ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 

অনেক দিন থেকে মনের ক্ষোভ চাপা দিয়ে রেখেছি। ভাবছি এবার এ নিয়ে কিছু লিখব। কিন্তু ক্ষোভের নিজস্ব একটা গুণ আছে। সে প্রকাশ হতে চায় না। আমার চারপাশে এতো অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলা আমি তো কতকিছু নিয়েই লিখতে পারি না। আজ লিখব আমার অহংকারের কথা। আজ লিখব মাঠে দুটি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইয়ের কথা। বাংলাদেশে এক সময় ফুটবলের জোয়ার ছিল। সেই জোয়ারের ধাক্কা আমার মধ্যেও কিছুটা লেগেছিল। আমি গ্রামের ছেলে। ফুটবল যখন খেলেছি তখন ক্রিকেট খেলা বুঝতাম না। খেলা বুঝার আগে থেকেই আমার ক্রিকেট খেলা শুরু তবে দর্শক হয়ে। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের আইসিসি ট্রফি জেতার মধ্য দিয়ে আমার ক্রিকেট দেখা শুরু হয়। প্রথমবারের মতো ১৯৯৯ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশ। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ পাকিস্তান এবং স্কটল্যান্ডকে পরাজিত করে। আস্তে আস্তে যখন খেলা বুঝতে শুরু করেছি বুঝলাম মাঠে দুটি দল খেলে জেতার জন্য আরেকটি দল থাকে দুটি দলকে নিরপেক্ষভাবে সাহায্য করার জন্য। কিন্তু সন্দেহ হতে লাগল মাঠে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ দল যে দুটি! যে দলটির নিরপেক্ষ থাকার কথা তারা বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হয়ে খেলছে। ১৫ বছর আমি ক্রিকেট দর্শক হয়ে দেখেছি মাঠে বাংলাদেশের দুটি প্রতিপক্ষ থাকে।

বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়ে বলতে গেলে বাংলাদেশ ক্রিকেটের দুর্বলতা নিয়ে বলতে হয়, প্রথমেই বলতে হবে বাংলাদেশ ক্রিকেট প্লেয়ারদের মানসিক কিছু সমস্যা আছে। তারা মনঃসংযোগ করতে পারেন না। ক্রিকেট অবশ্যই মেন্টাল গেম যদিও সব খেলাই মেন্টাল গেম। আর দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশকে দুটি দলের বিপক্ষে খেলতে হয়। আমি ক্রিকেটে দেখেছি সব ডিসিশন বাংলাদেশে বিপক্ষেই যায়। বাংলাদেশ ক্রিকেটে অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় ছিলেন এবং এখন আছেন। তাদের অনেককেই ঝরে যেতে হয়েছে দুটি পক্ষের বিপক্ষতার কারণে।

