ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 

পুরো এশিয়া-কাপ জুরে ছিল ব্যাড-আম্পায়ারিং এর ছড়াছড়ি। তা চূড়ান্ত-পর্যায়ে নিয়ে গেল ফাইনাল ম্যাচের আইজাজ চিমা-মাহমুদুল্লাহ সংঘর্ষের বিতর্কিত ডিসিশনটি। প্রসঙ্গ ২২ মার্চ ২০১২ এ অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-পাকিস্তানের এশিয়া-কাপ ফাইনাল ক্রিকেট ম্যাচ। ৫০ তম ওভারের প্রথম বলে পাকিস্তানের পেসার আইজাজ চিমা বাংলাদেশী ব্যাটসম্যান মাহমুদুল্লাহকে অবৈধভাবে বাধা দিয়ে ক্রিকেট ইতিহাসে আরেকটি কলঙ্কের জন্ম দেন। যা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের অভিযোগের কারণ।

cricinfo’এর মতে অভিযোগটি হল, “The incident, during the first ball of the 50th over, involved a collision between the bowler Aizaz Cheema and Mahmudullah as the latter tried to come back for a second run – something the BCB claims the Pakistan bowler did deliberately.”

ঢাকায় বিসিবি থেকে এনায়েত হোসেন সিরাজ বলেন, “আমরা ঐ ভিডিওটি বার বার দেখেছি যেখানে আইজাজ চিমা মাহমুদুল্লাহকে ইচ্ছাকৃত ভাবে বাধা দেয়”

যেহেতু আম্পায়ারের কাছে আবেদন করে বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা পায়নি তাই তিনি এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের কাছে আপিল করার কথা বলেন। আপিলের একটি কপি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে পাঠানোর কথাও বলেন তিনি।

cricinfo’তে বলা হয় “We have seen video footage of the incident repeatedly. It is clear that Cheema blocked Mahmudullah deliberately,” Enayet Hossain Siraj, the chairman of the BCB cricket operations committee, told reporters in Dhaka. “We will lodge a written appeal with the ACC very soon and will also give a copy to the ICC.”

ক্রিকেট আইনের (42.4- Deliberate attempt to distract striker) ধারা অনুযায়ী যদি ফিল্ডিং সাইডের কোন সদস্য কোন ব্যাটসম্যানকে রান নেয়ার সময় বা রানের প্রস্তুতি নেয়ার সময় বাধা দেয়ার জন্য ইচ্ছাকৃত ভাবে তার মনঃসংযোগ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করে তবে এটি একটি সুস্পষ্ট অপরাধ হবে।

ক্রিকেট আইনের (42.5- Deliberate distraction or obstruction of batsman) ধারা অনুযায়ী যদি কোন ব্যাটসম্যান বল পাওয়ার পর ফিল্ডিং সাইডের কোন সদস্যের কথা বা কাজের মাধ্যমে ইচ্ছাকৃত ভাবে বাধা প্রাপ্ত হয় বা তার মনঃসংযোগ বিচ্ছিন্ন হয় বা বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করা হয় তবে এটি একটি সুস্পষ্ট অপরাধ বলে বিবেচিত হবে (42.4 ধারা সহ)।

ক্রিকেট আইনের ৪২.৫ ধারা অনুযায়ী
ক) এ ব্যাপারে যেকোনো একজন আম্পায়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে আসলে এতে ইচ্ছাকৃত ভাবে মনোযোগ আকর্ষণ করা বা পথে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছিল কিনা।
খ) যদি কোন আম্পায়ার মনে করে যে ফিল্ডিং পক্ষের কোন সদস্য ইচ্ছাকৃত ভাবে মনোযোগ আকর্ষণ করার মত বা পথে বাধা সৃষ্টি করার মত কিছু ঘটিয়েছে বা তা ঘটানোর চেষ্টা করেছে তবে তাকে,
১. সাথে সাথে ডেকে ডেড বলের সঙ্কেত দেয়া হবে।
২. কেন ডাকা হয়েছিল তা ফিল্ডিং সাইডের অধিনায়ককে এবং অন্য আম্পায়ারকেও জানানো হবে
৩. ঐ বলে কোন ব্যাটসম্যানকে আউট দেয়া হবে না।
৪. এই অপরাধের জন্য ব্যাটিং সাইডে ৫ রান যুক্ত করা হবে (42.17- ‘Penalty runs’ এ বিস্তারিত)। এক্ষেত্রে ব্যাটসম্যান যে রানের জন্য কল করেছিল সে রানটি পূর্ণ করতে না পারলেও তা গণনা করা হবে (১৮.১১ এ ডেড বলের জন্য রানের ধারা বলা আছে)
৫. বোলিং প্রান্তের আম্পায়ার বোলিং সাইডের অধিনায়ককে এই আইনগত পদক্ষেপ নেয়ার কারণটি বুঝিয়ে বলবেন এবং যখনই সম্ভব হয় বেটিং সাইডের অধিনায়ককে ও বিষয়টি জানাবেন।
৬. ওভারের ঐ বলটি কাউন্ট করা হবে না।
৭. উইকেটে থাকা ব্যাটসম্যানরা সিদ্ধান্ত নিবেন তাদের মধ্যে কে পরবর্তী বল মোকাবেলা করবেন।
৮. আম্পায়ারগণ ঘটনাটি যথা শীঘ্র সম্ভব ফিল্ডিং সাইডের নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানাবেন এবং ম্যাচে দায়িত্ব প্রাপ্ত ম্যাচ রেফারিকে ও জানাবেন যিনি সঠিকভাবে বিবেচনা করে অধিনায়কের অধীনস্থ উক্ত খেলোয়াড় বা খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবেন।

