ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

রাজনীতি রম্য

বার-বি-কিউ তন্ত্রঃ প্রানী এবং মানুষ

লিখিতে বা মতামত দিতে বড়ই শঙ্কা বোধ হয়। প্রবাসে বাস করি; দেশ নিয়া কথা বলিবার অধিকার আমাদের নাই। এই ধারনাটি বর্তমানে সর্বজন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক জাফর ইকবালও ধারন করেন। বিষয়টি এই রকম বোধ হইতেছে যে, যাঁহারা বাংলাদেশে বসবাস করেন তাঁহারা ভারত বা মার্কিন দেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়া কথা বলিতে পারিবেননা। জনাব জাফর ইকবাল ১৮ বছর মার্কিন দেশে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ নিয়া কোন বক্তব্য দেন নাই— ইহা জানিয়া সবিশেষ জ্ঞান লাভ করিয়াছি। জাফর ইকবাল আমাদের প্রনম্য, এবং তাঁহার বক্তব্যগুলি আমি সকল সময় অনুসরণ করি গভীর আগ্রহের সহিত। কাজেই অদ্য এইখানে যাহা বলিব তাহা অনধিকার চর্চা বলিয়া ধরিয়া নিতে হইবে।

১)

বর্তমানে দেশে বিভিন্ন রকমের “গণতন্ত্র” চলিতেছে। মানুষ নামের বাংলাদেশে বসবাসকারী সাধারন প্রানীদের (মানুষ নহে) পোড়ানো হইতেছে বার-বি-কিউ ষ্টাইলে। ইহাও নাকি এক ধরনের গণতন্ত্র, এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের তরিকা। এই গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে কিছু কহিলে তাহা হইবে ভারতীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সাহায্য করার সামিল। আরেকটি মতামত আসিয়াছে ক্যেকদিন আগে আন্দোলনের নেত্রীর কাছ হইতে। তাহা হইলো, এই সকল কর্ম করিতেছেন সরকার এবং সরকারী দলের ব্যক্তিবর্গ। যাঁহারা বার-বি-কিউ মেশিনের সকল ইন্তেজাম করিতেছেন তাঁহারা সকলেই তাহা হইলে সরকারী দলের লোক!!!

প্রশ্ন হইলো, ইঁহাদের গুলি করা উচিত কিনা। এই জায়গায় নেত্রী বড়ই ঝামেলায় ফেলিয়া দিয়াছেন আমাদের। কাজটি করিতেছে সরকারী দলের দুষ্কৃতিকারীরা, কিন্ত ইহাদের গুলি করিবার প্রস্তাবে বিরোধী নেত্রী আপত্তি করিয়াছেন!!! আমরা বুঝিয়াছি, ইহাকেই গণতন্ত্র বলে। দুষ্কৃতিকারীদের গুলি করিলে গণতন্ত্রহীনতা হইবে, কিন্ত মানুষ নামের প্রানীদের পোড়াইলে গণতন্ত্র উদ্ধার হইবে!! চমৎকার ধারনা দিয়াছেন আন্দোলনের নেত্রী এবং তাঁহার সেবক নেতৃমণ্ডলী। বাংলার প্রানীকূল বুঝে কম। ইহাদের বুঝাইতে হইবে যে, এই নতুন ধরনের গণতন্ত্র যাহাকে আমরা বার-বি-কিউ তন্ত্র নামে ডাকিতে পারি তাহাই হইবে এই দেশে গণতন্ত্র উদ্ধারের তরিকা।

দিন কয়েক আগে আরেকটি খবর দেখিলাম। কুমিল্লা জেলার উচ্চ পদস্থ এক বিএনপি নেতার পণ্য পরিবাহী ট্রাক গুলি ভাঙ্গা হয় নাই যদিও ইহাদের আশেপাশের সকল ট্রাক ভাঙ্গা হইয়াছে বিপুল বিক্রমে; ধারনা করি, মালিকের কারনে ট্রাক গুলিও ট্রাকদের নেতা হইয়াছেন, তাই তাঁহারা রক্ষা পাইয়াছেন; ইঁহাদের ভিতরে বার-বি-কিউ এর উপযুক্ত প্রানীও মনে হয় পাওয়া যায় নাই, কারন, ট্রাকের আশেপাশে যাঁহারা ছিলেন তাঁহারা সকলেই “মানুষ” তাঁহাদের মালিকের কারনে, প্রানী নহেন। তাই এই বিশেষ ট্রাক মহাশয়েরা ট্রাক কুলের নেতা হিসাবে রক্ষা পাইয়াছেন। ইহাও আরেক ধরনের গণতন্ত্র বটে। প্রশ্ন হইলো, বিএনপির উক্ত নেতা কি আন্দোলনে অংশ নিতেছেননা? নাকি তিনি অংশও নিতেছেন, আবার ব্যবসাও চালাইতেছেন? জটিল প্রশ্ন। উত্তর নাই। এখন পর্যন্ত বিএনপি-জামাত এবং ক্ষমতাসীন দলের একজন কর্মীকেও বার-বি-কিউ এর সম্মুখীন হইতে হইলোনা, কারন তাঁহারা “মানুষ”, প্রানী নহেন। এই ধরনের মিল মহব্বতের গণতন্ত্র বাংলাদেশ বহুদিন দেখে নাই।