বাংলাদেশের বড় সমস্যার আরেকটি দিক হল খেলোয়াড়দের ফর্ম থাকেনা। যতগুলো প্রতিভাবান খেলোর ছিলেন বা আছেন তাদের উত্থানের দিকে অ্যাটম বোমা হিসেবে উড়ে এসেছে আম্পায়ারের ডিসিশন। ভেঙ্গে দিয়েছে মনোবল নষ্ট করে দিয়েছে কেরিয়ার। যখনই জেতার কোন সুযোগ এসেছে আবার অ্যাটম বোমা হিসেবে উড়ে এসেছে আম্পায়ারের ডিসিশন। বোলিং, ব্যাটিং সব ক্ষেত্রেই আম্পায়ারের ডিসিশন আমাদের বিপক্ষে যায়। হ্যাঁ, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডেরও অনেক ত্রুটি আছে। তারা কখনও সাহস করে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন না। তারা প্রতিবাদ করেন না। বাংলাদেশী খেলোয়াড়গণ দু একদিন চিৎকার চেঁচামেচি করে চুপ হয়ে থাকেন। ১৫ বছরের পুরনো ইতিহাসে আমরা ফিরে যাব না। কেউ google এ সার্চ করে বাংলাদেশের বিপক্ষে আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তগুলো দেখতে পারেন। বাংলাদেশের বিপক্ষে আম্পায়ারের ভূমিকা প্রমাণের জন্য সুদূর ইতিহাসে যেতে হবে না। এখন এশিয়া কাপ ১১-১২ চলছে। এতে বাংলাদেশ ১১ মার্চ পাকিস্তানের বিপক্ষে ৫০ ওভারের ডে-নাইট ম্যাচটি খেলে। পাকিস্তানের ৮ উইকেটে করা ২৬২ রান তাড়া করতে যেয়ে বাংলাদেশের শুভ সূচনা করে। সেই সাথে স্কোর বোর্ডে যখন ২৮.২ ওভারে মাত্র ৩ উইকেটে ১৩৫ রান তখন বাংলাদেশ নিশ্চিত জয়ের পথে। বহুদিন পর বাংলাদেশের দায়িত্বশীল ব্যাটিং দেখে সবাই আনন্দিত। তখন ১৩৫ রানে ২৮.৩ ওভারে তামিমের চতুর্থ উইকেটটির পতন হয়। মাঠে আসেন আরেক দায়িত্বশীল ব্যাটসম্যান মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ যখন ২১.৩ ওভারে বাংলাদেশের দরকার ১২৮ রান আর হাতে আছে ছয় ছটি উইকেট। কিন্তু তৃতীয় পক্ষ একি খেল খেললেন! নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছিল না। একটি বল যেটি লেগ স্টাম্পের বাইরে দিয়ে চলে যায় সে বল পায়ে লাগায় হাফিজের বলে কোন দ্বিধা না করে আউট দিয়ে দিলেন ইংল্যান্ডের আম্পায়ার Ian James Gould. কোন যুক্তিতেই এটাকে আউট বলা যায় না। cricinfo’র commentary থেকে মন্তব্য পাওয়া যায় “Tossed up and he shapes up to play the sweep first ball, missed, it struck him on middle and leg, it did turn down and would have slightly missed leg stump as the replays show. The umpire, however, felt otherwise” তারপর ভেঙ্গে যায় স্বপ্ন। আরেকটি স্বপ্ন। এভাবে দিনের পর দিন ভুল আম্পায়ারিং এর শিকার বাংলাদেশ প্রতিবাদ করে না। দেশের মূল কাঠামোর ছাপ যেন পড়েছে ক্রিকেটে।

মাহমুদুল্লাহর পায়ে বল লাগায় আম্পায়ার Ian James Gould'এর প্রতি এলবি আউটের আবেদন জানায় হাফিজ।

মাহমুদুল্লাহকে এলবি আউট দিচ্ছেন আম্পায়ার Ian James Gould.

এটি কোনভাবেই আউট ছিল না।

আম্পায়ার Ian James Gould এর ভূল সিদ্ধান্ত।

এশিয়া কাপে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ম্যাচে ১৬ মার্চ ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশ যখন জয় নিশ্চিত করে ফেলেছিল ঠিক তখনই তৃতীয় পক্ষ তাদের খেলা দেখাল। স্কোর বোর্ডে তখন ৩ উইকেটে ২২৪ রান ৪১.৩ ওভার। অসিনের ওভারের চতুর্থ বলটি চমৎকার ঘুরে যায় ফলে সাকিব কিছুটা পরাস্ত হয়। সাকিব দীর্ঘ একটি স্টেপের মাধ্যমে লাইনে তার অবস্থান বজায় রাখে। রিভিউতে দেখা সবগুলো এঙ্গেল থেকেই সমর্থন পাওয়া যায় সাকিব নিরাপদ অবস্থানে ছিলেন। একটি এঙ্গেলে বিতর্ক থাকে সাকিবের পা লাইনে ছিল কিনা তারা নিশ্চিত হতে পারেননি। সেক্ষেত্রে এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি ব্যাটসম্যানের পক্ষেই যায়। কিন্তু সব নিয়ম নীতি ছাড়িয়ে সাকিব আউট হয়ে গেলেন। ক্রিকেটের ইতিহাসে বাংলাদেশের বিপক্ষে আরও একটি ভুল সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের কোটি ক্রিকেট প্রাণে রক্তক্ষরণ ঘটালো।