এ ব্যাপারে ভিডিও ফুটেজটি দেখে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই যে আইজাজ চিমা ইচ্ছাকৃত ভাবে মাহমুদুল্লাহকে বাধা দেয়। আমরা ভিডিও ফুটেজে দেখতে পাই, সংঘর্ষের পরপরই ব্যাটসম্যান মাহমুদুল্লাহ আম্পায়ারকে বিষয়টি অবহিত করে অভিযোগ করেন। ভিডিও ফুটেজে দেখতে পাই, অভিযোগের প্রেক্ষিতে আম্পায়ার পেসার আইজাজ চিমাকে সতর্ক করে দেন এবং আইজাজ চিমা আম্পায়ারের অভিযোগটি স্বীকার করে নমনীয়তা প্রকাশ করেন। তারপর আম্পায়ার স্টিভ ডেভিস মাহমুদুল্লাহর সঙ্গে কথা বলেন এবং তখন ইচ্ছাকৃত ভাবে বাধাদানের জন্য ব্যাটসম্যান মাহমুদুল্লাহ মধ্যে আপত্তির ছাপ লক্ষ করা যায়।

পঞ্চাশতম ওভারে প্রথম বলের ধারা বিবরণী,
49.1 Aizaz Cheema to Mahmudullah, 1 run, 135.7 kph, leading edge, tried to shuffle across and paddle it over short fine, went instead to third man, just the single
Mahmudullah ran into the bowler on the attempted second run, the umpire had a word with both. 8 off 5 to win –cricinfo
cricinfo’তে বলা হয়, “in this case, after the players had collided, the umpire Steve Davis was seen having a word with both players.”
দৈনিক ডেসটিনির মতে, “ফাইনালে শেষ ওভারের প্রথম বলটি করার পর রান নেওয়ার সময় মাহমুদুল্লাহ রিয়াদকে ইচ্ছাকৃত ভাবে বাধা দেন আইজাজ চিমা। বিষয়টি তাৎক্ষণিক ভাবে মাঠের আম্পায়ারদের জানান রিয়াদ। বাংলাদেশ সহ-অধিনায়কের সমর্থনে চিমাকে সতর্ক করে দেন আম্পায়ার।”

কিন্তু এটিই কোন সমাধান নয়। দৈনিক ডেসটিনির মতে, “তবে এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সতর্কবাণী সমাধান নয়, সরাসরি শাস্তির বিধান রয়েছে ক্রিকেট আইনে।”
এ বিষয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন দৈনিকে ক্রিকেট সমালোচকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জোরালো আবেদনের দরকার ছিল। জোরালো আবেদন হয়নি বলে বিষয়টি আম্পায়ারের দৃষ্টিগোচর হয়নি।

দৈনিক ডেসটিনিতে এটি আম্পায়ারের ভুল বলে অভিহিত করে বলা হয়, “কিন্তু আম্পায়ারের এ ভুল তৎক্ষণাৎ ধরিয়ে দেননি কেউ। টিম ম্যানেজমেন্টও বিষয়টি বুঝে উঠতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ফাইনাল ম্যাচ শেষ হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার পর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে এসিসিকে জানায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। এর একটি কপি পাঠিয়ে দেওয়া হয় আইসিসির বরাবরও।”

ফিল্ড আম্পায়াররা ঘটনাটি নিয়ে কোন রিপোর্ট না করায় বাংলাদেশের আবেদনটি বাতিল হয়ে যায়। মাঠে ব্যাটসম্যানরা আম্পায়ারের কাছে বিষয়টি নিয়ে জোরালো আপিল করলে বিষয়টি অন্যরকম হতে পারত। এ ক্ষেত্রে ক্রিকেট আইনের ৪২.৫ ধারাটি কাজে লাগাতে পারত বাংলাদেশ।
তবে এগুলো হচ্ছে আম্পায়ারের বিভিন্ন দুর্বলতার কথা। আর জোরালো আবেদনের বিষয়টিও নিতান্তই আপেক্ষিক। যেখানে ইচ্ছাকৃত ভাবে বাধার শিকার মাহমুদুল্লাহ নিজেই আম্পায়ারের কাছে আবেদন করেন সেখানে আইনে এই ত্রুটি গ্রহণযোগ্য নয় যে জোরালো আবেদনের প্রয়োজন ছিল।

