ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

 

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

আমাদের সম্মানিত মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারকে আমরা সবাই দেশপ্রেমিক হিসেবেই জানি। দেশের নানান সমস্যা নিয়ে প্রায়ই কলাম লিখেন। দেশের স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে জাফর ইকবাল স্যার একজন আপোষহীন কলাম লেখক। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হয়, তাই করছি, মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখা পড়েই আমি জেনেছি দেশপ্রেম কারে কয়। ৭১ বা ৭১ পূর্ববর্তী পাকিস্তানের বৈষম্য, অত্যাচার, নিষ্ঠুরতা, পৈশাচিকতা আমি স্যারের বই পড়ে জেনেছি। কিন্তু আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কোন কথা আমি জাফর স্যারের বইতে দেখতে পাইনি। একটি বিষয় পেয়েছি, ৭১ এ তাদের মহান অবদানের কথা। কিন্তু যুদ্ধপরবর্তী ৪০ বছরের ইতিহাস শুধু মহান অবদানের নয়। এ কাহিনী লজ্জার, ঘৃণার, বৈষম্যের আর নিষ্ঠুরতার। স্যারের লেখায় এগুলো কেন আসে না? এতে স্বাধীনতা যুদ্ধের মহান অবদানের কথা ফিকে হয়ে যাবে বলে? আমাদের দেশের একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, পাকিস্তানি কিছু যুবক দ্বারা বাংলার সন্তান গগণ বেলজিয়ামে খুন হয়েছিল, দেশের জন্য প্রতিবাদ করতে গিয়ে। স্যারের লেখায় চমৎকার উঠে এসেছে। কিন্তু কেন উঠে আসেনি সে কথা, যে কথার প্রতিবাদ আমরা শুনতে চাই।

‘জীবিকার সন্ধানে বাবা-মার সঙ্গে ইট ভাটায় কাজ করতে ভারতে গিয়েছিল ১৪ বছরের কিশোরী ফেলানি। কাঁটাতারের প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে নিজ দেশে ফেরার সময় তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে বিএসএফ সদস্যরা। ফেলানি তার স্বপ্ন নিয়ে পাখির মত ঝুলে পড়ে কাঁটাতারে। চার ঘণ্টা প্রাণ নিয়ে পানি পানি বলে চিৎকার করতে থাকে ফেলানি। এক সময় কাঁটাতারে ঝুলন্ত অবস্থাতেই তার মৃত্যু ঘটে।” এসব কথা কেন লিখেননি স্যার? এতে স্বাধীনতা যুদ্ধের মহান অবদানের কথা ফিকে হয়ে যাবে বলে? বিএসএফ সদস্যরা জাওরানী গ্রামের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র বিষাদকে ৭ নভেম্বর ধরে নিয়ে। একে একে তিন মাস পার হয়ে গেল, অবুঝ শিশু বিষাদকে দেখে না মা শান্তি বালা পাগল প্রায়। সারাদিন উপোষ আর কান্নাকাটি করে নির্ঘুম রাত কাটছে হতভাগী এ মায়ের। এসব কথা কেন উঠে আসেনি স্যার? এতে স্বাধীনতা যুদ্ধের মহান অবদানের কথা ফিকে হয়ে যাবে বলে? নগ্ন করে যৌনাঙ্গে পেট্রোল ডেলে, কখনো বা নিতম্বে বিষাক্ত ইনজেকশন পুষ করে অত্যাচার নির্যাতন করে হত্যা করা হয় বাংলাদেশী নাগরিকদের এসব কেন আপনার লেখায় উঠে আসেনি স্যার? এতে স্বাধীনতা যুদ্ধের মহান অবদানের কথা ফিকে হয়ে যাবে বলে? নাকি এটা আপনি আপনার দায়িত্ব মনে করেন না? হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর সীমান্ত হল ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে বিএফএফের বিচার হওয়া উচিত। আমি শুধু মানবাধিকার ইস্যু নিয়েই কথা বলছি, সবগুলো লিখতে গেলে সময় ফুরিয়ে যাবে আমার লেখা ফুরাবেনা। ১৯৬৬ সালের ইন্টারন্যাশনাল কনভেন্ট অন সিভিল ও পলিটিক্যাল রাইটস, ১৯৮৪ সালের কনভেনশন অ্যাগেইনস্ট টর্চার নীতিমালা অনুসারে এভাবে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে হত্যা মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ এবং পশ্চিমবঙ্গের মানবাধিকার সংস্থা ‘মাসুম’-এর ‘ট্রিগার হ্যাপি’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুসারে গত ১০ বছরে সীমান্তে ভারতীয় বাহিনী বা তাদের মদদে ভারতীয় নাগরিকদের হাতে খুন হয়েছে এক হাজারের বেশি মানুষ। এসব কি আপনার লেখায় উঠে আসার জন্য যথেষ্ট নয়?

এরপরও নিশ্চুপ সরকার। উল্টো বিএসএফের হত্যা, বর্বরতা, নির্যাতনের পক্ষে বিবৃতি দিলেন সরকার ও বিএসএফ প্রধান। কোথাও আপনার লেখায় পড়েছিলাম, বাধ্য হয়ে প্রতিবাদ করার সব পথ বন্ধ হয়ে গেলে রাজনৈতিক দল গুলোকে হরতাল করতে হয় (যদিও আপনি হরতালের বিপক্ষে অনেক লিখেছেন)।

একজন হ্যাকারের প্রশ্নে আপনি বলেছেন, ‘যা তুমি প্রকাশ্যে করতে পারছ না তাই অন্যায়’। এই অন্যায়টা আমরা করতাম না যদি সরকার বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করত। আমরা নিরুপায়, তাই নিজেদের ভাষায় প্রতিবাদ করছি। আমরা এটাকে যুদ্ধ মনে করছি। আর যুদ্ধ শুরু করেছে ভারত, যুদ্ধাবস্থা ছাড়া বিনা উস্কানিতে যেদিন ভারত বাংলাদেশী নাগরিকদের খুন করা শুরু করেছে সেদিনই যুদ্ধ শুরু হয়েছে। অবশ্যই আমরা নীরবে অপ্রকাশ্যে যুদ্ধ করছি। আমাদের উদ্দেশ্য ভারতের সাধারণ মানুষসহ বিশ্ব জনমতকে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে জাগিয়ে তুলা। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে গণজাগরণ সৃষ্টি করা। এখন তা যদি অপরাধ হয়, তবে আপনি বলুন ৭১ এ কি আমরা অপরাধ করেছিলাম? অপরাধ করেছিলাম গোপনে গেরিলা যুদ্ধ করে? আজ লক্ষ কোটি যোদ্ধার প্রশ্ন আপনার কাছে, জবাব চাই।

আরিফ হোসেন সাঈদ, ০২/২০/২০১২, বাংলাদেশ।