রী পলকের একটি মন্তব্য দেখলাম সামাজিক মিডিয়াতে। মোটা দাগে এটিও খালেদার মা হিসেবে পুত্রশোক কম পাওয়া বিষয়ক। সেইসাথে তারেক কেন ভাইয়ের মৃতদেহ দেখতে একটা দিনও বের করতে পারলোনা তার হিসাব নিকাশ। আমি বারবারই অবাক হই এই ধরনের কথাবার্তা শুনে। অবধারিত ভাবে এর উত্তরে কয়েকজন প্রশ্ন তুললেন ৭৫ এ শেখ হাসিনা কেন দেশে এলেননা। এরাও রুচির বিকৃতিতে ভুগছেন বলেই আমার ধারনা।

তাই বলছিলাম, অনেকদিন হয়ে গেল বাংলাদেশের রাজনীতি এবং সমাজনীতি পরিচালিত হচ্ছে অসভ্যতা দিয়ে। এখানে মানুষের মনের কোমল অংশটিতে আস্তরণ পড়ে গেছে অনেক। ক’দিন আগেই আমার খুব প্রিয় একজন ব্যক্তিত্ত্ব আবেদ খান তাঁর লেখায় হারিয়ে যাওয়া কবি হুমায়ূন আজাদের কথা দিয়ে বলেছেন, সব কিছুই নষ্টদের অধিকারে চলে যাচ্ছে। এত বড় বক্তব্য দেয়ার অধিকার আমার নেই, এবং আজ এখানে যেসব মানুষের কথা বললাম এরা কেউই নষ্ট নন বলে আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু একটি ভয়াবহ রুচির বিকৃতি ঘটেছে সব জায়গায়। এর একটি নিষ্পত্তি দরকার। আমার কেন যেন মনে হয় আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পাল্টানোর ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপটি হচ্ছে রুচির বিকৃতি রোধ করা, এবং এটি সম্ভব আমাদের পুরোনো যে সামাজিক রীতিনীতি প্রচলিত ছিল সংস্কৃতিতে সেটি