ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

সন্তান মেয়ে হলে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মেয়েদেরকেই (মা) সবচেয়ে বেশি ব্লেম (দোষ চাপানো) দেওয়া হয় এবং সাথে অন্যান্য গৌণ কারণও অনুসন্ধান করা হয়। এই ব্লেম শুধু পুরুষ না, অন্য নারীদের থেকেও আসে। আর এটার পাল্টা ব্লেম দিতে নারীবাদী ও লেখক সমাজের অনেকেই ‘বৈজ্ঞানিক যুক্তি’ দিয়ে দায়ভার পুরুষকে দেয়। ব্যাখ্যাটি এরূপ- ‘XY’ মিলে ছেলে শিশুর জন্মে, যেখানে কেবল পুরুষের শুক্রাণুতেই ‘Y’ ক্রোমোজোম আছে।

এ ব্লেমিং করার যুক্তিই-বা কতটুকু যৌক্তিক? প্রকৃতপক্ষে এখানে কি মানুষের কোন নিয়ন্ত্রণ আছে? কখনোই না। যদি থাকত, তবে তো পুরুষটি প্রয়োজন অনুযায়ী কখনো ‘Y’ আবার কখনো ‘X’ ক্রোমোজোমের স্খলন ও মিলন ঘটিয়ে একবার ছেলে ও একবার মেয়ে সন্তান নিতে পারতো! যেমন- চীন প্রযুক্তি, অস্ত্র ও অর্থনীতিতে শক্তিশালী হয়েও ‘এক সন্তান নীতি’ নেয়ার পর আনুপাতিক মেয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যাওয়ায় তাদের ঐ নীতি পরিবর্তনে করতে বাধ্য হয়েছে। ভারতে মেয়ে ভ্রূণ হত্যা করতে পারলেও, কোন পুরুষ বা নারী ডাক্তার ‘XX’ ও ‘XY’ মিলনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।

আসলেই এটা একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ঘটনা, যেখানে বিধাতা আপাত-প্রত্যক্ষ, মানুষের করার কোন কিছুই রাখেননি। যদি করার কিছুই থাকত তবে মানুষ কেবল আগত সন্তানটির লিঙ্গ নির্ধারণ করে ক্ষান্ত না হয়ে এর অন্যান্য বৈশিষ্ট্যও (শারীরিক গঠন, গায়ের রঙ, বুদ্ধিমত্তা, ইত্যাদি) মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাই ক্রোমোজোমের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করত। ছেলে সন্তানের জন্য যে তাবিজ-কবজ-পীর ইত্যাদি তুলকালাম হয়, তা কতটুকু ফলপ্রসূ হয় তাও গবেষণার বিষয়।

মূলকথা হচ্ছে, সন্তান ছেলে বা মেয়ে যা-ই হোক না কেন, পুরুষ বা নারী কাউকেই ব্লেম দেওয়া যাবে না। ব্লেম দেওয়ার ক্ষেত্রে, নারী বা পুরুষ এর পক্ষে যুক্তি বা বিপক্ষে পাল্টা যুক্তি দেওয়াই যাবে, কিন্তু এখানে বিষয়টি যুক্তির মাধ্যমে বিচার্য কিনা তা প্রথমে ভেবে নিতে হবে। ‘সন্তানের লিঙ্গের দায়ভার’ বিষয়টি নিজেই যখন অযৌক্তিক, তখন এর পক্ষে বা বিপক্ষে কেন যুক্তি আসে? প্রাকৃতিক কোন ঘটনা, যেখানে মানুষের আদৌ কোন নিয়ন্ত্রণ নেই, সেখানে দায়ভার চাপানোর ব্যাখ্যা নিতান্তই অমূলক ও হাস্যকর।

মেয়ে শিশু জন্ম নেওয়ার জন্য একটি নারী অথবা পুরুষের উপর দায়ভার চাপানো, দুটোই চরম অন্যায়। সমাজে পুরুষ দ্বারা এই চর্চা হচ্ছে বলেই প্রকৃতি বিরুদ্ধ কথা বলা সমীচিন নয়। আর বৈজ্ঞানিক যুক্তির খাতিরে যদি মেনে নেওয়া হয় পুরুষটিই ছেলে বা মেয়ে হয়ার জন্য দায়ি, তবে এখন থেকে আবার সমাজে পুরুষটিকে তিরস্কার ও নির্যাতন করা শুরু করতে হবে। যেমন, মেয়ে সন্তান বার বার হতে থাকলে একটি নারীকে স্বামী বাদে অন্য পুরুষ খুঁজে নিবে, যেমনটা এখন পুরুষরা করছে। যে অন্যায় চর্চা এখন নারীর বিরুদ্ধে চলছে, তখন সে অন্যায়টা পুরুষটার বিরুদ্ধে করতে হবে- যেহেতু তার শুক্রাণুর ক্রোমোজোমে সমস্যা। যদি এরূপ চিত্র তৈরি হয়, তাহলে পুরুষ ও নারীর মাঝে পার্থক্যই কী থাকবে- যেখানে উভয়ই নির্যাতনকারী কেবল সময়ের পালাবদল!