কিন্তু বিসিবির এই আপিলটি এসিসি নাকচ করে দেয়। এ প্রসঙ্গে এসিসির পক্ষ থেকে এসিসি প্রধান সৈয়দ আশরাফুল হক বলেন, আম্পায়ারদের পক্ষ থেকে কোন ফর্মাল রিপোর্ট না দেয়ার কারণে এই বিষয়টি মাঠেই শেষ হয়ে গেছে

এএফপিকে তিনি বলেন, আম্পায়ারদের পক্ষ থেকে কোন রিপোর্ট না দেয়ায় বাংলাদেশের অভিযোগটি পাওয়া সত্ত্বেও এসিসির কিছুই করার নেই।
হক বলেন যে,বিসিবির আপিলের আর সুযোগ নেই। -cricinfo

সৈয়দ আশরাফুল হক আরো বলেন যে, মাঠেই আম্পায়ার বা ম্যাচ রেফারি এ ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। তারা তা না নেয়ায় বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ মাঠে আবেদন করেও কোন বিচার পেল না যেখানে একটি নির্দিষ্ট আইন রয়েছে। তারপর আপিল করেও কোন ফলাফল পেল না, কারণ আম্পায়ার বা ম্যাচ রেফারি বিষয় এসিসিকে অবহিত করেনি।
আমার কাছে এসিসির বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ আম্পায়াররা বাংলাদেশকে বঞ্চিত করেছে বলেই তো বাংলাদেশ এসিসির কাছে আপিল করেছে। সেখানে আপিলে এই কথা বলার কোন অর্থ হয় না যে, “এটি আম্পায়ারের বিষয়”

ক্রিকেট আইনের ৪২.৫ ধারায় বলা আছে, law 42.5 deliberate distraction or obstruction of batsman – in addition, the umpire shall report the incident to the ICC match referee under the ICC code of conduct.

দৈনিক ডেসটিনিতে বলা হয়, “এশিয়া কাপ চ্যাম্পিয়ন খেতাব ছিনিয়ে আনতে নয়, ফাইনালে আইজাজ চিমার কেলেঙ্কারি স্রেফ জানিয়ে রাখার জন্য এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলকে অবহিত করেছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। তবে সে আবেদনটি নাকচ করে দিয়েছে এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল।”

এই দৈনিকে আরো বলা হয়, “তবে বাংলাদেশ শুধু ছোট দল হিসেবে তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের বিষয়টি তুলে ধরতেই এ অভিযোগ জানিয়েছিল।”
তা হলে এর দায় কে নেবে? আম্পায়ার বা ম্যাচ রেফারি? তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কি পদক্ষেপ নেয়া হবে। নাকি তারা সকল বিচারের ঊর্ধ্বে?
তবে এই আপিলকে ঘিরে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড থেকে বেশ কিছু মন্তব্য পাওয়া গেছে।

নিউজিল্যান্ড ভিত্তিক একটি সংবাদ সংস্থাকে পিসিবি’র সিইও সুবহান বলেন, “বাংলাদেশের দেরিতে প্রতিক্রিয়া জানানো আমাদের বিস্মিত করেছে। যদি ম্যাচে কোন কিছু ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকতো তাহলে ম্যাচ অফিসিয়ালরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারতেন। আমরা যেটা বুঝে উঠতে পারছি না সেটা হচ্ছে, বাংলাদেশ বোর্ড কেন এত দেরিতে প্রতিক্রিয়া জানালো।”

বার্তা সংস্থা সিনহুয়াকে ইন্তেখাব বলেন, “এমন একটি ম্যাচে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়। বিসিবি’র এ আবেদন আমরা কল্পনাও করিনি। ম্যাচটিতে ম্যাচ-রেফারি বা আম্পায়ারও কোন অভিযোগ তোলেননি। সুতরাং বাংলাদেশের এমন আপত্তির পেছনে শক্তিশালী কোন যুক্তি নেই।” এবং বাসিত আলী সিনহুয়াকে বলেন, “আসলে এশিয়া কাপের ফাইনাল ম্যাচে কোন সমস্যা নেই। এই ম্যাচের ফলাফলে আপত্তি তুলে বাংলাদেশ আমাদের পরিষ্কারভাবে একটি বার্তা দিয়েছে, তা হলো—নানা কৌশলে পাকিস্তান সফর বাদ করতে চাইছে তারা”

আরিফ হোসেন সাঈদ,
০৩/২৮/১২