ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

ষাটের দশকে নির্মিত হয় ডিএনডি প্রকল্প, উদ্দেশ্য ছিল কৃষিজ উৎপাদনকে সহায়তা করা। নব্বই এর দশকে এসে প্রকল্পটি পুরোই আবাসিক বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। আর বর্তমানে শুধু ডিএনডি প্রকল্প থেকে প্রতি বছর প্রায় ৩২১ কোটি ঘনফুট বর্জ্য শীতলক্ষ্যা নদীতে যোগ হচ্ছে। ডিএনডি বাঁধের অভ্যন্তরে প্রায় ১৬ লাখ মানুষ বসবাস এবং প্রতিদিন ১৬ লাখ মানুষের বর্জ্য ডিএনডি প্রকল্পে যোগ হচ্ছে। ডিএনডির অভ্যন্তরের ৩২ দশমিক ৮ কিলোমিটার এলাকায় রাজধানী ঢাকার চারটি ইউনিয়ন দনিয়া, শ্যামপুর, সারুলিয়া, মাতুয়াইল এবং নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার চারটি ইউনিয়ন কুতুবপুর, ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, গোদনাইল রয়েছে। টানা দুদিনের বৃষ্টিতেই প্রকল্প এলাকার ৭০ ভাগ মানুষের জনজীবন থেমে যায়। নিষ্কাশন খালগুলো অবৈধ দখল এবং ময়লা আবর্জনায় ভরে যাওয়াই এ অবস্থার জন্য দায়ী। ময়লা আবর্জনা ও দখলের কারণে শাখা খালগুলো সংকুচিত হয়ে গেছে। ডিএনডি প্রকল্প উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০১৩ সালের মধ্যে ২৩৮ কোটি ৩৮ লাখ ১৬ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। দিন দিন নতুন করে ভরাট হচ্ছে খাল। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এক হিসাবে দেখা গেছে, বৃহত্তর ঢাকায় স্থাপিত প্রায় চার হাজার ইটভাটা এলাকার মধ্যে ডিএনডি এলাকা রয়েছে। স্থানীয়রা জানায় “এর আগে যতবার সংস্কার করা হয়েছে তাতে কোন ফলাফল আসেনি। কারণ খাল থেকে ময়লা আবর্জনা তুলে তা খাল পাড়েই রাখা হয়। ফলে তা পুনরায় খালে চলে যায়। যার ফলে খালের প্রশস্ততা কমে গেছে। সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে খাল সংলগ্ন এলাকায় খালের পানি থেকে প্রচুর দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং খালের পানি ঘন কালো সিরাপে পরিণত হয়েছে। ডিএনডি বাঁধের ভেতর কয়েকশ ডাইংসহ কলকারখানা স্থাপিত হওয়ার কারণে বিষাক্ত দূষিত পানির পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। ১৪ হাজার ৫০০ একর আয়তনের ডিএনডি প্রজেক্টের অভ্যন্তর থেকে বিবর্ণ, পচা ডাইং এবং টেক্সটাইল মিলের বিষাক্ত বর্জ্য মিশ্রিত পানি চারটি পাম্প দিয়ে প্রতিদিন শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলা হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ী আবদুল করিম অভিযোগ করেন, ঠিকাদারেরা ভালোভাবে কাজ না করায় কিছুদিন যেতে না যেতেই পানি নিষ্কাশনের নালা ভেঙে যায়। এর ফলে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং বর্ষায় তা চরমে উঠে। এলাকাবাসীকে চলাচলে বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগ কাটাতে হয়। ডিএনডি খালের পাশের রাস্তাটি ভেঙে অনেক স্থান দিয়ে গ্যাসের পাইপ বের হয়ে পড়ায় গ্যাসলাইনটি নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কোন কোন এলাকায় চাঁদাবাজ ও দখলদারদের দৌরাত্ম্য রয়েছে। ডিএনডি বাঁধের খালের একাংশ এসব এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এসব প্রতিরোধে তাঁরা প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ দাবি করেন। বৃষ্টি হলেই খালের দুই পাড় ছাপিয়ে পানি উঠে আসে এলাকায়। খালের তলদেশ আবর্জনায় ভরাট হয়ে গেছে। আবার খাল দখল করে অবৈধ স্থাপনাও গড়ে উঠেছে। এই খালেই প্রবাহিত হচ্ছে বিভিন্ন ডাইং কারখানার শিল্প বর্জ্য। পানি ও মাটি দূষণের কারণে এলাকার জমিতে ঠিকমতো ফসল ফলানো যাচ্ছে না। দূষিত পানি ব্যবহার করে অনেকে চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে জানান। অপরিকল্পিত শিল্পায়নের কারণে শিল্প বর্জ্যে এলাকার পরিবেশ হুমকির মুখে রয়েছে। এ এলাকার খালগুলো দখল হয়ে যাওয়ায় কয়েক বছর আগে এমন জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় যে, মাসের পর মাস লাখো মানুষকে পানি বন্দি হয়ে থাকতে হয়েছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে খালের উপর অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সাথে সাথেই চিত্র পাল্টে যায়। স্থানীয়রা জানায় প্রভাবশালী বিএনপি নেতা গাজী ইসমাইল হোসেন স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতাদের সাথে যোগসাজশে ইট-সুরকি দিয়ে খাল ভরাট করে দোকান-পাট নির্মাণ করেছেন। যা তিনি ভাড়া দিয়ে অর্থ উপার্জন করছেন অথচ প্রশাসন কিছুই বলছে না। বর্তমানে গাজী ইসমাইলের মৃত্যুর পর দখল বদল হয়েছে ।