তবে তাঁহারা যেহেতু মানুষ, তাঁহাদেরও দুই চারিটি ভুল হইয়া যায়। এই ভুলের শিকার তাঁহাদের মত মানুষেরাই। যেমন, দিন দুয়েক আগে এক বিএনপি নেতার পিতা মানুষ হওয়া সত্ত্বেও আগুনে পুড়িয়াছেন, বা বোমার আঘাত পাইয়াছেন। পুত্রের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জীবন দেয়ার ঘটনা বাংলাদেশে খুব বেশী আছে বলিয়া বোধ হয়না। তিনি কোন প্রজাতির জীব ছিলেন, মানুষ না প্রানী? এই নিয়া কিঞ্চিত ভাবিত আছি। আরেকটি ঘটনাও ঘটিয়াছে। আওয়ামী নেতা মনে করিয়া বিএনপি নেতার হাত পায়ের রগ কর্তন করা হইয়াছে। এ হেন ভুল মানুষ মাত্রেই করিয়া থাকে; সেই কারনেই ইঁহারা মানুষ।

কিছুদিন পূর্বে এক অজ্ঞাত স্থান হইতে আমাদের সময়কার ছাত্রনেতা জনাব রুহুল কবীর রিজভী প্রানী সকলকে একটু কষ্ট সহ্য করিয়া আন্দোলনে অংশ নিতে বলিয়াছেন। আন্দোলন সফল করিতে সকল দলের মানুষদের প্রাণীকুলকে প্রয়োজন পড়ে। শুনিয়া বড়ই আমোদ পাইয়াছিলাম। তিনি সময়মত মাঝেমধ্যেই নাকি রাজনৈতিক অসুস্থতার স্বীকার হন। এইবারও হইয়াছিলেন কয়েকবার। অতঃপর তিনি অজ্ঞাত বাসে গিয়াছেন। সরকারদলীয় লোকজন বা মেশিনারীগুলি জানেনা তিনি কোথায়, কিন্তু সাংবাদিকরা জানেন। একেবারে চে গুয়েভারা ষ্টাইলে গোপন স্থান হইতে আমাদের জন্য নির্দেশ পাঠাইতেছেন। নেতাকেতো বাঁচিয়া থাকিতে হইবে; তিনিতো মানুষ, প্রানী নহেন। প্রানীরা একটু কষ্ট সহ্য করিবে, জীবন দিবে—ইহাই তাহাদের নিয়তি। নেতারা অবরুদ্ধ অবস্থায়ও আরামে আয়েশে থাকিবেন, বিরিয়ানী খাইবেন, খোশ গল্প করিবেন– জগতের এই রীতি অস্বীকার করার সাধ্য কাহার আছে। নেতাদের ট্রাক ভাঙ্গা হইবেনা; হাইকোর্ট বিল্ডিং এ তাঁহাদের কেউ কেউ ধোপদুরস্ত জামা কাপড় পরিয়া বক্তিমা প্রদান করিবেন ইহাই নিয়ম। প্রানীদের কিন্তু মরিতেই হইবে; স্বয়ং সৃষ্টিকর্তারও ক্ষমতা নাই এই নিয়ম পরিবর্তন করেন।

