ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

ব্রিটিশ দখলদারিত্ব শেষ হবার পরপরই কাশ্মীর রাজ্যটি নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মাঝে দখলদারিত্বের বিবাদ শুরু হয়। সেই ১৯৪৭ সাল থেকে আজ অবধি প্রায় ৭২ বছরেও এর কোনো শান্তিপূর্ণ স্থায়ী সমাধান হয়নি। রাষ্ট্রীয় শাসনের এ সংকটটি নিয়ে প্রায়ই এই দুটি রাষ্ট্রের মাঝে চরম উত্তেজনা বা কাশ্মীরে বসবাসরত জনগণের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।

এর ফলে যেমন ভুক্তভোগী বেশি হতে হচ্ছে কাশ্মীরের জনগণকে, তেমনি ক্ষতি হচ্ছে ভারত ও পাকিস্তানের জনগণের। ভারতীয় উপমহাদেশের মহান রাজনীতিবিদ শেখ মুজিবুর রহমান কাশ্মীর সংকট এবং এর সমাধান নিয়ে ১৯৬৬ সালে কারাগারে থাকাকালীন ভাবনাসমূহ আজও যেন সমভাবে প্রযোজ্য। পাঠকের জন্য বঙ্গবন্ধুর এ সম্পর্কিত নোটগুলো সরাসরি উদ্ধৃত হল।

শনিবার ২রা জুলাই ১৯৬৬ 

“ভারতের মুসলমানরা যখনই তাদের অধিকারের জন্য দাবি করেছে তখন বর্ণ হিন্দু পরিচালিত কংগ্রেস তার বিরুদ্ধাচরণ করে বলেছ, ‘মুসলমানরা স্বাধীনতা চায় না’। মুসলমানরা ফেডারেল ফর্মের সরকার দাবি করেছিল, কিন্তু কংগ্রেস এককেন্দ্রিক সরকার গঠন করার জন্য চেষ্টা চালাতে থাকল। মুসলমানরা বাংলাদেশ, পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ হলে এই কয়েকটি প্রদেশে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসাবে শাসন চালাতে পারে, এজন্য ফেডারেল ধরনের শাসনতন্ত্র দাবি করল।” (কারাগারের রোজনামচা, পৃ. ১৪০-১৪১)

বুধবার ১৩ই জুলাই ১৯৬৬

“ভারতের উচিত ছিল গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার মেনে নিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটা স্থায়ী শান্তি চুক্তি করে নেওয়া । তখন পাকিস্তান ও ভারত সামরিক খাতে অর্থ ব্যয় না করে দুই দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য অর্থ ব্যয় করতে পারত। দুই দেশের জনগণও উপকৃত হত। ভারত যখন গণতন্ত্রের পূজারি বলে নিজকে মনে করে তখন কাশ্মীরের জনগণের মতামত নিতে কেন আপত্তি করছে? এতে একদিন দুইটি দেশই এক ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হতে বাধ্য হবে।” (কারাগারের রোজনামচা, পৃ. ১৫৯-১৬০)

মঙ্গলবার ২রা আগস্ট ১৯৬৬

“আইয়ুব সাহেবের মাস পহেলা বক্তৃতা ভালভাবে পড়লাম, তবে ভারতের সাথে আলোচনা ও ফয়সালা হতে হলে কাশ্মীরের একটা সন্তোষজনক মীমাংসা হওয়া উচিত। ভালই বলেছেন তিনি। পত্রিকায় লিখেছেনঃ ‘President Ayub Khan said, without meaningful talks on the problem of Jammu and Kashmir, any treaty between India and Pakistan to resolve basic disputes would be futile.’  আমি ‘meaningful’ অর্থটা বুঝলাম না। পূর্বেও প্রেসিডেন্ট সাহেবের মুখ থেকে একথা শুনেছি। এর অর্থ কি এই হয় না যে আমাদের আর গণভোটের দাবি নাই। যদি না থাকে, তাহাও পরিষ্কার করে বলা উচিত। ভারতও তার মতের কোনো পরিবর্তন করতে রাজি নয়। কারণ, তারা জানে গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের জনগণের মতামত নিলে ভারতের পক্ষে কাশ্মীরের লোক ভোট দিবে না। তাই জুলুম করেই দখলে রাখতে হবে।…… দুই দেশের সরকার কাশ্মীরের একটা শান্তিপূর্ণ ফয়সালা না করে দুই দেশের জনগণের ক্ষতি করছেন। দুই দেশের মধ্যে শান্তি কায়েম হলে, সামরিক বিভাগের বেশি টাকা খরচ না করে দেশের উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা যেত। তাতে দুই দেশের জনগণই উপকৃত হতো। আমার মনে হয়, ভারতের একগুঁয়েমি দায়ী শান্তি না হওয়ার জন্য। ” (কারাগারের রোজনামচা, পৃ. ১৮৬)

এধরনের সম্যসা সমাধানের রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের সমালোচনা করে তিনি আরো লিখেছেন, “একই সমস্যা একই সমাধান, গুলি করা। আমরা দুইটা রাষ্ট্র পাশাপাশি। অত্যাচার আর গুলি করতে কেহ কাহারও চেয়ে কম নয়। গুলি করে গ্রেপ্তার করে সম্যসার সমাধান হবে না।” (কারাগারের রোজনামচা, পৃ. ১৫৯)

তিন ভাগে বিভাজিত কাশ্মীরে  ভূরাজনৈতিক বা অন্যান্য যে কারণই থাকুক না কেন কাশ্মীরবাসী দ্রুতই রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন থেকে মুক্তি পাবে বলে কাম্য।