ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাধিকার চেতনা

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে শহীদ মিনার এলাকার শিক্ষক কোয়ার্টারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক এ এন এম মনিরুজ্জামান, তার ভাই এডভোকেট শামসুজ্জামান, ছেলে আক্রামুজ্জামান ও ভাগিনা নাসিরুল ওহাব পাক হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হন। স্বামী, সন্তানসহ স্বজনদের হারিয়ে পাগলপ্রায় সৈয়দা মাহমুদুজ্জামান জোহরা (মনিরুজ্জামানের স্ত্রী) সান্ত্বনা খুঁজে পেয়েছিলেন এই ভেবে যে একদিন দেশ শত্র“মুক্ত হবে। পরাধীনতার গ্লানি থেকে আমরা মুক্তি পাবো। মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন গর্বিত সৈনিক হিসেবে তার স্বজনদের নামের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিলবে। শহীদের স্ত্রী ও মা হিসেবে গর্বে তার বুক ভরে যাবে।

দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হলো। শহীদ হিসেবে তার স্বামী, সন্তানের নাম রাষ্ট্রীয় তালিকায় লেখা হবে। এই স্বীকৃতির জন্য তিনি অধীর আগ্রহে ছেলে মাহমুদুজ্জামানকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়সহ ঘুরেছেন বিভিন্ন জায়গায়। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি এই স্বীকৃতির অপেক্ষায় ছিলেন। মৃত্যুর আগে দেখে যেতে চেয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের জাতীয় তালিকায় তার স্বামী সন্তানের নামটি স্থান পেয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ তার হয়নি। এই কষ্ট বুকে নিয়েই ২০০৮ সালের ২২ জানুয়ারি তিনি মারা যান।

সৈয়দা মাহমুদা জামানের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী (২৫ মার্চের কালরাতে রোকেয়া হলের লিফটম্যান হিসেবে কর্মরত) শহীদ আহম্মদ আলীর স্ত্রী সালেহা বেগমও মৃত্যুর আগে দেখে যেতে চেয়েছিলেন তার স্বামীর নামটি জাতীয় তালিকায় স্থান পেয়েছে। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। তিনিও এক বুক বেদনা নিয়ে ২০০৪ সালের ১৮ এপ্রিল মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েন।

মাহমুদা জামান ও সালেহা বেগমের মতো শহীদ পরিবারের অনেক সদস্যই পরপারে চলে গেছেন। যারা এখনো বেঁচে আছেন তারা আশায় বুক বেঁধে আছেন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ার। কিন্তু প্রশ্ন সেই ভাগ্য তাদের হবে কি?

অনুসন্ধানে জানা যায়, স্বাধীনতার ৪১ বছর পার হলেও এখনো পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের জাতীয় তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। শহীদ পরিবার হিসেবে আমন্ত্রণও জানানো হয় না কোনো অনুষ্ঠানে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকারের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদদের নাম জাতীয় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তখন তারা রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণও পেতেন। কিন্তু ৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর থেমে যায় সেই প্রক্রিয়া। এর পর রাষ্ট্রীয় এই স্বীকৃতির জন্য শহীদ পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহলে ঘুরেছেন। আশ্বাসও পেয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি।

এরশাদ সরকারের সময়ে মাত্র তিনজন শহীদ শিক্ষকের নাম শহীদ হিসেবে জাতীয় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হলেও বাকিদের নাম ওই তালিকায় ঠাঁই পায়নি। এছাড়া স্বাধীনতার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধকালীন শহীদদের একটি তালিকা প্রণয়ন করা হয়। ওই তালিকায় ২০ জন শিক্ষক ও কর্মকর্তা, ১০১ জন শিক্ষার্থী ও ২৮ জন কর্মচারীর নাম রয়েছে। কিন্তু শহীদদের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হলেও অন্যদের নাম এখনো পর্যন্ত তালিকায় স্থান পায়নি। তাদের নাম এখন কেউ জানে না।

জানা যায়, ১৯৮৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শহীদ পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের জন্য পূর্ত মন্ত্রণালয়ে একটি পত্র দেন। এছাড়া ৯১ সালের ১৩ ফেব্র“য়ারি সিন্ডিকেটের সভার সিদ্ধান্ত
অনুযায়ী ৯১ সালের ২১ মার্চ ও ২৫ নভেম্বর পুনর্বাসনের স্বার্থে ১৪ জন শহীদ পরিবারের (যারা ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসভবনে অবস্থান করছিলেন) নামের তালিকাসহ দুটি চিঠি পূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব একটি চিঠির মাধ্যমে মাত্র তিনজন শহীদ শিক্ষকের নাম সরকারি পরিত্যক্ত বাড়ি বরাদ্দের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত আছে বলে জানান।

শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কখা বলে জানা যায়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় শহীদদের যে জাতীয় তালিকা করেছিল তাতে বহুবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদদের নামও অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছিল। এরশাদের শাসনামলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ইংরেজি বিভাগের তৎকালীন সহকারী অধ্যাপক এস এম এ রাশিদুল হাসান, বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আনোয়ার পাশা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন মেডিকেল অফিসার ডা. মোঃ মোর্তুজার নাম জাতীয় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে এবং এই পরিবারগুলোকে শহীদদের স্বীকৃতি স্বরূপ সনদও দেয়া হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য বাকিদের এই স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। এর ফলে তিনটি পরিবার ছাড়া বাকিরা শহীদ পরিবার হিসেবে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে।

এরপর ১৯৯৬ সালের ১২ মার্চ পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে শহীদদের নাম জাতীয় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রতিরক্ষা সচিব বরাবর আবেদন করা হয়। ওই বছরের ৩ ডিসেম্বর মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মোঃ আমিনউদ্দিন একটি চিঠি শহীদ পরিবার কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি মোশাররফ হোসেন বরাবর পাঠান। চিঠিতে আবেদনের প্রেক্ষিতে স্থানীয় ঠিকানা প্রেরণ ও ইতিপূর্বের নির্ধারিত সময়ে নাম তালিকাভুক্তির জন্য নির্ধারিত ফরমে আবেদন করেছেন কিনা তা জানতে চাওয়া হয়। মোশারফ জানান, এরপর স্থানীয় ঠিকানাসহ আমাদের আবেদনের সমস্ত কাগজপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠালেও অদ্যাবধি এর কোনো জবাব পাইনি।

১৯৯৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ঢাবির শহীদ পরিবার সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ দেখা করে তাদের প্রতি বঞ্চনা ও অবহেলার কথা তুলে ধরেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শহীদের নাম জাতীয় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছিলেন।

শেখ হাসিনা তাদের দাবির প্রেক্ষিতে ঢাবির শহীদদের নাম জাতীয় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা আর আলোর মুখ দেখেনি।
শহীদ পরিবার কল্যাণ সমিতির সভাপতি শহীদ অধ্যাপক মনিরুজ্জানের ছেলে আবু মুসা ম. মাসুদউজ্জামান বলেন, ৭১ এর ২৫ মার্চ রাত থেকে ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাদের হত্যা করা হয়েছিল তাদের সবাই কোনো না কোনোভাবে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ৭১ এর ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্চ মাসের শুরু থেকেই মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে ট্রেনিং ও কুচকাওয়াজ শুরু হয়। এতে শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী, কর্মকর্তা, কর্মচারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। ২৫ মার্চ রাতে প্রথমেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আক্রান্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকলেই যার যার অবস্থান থেকে এর প্রতিবাদ করেন। আর এ কারণেই নির্বিচারে হত্যা করা হয় তাদের। আমি মনে করি মুক্তিযুদ্ধকালীন যারা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পাক হানাদার ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের হাতে নিহত হয়েছেন তারা সবাই শহীদ মুক্তিযোদ্ধা।

ঢাবি শহীদ পরিবার কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোঃ শাহজাহান বলেন, আমাদের দুঃখ একটাই আমরা শহীদ পরিবার হওয়া সত্ত্বেও স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে সরকার বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কেউ আমাদের আমন্ত্রণ জানায় না। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, যদি শহীদ হিসেবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কমকর্তা-কর্মচারীদের স্বীকৃতি দেয়া হয় তবে কেন জাতীয় তালিকায় তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।

মূলত ৭১’র মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিল। এক কথায় একটি রাস্ট্রের সৃষ্টিতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান কি ছিল, তা ইতিহাস খুঁজলে পাওয়া যাবে। তবে সে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদদের সংখ্যা এবং শীদদের মর্যাদা আজোও পাওয়া যায়নি, তা ভাবতেও কষ্ট হয়। এ নিয়ে আমি শহীদদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে ( একটি পত্রিকায় বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্র্টার থাকাকালীন) আমরা কয়েকজন কয়েকটি রিপোর্ট করেছিলাম। কিন্তু কাজ হয়নি। ভবিষতে কাজ হবে কিনা জানিনা। তারপরও বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ পরিবারসহ দেশের সকল শহীদ পরিবারের সঠিক তালিকা যথাযথ মূল্যায়ন করা হওক।