অবরুদ্ধ অবস্থায় নেতারা শত্রু সমতুল্য প্রতিবেশী দেশের ক্ষমতাসীন দলের প্রধানের নিকট হইতে দূরালাপনি পাইবেন ইহাতেই বা আশ্চর্য হওয়ার কী আছে? মার্কিন দেশের প্রখ্যাত নেতারা তাঁহাদের জন্য সরকারের সমালোচনা করিবেন ইহাও ঠিক আছে। বাংলাদেশের অনেক প্রানী ইহা মানিয়া নিয়াছিল, কিন্তু গোল বাঁধাইলেন যাঁহারা দূরালাপনির মাধ্যমে আলাপটি করিয়াছিলেন তাঁহারাই, এবং সরকারের বিদেশী সমালোচকেরা। বাংলাদেশের প্রানীকূল ইহাও মানিয়া নিয়াছিল। হইতেই পারে বিদেশী রাজনীতিকেরা মিথ্যা বলিতেছেন। কে না জানে আমাদের রাজনীতিকেরা কদ্যপি মিথ্যা কহেন না।

আমাদের এক যুবরাজ বিদেশ হইতে নানান ধরনের বক্তব্য দিতেছেন। আমরা প্রানীকূল তাঁহার গবেষনা দেখিয়া আপ্লুত হইয়াছি। রাজনীতি বিজ্ঞান এবং ইতিহাসের গবেষকগনতো বটেই, জগতের সকল প্রানী এই ধরনের প্রতিভা দেখিয়া সুখী হইয়াছে। তাঁহার পিতা জীবিত অবস্থায় যাহা কহেন নাই, বা বলেন নাই, এবং তিনিও পূর্বে এই গবেষনাটি সম্পন্ন করার কথা ভাবেন নাই, তাহার ছটা দেখিয়া আমরা বাসী এবং প্রবাসী সকল প্রানী উদ্বাহু নৃত্য করিতেছি। এতদিন কোথায় ছিলেন আমাদের এই পণ্ডিত শিরোমণি নেতা? হাওয়া ভবন হইতে সেই যে নিরুদ্দিষ্ট হইলেন ২০০৭ সালে আমাদের বুকে একবার আসিতে কী হইয়াছিল? না আসিলেন, তাহাতে কী? আপনার নির্দেশ পালন চলিতেছে সারা দেশে। আপনি লন্ডনের ব্যস্ত জনারণ্যে আমাদের জন্য যে সকল মুক্তির বানী পাঠাইতেছেন তাহা আমরা ভুলি নাই জনাব। আমরা একটু কষ্ট সহ্য করিতেছি, পুড়িতেছি, মরিতেছি, এবং বার-বি-কিউ তন্ত্র প্রায় প্রতিষ্ঠা করিয়া আনিয়াছি। আশা আছে একদিন আপনি এই বঙ্গদেশে নতুন হাওয়া ভবনে আবারো আসীন হইবেন, এবং বঙ্গদেশের সকল প্রানীকে সুখী করিবেন।

২)

বার-বি-কিউ তন্ত্রের এক পক্ষকে নিয়া অনেক লম্বা শ্রদ্ধাঞ্জলী জানানো হইয়াছে। অপর পক্ষকে একেবারে কিছু শ্রদ্ধা না দেখাইলে তাঁহারা মাইন্ড করিতে পারেন। আমাদের উজিরে আযম এবং তাঁহার সাঙ্গপাঙ্গরা প্রায়ই চমৎকার সব বক্তব্য এবং ত্তত্ব প্রদান করেন। প্রানীকূল কিছুই বুঝেনা, কাজেই তিনি এবং তাঁহার সাঙ্গপাঙ্গরা ইহাদের সঠিক রাস্তাটি বুঝানোর দায়িত্ত্ব লইয়াছেন। তাঁহারা স্রষ্টা কর্তৃক প্রেরিত দূতের মতন। সমগ্র ইতিহাস তাঁহাদের নখ দর্পণে। উজিরে আযম নিজেও পুস্তক লিখিয়া থাকেন। তাঁহার পক্ষে আরো অনেকেই লিখেন। তিনি আমাদের জানাইয়াছিলেন, বিএনপি-জামাতের কেউই মানুষ হত্যা করিতে পারিবেনা। তিনি কথা রাখিয়াছেন। মানুষ হত্যা বা পোড়ানো হয় নাই; প্রানী পুড়িয়াছে সব। অনেক ধমক-ধামক দিয়াছিলেন; বাস্তবে বার-বি-কিউ আলাদের ওপর গুলি চলে নাই তেমন। দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আর প্রানী হত্যাকারীদের ধরেনা; প্রানীরাই দেখা যাইতেছে দুই একজন বার-বি-কিউ আলাকে ধরাইয়া দিতেছে। এই বিষয়টি চমৎকার। বার-বি-কিউ তন্ত্রে প্রানীদের ধরিতে হয় অপরাধীকে; পুলিশ ইহা করেনা। এই তন্ত্র গণতন্ত্রকে ছাড়াইয়া গিয়াছে।