দেখে বুঝার উপায় নেই। কিন্তু এটি সেই ৬০এর দশকের কংশ নদী (ডিএনডি খালের শাখা)। বেদখল, ভরাট ও সরকারি পক্ষের ক্ষমতাবানদের আগ্রাসনে কোথাও কোথাও এখন আর খালের অস্ত্বিত্ব খুজে পাওয়া যায় না। আর কোথাও খালের প্রশস্ত ৪-৫ ফুটে নেমে আসেছে। মিজমিজি পূর্বপাড়া, বাতানপাড়া, মজিববাগ, পাইনাদী পূর্বপাড়া, সিআইখোলা, তালতলা ও মধ্যপাড়াসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে একেবেকে বয়ে যাওয়া এই দীর্ঘ খাল এখন ইতিহাস হয়ে রয়েছে।

কংশ নদী (ডিএনডি খালের শাখা) ও মূল ডিএনডি খালের সংযোগস্থল স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সেখানে মাটি ফেলে মিজমিজি পোষ্ট অফিস ও সিদ্ধিরগঞ্জ পৌর পাঠাগার করা হয়েছে। একজন এলাকাবাসীকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ''বহু বছর ধরেই তিনি এখানে পোষ্ট অফিস দেখছেন যা বর্তমানে পাকা ও স্থায়ী করা হয়েছে''।

সরকারী নিষ্কাশন খাল ভরাট করার ফলে মিজমিজি পূর্বপাড়া, বাতানপাড়া, মজিববাগ, পাইনাদী পূর্বপাড়া, সিআইখোলা, তালতলা ও মধ্যপাড়াসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হওয়ায় এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয়রা জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডে কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি জানিয়েও তারা কোন প্রতিকার পাননি। ফলে গ্রীষ্মকালে ডিএনডি এলাকার জনজীবন ও জলাবদ্ধতা আরও চরমে উঠে। দেশের সর্ব উন্নয়নের স্বার্থেই সরকারের ডিএনডি প্রকল্প উন্নয়নে মনোযোগী হওয়া উচিত। কারণ সরকারের ব্যর্থ সায়দাবাদ পানি শোধনাগারটিও এই ডিএনডি প্রকল্পের সাথে জড়িত।

(চলবে…)