আবার যদি বলা হয়, একারণে নারীদের পুরুষকে নির্যাতনের মোহ নেই, তারা শুধু এই ব্লেম থেকে মুক্তি চায়।  তাই বলে পুরুষের একটি অন্যায় চর্চা ও অযৌক্তিক ব্লেমকে প্রতিরোধ করার জন্য, আমরা অন্য আরেকটি অমূলক যুক্তি ও পাল্টা ব্লেম দিতে পারি না। দায়ভার চাপানো পুরুষকে আরো আগ্রাসী করে তুলতে পারে, কারণ এটা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী মনোভাব গড়ে তুলে। এটা এ-ও বোঝায় যে, মেয়ে শিশু জন্মানো দোষের কিছু, তাই পুরুষ নারীকে বলে ‘এ দায় তুমি নাও’ আর নারী পুরুষকে বলছে ‘না, এ দায় তুমি নাও’। তবে মেয়ে শিশুকে নিয়ে সমাজের এই অবমাননাকর ছোড়াছুড়ি বন্ধ হওয়াই কাম্য।

এটাও বলা যাবে না যে, এটা পুরুষরা যুক্তি বিচার করে সচেতন ভাবেই করছে। আমাদের সমাজ বাস্তবতায় সৃষ্ট বহুবিধ কারণই পুরুষকে যুগ যুগ ধরে এই অন্যায় চর্চা ও নারী নির্যাতনে ইন্ধন যুগিয়েছে। যেখানে এই চর্চার পিছনে নানাবিধ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাষ্ট্রীয় ইত্যাদি কারণ জড়িত, সেখানে কেবল বায়োলজিক্যাল একটি যুক্তি দেখিয়ে সব দায়ভার পুরুষের উপর চাপিয়ে নিজেদেরকে (নারীরা) খালাস মনে করা যায় না।

আমাদের প্রথমে বিবেচনা করতে হবে- কেন সমাজে এই ব্লেমিং কালচার তৈরি হচ্ছে এবং তা অবিরত চর্চা হচ্ছে? আর এটাও মনে রাখতে হবে, কোন অন্যায়ের যৌক্তিক কারণ থাকে না, যা থাকে তা সবই গরল ও নীতিভ্রষ্ট। তাই কোন অন্যায়কে ডিফেন্স করার জন্য যৌক্তিক কোন ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন। কোন পুরুষ হাজারও যুক্তি ও কারণ দেখিয়েও অন্যায় আর নির্যাতনকারী হতে পারে না । নানান অজুহাতে নারীর প্রতি সহিংসতা কোন অবস্থাতেই মেনে নেওয়া যায় না। যেমন: কোন সার্টিফিকেটধারী চাকুরীজীবী পুরুষ যদি স্ত্রীকে শারীরিকভাবে প্রহার করে, তাকে অশিক্ষিত-মূর্খ বলাই শ্রেয়। এক্ষেত্রে মনোভাব পাল্টানোই সবথেকে ভাল সমাধান। আসুন পরস্পরকে ব্লেমিং বাদ দিয়ে একটা নতুন শিশুকে পৃথিবীতে স্বাগত জানাই, যেখানে তার লিঙ্গ যাই হোক।

এই সমাজ বিশেষত পুরুষরা যে ব্লেমিং চর্চা করছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এটা এরকম বলা যায়  যে, ‘এ যাত্রায় পুরুষরা (স্বামী) অগ্রগামী আর নারীরা অনুগামী, অন্য একটি নারীর (স্ত্রী)  বিরুদ্ধে । বর্তমান বাংলাদেশে আধুনিক শিক্ষা ও বিশ্বায়নের প্রভাবে ব্লেমিংয়ের চর্চা হয়তোবা অনেকটা কমেছে, তবে গবেষণার মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র তুলে আনা যাবে। ব্লেমিং কমে থাকলেও এ কথা সত্য যে, এখনো একটি মেয়ে শিশু জন্মগ্রহণ করলে নারী-পুরুষ সমভাবে ব্যথিত হয়। মেয়ে সন্তান হওয়ায় শুধু স্বামী নয়, স্ত্রীও নিজ সন্তানের স্ত্রী-লিঙ্গের কারণে মনঃক্ষুন্ন হন।

কোন দম্পতি বা পরিবার কখনো একবার ছেলে বা আরেকবার মেয়ে সন্তান আশা করতেই পারে। কাঙ্ক্ষিত লিঙ্গের সন্তান জন্ম না নিলে স্বাভাবিকভাবেই মনের অজান্তে ‘দম্পতির’ বা পরিবারের মন খারাপ হতেই পারে- সেটা দোষের কিছু নয়। তাই বলে একে অপরকে ব্লেম দেওয়া বা বিভিন্ন কারণ অনুসন্ধান (যেমন: বংশগত দোষ) করাই গর্হিত কাজ। ব্লেমিং চর্চার বাস্তব উদাহরণ ও কারণসমূহ, পরিসংখ্যান এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে বিশদ প্রবন্ধ লেখা যাবে।

শেষ কথা, নারী-পুরুষ পাশাপাশি থেকে সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে মনোনিবেশ করবে, যেখানে কেউ কারও উপর দোষ চাপানোর বাহানা খুঁজবে না। আমাদের সমাজ ততক্ষণ পর্যন্ত নারীবান্ধব হবে না, যতক্ষণ না আমরা সর্বক্ষেত্রে একে অপরকে দোষ চাপানোর সংস্কৃতি বন্ধ না করবো।