ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

সেই কবে থেকে ফ্রাঙ্কেনষ্টাইনের গল্প শুনি। আমরা সবাই গল্পটি জানি। তবুও আরেকবার বলতে মন চাইলো। ফ্রাঙ্কেনষ্টাইন নাকি এক দানবের জন্ম দিয়েছিলেন যার ক্ষমতা ছিল প্রায় অসীমের কাছাকাছি। এই দানব একে একে খুন করে তার সৃষ্টিকর্তার ভাইকে, প্রেয়সীকে, এবং প্রিয়তম বন্ধুকে। এতসব ঘটনার কার্যকারণে মৃত্যু বরন করেন ফ্রাঙ্কেনষ্টাইনের পিতা, এবং দানবের খুনের দায়ে মৃত্যুদন্ড মেনে নিতে হয় ফ্রাঙ্কেনষ্টাইনের পরিবারের আরেক নির্দোষ মেয়েকে। ফ্রাঙ্কেনষ্টাইন ভেবেছিলেন তাঁর এই সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি জ্ঞানের জগতে এক অসীম ক্ষমতার অধিকারী হবেন, কিন্তু হননি তিনি, কারন তাঁর সৃষ্টি আর সৃষ্টিকর্তার কথা শোনেনি, এবং ফ্রাঙ্কে্নষ্টাইন আর এই দানবকে নিয়ন্ত্রন করতে পারেননি। যখন তিনি বুঝলেন এই সৃষ্টি তাঁর এবং অন্য সবার জন্য ক্ষতিকর, তিনি তখন একে ধ্বংস করতে চাইলেন, কিন্তু পারলেননা; বরং নিজেই মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়লেন। দানবকে সৃষ্টির ক্ষমতা ফ্রাঙ্কেষ্টাইনের ছিল, কিন্তু তাকে নিয়ন্ত্রনের ক্ষমতা তাঁর ছিলনা। সেই জন্য অভাজন হিসাবেই বলি, ফ্রাঙ্কেনষ্টাইনের দানব জন্ম দেয়া যায়, ধ্বংস করা যায়না।

শানে নজুল বলা গেল। এবার একটু বিস্তারের দিকে এগুনো যাক। আমরা কি ওপরের গল্পের ছায়া আমাদের দেশের প্রতিদিনের ঘটে যাওয়া মানুষ পোড়ানোর যজ্ঞে দেখতে পাচ্ছিনা? আমার বারবারই মনে হচ্ছে আপনি দানব তৈরী করেছেন, ম্যাডাম, অসংখ্য দানব। এখন আপনার আর এর থেকে মুক্তি নেই; এর থেকে আপনার নিস্তার নেই। আমি আজ একে একে এই দানবদের গল্প শোনাব আপনাকে।

কেন গল্পগুলো বলবো সেটি একটু বলে নেই। আমার কেন যেন মনে হয়েছে বাংলাদেশের বর্তমান মানুষ পোড়ানোর যে মহাযজ্ঞ চলছে তাতে ম্যাডাম আপনার কোন নিয়ন্ত্রন নেই। এখন এটি অন্য জায়গা থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। আমি দেখলাম গত ক’দিন ধরেই “কর্মসূচী” গুলো আসছে জনাব সালাহউদ্দীন এর নামে, এবং তাঁর সইও এতে নেই। আপনার দলের নেতারা যারা পুলিশের সেবার বাইরে আছেন আপাতত তাঁরাও কিছু বলেন না। এখন আপনার রাজনীতি কি আপনি আসলেই নিয়ন্ত্রন করছেন? আসুন একে একে ফ্রাঙ্কেনষ্টাইনদের গল্প শুনি তাহলে। দেখুনতো মেলে কিনা?

