ক্যাটেগরিঃ স্যাটায়ার

 

ইদানীং বাংলা ভাষায় একটা খুব “অসুন্দর কিন্তু কঠিন সত্য” ধরনের কথা চালু করেছে ব্লগার বিচ্ছুরা। সেটি হলো এইঃ যতই ঢেকেঢুকে রাখা হোকনা কেন, ল্যাঞ্জা লুকোনো যায় না। কথাটা আসলেই সত্য। মনে করুন, আপনি আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধী, কারন, আপনি মনে করেন স্বাধীনতা আসলে ওই হিন্দু ইন্ডিয়ার ষড়যন্ত্রের ফসল। অবধারিতভাবে আপনি সাম্প্রদায়িকও বটে, কারন এইটি ছাড়া স্বাধীনতা বিরোধী হওয়া যায়না। অর্থাৎ সাম্প্রদায়িকতা স্বাধীনতা বিরোধীতার প্রয়োজনীয় কারন (নেসেসারী কজ)। এই যে আপনি সাম্প্রদায়িক, এবং সে কারনেই স্বাধীনতা বিরোধী এইটিই হচ্ছে আপনার ল্যাঞ্জা। এ এমন এক ল্যাঞ্জা যেটি আপনি লুকোতে চান; প্রচুর আবরণে এটিকে ঢেকেঢুকে রাখতে চান। কিন্তু বেশী ঢেকেঢুকে রাখতে যেয়ে  আপনার শরীরে প্রচন্ড চুলকানি শুরু হয় অনেকটা চোতরা বা বিছুটি পাতা গায়ে লাগার মত, এবং এক সময় আপনি ওইসব আবরণ ছুঁড়ে ফেলে দেন; অতঃপর আপনার ল্যাঞ্জাটি বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু আপনি কিভাবে এটিকে সব চেয়ে বেশী সময় লুকিয়ে রাখবেন তার একটি নিম্নমানের গঞ্জিকা এখানে দেয়া হোলো; নিজ দায়িত্ত্বে সেবন করবেন।

যে ল্যাঞ্জাটি আপনি ধারন করেন সেটি কিভাবে লুকোবেন? আপনি শুরুতেই স্বাধীনতার পক্ষের লোকদের জানিয়ে দিন যে, আপনিও স্বাধীনতার একনিষ্ঠ সমর্থক। তাদের এটিও বলুন যে, আপনার পিতার পাড়াতুতো নানা এবং জেলাতুতো ভগ্নীপতি মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্ত্র ধরেছিলেন। সম্ভব হলে একটি সেক্টরের নাম্বারও (শুধু এগার নম্বরটি বলবেন না যদি তাঁরা শিল্পী টিল্পী না হন) বলে দিতে পারেন। আরো ভালো হয় যদি একজন সেক্টর কমান্ডারের নাম বলতে পারেন যার অধীনে তাঁরা “যুদ্ধ” করেছেন। আজকাল বাঙ্গালীর যা দশা হয়েছে, যে কোন একটা নাম বলে তার আগে বীরোত্তম যোগ করে দিলেই বাঙ্গালী মোটামুটি মুগ্ধ বিস্ময়ে আপনার দিকে তাকিয়ে থাকবে। এখন আপনি যদি ১৯৭১ এ খুব ছোট থাকেন তা হলে আপনার শ্রোতাদের জানিয়ে দিন সে সময় আপনার মাতা আপনাকে কোলে নিয়ে কিভাবে পালিয়ে বেড়িয়েছেন। যদি ১৯৭১ এ জন্ম না নিয়ে থাকেন তা হলে তো কথাই নেই। ওদের বলুন আপনি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সব গল্প আপনার গ্রামতুতো মামার কাছে শুনেছেন। আর যদি সে সময় আপনি প্রাপ্ত বয়স্ক থেকে থাকেন, তবে খুব সুকৌশলে প্রফেসর জাফর ইকবাল এবং হুমায়ুন আহমেদ ভ্রাতৃদ্বয়কে আলোচনায় টেনে আনুন; সম্ভব হলে  তাঁদের সাথে একটা আত্মীয়তার সম্পর্ক বের করুন, এবং এ পর্যন্ত বলতে পারেন যে, এদের সাথে আলোচনা করেই সে সময় আপনি বা আপনারা যুদ্ধে যাননি। এই পর্যায়ে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন যে, আপনার ল্যাঞ্জাটি আপনি মোটামুটি লুকিয়ে ফেলতে পেরেছেন।