আম্পায়ার Ruchira Palliyaguruge এর ভূলের শিকার সাকিব আল হাসান।

গত ১৬ই মার্চ ভারত-বাংলাদেশের ম্যাচে সাকিবকে অপ্রচলিত বিতর্কিত আউটের রায় দেন শ্রীলংকান থার্ড আম্পায়ার Ruchira Palliyaguruge. এ বিষয়ে cricinfo’এর commentary থেকে বলা হয়, “41.5 81.7 kph, Tough call for the umpire! Ashwin gets some sharp turn that beats the left-hander, Shakib was a long way forward, Dhoni was very confident, and I think Shakib was a touch unlucky here! The benefit of the doubt should have gone to the batsman, a part of his boot was on the line but one angle suggested a part of it was behind the crease when the bail was off the groove, Bangladesh have to move on now 224/4”
সাকিবের আউট প্রসঙ্গে ১৬ই মার্চ ধারাভাষ্যকার চৌধুরী জাফর উল্লাহ শরাফত বলেন, একজন ব্যাটসম্যান আউট না হলে তাকে আউট দিতে হবে এটা ক্রিকেটের কোন অভিধানে লেখা আছে। এ সময় তিনি শ্রীলংকান আম্পায়ার আশোকা ডি সিলভা সম্বদ্ধে বলেন, তিনি একসময় বাংলাদেশের নুন খেয়েছিলেন। বাংলাদেশ দলের বিপক্ষে অসংখ্য ভুল আউট দেয়ার সিদ্ধান্তের জন্য তিনি তার সমালোচনাও করেন।
এ ম্যাচে ভারতের ইনিংসের ৬ষ্ঠ ওভারের শেষ বলে শফিউল ইসলামের একটি বল সরাসরি কোহলির পেছনের পায়ে গিয়ে আঘাত করে। যা খুবই ক্লোজ ছিল। স্বাভাবিকভাবে দেখেই বলে দেয়া গেছে এটি শতভাগ আউট দেয়ার পক্ষে। এ সময় কোহলির লেগবাই আউটের জন্য জোরালো আবেদন করা হয়। রিপ্লেতে দেখা যায় সরাসরি মিডল স্টাম্পে আঘাত করে। যা আম্পায়ারের কাছে আউট মনে হয়নি। cricinfo’র commentry তে বলা হয়, “5.6 Shafiul Islam to Kohli, no run, 132.5 kph, big appeal for an lbw and that looked close! Nips this back in sharply and hits his back leg on the drive, perhaps that was too high, need to see another replay”

কিন্তু এত কিছুর পরও বিজয় আমাদেরই। এই বিজয়ে চাপা পরে যেতে পারে সব বিতর্ক। খেলার পর বাংলাদেশের বিপক্ষে দেয়া সব বিতর্কিত সিদ্ধান্তই চাপা পরে যায়। কিন্তু সে দলটি যখন ভারত বা অস্ট্রেলিয়া বা অন্য কোন দেশ হয়? তখন এটা নিয়ে এত বেশি হইচই হয় যে ক্রিকেট বিশ্ব নড়েচড়ে বসেন। জরিমানা করা হয় সতর্ক করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় আমাদের দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হয়। এ যেন আমাদের নিয়তি। এ বিষয়ে মাথা ঘামাবার মত মাথা আমাদের ক্রিকেট বোর্ডের নেই।

আরিফ হোসেন সাঈদ
০৩/১৭/১২, নারায়ণগঞ্জ।