ঊজিরে আযমের সাঙ্গপাঙ্গরা আরেক কাঠি সরেস। ইঁহারা যখন তখন লাফ ঝাঁপ করিতেছেন। একজন বলিতেছেন, বার-বি-কিউ আলাদের বুকে গুলি করা হইবে; আরেকজন বলিতেছেন (ইনি গত টার্মে অল্প কিছু অর্থ এদিক সেদিক করিতে গিয়া ঝামেলায় পড়িয়াছিলেন), দুই চারিটা পেট্রোল বোমা সরকারকে দমাইতে পারিবেনা। আরেক কুশীলবতো একেবারে বিরোধী নেত্রীকে শেষ করিয়া দিতে উজিরে আজমের অনুমতি চাহিয়াছেন!!! আহা!! কী মধুর বক্তব্য!! হরে দরে যাহা লাউ তাহাই কদু। দুই চারিজন প্রানী পেট্রোল বোমার আঘাতে মরিয়া গেলে তেমন ক্ষতি কিছু নাই; তাঁহারা ক্ষমতায় থাকিলেই হইলো। ভাবখানা ওই রিজভী সাহেবের মতই; প্রানীরা একটু কষ্ট করুক, পুড়িয়া মরুক—আখেরে মানুষদের কল্যাণ তো হইবে; তাঁহাদের ক্ষমতায় থাকার গণতন্ত্র রক্ষা পাইবে; ত্যাগী রাজনৈতিক জীবনে আরো কিছুটা নয় ছয় করার সুযোগ পাওয়া যাইবে।

আরেকজন সদ্যই বলিয়াছেন, তাঁহারা নাকি আশা করিয়াছিলেন যে, আন্দোলনের নেত্রী প্রানীদের কাছে ক্ষমা চাহিয়া অবরোধ উঠাইয়া লইবেন। মামাবাড়ীর আবদার!!! হইতে পারে এই বিরাট মানুষটির মামাবাড়ী ফেনী জেলায়, কারন চট্টগ্রামের অনেক মানুষেরই মামার বাড়ী বৃহত্তর নোয়াখালী জেলায়। এই কারনে তিনি মনে হয় নেত্রীকে তাঁহার কাজিন ঠাওরাইয়াছিলেন। যাহা হউক, তাঁহার আবদার কাজিন শুনেন নাই। ধন্য আশা কুহূকিনী!!! উজিরে আযমের অন্য অনুসরণকারী এক সময় টেলিযোগাযোগের দায়িত্ত্বে ছিলেন, এবং নয় ছয়ের প্রচুর অভিযোগ উঠিয়াছিল। তিনি একটি ট্রেন তত্ত্ব নিয়া হাজির হইয়াছেন। আন্দোলনের নেত্রীকে পরের ট্রেনে আসার আহবান জানাইয়াছেন। কী উদার এই মনুষ্য সকল!!! প্রানী শিখিতে পারিলোনা কিছুই।

অবরোধ নাকি চলিবে। মনুষ্য কূলের গণতন্ত্রের জন্য প্রানীকূল কে আত্মাহুতি দিতে হইবে। ইহাই নিয়তি। রিজভী বাবাজী দূর হইতে হুংকার দিয়াছেন যে, শেষ বিজয় না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলিবে। আহা কত বড় নেতা!!! ভাতের অভাবে বিরিয়ানী খাইয়া শুকাইয়া যাইতেছেন। প্রানীকূল তাঁহাদের মনুষ্য নেতার এই আহবান নিশ্চয়ই শুনিয়াছে। গণতন্ত্র প্রায় দোরগোড়ায়। বার-বি-কিউ তন্ত্র একটি মধ্যবর্তী অবস্থা; অচিরেই গণতন্ত্র আসিবে; তবে প্রানীরা মরিবে এবং পুড়িবে বারংবার, কারন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র মানুষের জন্য, প্রানীদের জন্য নহে।

কিন্তু প্রানীরা যেকোন সময় বিদ্রোহী হইলেই বিপদ ঘনাইয়া আসিবে বলিয়া ধরনা করি। যেইভাবে বিভিন্ন জায়গায় বার-বি-কিউ আলাদের ধরিয়া ধোলাই দিতেছে তাহাতে বড়ই শঙ্কা যুক্ত আছি। অচিরেই সরকার দলীয় মনুষ্যদেরও ধরিয়া বসিতে পারে। কে বলিতে পারে কখন কী ঘটিবে!!! বিধাতার মনেই বা কী আছে তা কেইবা জানে??