কিন্তু ল্যাঞ্জা লুকোলেইতো হোলোনা; এটি সারাক্ষন লুকিয়ে রাখাওতো যন্ত্রণার বিষয়। কত আর আপনার পেয়ারে পাকিস্তানকে নিয়ে আজেবাজে কথাবার্তা  শোনা যায়; অথবা আপনার দিল কা পেয়ারে নেতা গোলাম বা মুজাহিদ বা কাসেম অথবা নিশানে পাকিস্তান নিজামী বা শায়ারে কিস্তি সাকাকে নিয়ে নাফরমানী বক্তব্যই বা কত সহ্য করা যায়!!! ভদ্রতারওতো একটা সীমারেখা আছে। আপনার ভদ্রতাকে এরা দুর্বলতা ভাবছে। এ তো হতে পারেনা। আপনি এবার আস্তে আস্তে এসবের প্রতিবাদ করুন। কিভাবে করবেন? শ্রোতাদের জানান যে, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ মুজিব (যদি বেশী সেয়ান হন তবে বঙ্গবন্ধু বলুন; আখেরে লাভ হবে) ছাড়া ভাবা যায়না, তবে…।। হ্যাঁ, এই “তবে” বলেই একটু কৌশলী পজ দিন। এরপর বলার চেষ্টা করুন যে, মুজিবের আগে ভাসানী এবং অন্য নেতারাও স্বাধীনতার কথা বলেছিলেন। এ বিষয়ে একটি ভিডিও ক্লিপের রেফারেন্স দিতে পারেন যেখানে মুজিব স্বাধীনতা চান না বলেছেন। প্রয়োজনে এ বিষয়ে সামান্য পড়াশুনোও  করে নিতে পারেন। খুবই চমৎকার ভাষায় আপনার শ্রোতাদের জানান, মুজিব ১৯৪২-৪৭ এ সোহরাওয়ারদীর সাথে মিলে কী করেছিলেন। তবে সাবধান, আগে বুঝে নিন্‌ আপনার শ্রোতার ইতিহাস জ্ঞান কেমন। সবার সাথে এই বটিকাটি ব্যবহার করবেন না।