প্রথম দানব সৃষ্টি করেছিলেন আপনার নিজের ঘরে। দুই দানব, তারেক আর কোকো। বড় আর ছোট দানব। বড়টির তাণ্ডবের কাছে ছোটটির কর্ম খুব টের পাওয়া যেতনা, তবে তিনি যে আছেন এবং ছিলেন তা বোঝা যেত তাঁর নামের বিভিন্ন বানিজ্যলক্ষীর লেবেলে, যেমন কোকো ১, কোকো ২, খাম্বা লিমিটেড ইত্যাদি। বলা হয় যে, বড় জন ছোট জনকে ব্যবহার করতো। হতে পারে, কিন্তু আপনি এদের তৈরী করেছিলেন। আমি বলবো, সৃষ্টি করেছিলেন। তার খেসারত কিন্তু আপনাকেই দিতে হয়েছে। এখনো দিতে হচ্ছে। ছোট দানব আজ আর নেই, কিন্তু বড়জন আপনাকেসহ সবাইকে শেষ করে ছাড়বে বলে আমার মনে হচ্ছে। আজ আর দলীয় সিদ্ধান্তগুলো আপনি নিতে পারছেননা। কোথাকার কোন সালাহউদ্দীন নিচ্ছেন; আসলে তিনিও নিচ্ছেন না; নিচ্ছেন লন্ডনে নিরাপদ বাসস্থানে সুখে শান্তিতে থাকা তারেক রহমান, আপনার বড় দানব। এই দানবের সামনে আপনার দলের বড় বড় নেতারা হাত কচলে কথা বলেছেন এক সময়। সাইফুর রহমান, মান্নান ভুঁইয়ার মত নেতারা তাঁর সাক্ষাত পাননি। আমার কি প্রমান করার দরকার আছে যে তিনি ফ্রাঙ্কেনষ্টাইনের দানবের মতই আপনার একটি সংস্করণ? হিসেবটি দেখবেন? আপনার বিরুদ্ধে তীব্র গনরোষ সৃষ্টির পেছনে এই বড় দানবের বিরাট ভুমিকা আছে। মানেন এটা? নিজেকে প্রশ্ন করুন। আপনার কি এরকম বিশ্রী ভাবে পরাজিত হওয়ার কথা ২০০৮ এর নির্বাচনে?

এরপর থেকে আপনার অবস্থান চিন্তা করুন। সব বাদ দিয়ে এখনকার অবস্থাটা ভাবুনতো একবার। আপনাকে “আটকে” রাখা হয়েছে; “যোগাযোগ” বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে, এমনকি আপনাকে নাকি অভুক্তও রাখা হয়েছে হোটেল সোনারগাঁ থেকে আসা খাবার আটকে রেখে। এরপরও মানুষ আপনার জন্য পথে নামছেনা কেন? ভাবুনতো ১৯৯০ সালে এরশাদকে ক্ষমতা থেকে নামাতে কত মানুষকে মরতে হয়েছিল কতদিনে? আর গত প্রায় ৫০ দিনে আপনার “আন্দোলনে” কতজন পুড়েছে? নিজেকে প্রশ্ন করুন, ম্যাডাম। আজ আপনার দলের হরতাল, অবরোধ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গুলো কে দিচ্ছেন? আপনি? কিভাবে? আপনারতো যোগাযোগ নেই কারো সাথে। তাহলে? আমার মত নাদানদের শুধু মনে হয়, এখন কোন সিদ্ধান্তই আপনি দিচ্ছেননা। আপনার বড় দানব দিচ্ছেন আমাদের কলনিয়াল প্রভুদের জায়গা থেকে। আপনি পরিণতি টের পাচ্ছেন? মনে হয় পাচ্ছেননা; ফ্রাঙ্কেনষ্টাইনও টের পাননি প্রথমে। যখন পেলেন তখন আর নিজেকেও বাঁচাতে পারেননি। আপনিও কাঁটা তার দিয়ে ওটা পারবেননা।

বড় দানবের মতই অনেক ছোট ছোট দানব আপনি তৈরী করেছিলেন। গল্পে দানব তার সৃষ্টিকর্তাকে অনুরোধ করেছিল তার (দানব) জন্য আরেকজন সঙ্গী (নতুন দানব) সৃষ্টি করতে। সৃষ্টিকর্তা নতুন দানব তৈরী করেও তাতে প্রান দেননি এর ভয়াবহতা চিন্তা করে। আপনিও আপনার বড় দানবের জন্য অনেকগুলো ছোট দানব তৈরী করেছিলেন, কিন্তু এদের মাঝে প্রান দিয়েছিলেন। গল্পের সৃষ্টিকর্তার সাথে এইখানে আপনার পার্থক্য। গল্পের দানব একজন সঙ্গী (আসলে সঙ্গিনী) চেয়েছিল, আর আপনার বড় দানবের দরকার ছিল অনেকগুলো। এইসব ছোট ছোট দানবরা এখন আর আপনার কথা শোনেনা। দেখুন, রিজভীর আচরণ। খেয়াল করুন সালাহউদ্দিনের মত একজন নাদান রাজনীতিকের আপনাকে অতিক্রম করা। কারা এরা? আজ দেশের মানুষ পোড়ানোর যজ্ঞে টাকা ঢালছে কারা? কারা নির্দেশ দিচ্ছে নাশকতার? আপনি চেনেন এদের? যাত্রাবাড়ীতে নাশকতার নির্দেশ কে দিয়েছে? এইসব ছোট ছোট দানব আপনি বানিয়েছেন। আপনার বন্ধুরা কোথায়? সালাহউদ্দীন কে? আপনার দলের বড় নেতারা যারা বাইরে আছেন তাঁরা প্রায় কিছু জানেননা কেন? অথচ সবই আপনার নামে চলছে। আমার কেন যেন মনে হয়, আপনি এখন আর বিএনপির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মালিক নন। আপনার দলের এবং ঘরের দানবেরা আপনাকে শেষ করে দিচ্ছে, এবং সেইসাথে শেষ করছে আমাদের মত নিরপরাধ মানুষগুলোকে, হাসিনাকে নয়, আওয়ামী লীগকে নয়। সবাই যা বুঝতে পারছে আপনি তা পারছেননা।