এরপর আসুন ল্যাঞ্জা লুকিয়ে নিজেকে কিভাবে উপস্থাপন করবেন। মনে করুন আপনি যে বান্দাটি্র স্বাধীনতা বা মুজিব বা আওয়ামী লীগ বিষয়ক কথাবার্তা অপছন্দ করেন সেই নরাধম কোন একটি আসরে পাকিস্তানীদের উদ্দেশ্যে “হ্যান কারেঙ্গা- ত্যান কারেঙ্গা, হাতি ঘোড়া মারেঙ্গা” টাইপ বক্তব্য দিচ্ছে। লুকোনো ল্যাঞ্জার কারণে  এদিকে আপনার চুলাকানির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। অথচ আপনি ল্যাঞ্জা লুকিয়ে এবং চোতরা পাতার চুলাকানিসম যন্ত্রণা সহ্য করেও ওই ফাজিলকে কিছুই বলতে পারছেন না। এই পর্যায়ে একটু ধৈর্য ধরুন। একবার না একবার আপনার কোর্টে বল আসবেই। বলটি না আসা পর্যন্ত মুখে চমৎকার নিশানে পাকিস্তান নিজামী সদৃশ একটি হাসি দিয়ে ভাব দেখান যে, আপনি মোটামুটিভাবে ওই নাদান পাবলিকের সাথে একমত। আরো ভালো হয় যদি তাকে উসকে দিতে পারেন। এই যেমন বলতে পারেন, সব পাকিস্তানী কিন্তু এক রকম নয়, যেমন প্রফেসর সালাম। এটি শোনার সাথে সাথে উক্ত বান্দার ক্ষেপে যাওয়ার চান্স খুবই হাই, এবং সেই সাথে বান্দাটি বলে বসতে পারে, “সব পাইক্কাই এক টাইপ”। এইবার কিন্তু আপনি খেলবেন। আসরে উপস্থিত আপনার এবং ওই বান্দার মত জ্ঞানীদের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করুন, একটি পুরো জাতিকে এইভাবে “পাইক্কা” বলা ঠিক নয়; আমেরিকাতে কালোদের আমরা বাঙ্গালীরা “কালুয়া” বলি, এবং আমরাই বর্ণবাদের বিরুদ্ধে বলি। আরো বলুন, এই যে পাইক্কা বা পাকি ডাকার চল এইটি কিছুতেই ভদ্রজনোচিত হয়না, কারন এটি বর্ণ বাদী চিন্তাধারার বহিঃপ্রকাশ। এই পর্যায়ে আপনি খেয়াল করবেন, চারপাশে আপনি অনেকেরই সমর্থন সূচক ঘাড়নাড়া পাচ্ছেন।  আপনার ল্যাঞ্জা আরো শক্ত আবরণে লুকিয়ে পড়বে। এরপর আপনার অন্যান্য বক্তব্য এর সাথে যোগ করতে থাকুন।

তবে সাবধান থাকবেন যদি দেখেন আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী মুমিন অনেক বেশী কৌশলী। সেক্ষেত্রে আপনার ল্যাঞ্জা কিন্তু বেরিয়ে পড়তে পারে। এরকম একটি ঘটনা আমি এই সম্প্রতি দেখতে পেলাম। ফেসবুকে আলোচনাটি চলছিল আমাদের বংগ বিড়াল খান বাহাদুর সেলিম ওসমান সাহেবের অসাধারন কীর্তি বিষয়ে। আজীবন জনতা শুনে এসেছে, শিক্ষকেরা ছাত্রদের কানে ধরায়, আর সেখানে খান বাহাদুর সাহেব নিজেই শিক্ষককে কান ধরিয়েছেন, কারন তিনি একজন সত্যিকারের “মুসলমান” হিসেবে কাজটিকে ছহি মনে করেছেন। ভালো কথা। আমরাও আহ্লাদিত, তবে মূর্খ জনগণের মাইরের ভয়ে চুপ করে ছিলাম। মূর্খেরা হাজার হাজার পোষ্ট শেয়ারে দিচ্ছিল। আমার মেজাজ খারাপ হচ্ছিল, এবং আমি এর কোনটাতেই লাইক দেয়া থেকে বিরত ছিলাম। তার ওপর এটা আবার ধর্ম নিয়ে ঝামেলা। আমার সম মানসিকতার এক জ্ঞানী বন্ধু আমাকে দূরালাপণীতে বলল, বুঝলি, আসল ঘটনা আর কিছুনা; এগুলো সবই ইন্ডিয়ার ষড়যন্ত্র; সেলিম ওসমান আসলে কিছুই করেনি; র’ এর এক এজেন্ট এটি করেছে সেলিম ওসমানের ছদ্মবেশে। আমি বললাম, ভাই, তোর কাছে দেখি সব গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো বিএনপির রিজভী আর আওয়ামী লীগের হাছান মাহমুদের মত চলে আসে, কিন্তু দোস্ত এই খরবটা চেপে যা; এখন দিনকাল খারাপ; যখন তখন গুম হয়ে যাবি, কারন র’ এর এজেন্টরা তোর আর আমার দিকে কঠিন নজর রাখছে। বন্ধুটি আমার সব কথাই শোনে, কিন্তু এই কথাটি শুনলোনা। কোথাকার কোন্‌ তৃতীয় শ্রেনীর ব্লগে আওয়ামী লীগারদের দ্বারা শিক্ষক লাঞ্ছনার খবর ফেস বুকে শেয়ার করে দিল। আর যায় কোথায়? সাথে সাথে মূর্খ জনগণ ধরে বসলোঃ কীরে ভাই, তুই এত দিনের মধ্যে খান বাহাদূরের কীর্তি নিয়ে কিছুই বললিনা, অথচ যেই একটি আকামে আওয়ামী লীগের কানেকশান দেখলি ওমনি তা শেয়ারে দিলি, অথচ এই খবরটি ফালু সাহেবের টিভি চ্যানেলেও দিলোনা; ব্যাপারটা কী?

অতঃপর আমার বন্ধুটিকে আমিই ফোন করলাম। দেখলাম, ল্যাঞ্জা প্রকাশ হওয়ার দুঃখে সে খুবই কাতর। আমি তাকে সান্তনা দিয়ে বললাম, দুঃখ পেওনা, বন্ধু; আরো অনেক ল্যাঞ্জা আমাদের গোপন আছে; সেগুলো লুকোতে হবে; খুঁজে দেখ্‌, শেখ মুজিবের স্বাধীনতা ঘোষণা নিয়ে কোন ঝামেলা আছে কিনা, অথবা মুজিব পাকিস্তানীদের কারাগারে যাওয়ার সময় পাইপ সাথে নিয়ে যেতো কেন সে বিষয়ে একটু গবেষনা কর্‌ ম্যাডামকে দেয়ার জন্য; আর খুঁজে দেখ্‌ লায়াল পুরে মুজিব কী ধরনের খাওয়া দাওয়া করতো; পোলাও মোরগ মুসাল্লাম খেতো কিনা। ওকে আরো বললাম কথা বার্তায় সাবধান হতে। আমাদের ম্যাডাম যে যন্ত্রণায় পড়েছেন এখন লায়ালপুরে মুজিবের বিলাস-ব্যসনে দিন কাটানোর কথা বলে তা থেকে শিক্ষা নিতে বললাম তাকে। ম্যাডাম এই কথাটি বলাতেই তো এই কতিপয় ব্লগার বিচ্ছুরা ১৯৭১ এ তিনি কতটা নির্যাতিত অবস্থায় দিন কাটিয়েছিলেন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে; তিনি কেন আমাদের “ঘোষকের” পাঠানো বাহিনীর সাথে স্বামীর কাছে যাননি তা নিয়ে কথা বলছে; ডন পত্রিকায় স্বামীকে ফিরে আসার যে আহবান জানিয়েছিলেন তা এই বিচ্ছুগুলা প্রকাশ করে দিচ্ছে। এ থেকে শিক্ষনীয় অনেক কিছু আছে। ম্যাডাম অনেকদিন ল্যাঞ্জা লুকিয়েছিলেন, কিন্তু এই যাত্রা আর পারলেন না।

ব্লগার বিচ্ছুরা আসলেই স্বাধীনতা যুদ্ধে পাইক্কা সেনাদের পানিতে চুবানো বিচ্ছুদের চেয়ে কম যায়না। বন্ধুকে যাই বলিনা কেন, জীবনের সার কথা যা বুঝলাম তা হল, আসলেইতো, ল্যাঞ্জা লুকানো যায়না; চোতরা পাতা সম চুলকানির এক পর্যায়ে এটি বেরিয়ে পড়তে বাধ্য; রথী মহারথীরা ম্যাডামেরাই যেখানে পারেননা, আমাদের মত নাদানেরা কোন ছার!!!