আরেকটি বিশাল দানব তৈরী হয়েছে আপনার দলের ছায়াতলে। এর সৃষ্টির জন্য আপনি দায়ী নন; পরিচর্যার জন্য আপনি দায়ী অনেকটাই। সেটি হল জামাত-শিবির নামের বিষবৃক্ষ। স্বাধীন বাংলাদেশে এটি সৃষ্টি করেছিলেন বা এটি সৃষ্টির বীজ বপন করেছিলেন বংগবন্ধুর পক্ষে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘোষনার পাঠক, কিন্তু এর সুবিধা গুলো আপনি ভোগ করেছেন সবচেয়ে বেশী। এই দানবের সমর্থন নিয়ে আপনি ক্ষমতায় গেছেন, তাদের মন্ত্রী করেছেন; অস্ত্র আমদানী হয়েছে জঙ্গী তৎপরতা বাড়ানোর জন্য। সারাদেশকে আপনার আমলে জঙ্গীদের আখড়া বানানো হয়েছিল। আপনার বড় দানব এদের নিয়ে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী নেতৃত্ব স্বাধীনতার পক্ষ শক্তিকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করেছিল। আজ এসব বেরিয়ে আসছে। আপনি জানতেননা এসব? ধারনা করি, জানতেননা। ২০০৮ এর নির্বাচনে আপনার এই ভরাডুবির জন্য এই দানবদের কোন ভুমিকা নেই? আওয়ামী লীগ এত জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিল হঠাৎ? ভেবেছেন কখনো? ভাবেন নি, না? গত বছরের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ এরকম যেনতেন নির্বাচন করতে পারলো কোন বাধা ছাড়া!!! আপনার দলের এতবড় সমর্থকগোষ্ঠী তা মেনে নিল?

আপনি ভাবছেন এরা আপনাকে ক্ষমতায় নেবে। দেখুন, আজ যারা ধরা পড়ছে বোমা মারা বা আগুন দেয়ার জন্য এদের বেশীরভাগের রাজনৈতিক পরিচয় হল এরা জামাত-শিবিরের লোক। বাংলাদেশের মানুষ আপনাকে ভালবাসতে পারে, কিন্তু এদের? সম্ভব এদের ভালোবাসা? নাৎসিদের ভালোবাসা সম্ভব ইহুদীদের? ফলাফল এই যে, আমি মনে করি, এদের কারনে আপনি শেষ হচ্ছেন। এরা আপনার কথা আর শোনেনা; এরা জানে আপনি এখন আর কেউ নন। তাই এরা ছুটে গেছে আপনারই বড় দানবের কাছে। এদের ব্যবহার করছে বা এদের দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছে আপনার বড় দানব। সেই মোতাবেক আজ আপনি শেষ হচ্ছেন রাজনৈতিক ভাবে, আর আমরা শেষ হচ্ছি জীবন দিয়ে। এরা কি আপনার জন্য দানব নয়?

তবে ম্যাডাম, একটি কথা। ইতিহাস এধরনের দানবদের কারনে একসময় এদের সৃষ্টকর্তাদের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে। কিন্তু ইতিহাসের ধারায় জনতার মাঝেও তৈরী হয় এক নতুন ধরনের দানব। এদের সৃষ্টিকর্তা এরা নিজেরাই বা ইতিহাস নিজেই। এদের ধ্বংস হয়না; এদের ধ্বংস করা যায়না। আপনার এবং আপনাদের তৈরী দানবদের কারনে আমারও মনে হয় ইতিহাস দিক নতুন দানবের জন্ম যেমন দিয়েছিল একাত্তুরে বা নব্বইয়ে। আমারও হতে ইচ্ছে করে এরকম নতুন দানব; আমার ফ্রাঙ্কেনষ্টাইন হব আমি নিজেই, কারন আমিই ইতিহাস। ধ্বংস করবো আমি নষ্ট রাজনীতির দানবদের এবং তাদের সৃষ্টিকর্তা ফ্রাঙ্কেনষ্টাইনদের যারা আমার স্বজন পোড়ানোর যজ্ঞে মদদ দেয়। তারপর, “হব ইতিহাস”।